শহুরে জীবনের প্রতিদিনের সেই চিরচেনা ব্যস্ততা, ট্রাফিক জ্যামের করুণ অভিজ্ঞতা আর ইটপাথুরে দেয়ালের ভিড়ে আমরা যখন হাঁপিয়ে উঠি, তখন মন চায় এমন কোথাও হারিয়ে যেতে যেখানে ঘড়ির কাঁটা থমকে দাঁড়ায়। যান্ত্রিক কোলাহল ও নাগরিক ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলতে তাই আমাদের গন্তব্য ছিল মহেশখালীর বুক জেগে থাকা মায়াবী এক ভূখণ্ড— সোনাদিয়া দ্বীপ।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসক্লাবের বেশ কয়েক সংখ্যক সদস্য ১৫ জানুয়ারি রাতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রওনা দিলাম সোনাদিয়া দ্বীপের উদ্দেশ্যে। আমরা সকালে কক্সবাজার শহরে গিয়ে পৌছালাম। কক্সবাজারে সকালে নাস্তা করে, কলাতলী বা ডলফিন মোড় থেকে প্রথমে ৬ নম্বর জেটিঘাট এবং সেখান থেকে স্পিডবোর্ড করে রওনা দিলাম সোনাদিয়ায়। ২০-৩০ মিনিটের মধ্যে আমরা পৌছে গেলাম সোনাদিয়া দ্বীপে।
৯ বর্গকিলোমিটার এই দ্বীপে পা রাখার সাথে সাথে আমাদের চোখের সামনে ভেসে আসলো এক বিস্তীর্ণ চর যেখানে ছিল মহিষের বাথান ও গরু-ছাগল, সেখানে তারা নিশ্চিন্ত মনে ঘাস খাচ্ছিল ও ঝাউবনের ছায়ায় বিশ্রাম নিচ্ছিল। তারপর আমরা গুটি গুটি পায়ে আমাদের নির্ধারিত গন্তব্যে অর্থাৎ হিলি রিসোর্টে উঠে পড়লাম। তবে পর্যটকদের জন্য এখানে বিলাসবহুল কোনো হোটেল নাই। পর্যটকের সংখ্যা বাড়ায় এখানে ছোট ছোট কিছু হোটেল বা রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। কিছুক্ষন বিশ্রাম শেষে আমরা সাগরের পাড়ে ফুটবল খেলতে চলে গেলাম। ঠান্ডা বাতাস আর বালুময় সাগরের তীরে ফুটবল খেলা আমাদের এক নৈসর্গিক আনন্দের অনুভূতি এনে দিয়েছিল। সাগরের কিছু সময় অতিবাহিত করে আমরা ফিরে এলাম রিসোর্টে এবং ফ্রেশ হয়ে খাওয়ার পর্ব শুরু হল। খাওয়ার পর্ব যেখানে ছিল স্থানীয় সামুদ্রিক মাছ,শুটকি ও বিভিন্ন পদের ভর্তা, শেষ করে বিশ্রামে চলে গেলাম।
সোনাদিয়ার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল রাতে তাবু খাটিয়ে ক্যাম্পিং করা এবং নিরিবিলি পরিবেশে সূর্যাস্ত দেখা। সাগরের গর্জন আর খোলা আকাশের নিচে রাত কাটানো এক রোমাঞ্চকর পরিবেশে আমি নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলাম। আমার কাছে মনে হয়েছে সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছে এবং চারিদিকের এক নিস্তব্ধ পরিবেশ, প্রকৃতির এক নৈসর্গিক সৌন্দর্যকে উপভোগ করছি। এই দ্বীপে ক্যাম্পিং করে মনে হলো আদিম এক সৌন্দর্যের মুখোমুখি হয়েছি যেখানে ছিল না কোনো আধুনিকতার ছোয়া। চারদিকে অথৈ পানি, মাথার ওপর খোলা আকাশের নিচে ক্যাম্পফায়ারিং, বন্ধুদের সাথে আড্ডা ও বারবিকিউ পার্টি, যা আমাকে এক রোমাঞ্চকর ও নৈসর্গিক সুখ এনে দিয়েছিল। আধুনিকতার সকল উপকরনকে পিছনে ফেলে আদিম পরিবেশে প্রকৃতির এক টুকরো স্বর্গে আমি অবস্থান করেছি, এই অনুভূতি আপনার মনে উদয় হয়েছিল।
