ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ

রাখাইন স্টেট মিয়ানমারের একটি রাজ্য। এর পূর্বনাম আরাকান। রোহিঙ্গা মুসলিম অধ্যুষিত এই আরাকান অঞ্চলটি যেনো এক মৃত্যুপুরী। দেশটির সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপর দমন-পীড়ন শুরু করে গ্রামের পর গ্রামে আগুন জ্বালিয়ে রোহিঙ্গাদের বসতবাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে। নির্বিচারে হত্যা করেছে নারী, শিশু, বৃদ্ধসহ অসংখ্য রোহিঙ্গা মুসলমানকে। বাড়ি থেকে রোহিঙ্গা মহিলাদেরকে তুলে নিয়ে গিয়ে অমানবিকভাবে ধর্ষণ শেষে হত্যা করা হয়। ২০১৬-১৭ সালের তাদের নির্যাতনের মাত্রা এতোটাই ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছিলো যে, পোড়া বসতবাড়ির ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে পোড়া লাশের উৎকট গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছিলো। উপায়ন্ত না পেয়ে দশ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা মুসলমান বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণ করেছে। অনেকে জীবন বাঁচানোর জন্যে পালিয়ে যাওয়া রোহিঙ্গাদেরও দেখামাত্রই গুলি করে হত্যা করছে দেশটির সেনাবাহিনী। কোন ধরনের মিডিয়াকর্মীকে সে সব এলাকায় প্রবেশ করতে দেয়া হয় না। মানবিক বিপর্যয়ের এক জ¦লন্ত অগ্নিপুরীতে পরিণত হয়েছে রোহিঙ্গাদের বসতভিটে। অথচ তারা আরাকানেরই মূলজনগোষ্ঠী, জন্মগতভাবেই আরাকানের নাগরিক, তাদের হাতেই পরিপুষ্টি অর্জন করেছে আরাকনের ইতিহাস ঐতিহ্য। তারাই আরাকানের প্রথম বসতি স্থাপনকারী মূল ধারার সুন্নী আরব মুসলমান। আরাকান রাজ্যের মুসলিম সংস্কৃতি ও ইতিহাস ঐতিহ্যের ধারক-বাহক হিসেবে রোহিঙ্গাদের ভূমিকাই ছিল প্রধান। রোহিঙ্গাদের কেউ হাজার বছর, কেউ পাঁচ শতাধিক বছর আর কেউবা কয়েকশত বছর ধরে সেখানে বসবাস করছে। মধ্যযুগের আরাকানের প্রশাসনে তাদেরই প্রাধান্য লক্ষনীয়। তাদের হাতেই মধ্যযুগে বাংলাসাহিত্য উৎকর্ষ সাধিত হয়েছিল। কবি দোলৎকাজী, মহাকবি আলাওল, কবি মরদনসহ মধ্যযুগের শক্তিমান কবিরা বাংলা সাহিত্যের বিকাশ ঘটিয়েছেন আরাকানে বসে।

