জাকির আবু জাফর
স্রষ্টার তরফ থেকে মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় উপহারের অন্যতম হলো ভাষা। এ উপহার কেবল মানুষকেই দেয়া হয়েছে। কোনো প্রাণী, কোনো উদ্ভিদ বা কোনো পশুকে দেয়া হয়নি। ভাষার এ গুণই মানুষকে পশু ও অন্যান্য প্রাণী থেকে আলাদা করেছে। দিয়েছে অনন্য বৈশিষ্ট। প্রাণী থেকে মানুষ যে কয়টি গুণে শ্রেষ্ঠ ভাষা তার অন্যতম। ভাষার মাধ্যমেই মনের ভাব বিনিময় করে মানুষ। নিজেকে প্রকাশ করে। নিজের চাহিদার কথা ব্যক্ত করে। নিজের গোপন প্রকাশ্য সবই ব্যক্ত করে।
ভাষার মাধ্যমেই মানুষ অধিকারের কথা বলে। স্বপ্নের কথা বলে। সম্ভাবনার কথা বলে। নতুন কল্পনা কিংবা পরিকল্পনার কথা। বলে ইতিহাসের কথা, ভূগোলের কথা। জ্ঞান বিজ্ঞানের কথা। ঘটে যাওয়া যুদ্ধ বিগ্রহ এবং অতীত জীবনের কথা। বলে অনাগত দিন অর্থাৎ ভবিষ্যতের কথা। মানুষ তার প্রিয়জনের কথা বলে। প্রিয়মুখের কথা বলে। বন্ধু এবং শত্রুর কথা বলে। এভাবে বলে বলেই মানুষ বুঝেছে জীবনের প্রয়োজন। বুঝেছে জীবনের আয়োজন। বুঝেছে ভয় ও সাহসের সীমানা। জেনেছে আকাশ থেকে পাতাল অবধি সকল কিছু ব্যক্ত করার মাধ্যম।
তবে মজার বিষয় হচ্ছে- জগতের সকল কিছুর ভাষা আছে। সকল প্রাণীর ভাষা আছে। সকল উদ্ভিদের ভাষা আছে। এমনকি প্রাণহীন জড়পদার্থেরও ভাষা আছে।
মানুষের ভাষা সশব্দ। আর অন্য সৃষ্টির ভাষা নিঃশব্দ। মানুষ মানুষের ভাষায় কথা বলে। প্রাণীরা কথা বলে প্রাণীদের ভাষায়।
মানুষের ভাষা সশব্দ অর্থাৎ শব্দের মাধ্যমে মনোভাব প্রকাশ করে মানুষ। এ শব্দ হয় মাতৃভাষার নয় তো অন্য কোনো বিদেশি ভাষার।
কিন্তু প্রাণীদের বিদেশি ভাষা নেই। প্রাণীরা নিজেদের প্রকাশ করে তাদের নির্দিষ্ট ইংগিতে। এটি বোঝা যায়- প্রাণীরা বিপদে পড়লে একধরনের ইংগিত দেয়। তখন তাদের চেহারায়ও উদ্বিগ্ন অবস্থার প্রকাশ ঘটে। আবার স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে থাকলে সেটিও বোঝা যায়।
মানুষের ভাষা প্রয়োগের বিষয়টি সত্যি অবাক করার মতো। প্রশ্ন জাগে- মানুষের মুখে কি যন্ত্র লাগানো যে মানুষ শব্দ উচ্চারণ করে! শুধু কি উচ্চারণ! না, বরং মধুর উচ্চারণ! সুরে আনন্দে আহ্লাদে উচ্চারণ!
