ইয়াছিন ইবনে ফিরোজ
বাংলাদেশের মানচিত্রের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে, নদী আর সাগরের আলিঙ্গনে গড়ে ওঠা এক রহস্যময় সাম্রাজ্য সুন্দরবন। পৃথিবীর বৃহত্তম এই ম্যানগ্রোভ বন একদিকে লবণাক্ত জলের খাল, অন্যদিকে শ্বাসমূলীয় গাছের দুর্ভেদ্য জঙ্গল। এই বনের কোল ঘেঁষেই ছোট গ্রাম রাতারখালি। এখানে বানর, কুমির, বাঘ, হরিণ ও নানা রকম প্রাণী রয়েছে। সুন্দরী গাছ ও জঙ্গলের মাঝে খাল নিয়ে বনটা যেন এক রহস্যের গোলকধাঁধা । এখানকার জীবন চলে মাছ, মধু আর বনজ সম্পদের ওপর নির্ভর করে। রাতারখালির বাসিন্দা রুদ্র। বয়স ১৪ বছর। জলজঙ্গলের সন্তান হলেও, রুদ্রের জীবনে এক গভীর ক্ষত জলভীতি। ঠিক দুই বছর আগের এক ভরা বর্ষার রাত। মাছ ধরতে গিয়ে
এক আকস্মিক ঝড়ের কবলে পড়েন রুদ্রের অত্যন্ত প্রিয় চাচা, ইদ্রিস মিয়া। তিনি খালের উন্মত্ত স্রোতে ভেসে যান। নিবিড় অনুসন্ধানের পরও তাঁর দেহ মেলেনি। গ্রামবাসী ধরে নেয় ইদ্রিস মিয়াকে কুমির বা স্রোত গ্রাস করেছে। সেই ঘটনার পর থেকে রুদ্র গভীর খালে নামতে ভয় পেতেন, জলের দিকে তাকালেই তার বুকে এক শীতল স্রোত বইত।
একদিন পড়ন্ত সন্ধ্যায়, প্রকৃতির স্নিগ্ধ রূপে মুগ্ধ হয়ে রুদ্র খালের কিনারায় বসেছিল। হঠাৎ নীরব জলরাশি ভেদ করে এক চাপা, তীক্ষ্ণ চুইচুঁই ধ্বনি।
শব্দ অনুসরণ করে রুদ্র দেখল জলের ওপর ভেসে উঠল ধূসর-কালো রঙের এক গোল মাথা, যা সুন্দরবনের নিজস্ব সম্পদ ইরাবতী ডলফিন । এই প্রজাতির ডলফিন সাধারণত মোহনা ও খাঁড়িতে বিচরণ করে এবং মানুষের কাছাকাছি সহজে আসে না। ডলফিনটি কয়েকবার শব্দ করে রুদ্রের দিকে তাকাল। তার চোখে ছিল এক অদ্ভুত প্রশান্তি। যেন সে রুদ্রকে অভয় দিয়ে বলতে চাইছে,ভয় পেও না, জল বিপদ নয়। রুদ্রের ভেতরের আতঙ্ক এক পলকে যেন থমকে গেল। সে ভয়ে ভয়ে হাত বাড়িয়ে জলের দিকে ধরল। সেই সন্ধ্যা থেকেই এই বন্য জলজ প্রাণীর সাথে তার এক অলৌকিক, নিবিড় বন্ধুত্ব শুরু হলো। ডলফিনটির গায়ের রং কিছুটা গাঢ় নীল হওয়ায় রুদ্র সস্নেহে তার নাম দিল নীলু। নীলু যেন রুদ্রের জল-জগতের একমাত্র অভিভাবক। কয়েক দিন ধরে রাতারখালিতে যেন চাপা আতঙ্ক বিরাজমান। গভীর রাতে খালের ভেতরে অচেনা ইঞ্জিনচালিত ট্রলারের আনাগোনা বেড়েছে। গুজব রটেছে, এক শক্তিশালী চক্র বনের দুর্লভ সম্পদ, যেমন গর্জন কাঠের লগ এবং চিত্রা হরিণের মূল্যবান চামড়া পাচার করছে। বনরক্ষী এবং কোস্টগার্ড তাদের ধরতে পারছে না, কারণ পাচারকারীরা খালের জটিল জলপথ ব্যবহারের কৌশল জানে। এক রাতে রুদ্রের বাবা জরুরি গ্রাম কমিটির মিটিং থেকে ফিরে এলেন গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে। কাঁপা গলায় তিনি স্ত্রীকে বললেন, এই পাচারকারীরা গুপ্ত পথ জানে। এদের ধরতে না পারলে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যাবে। কথাগুলো রুদ্রের বুকে মোচড় দিল। ঠিক সেই রাতে, নীলু অদ্ভুতভাবে অস্থির হয়ে রুদ্রের বাড়ির ঘাটে এলো। সে বারবার জল থেকে মাথা তুলে রুদ্রের দিকে চেয়ে দেখছিল, তার অস্থিরতা যেন এক আসন্ন বিপদের ইঙ্গিত। নীলু তার পিঠ ও লেজ দিয়ে জলে প্রবল আন্দোলন সৃষ্টি করল,যেন সে রুদ্রকে ইশারা করছে, দেখাতে চাইছে, এসো, কিছু একটা দেখা দরকার!