মাহকবি আলাওল

ভাগ্য বিড়ম্বিত কবি আলাওল (১৬.৭-১৬৮০ খ্রি.) ছিলেন একজন বহু ভাষাবিদ, মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠকবি, সুপণ্ডিত, অনুবাদক, সঙ্গীতজ্ঞ, রাগতাল বিশেষজ্ঞ, সুফিতাত্ত্বিক, বৈষ্ণবপদ রচয়িতা, অষ্টমহাগণতত্ত্ব বিচারক ও সর্বোপরি আল্লাহ প্রেমিক একজন আদর্শ মুসলমান কবি। তিনি আনুমানিক ১৬০৭ খ্রিস্টাব্দে ফতেয়াবাদ অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন। আলাওলের পিতা ছিলেন এ ফতেহাবাদ পরগনার পরাক্রান্ত জায়গীরদার মজলিশ কুতুবের অমাত্য। তিনি উক্ত মহাল তত্ত্বাবধান করতেন। এ জালালপুরেই কবির জন্ম হয়। কবি ফতেয়াবাদে থাকতেই বিভিন্ন ভাষায় পাণ্ডিত্য অর্জন করেন এবং কোন এক কাজের জন্য নদী পথ ধরে যাবার সময় ‘হার্মাদ’ (পর্তুগিজ) জলদস্যুদের কবলে পড়ে তার পিতা শহীদ হলেও আলাওল কোন রকমে রক্ষা পেয়ে আরাকানে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করেন। অশ্ব চালনার যোগ্যতা থাকার সুবাদে তিনি আরাকানে অশ্বারোহী সৈন্য পদে চাকরি পান। আলাওল এ ছোট চাকরি গ্রহণ করে নিজের পরিচয় গোপন রেখে চাকরি জীবন চালালেও অচিরেই তাঁর প্রতিভার প্রকাশ ঘটে। ফলে আরাকানের মুসলিম মন্ত্রী এবং পাত্র-মিত্ররা তাঁর গুণের পরিচয় পেয়ে তাদের সন্তানদের শিক্ষাদানের জন্য তাঁকে নিযুক্ত করেন। সঙ্গীত বিশেষজ্ঞ হবার কারণে তাঁর কদর আরও বেড়ে যায়। ফলে অনেক উচ্চ পদস্থ মহৎ লোকজনও তাঁকে গুরু বলে মেনে নেয়। পরবর্তীতে তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতাতেই ১৬৫১ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৬৭৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যেই তাঁর কাব্যসমূহ রচনা করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হচ্ছে-

ক. পদ্মাবতী

আলাওলের প্রথম ও শ্রেষ্ঠকাব্য পদ্মাবতী। আরাকানরাজ থদো মিংদারের (১৬৪৫-১৬৫২ খ্রি.) শাসনামলে রাজসভার প্রভাবশালী অমাত্য ও কবি কোরেশী মাগন ঠাকুরের অনুরোধে ১৬৫১ খ্রিস্টাব্দে কবি এ ‘পদ্মাবতী’ কাব্যটি রচনা করেন। হিন্দি কবি মালিক মুহাম্মদ জায়সীর ‘পদুমাবৎ’ নামক কাব্যটিরই ভাবানুবাদ। তবে ঘটনার বিবরণীতে অনুকরণ থাকলেও কাব্যের বিভিন্ন অংশে তাঁর স্বকীয়তার প্রমাণ বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। জায়সীর ‘পদুমাবৎ’ ফারসি মসনবী রীতিতে রচিত পক্ষান্তরে আলাওল বাংলা পাঁচালী কাব্যের রীতিতে পদ্মাবতী অনুবাদ করেন। সেইসাথে তিনি নাগমতি, ‘বারমাসী ও পদ্মাবতীর রূপচর্চা’ খণ্ড দুটি সংক্ষিপ্ত করে কুকুনুছ পক্ষীর বিবরণ, পদ্মাবতী-রত্নসেনের বিবাহ বর্ণনা, বাদলের পত্নী প্রসঙ্গে রাজপুত গউনা প্রথার বিবরণ এবং গোরা বাদল যুদ্ধ বর্ণনাসহ ৪টি খণ্ডের বিস্তৃতি সাধন করেছেন। পদ্মাবতী আলাওলের অনুবাদ কাব্য হলেও এর মধ্যে স্বকীয়তাকে ফুটে তোলার চেষ্টা করে তিনি সফল হয়েছেন। এ কাব্যে স্তুতি খণ্ড, হযরতের সিফতের বিবরণ এবং চার আছহাবের কাহিনী, রোসাঙ্গ বর্ণনা, সৎকীর্তি মাগনের প্রশংসা, আত্ম পরিচয়সহ বিভিন্নস্থানে তিনি স্বকীয়তার সার্থক চিত্র অংকন করতে সক্ষম হয়েছেন। এ সব স্থানে তিনি যেমন বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটিয়েছেন তেমনি আরাকানের সমাজ-সংস্কৃতিরও চিত্র অংকন করেছেন।