মানুষ বলে তার অনুভূতির কথা বলে। অনুভবের কথা বলে। বোধ ও বিশ্বাসের কথা বলে। আশা আকাক্সক্ষার কথা বলে। দুঃখ কষ্ট হাসি আনন্দ জন্ম মৃত্যুর কথা বলে। এমনকি মৃত্যু পরবর্তী জীবনের কথাও বলে। এভাবেই মানুষ মানুষের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে। সমন্বয় করে। সংযোগ স্থাপন করে। পরস্পরের নিকটে থাকে এবং রাখে।
বলছিলাম- মানুষের ভাষা সশব্দ। সশব্দ ভাষা থাকার অর্থই হলো- নিঃশব্দ ভাষাও রয়েছে।
সশব্দ অর্থাৎ শব্দ আছে। বর্ণ আছে। বাক্য আছে। মানুষের এ ভাষা যেমন বলা যায়। তেমনই লেখা যায়। তেমনই পাঠও করা যায়। এই বলা লেখা এবং পাঠের সমন্বয়ে মানুষের ভাষার জীবন। ভাষার এ জীবন যার যত উন্নত তিনি ততটাই শিল্পীত। ভাষার সৌন্দর্য মানুষের ব্যক্তিত্ব বিকাশে সহায়ক। ভাষা ব্যবহারে বোঝা যায় মানুষের ব্যক্তিত্বের ধার। মানুষের চিন্তাকেও নিয়ন্ত্রণ করে ভাষা। কেননা, যার ভাষা উন্নত, তার চিন্তাও উন্নত। উন্নত চিন্তাকে বহন কিংবা ধারণ করার জন্য উন্নত ভাষা দরকার।
শব্দরা পরস্পর বসে যখন কোনো অর্থ প্রকাশ করে সেটি হয় বাক্য। এই শব্দ এবং বাক্য মিলেই ভাষা প্রকাশ্য হয়। এটিই সশব্দ ভাষা।
এখন আমরা দেখবো নিঃশব্দ ভাষার ভাণ্ডার। পৃথিবীর সকল প্রাণীর ভাষা আছে। সকল উদ্ভিদের ভাষা আছে। এমনকি প্রতিটি বস্তুরও আছে ভাষা।
প্রথমত এই ভাষা থাকে প্রতিটি প্রাণী উদ্ভিদ এবং বস্তুর অবয়ব বা আকারের মধ্যে। এটিকে আমরা শারীরিক ভাষাও বলতে পারি।
একটি বৃক্ষকে দেখেই আমরা বলি- এটি বৃক্ষ। কি বৃক্ষ? ধরুন হিজল, কিংবা কাঁঠাল বৃক্ষ। তো গাছটিকে দেখেই আমরা বলি- এটি কাঁঠাল গাছ। এটি হিজল গাছ। গাছের ডাল দেখে বলি- এটি ডাল। পাতা দেখেই বলে উঠি- এটি পাতা। এমনি করে ফুল ফল কাণ্ড প্রতিটি অঙ্গ দেখেই আমরা নাম বলে দেই।
আবার জড়বস্তুর ক্ষেত্রেও একই কথা। টেবিল, চেয়ার, খাট, আলনা, আয়না, আলমারি এ সবই দেখা মাত্র তার অবয়বে মিশে থাকা ভাষায় ভেসে ওঠে মানুষের চোখে। মানুষ দেখা মাত্রই বলতে পারে এসবের কোনটি কি। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের লেখা একটি কবিতার নাম -”বাতায়ন পাশে গুবাক তরুর সারি”। এ কবিতায় কবি বলেছেন- তোমার পাতায় দেখেছি তাহারই আঁখির কাজল লেখা / তোমার দেহের মতন দীঘল তাহার দেহের রেখা।/ তব ঝিরঝির মিরমির যেনো তারই কুণ্ঠিত বাণী/ তোমার শাখায় ঝোলানো তারির শাড়ির আঁচল খানি। এখানে কবি তার প্রেয়সপ্রেয়সীর সৌন্দর্য একটি বৃক্ষের সৌন্দর্যের সাথে জড়িয়ে দেখেছেন। এটিও একটি ভাষা।
আমরা আকাশের দিকে ফিরেই বলি ওটি আকাশ। মেঘ দেখেই বলি- ওটি মেঘ। আবার কালো মেঘ ধলো মেঘ ধূসর মেঘ কিংবা রাঙা মেঘ তাদের সকলেরই শারীরিক ভাষা প্রকাশিত।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে- মানবজীবনে ভাষার অধিকার কি! কেনো ভাষা রপ্ত করতে হবে। কেনো উন্নত ভাষা আয়ত্ত করার চেষ্টা করতে হবে!
