আব্দুস সাত্তার সুমন
শীতের সকালে সূর্য আলতো আলতো করে উঠে আলো ছড়াচ্ছে। শহরের ছোট্ট মীমি আজ শীতের ছুটিতে নানাবাড়ি যাচ্ছিল। মা বললেন, মীমি, এক সপ্তাহ তুমি নানা-নানির কাছে থাকবে। সেখানে তুমি নতুন কিছু শিখবে এবং অনেক আনন্দ পাবে। মীমি উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল। সে জানত নানাবাড়ির শীতের দিনগুলো শহরের চেয়ে একেবারেই আলাদা।
গাড়ি চলছিল গ্রামের ছোট্ট রাস্তার ধারে। রাস্তার পাশে লম্বা বটগাছ, জমে থাকা শিশির, আর হালকা কুয়াশা সব মিলিয়ে যেন স্বপ্নের ছবি। মীমি জানল, এই ছুটি তার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের হবে।
নানাবাড়িতে পৌঁছে নানু মীমিকে বুকে টেনে নিলেন। নানা মুচকি করে হাসলেন, মীমি, এখানে তো চুলা আছে। এসো, গরম হও। মীমি চুলার পাশে বসে দেখল কিভাবে নানু আগুন জ্বালালেন। চুলার ধোঁয়া আর গরম আলো একসাথে ঘরকে রঙিন করে তুলেছে।
পরের দিন, মীমি ও নানু মিলে পিঠা বানানোর কাজ শুরু করল। ময়দা, নারকেল, খেজুরের গুড় সবকিছু মিলে চমৎকার পিঠা তৈরি হলো। মীমি দেখল, নানু কিভাবে মিহি হাত দিয়ে ময়দা গড়ে তোলে। সে নিজেও চেষ্টা করল, হাত ময়দায় লেপা পড়লোÑ নানু হাসতে হাসতে বললেন, চিন্তা নেই, মীমি। মজাই হলো সবচেয়ে বড় উপহার।
দুপুরে নানা মীমিকে বাগানে নিয়ে গেলেন। গাছগুলো কুয়াশায় ঢাকা, পাখিরা শীত কাটানোর চেষ্টা করছে। হঠাৎ মীমি দেখতে পেল এক ছোট্ট খরগোশ লুকিয়ে আছে। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল, আর খরগোশ চুপচাপ তার সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে চাইছে মনে হলো। মীমি তাকে গাজর দিল, খরগোশ নাক নাড়ল যেন ধন্যবাদ জানাচ্ছে।
শীতের বিকেল, নানা গল্প করতে শুরু করলেন। গ্রামের শীতকালীন উৎসবের গল্প, প্রাচীন রীতিনীতি, পিঠা উৎসবের আনন্দ সবকিছু মীমিকে মন্ত্রমুগ্ধ করল। মীমি বুঝল, শীতের আনন্দ শুধু গরম কাপড়ে নয়, বরং পরিবারের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তে লুকিয়ে থাকে।
পরের দিন, মীমি গ্রামের ছোটদের সঙ্গে খেলতে গেল। তারা শীতের প্রথম তুষার এবং জমে থাকা কাদা নিয়ে খেলল। মীমি দেখল, গ্রামের ছোটরা কত আনন্দে শীত কাটায়। তারা বাগানে ছোট্ট খেলার মাঠ বানায়। মীমি তাদের সঙ্গে মিলেমিশে খেলার সময় শিখল, বন্ধু হওয়া কত মজার।
একদিন, নানু মীমিকে নিয়ে পিঠা উৎসবের প্রস্তুতি করলেন।
পিঠা বানানোর সময় গ্রামের অন্য শিশুরাও এসে মিলে সাহায্য করল। মাধুরী পিঠা, নীলকাঁঠালের পিঠা, নারকেল গুড়ের পিঠা সব মিলিয়ে ঘর যেন ছোট্ট উৎসবের মতো হয়ে উঠল। মীমি শিখল, সহযোগিতা করলে কাজ আরও মজা হয়ে যায়।
শীতের আরেকটি দিন, নানা মীমিকে শীতকালীন পশুপাখির পরিচয় করালেন। এই শীতেই আমাদের অতিথি পাখিরা আসে, বললেন। মীমি দেখল, লালচে কোকিল, ছোট ধূসর চড়ুই, এবং একটি সাদা হাঁস সবই আনন্দে বাগানের চারপাশে ঘুরছে। মীমি বুঝল, প্রকৃতির সঙ্গে মেলামেশা করা কত আনন্দের।
এক বিকেলে, মীমি বাগানের পেছনে ছোট্ট পুকুরে খেলতে গেল। সে হাঁটুপানি দিয়ে খেলার চেষ্টা করল। হঠাৎ ঠান্ডাপানি লাগল, কিন্তু নানু হাসতে হাসতে বললেন, শীতের আনন্দ কখনও কখনও একটু ঠান্ডার সঙ্গে আসে। তবে সাহসী হলে সব মজা হয়। মীমি বুঝল, শীত মানেই নতুন কিছু চেষ্টা করা এবং সাহসী হওয়া।
মীমি শিখল, শীতের দিনগুলোতে প্রাকৃতিক দৃশ্য, পাখি-পশুপাখির আচরণ, এবং গ্রামের জীবন কত মজার হতে পারে। সে একদিন শীতল হাওয়ার মধ্যে নানার সঙ্গে হাঁটতে গেল। পথের ধারে জমে থাকা শিশিরে নরম কুয়াশার মধ্যে পায়ে পায়ে চলল। নানা বললেন, মীমি, প্রকৃতি আমাদের শেখায় ধৈর্য, শান্তি, এবং কল্পনা। মীমি মাথা নাড়ল।
শীতের শেষ দিনে, মীমি নানা-নানুর সঙ্গে বাগানে চুলা জ্বালিয়ে বসে গল্প করল। চারপাশে ঠান্ডা হাওয়া, নানার গল্প, নানুর হাসি, পিঠার মিষ্টি ঘ্রাণ, খরগোশের ছোট দৌড়– সব মিলিয়ে যেন মীমির জীবন এক নতুন গল্পের সূচনা হলো।
শেষ রাতে, নানা বললেন, মীমি, শীতের আনন্দ কেবল চুলা বা গরম কাপড়ে নয়, বরং পরিবার, বন্ধু, এবং প্রকৃতির সঙ্গে কাটানো মুহূর্তে লুকিয়ে থাকে। মনে রাখো। মীমি জানল, এই শীতকালীন নানাবাড়ির ছুটি তার জীবনের সবচেয়ে মধুর স্মৃতি হয়ে থাকবে।