কবি আলাওলের পদ্মাবতী কাব্যের সূচনা পর্বে যেমন তাঁর আল্লাহর একত্ববাদের ক্ষেত্রে অটুট বিশ্বাস এবং কুরআন-হাদিস সম্পর্কে গভীর জ্ঞানের পরিচয় মেলে তেমনি আরাকানের প্রশাসন ও সমাজ জীবনেও ইসলামের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। রোসাঙ্গ বর্ণনা অংশে কবি আরাকানের রাজার প্রশংসা করতে গিয়ে আরাকানে আগত বিদেশীদের চিত্রও অংকন করেন। এর মধ্য দিয়ে মুসলিম প্রভাবেরও তথ্য বেরিয়ে আসে। বিশেষত ‘সৎকীর্তি মাগনের প্রশংসা’ অংশে কবি আরাকানের অমাত্যসভা কর্তৃক মুসলমানদের জ্ঞান চর্চা ও তাদের পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে ইসলামের প্রভাব বিশ্লেষণের প্রয়াস পেয়েছেন। কবির ভাষায়-

ওলামা সৈদ শেখ যত পরদেশী

পোষন্ত আদর করি বহু স্নেহবাসি ॥

কাহাকে খতিব কাকে করন্ত ইমাম

নানাবিধ দানে পুরায়ন্ত মনস্কাম ॥

কিংবা;

বহু মুসলমান সব রোসাঙ্গে বৈসেন্ত

সদাচারী কুলীন পণ্ডিত গুণবন্ত ॥

উপরোদ্ধৃত পঙক্তিসমূহে দেখা যায় যে, আরাকানের রাজধানীতে হাজারো কুলীন পণ্ডিত ও গুণী ব্যক্তিদের ভিড় লক্ষ্যণীয়। এদের মধ্যে ওলামা, সৈয়দ, শেখ প্রভৃতি যারা বিদেশী ছিলেন কিংবা স্বদেশী ছিলেন সবাইকে মুসলিম অমাত্যগণ বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত করে রাজ্যের উন্নতি যেমন নিশ্চিত করেছেন তেমনি আরাকানি প্রশাসনে মুসলমানদের প্রভাব প্রতিপত্তি ও মর্যাদাকে নিশ্চিত করেছেন। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রেক্ষিতে আরাকান রাজসভায় বিদেশী মুসলিম-অমুসলিম লোক আরাকানে একত্রিত হয়ে আরাকানি সমাজ ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছেন। বিশেষত আরাকানে ইসলামের প্রসার ও প্রভাব বিস্তারে তাদের অবদান ছিল অনস্বীকার্য।