ভাষা প্রতিটি মানুষের একটি মৌলিক অধিকার। এই অধিকার জন্মগতভাবেই। এই অধিকার সংরক্ষণ করেই পৃথিবীতে আসে মানুষ। একটি শিশু মাতৃগর্ভ থেকে ভূমিষ্ট হওয়ার পর কান্না জুড়ে দেয়। এ কান্নাই তার ভাষা। একইসাথে পৃথিবীতে এসেই এ কান্নাটি তার অধিকার। তাকে কাঁদতে হয়। না কাঁদলে কাঁদাতে হয়। যেনো তাকে বলা হয়- তুমি পৃথিবীতে এসেছো, তোমাকে কাঁদতে হবে। এটি তোমার অধিকার। তোমার প্রথম ভাষা হলো কান্না। তুমি নিজে এ অধিকার না নিলে, আমরা বুঝিয়ে দেবো তোমার অধিকার!
অর্থাৎ একটি নবজাতকের জন্য এই কান্না একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষা! শিশটি ভাষার এ অধিকার প্রয়োগ না করলে উদ্বিগ্ন হন বাবা মা ডাক্তার! তখন তাকে কিছুটা কষ্ট দিয়ে হলেও ভাষার অধিকার বুঝিয়ে দেয়া হয়।
মজার এবং বিস্ময়ের বিষয় হচ্ছে-
পৃথিবীর সকল মানুষের কান্না হাসির ভাষা এক। আনন্দ বেদনার ভাসা এক। সুখ দুঃখের অনুভূতি এবং প্রকাশও এক। এটি সকল জাতির সকল ভাষার সকল মানুষের ক্ষেত্রে একই।
সুতরাং ভাষার এ অধিকার জগতের সকল মানুষের রয়েছে। এই অধিকার মানুষকে স্বয়ং স্রষ্টা দিয়েছেন। এই বিষয়ে কারো কোনো দ্বিমত নেই। অন্য কিংবা ভিন্ন মতও নেই। অর্থাৎ মানুষ মাতৃগর্ভ থেকে পৃথিবীতে আসে যতগুলো অধিকার নিয়ে ভাষা সেই অধিকারের একটি উল্লেখয়োগ্য অধিকার।
জন্মগত এমন অধিকার আরও আছে। যেমন বেঁচে থাকার অধিকার! স্বাধীনতার অধিকার। দেশের নাগরিকত্বের অধিকার। শ্বাস প্রশ্বাসের অধিকার। বসবাসের অধিকার। ভাত কাপড়ের অধিকার। ঠাণ্ডা গরমের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করার অধিকার। লেখাপড়ার অধিকার! স্বাস্থ্য চিকিৎসার অধিকার। নিরাপত্তার অধিকার। এইরকম আরও আরও অধিকার রয়েছে! যা মানুষ জন্মগতভাবে পেয়ে যায়। বা অধিকার নিয়েই জন্মায়। এর মধ্যে ভাষার অধিকারটি গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু কখনও কখনও মানুষেরা মানুষের অধিকার কেড়ে নিতে চেষ্টা করে। কেড়ে নেয়ও। এমন উদাহরণের অভাব তো নেই। পৃথিবীতে এমন বহু শাসক আছে, যারা তাদের দেশের নাগরিকদের মৌলিক অধিকার হরণ করে। দেশ দেশে এমন শাসকের অভাব নেই এখন। মানুষ মানুষের জন্মগত অধিকার কেড়ে নেয়,নিতে পারে এটি ভাবা যায় না। শাসক সেজে বসে স্বৈরাচার। এসব স্বৈরাচার মানুষকে নিপীড়ন করে। নির্যাতন করে। নিষ্পেষণে জর্জরিত করে। প্রতিবাদ করতে গেলে নির্যাতন হয় আরও বেশি।
আমারা আমাদের বাংলাদেশের কথাই ধরি। একসময় পাকিস্তানি শাসকশ্রেণি আমাদের মাতৃভাষার অধিকার কেড়ে নিতে চেয়েছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে উর্দু চাপিয়ে দিতে চেয়েছে। আমরা মানিনি। প্রতিবাদ করেছি আগনঝরা। রক্ত দিয়েছি। জীবন দিয়েছি। তবুও রক্ষা করেছি মাতৃভাষার সম্মান। তারই ধারাবাহিকতায় এসেছিলো অগ্নিবৎ সময় একাত্তর। আমরা এক সাগর রক্ত দিয়েছি। লক্ষ শহীদের জীবনের বিনিময়ে স্বাধীনতা