পরদিন বিকেলে, রুদ্র তার সব জলভীতিকে উপেক্ষা করে নীলুর সাথে তার নির্দেশিত পথে চলল। খালের মূল স্রোত থেকে একটু দূরে, ঘন হেতাল গাছের ঝোপের আড়ালে নীলু স্থির হলো। সে তার মাথা দিয়ে জলের নিচের এক বিশেষ বাঁকের দিকে ইশারা করল। সাহস সঞ্চয় করে রুদ্র দেখল,গহিন ঝোপের আড়ালে একটা বড়, ইঞ্জিনবিহীন কাঠের ট্রলার স্থির দাঁড়িয়ে আছে। মাঝে দুইজন লোক ব্যস্ত হাতে বস্তা বোঝাই কিছু একটা ট্রলারে তুলছে। রুদ্র লুকিয়ে দেখতে থাকল। বস্তাগুলো খুলতেই তার চোখ কপালে উঠল,হরিণের শিং, চওড়া চামড়া এবং সদ্য কাটা কেওড়া ও গরান কাঠ। পরিবেশের প্রতি মমতায় তার গা ঠান্ডা হয়ে এলো। এরপর ঘটল সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ঘটনা। বস্তা সরানোর সময় একজন লোক মুখ তুলে তার সঙ্গীর দিকে তাকাতেই রুদ্রের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে তার হারিয়ে যাওয়া চাচা, ইদ্রিস মিয়া! যাকে দুই বছর ধরে সবাই মৃত বলে জেনেছিল। হতবাক রুদ্র চুপিচুপি পিছিয়ে আসার চেষ্টা করতেই, পেছন থেকে কেউ তার মুখ চেপে ধরল। সে আতঙ্কিত হয়ে দেখল সে আর কেউ নয়, স্বয়ং তার চাচা! ইদ্রিস মিয়া চোখের জল সামলাতে পারলেন না। তিনি ফিসফিস করে বললেন, ঝড়ের রাতে তিনি পানিতে পড়ে গিয়েও স্রোতে ভেসে বেঁচে যান। কিন্তু যখন তিনি গ্রামের দিকে আসছিলেন, তখন এই পাচারকারীরা তাকে জোর করে আটকে রাখে। বনের গোপন পথ এবং মাছ ধরার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তারা তাকে জোরজবরদস্তি করে ট্রলার চালানোর কাজ করাচ্ছিল। চাচা অসহায়ভাবে মিনতি করলেন, রুদ্র, আমাকে বাঁচিয়ে দেয়, এদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো দরকার, নইলে সুন্দরবনের ইকোসিস্টেম ভেঙে যাবে। ঠিক তখনই পাচারকারী দলের লিডার, কুখ্যাত কালা চাঁদ, রুদ্রের দিকে তাকিয়ে সন্দেহজনকভাবে প্রশ্ন করল, কার সাথে কথা বলছিস? এ ছেলে তো আমাদের সব দেখে ফেলেছে! রুদ্র আর চাচা, দুজনেই চরম বিপদের মুখে পড়ে গেল।
যখন কালা চাঁদ এবং তার সঙ্গীরা রুদ্রের দিকে এগিয়ে আসছে, ঠিক তখনই ঘটল সেই অলৌকিক ঘটনা। খালের পানি যেন হঠাৎ উন্মত্ত হয়ে উঠল। নীলু এসে প্রচণ্ড গতিতে ট্রলারে সজোরে ধাক্কা মারল। জলের সেই আকস্মিক আঘাতে ভারসাম্য হারিয়ে ট্রলারের ওপর রাখা বস্তাগুলো ছপ শব্দে পানিতে পড়ে গেল। পাচারকারীরা তাদের মূল্যবান মাল উদ্ধারে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। এই সুযোগটাই কাজে লাগালেন চাচা। তিনি রুদ্রকে নিয়ে গভীর জলে ঝাঁপ দিলেন। রুদ্র সাঁতার জানে না কিন্তু নিচে ছিল তার বন্ধু। নীলু দ্রুত এসে রুদ্রকে তার শক্ত, পিচ্ছিল পিঠে তুলে নিল। চাচাও পাশে ভেসে চললেন। নীলু প্রচণ্ড ক্ষিপ্রতায় তাদের নিয়ে বনের আঁকাবাঁকা, জটিল খালপথের মধ্য দিয়ে এগিয়ে গেল এবং নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দিল। রুদ্র তীরে পৌঁছেই বিন্দুমাত্র দেরি না করে তার মোবাইল ফোনে দ্রুত বনবিভাগের টহল নৌকাকে জরুরি খবর জানাল। টহল নৌকা দ্রুত সাইরেন বাজিয়ে এসে ট্রলারটিকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলল। পালানোর কোনো পথ ছিল না। পাচারকারীরা গ্রেফতার হলো। ইদ্রিস মিয়া পুরো ঘটনা এবং এই চক্রের আস্তানা কোথায় ছিল তা বনবিভাগকে জানালেন। এভাবেই সুন্দরবনের সম্পদ পাচারের মূল আন্তর্জাতিক চক্র ধরা পড়ল। চাচাও ফিরে এলেন তাঁর পরিবারের কাছে, যেখানে সবাই তাঁকে মৃত ভেবেছিল। রুদ্রের বাবা আবেগে আপ্লুত হয়ে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, যে ছেলে আগে পানিকে ভয় পেত, সে আজ শুধু চাচাকেই নয়, বরং সুন্দরবনকেও বাঁচিয়ে দিল। তুই আমাদের সুন্দরবনের রক্ষক। পরদিন ভোরের মিষ্টি আলোয় রুদ্র খালের ধারে গেল। নীলু পানির ওপর ভেসে তার প্রিয় চুইচুঁই শব্দ করল। সে যেন বলল, ভয়কে ভয় না পেলে, সমগ্র পৃথিবী জয় করা সম্ভব । এখন তুই বনের প্রকৃত রক্ষক। রুদ্রের মুখে হাসি। তার জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হলো,যে বন্ধুত্ব তৈরি হয়েছিল গভীর ভয়ের মাঝে, তা পূর্ণতা পেল অদম্য সাহসে।