খ. সতী ময়না-লোর চন্দ্রানী

মহাকবি আলাওল আরাকানের রাজা সান্দা থু ধম্মার (১৬৫২-১৬৮৪ খ্রি.) শাসনামলে আরাকানের সৈন্যমন্ত্রী মুহাম্মদ সোলায়মানের পৃষ্ঠপোষকতায় দৌলত কাজী রচিত অসমাপ্ত সতী ময়না ও লোর চন্দ্রানী কাব্যটি সমাপ্ত করেন। কবি আলাওল গতানুগতিক ধারায় শুরুতে ‘স্রষ্টার বন্দনা’ রচনা করেন। এর মধ্যে মহান আল্লাহর সৃষ্টিতত্ত্ব ও তার প্রশংসা যেমন করা হয়েছে তেমনি তারই প্রেরিত শ্রেষ্ঠ রাসুল হিসেবে হযরত মুহাম্মদ (স.) এরও বন্দনা-প্রশংসা করা হয়েছে। আল্লাহ ও রাসুল (স.) এর প্রশংসার পরই দৌলত কাজী কর্তৃক সতী ময়না, লোর চন্দ্রানী’র রচনা ও আশরাফ খান কর্তৃক পৃষ্ঠপোষকতার বিবরণ দেয়া হয়েছে। অতঃপর আত্মবিবরণী অংশে কবি স্বীয় জীবনের দুর্দিনের ইতিবৃত্ত টেনে দৈবক্রমে আরাকান পৌঁছার বিবরণ দেন। কাব্যটি আলাওলের খণ্ডিত হলেও তার ‘বন্দনা ও আত্মবিবরণী’ এবং ৩য় খণ্ডে মিলনের মাধ্যমে সমাপ্তি টানা সত্যিকার অর্থে তার দক্ষতার পরিচয় পাওয়া যায়। সেইসাথে সমকালীন আরাকানের প্রশাসনে মুসলিম প্রভাব ও উদার নৈতিক মূল্যবোধ এ কাব্যের মাধ্যমে ফুটে উঠেছে। মূলত এটি ছিল কবির মৌলিক রচনা।

গ. সয়ফুল মুলুক বদিউজ্জামাল

কবি আলাওল আরাকানের রাজা সান্দা থু ধম্মার শাসনামলে স্বীয় প্রধান অমাত্য মাগন ঠাকুরের পৃষ্ঠপোষকতায় সয়ফুল মুলক বদিউজ্জামাল নামক বিখ্যাত প্রণয়োপখ্যানটি রচনা শুরু করেন। কিন্তু ১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দে মাগন ঠাকুরের আকস্মিক মৃত্যু হলে পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে কবি গ্রন্থটি অসমাপ্ত রাখেন। অতঃপর প্রায় দশ এগার বছর পর আরাকানের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী সৈয়দ মুসার অনুরোধ ও প্রতিপোষনে তিনি এ কাব্যের শেষাংশ রচনা সমাপ্ত করেন। কবি আলাওল পূর্ববর্তী কাব্যসমূহের নিয়মেই কাব্যের সূচনায় হামদ ও নাত অংশে মহান আল্লাহর অপরিসীম গুণকীর্তন, সৃষ্টি মহিমাসহ রাসুল হযরত মুহাম্মদ (স.) এর জন্ম মহিমার কথাও বর্ণনা করেছেন। কবির রচিত হামদ-নাত অংশের চরণসমূহে কবির অন্তরাত্মার লালিত ইসলামের সুমহান আদর্শ, বিশ্বাস অনুভূতি, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও ভাবৈশ্বর্য ফুটে উঠেছে। কিন্তু এর শব্দ প্রয়োগে এবং ভাষায় ভঙ্গিতে আরবি-ফারসি প্রয়োগের পরিবর্তে দেশীয় উপকরণকে কাজে লাগিয়েছেন।

ঘ. সপ্তপয়কর

কবি আলাওল ১৬৬৩ খ্রিস্টাব্দে আরাকানের মুখ্য সেনাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ খানের আদেশ ও পৃষ্ঠপোষকতায় সপ্তপয়কর কাব্যটি রচনা করেন। এটি বিখ্যাত ফারসি কবি নিজামী গজাবী’র ‘হপ্তপয়কর’ কাব্যের স্বাধীন অনুবাদ। এ কাব্যে আরব-আজমের অধিপতি নোমানের পুত্র বাহরামের বীরত্বসূচক বিভিন্ন ঘটনা ও সাত রাজ্যের সাতজন রাজকন্যার সাতটি গল্প কাহিনী ফুটে উঠেছে। সপ্তপয়কর কাব্যটি কবি আলাওলের অনুবাদ কাব্য হলেও তা যেমন ছিল স্বাধীন তেমনি তিনি মূল কাহিনীর কিছু কিছু প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাহিনীকে সংক্ষিপ্ত করেছেন। কবি নিজামী এবং কবি আলাওল উভয়ই একনিষ্ঠ মুসলমান হবার কারণে ইসলামি সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক যেমন অক্ষুণ্ন রয়েছে তেমনি আলাওলের অনুবাদে ইরানী ও ভারতীয় ঐতিহ্য যুক্ত হয়ে কাব্যের ভাষারস আরও নান্দনিক রূপ লাভ করেছে। সুতরাং কবি তাঁর কাব্যে এ ধরনের শব্দ প্রয়োগের মধ্য দিয়ে ইসলামের ঔদার্যকেই সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন।