পেয়েছি। দেশ স্বাধীন হলো। কিন্তু স্বাধীনতার সুফল পেলো না এই জনপদের মানুষ। দুর্বল শাসন এবং দুর্বৃত্তের শাসন, স্বৈরাচারী শাসন সব শাসনই আমাদের শান্তি কেড়ে নিয়েছে। প্রবলভাবে এলো নব্বইয়ের গণআন্দোলন। বিদায় হলো স্বৈরাচার। কিন্তু নব্য স্বৈরাচারের জন্ম হতেই থাকে। সেই স্বৈরাচার তাড়াতে এলো জুলাই বিপ্লব। কিন্তু আমাদের ভাষাবিপ্লবের স্থান কোথাও হয়নি। কোনো সরকারই ভাষার গৌরব ধারণ করেনি। ভাষার সৌন্দর্য লালন করেনি। ভাষা উন্নতির কাজ তেমন করে করেনি। যা হয়েছে তার সবই একটি রুটিন কাজ। যে ভাসার শরীরে শহীদের রক্ত জড়ানো, যে ভাষার সাথে অসংখ্য জীবনের অঙ্গ জড়ানো সেই ভাষার উন্নতি কল্পে বড় পদক্ষেপ কেনো নেবে না সরকার। কেনো নেয়নি সরকার! এটি কি আমাদের দুর্ভাগ্য নয়!
এই জনপদে সাহসের পদচিহ্ন আঁকা হয়েছে বহুবার। অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী হয়েছে ইতিহাস। শাসক এসেছে, গেছে। শাসকের বদল হয়েছে। কিন্তু জনগণের কাঙ্খিত মুক্তি আসেনি।
আমরা জন্মেছি এই ভাটি অঞ্চলে। এই ভাটি বাংলায়। এখানে পাখির কুজনে সুর বাজে সংগীতের। এখানে ভোরের লালিমা আমাদের অন্তর আলোড়িত করে। নিঝুম দুপুরে ঘুঘুর গানে আনমনা হই আমরা। এসবই আমাদের ভাষার আনন্দে উদযাপন করি আমরা।
আমাদের জন্মগত ভাষা যাকে আমরা মাতৃভাষা বলি,তা হলো বাংলা ভাষা। বাংলা ভাষায় কথা বলেন আমাদের মায়েরা। আমাদের দাদা দাদী নানা নানী এবং তাদের পূর্ব পুরুষও এই ভাষায় কথা বলতেন। যে কারণে আমাদের মাতৃভাষা হলো বাংলা। মাতৃভাষার প্রতি একধরনের গভীর ভালোবাসা থাকে সকলের। দুনিয়ার সকল জাতির লোকদের কাছেই তার মাতৃভাষা ভীষণ ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মাতৃভাষা ছাড়া মানুষ কেমন করে কথা বলবে! কেমন করে স্বপ্ন দেখবে! কেমন করে মনের ভাব প্রকাশ করবে! পৃথিবীর যেকোনো মানুষ যে ভাষার জনপদে বসত করুন না কেনো, তিনি স্বপ্ন দেখেন তার মাতৃভাষায়।
এমন পরিস্থিতি কল্পনা করা যায় কি, যে পৃথিবীতে কোনো ভাষা নেই। কিংবা থাকবে না! কেউ কথা বলবে না বা বলতে পারবে না! যদি সত্যিই ভাষা না থাকতো তবে কি হতো! ভাষাহীন তেমন বোবা সময়ের কথা কি ভাবা যায়! নাকি কল্পনা করা যায়! তেমন পরিস্থিতি কল্পনা করলে দম বন্ধ হয়ে আসে! ভাবলে ভয় লাগে। তখন মানুষও প্রাণীদের মতো কাঁইকুঁই কাঁইমাই কুকু অ্যাঁ আঁ করতো শুধু। ভাষা না থাকলে মানুষের এতো মর্যাদা এতো সম্মান এতো পদ পদবী কি করে হতো! ভাষা না থাকলে কে প্রেসিডেন্ট কে প্রধানমন্ত্রী কে রাজা কে প্রজা কীভাবে প্রকাশ পেতো। আইনের দোহায় দিয়ে মানুষের অধিকার হরণের তামাশাও বন্ধ হয়ে যেতো।
ভাষার জন্যই এই মানুষ অন্য সব প্রাণীর ওপর নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করার সুযোগ পেয়ে ধন্য হয়েছে। ভাষা প্রয়োগেই একজন রাজনীতিক তার দর্শন প্রকাশ করে। দেশ শাসনের বৈধতা প্রতিষ্ঠিত করে। সেই ভাষাই যদি না থাকতো তো কি হতো!