দ্বীপজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ম্যানগ্রোভ বন, বিস্তীর্ণ চর, লাল কাকড়া, মহিষের বাথান আর নির্জন সমুদ্র সৈকত যেকোনো প্রকৃতিপ্রেমীদের মুগ্ধ করে। এখানে সমুদ্রের গর্জন ছাড়া অন্য কোনো যান্ত্রিক কোলাহল নেই। মাইলের পর মাইল বিস্তৃত বালুচরে যখন সূর্যের আলো পড়ে, তখন চারপাশ সোনাালি আভায় ভরে ওঠে। সোনাদিয়ার সমুদ্র সৈকতে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখে মনে হচ্ছে প্রকৃতির এক মহাকাব্যিক সমাপ্তি অবলোকন করছি। সমুদ্রের মাঝে সূর্য যখন ধীরে ধীরে ডুবে যায়, তখন চারপাশে যে পরিবেশের সৃষ্টি হয়, তা যে কাউকে স্তব্ধ করে দিতে বাধ্য।
সোনাদিয়া দ্বীপে দুটি পাড়া আছে - পূর্ব পাড়া আর পশ্চিম পাড়া। পূর্ব পাড়ায় প্রায় ৩৬০ পরিবার আর পশ্চিম পাড়ায় প্রায় ৪০০ পরিবারের মতো মানুষ বসবাস করে। মাছ ধরা ও লবন চাষ হচ্ছে এই দ্বীপের মানুষের প্রধান পেশা। জেলে, লবণচাষি ও সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ ভোরের আলো ফোটার আগেই জীবিকার সন্ধানে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়। এই দ্বীপের মানুষের অন্যতম একটা পেশা হচ্ছে মহিষ পালন, যেটা মহিষের বাথান নামে পরিচিত। সোনাদিয়া দ্বীপের বিস্তীর্ণ চরে এই মহিষের বাথান ছেড়ে দেওয়া হয় এবং সন্ধ্যার সময় তাদের নিজস্ব গন্তব্যস্থলে ফিরে আসে।
এখানকার মানুষকে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে বেঁচে থাকতে হয়। প্রকৃতির নানা বাধাকে অতিক্রম করে তারা এই দ্বীপে বসবাস করছে। এছাড়া স্বাভাবিক জীবনধারনের জন্য যেসব মৌলিক অধিকার পাওয়া দরকার, সকল কিছু থেকে তারা প্রতিনিয়ত বঞ্চিত হচ্ছে। এই দ্বীপে নেই কোনো চিকিৎসালয় বা হাসপাতাল, চিকিৎসার জন্য এখানাকার মানুষকে মহেশখালীর উপর নির্ভর করতে হবে। এছাড়া শিক্ষা অর্জনের জন্য ভালো কোনো বিদ্যালয় নাই তবে স্বপ্নযাত্রী ফাউন্ডেশন নামক এক এনজিও প্রতিষ্ঠান কিছু স্কুল পরিচালনা করে,যার মাধ্যমে খুবই সীমিত সংখ্যক ছেলেমেয়ে প্রাথমিক জ্ঞান অর্জন করতেছে।
এখানাকার মানুষের বসবাসের জন্য ভালো আবাসন ব্যবস্থা নাই, যার অন্যতম কারন সীমিত জীবিকা অর্জন। স্থানীয় এক লবনচাষীর সাথে কথা বলে জানা যায়,' তারা মণ প্রতি লবন ২৫০-৩০০ টাকায় বিক্রি করে থাকে'। এছাড়া তাদেরকে মাছও খুবই কম মূল্যে বিক্রি করতে হয়।
তবে পর্যটক বাড়ার সাথে সাথে সোনাদিয়ার পরিবেশ হুমকির মুখে পড়েছে। পর্যটকদের অনিয়ন্ত্রিত কার্যকলাপ যেমন আতঁশবাজি ফুটানো, উচ্চশব্দে গান বাজানো এবং যেখানে সেখানে ময়লা আর্বজনা ফেলানো এই দ্বীপের নিজস্ব পরিবেশকে হুমকির দিকে ফেলে দিচ্ছে। এছাড়া গাছখেকো কর্তৃক গাছ কর্তন চিরচেনা সোনাদিয়া দ্বীপের পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
সোনাদিয়া দ্বীপ শুধু একটি ভ্রমণের জায়গা নয়, এটি যেন নিজেকে নতুন করে চিনে নেওয়ার এক নির্জন পাঠশালা। যান্ত্রিকতার শিকল ভেঙে প্রকৃতির এই আদিম ও শান্ত রূপের সান্নিধ্যে এসে বারবার মনে হয়েছে—মাঝে মাঝে ব্যস্ততাকে ছুটি দিয়ে এমন নির্জনতায় হারিয়ে যাওয়াটা বিলাসিতা নয়, বরং বেঁচে থাকার জন্য খুব বেশি প্রয়োজন।