ঙ. তোহফা

তোহফা মহাকবি আলাওলের একটি অন্যতম বিখ্যাত ও উপদেশমূলক কাব্যগ্রন্থ। এটি দিল্লীর শেখ ইউসুফ গদার ইসলামি শরিয়ত সংক্রান্ত ফারসি ভাষায় রচিত ছন্দবদ্ধ একটি উপদেশগ্রন্থ ‘তোহফাত-উন- নাসাঈ’ এর স্বাধীন অনুবাদ। গ্রন্থটি ১৬৬৩-৬৪ খ্রিস্টাব্দে কবি আলাওল আরাকানের মহামাত্য মুহম্মদ সোলায়মান এর আদেশে এর কাব্যানুবাদ তোহফা নামে সম্পন্ন করেন। কাব্যটি আলাওলের অনূদিত কাব্য হলেও অন্যান্য কাব্যের মত এখানেও তিনি অনুবাদের ক্ষেত্রে স্বাধীনতা রক্ষা করেছেন।

তোহফা মূলত মুসলমানদের শরিয়াহভিত্তিক জীবন যাপনের কতিপয় মৌলিক বিধানকে সামনে রেখে রচনা করা হয়েছে। তোহফা শরিয়তের বিধান সম্বলিত গ্রন্থ হলেও এতে যেমন বাচনভঙ্গির সরসতা আছে তেমনি বাকপটুতা ও শাস্ত্রনীতির মৌলিক বিন্যাসও অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী। তিনটি মৌলিক বিষয় উঠে এসেছে এ কাব্যে। প্রথমত, ইসলামি শরিয়াহ বিধান, দ্বিতীয়ত, পারিবারিক জীবন বিষয়ক, তৃতীয়ত, সামাজিক লেনদেন তথা সমাজ বিষয়ক। উল্লেখ্য, কাব্যে বর্ণিত বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিভংগীর প্রতিফলন ঘটলেও সঙ্গীত শোনা, নৃত্য, সময়ের শুভাশুভসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক লৌকিক আচার-আচরণ ও উপস্থাপিত হয়েছে। কবি সাহিত্যিকগণ যে সামাজিক ও লৌকিক আচার-আচরণের ঊর্ধ্বে নয় এ সবের বর্ণনার মধ্য দিয়ে কবি তাও প্রমাণ করেছেন। সেইসাথে এ গ্রন্থের লোকাচার বিষয়ক বিধি নিষেধের আড়ালে তৎকালীন আরাকানের নৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনচিত্রও অনুমান করা যায়।