আমাদের মাতৃভাষা বাংলা নিয়ে বায়ান্নর শাসকগোষ্ঠী অকারণ কাহিনি করেছে। অন্যায় এবং অন্যায্য পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। কি কারণে উর্দু ভাষাটা আমাদের ওপর চাপিয়ে দিতে চেয়েছে তার কোনো কারণ খুঁজে পাই না। এটি করে কি লাভ হলো তাদের। বরং বিরাট ক্ষতি বহন করতে হয়েছে সেসব শাসকদের।
১৯৪৮ সালের দিকের কথা। সেই সময়কার শাসক গোষ্ঠী ঘোষণা করলো- শুধু মাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। পূর্ব পাকিস্তান যেটি এখন আমাদের বাংলাদেশ, এখানকার বেশির ভাগ মানুষই বাংলা ভাষায় কথা বলতো। উর্দু যদি রাষ্ট্রভাষা হয় তো বাংলা ভাষার মানুষ কি করবে! এমন চিন্তা থেকেই একসময় তীব্র আন্দোলন গড়ে ওঠে বাংলা ভাষার পক্ষে। এই আন্দোলনের অগ্রপথিক সংগঠন হলো তমুদ্দুন মজলিশ। আন্দোলন হতে হতে একসময় ভীষণ জোরালো হয়ে গেলো আন্দোলন। ১৯৫২ সালে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে বাংলা ভাষাভাষিরা প্রতিবাদী মিছিল বের করে। পাকিস্তানি শাসকদের ইশারায় এই মিছিলের ওপর গুলি বর্ষণ করে পুলিশ। এতে বরকত সালাম রফিকসহ প্রাণ দেন অনেকে। অনেকে চোখ কান হাত পা হারান। চিরতরে পঙ্গু হয়ে যায় বহু লোক। কিন্তু বাংলা ভাষার মর্যাদা ছিনিয়ে নিতে পারেনি তারা। আমাদের বাংলা ভাষা আমাদের থাকলো। আমরা মাতৃভাষা পেলাম আমাদের করে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পৃথিবীর কোনো দেশে কোনো জাতি এমন আর নেই যারা ভাষার জন্য লড়াই করেছে। ভাষার জন্য সংগ্রাম করেছে। ভাষার জন্য জীবন দিয়েছে। না, নেই কোনো দেশে, কোনো ভাষায়, কোথাও কোনোখানে। আমরা সংগ্রাম করেছি, লড়াই করেছি, জীবন দিয়েছি অর্থাৎ আমার ভাই শহীদ হয়েছে এ ভাষার জন্য। সে দিক থেকে কতনা গুরুত্বপূর্ণ আমাদের এই মাতৃভাষা বাংলা।
কিন্তু আমরা কি সেই গুরুত্ব অনুভব করি! আমাদের রাষ্ট্র কি অনুভব করে! আমরা কি আমাদের ভাষার মান রক্ষা করতে পেরেছি! পেরেছি কি তেমন করে সম্মান দিতে! পারিনি। কিন্তু কেনো পারিনি। কী অসুবিধা ছিলো আমাদের! কেনো শহীদি ভাষা পেয়েও আমরা ভাষার মর্যাদা উর্ধে তুলে ধরতে পারিনি!
অথচ আমরা তো স্লোগান দেই অতি উঁচু কণ্ঠে। স্লোগান দেই অনেক জোর গলায়। কিন্তু স্লোগানের আলোকে কখনও কাজ করার চিন্তা এবং চেষ্টা করেছি কি! কেনো করিনি! কে বাধা দিলো আমাদের। কে আমাদের যাত্রাপথে কাঁটা দিয়েছে। নাকি আমরাই আমাদের কাঁটা হয়ে সৃষ্টি করেছি ভয়াবহ প্রতিবন্ধকতা!