চ. সিকান্দরনামা

সিকান্দরনামা আলাওলের শেষ কাব্যগ্রন্থ। এটি ফারসি কবি নিযামী গঞ্জাবী রচিত ইস্কান্দরনামা কাব্যের ভাবানুবাদমূলক কাব্য। কবি আলাওল আরাকানের রাজা থিরি থু ধম্মার (১৬৫২-৮৪ খ্রি.) প্রধান অমাত্য নবরাজ মজলিসের আদেশ ও পৃষ্ঠপোষকতায় ১৬৭১ থেকে ১৬৭৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এটি রচনা করেন। অনূদিত কাব্য হলেও এটি যেমন ছিল স্বাধীন ও ভাবানুবাদ তেমনি কাব্যের বিভিন্নস্থানে নিজস্ব রচনাও বিদ্যমান। দ্বিগ¦ীজয়ী সিকান্দর, প্রজ্ঞাবান ও দার্শনিক সিকান্দর এবং নবী সিকান্দর এ তিন খণ্ডে কবি নিযামী কাব্যাটি সমাপ্ত করলেও কবি আলাওল কেবলমাত্র সিকান্দর নামাহ-ই বরাহ অর্থাৎ দ্বিগ¦ীজয় খণ্ডই অনুবাদ করেছেন। তিনি কাব্যের মূল কাঠামো ও ধারাবাহিকতা বজায় রেখে সংযোজন ও বিয়োজনের সুক্ষ্ম মিলনের মাধ্যমে নতুনত্বের অমৃত কাব্যরস দানে স্বার্থক হয়েছেন। কবি আলাওলের কাব্যসমূহে ভোগ ও ত্যাগ এ দুটি তত্ত্ব পাশাপাশি স্থান পেয়েছে। উভয় বিবরণ অত্যন্ত শক্তিশালী হলেও অবশেষে তিনি ত্যাগের পথেই মানুষের জীবন মুক্তির জয় ঘোষণা করেছেন। সাংসারিক মায়ামোহ ও বিলাস-জৌলুষ কাটিয়ে আল্লাহর পথে আকর্ষণ বোধ নিঃসন্দেহে কবির ইসলামি চিন্তাচেতনার প্রভাবেরই ফল। কবি আলাওলের কাব্য ভাণ্ডারের মধ্যদিয়ে সত্যিকার অর্থেই আরাকানে মুসলিম সংস্কৃতি, সভ্যতা ও জীবনাদর্শের সুস্পষ্ট প্রভাব ফুটে উঠেছে।

পরিশেষে বলা যায়, মধ্যযুগে আরাকানের রাজসভায় জ্ঞানীদের ব্যাপক কদর ছিল। উলামা, সৈয়দ, শেখ সবাইকে সম্মান দিয়ে রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পদে সমাসীন করা হতো। এভাবেই আরাকানে মুসলমানদের বিস্তৃতি ঘটেছে। কবি দৌলতকাজী ও আলাওল থেকে শুরু করে আরাকানের সকল কবিই ইসলামি চিন্তা চেতনাকে বর্ণনা করতে দেশীয় শব্দ ভাণ্ডারকে কাজে লাগিয়ে তাদের কাব্য সাহিত্যকে সকলের কাছে উপভোগ্য ও সমাদৃত করতে সচেষ্ট হয়েছেন। সংকীর্ণতার গণ্ডি পেরিয়ে দেশীয় মিথ ও ভাষাশৈলী ব্যবহারের মধ্য দিয়ে তারা উদারতা ও মহানুভবতাই দেখাতে সক্ষম হয়েছেন। সেইসাথে নিজস্ব গতিধারায় সমাজের অসংগতি বিষয় ও অনৈসলামিক আচরণকে সংশোধনের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছেন। মুলত আরাকান অমাত্যসভার মধ্যযুগীয় কবিরা আরাকানের রাজধানী ম্রোহঙকে রোহাঙ বা রোসাঙ্গ নামে উল্লেখ করেছেন। এ ক্ষেত্রে গবেষক ড. আহমদ শরীফ মন্তব্য করেন যে, আঞ্চলিকভাবে উচ্চারণগত পাথর্ক্যরে কারণে হ অক্ষরটি স হিসেবে উচ্চারিত হয়ে রোহাঙ শব্দটি রোসাঙ্গ উচ্চারিত হয়েছে। এ রোহাঙ বা রোসাঙ্গের নাগরিকরাই রোহিঙ্গা নামে খ্যাত। সুতরাং রোহিঙ্গারা বংশ পরম্পরায় আরাকানেরই নাগরিক।