সেই অর্থে আমরা আমাদের মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা এবং উন্নতির জন্য যুগোপযোগী কোনো জোরালো পদক্ষেপই নেইনি। নিলেও সেটি দায়সারা গোছের। কিংবা তা থেকে গেছে পরিকল্পনার ভেতর!
আমাদের শিশুরা সহজে বাংলা শিখতে পারে কি? এই বাংলা বলতে বাংলা ভাষার জাতীয় রূপের কথা বলছি। আমরা কি সবাই আঞ্চলিক ভাষার পাশাপাশি শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে পারি? পারি নাতো! তাহলে কি হলো ব্যাপারটি!
আমরা যে সংগ্রাম করলাম, জীবন দিলাম, পঙ্গু হলাম! তার কি ফল পেলাম!
কিন্তু আরও দুঃখের বিষয় উল্লেখ করতে হয়, আমাদের যারা উচ্চ শিক্ষিত লোক তারা বাংলা ভাষায় কথা বলতে যেনো লজ্জা বোধ করেন । এখানকার সুশীলদের ধারণা- বাংলা হলো ছোট লোকদের বুলি বা কম শিক্ষিত লোকদের ভাষা। অতি শিক্ষিতদের ভাষা হলো ইংরেজি! সুশীলেরা যেহেতু বড় শিক্ষিত অতএব তাদের ভিনদেশী ভাষায় বিশেষ করে ইংরেজিতে কথা বলতেই হবে। নইলে শিক্ষিত বা উচ্চ শিক্ষিতের মর্যাদা রক্ষা হবে কী করে! তাদের শিক্ষার সকল গৌরব ইংরেজি ভাষায় বসত করে! যদি ইংরেজি না বলেন তবে তো সব ধুলায় লুটিয়ে যাবে! জানতে সাধ জাগে- এরই জন্যে কি একুশে ফেব্রুয়ারির এতো বিশাল আন্দোলন হলো! এর জন্যে কি হলো এতো শহীদ! বিসর্জিত হলো এত প্রাণ!
আমরা প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারি এলে কি চমকপ্রদ আয়োজনে ব্যস্ত হয়ে যাই। সাদকালো পোশাক পরিধান করে প্রভাত ফেরিতে যাই। রাজপথে মিছিল করি। মধ্যরাতে শহীদ মিনারে ফুলের ডালা বিছিয়ে শহীদের স্তবগান করি। অথচ একুশে ফেব্রুয়ারি দিনটি অতিবাহিত হলেই সব ভুলে থাকি।
অথচ আমাদের কি করা উচিৎ! কি করি আমরা! সারাটি বছর বাংলা ভাষার উন্নয়নের পক্ষে কাজ করা জরুরি নয় কি! আমরা কি তা করি! কেনো করি না এ প্রশ্ন আমাদের তুলতে হবে। শুধু প্রশ্ন তোলা নয়, এর জন্য যথার্থ পদক্ষেপও নিতে হবে। আন্তরিকতা দিয়ে কাজ করতে হবে। ভাষার শুদ্ধতা শেখার জন্য সাধ্যমতো চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। আমাদের শিশু-কিশোরদের মুখে তুলে দিতে হবে ভাষার শুদ্ধতা। কণ্ঠে দিতে হবে বাংলা ভাষার আনন্দময় উচ্চারণ!
এখন থেকেই সচেতন হতে হবে। এখন থেকে শিখতে হবে ভাষার জাতীয় রূপ। শুদ্ধ করে বলা এবং লেখার কোনো বিকল্প নেই। যদি আমরা সঠিক ভাবে ভাষার সম্মান রক্ষা করতে পারি তবেই মর্যাদাবান হবে একুশে ফেব্রুয়ারি।
তবে এখানে এ কথা দ্বিধাহীন বলা যায়- ভাষার শুদ্ধাশুদ্ধির বিষয়টি সচেতনতার সাথে যদি না হয়, যদি সেটি সরকারি অর্থাৎ জাতীয় ভাবে না হয়, তবে ভাষার উন্নতি কখনও সম্ভব নয়!
লেখক:
কবি ও সম্পাদক