জাহিদ হাসান

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের উত্তম সৃষ্টি ২০ শতকের গণ্ডিতেই আটকে রয়েছে। বর্তমানে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের পথ ক্রমেই সংকীর্ণ হয়ে পড়ছে। এর মূল কারণ হলো কালের পরিক্রমায় বাংলা সাহিত্যের ভাব-ভাষায় আমূল পরিবর্তনে এক ধরনের অসংলগ্নতা। ভাষা ও সংস্কৃতির বিরূপ চর্চার কারণে বর্তমানে পাঠক ও লেখকের মধ্যে এক ধরনের সমন্বয়হীনতা তৈরি হয়েছে, যা বাংলা সাহিত্যকে বিলুপ্তির পথে ধাবিত করছে।

প্রাবন্ধিক আবদুল হক বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক আগেই বলেছিলেন যে, “এখন যেমন ইংরেজিয়ানা ইংরেজি ভাষা আয়ত্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, তেমনি ভাবিকালে যদি শুধু রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে ও রাজনৈতিক তাগিদেই বাংলা ভাষা আয়ত্ত করা হয়, তাহলে তাতে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিশেষ লাভবান হবে না।” (’সাহিত্য ও দেশপ্রেম’/ ‘ক্রান্তিকাল’) একুশ শতকে এসে বাংলা সাহিত্যের দুর্দশা এটাই প্রমাণ করে যে, আবদুল হকের ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হয়ে উঠছে। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে বা নব্বইয়ের দশকের সাহিত্যের পাঠকপ্রিয়তা ছিল এক রকম, আর একুশ শতকে এসে নতুন প্রজন্মের মধ্যে পাঠকপ্রিয়তা হয়ে উঠেছে অন্য রকম। স্বাধীনতার আগে ও পরে বাঙালিদের মধ্যে প্রত্যক্ষভাবে স্বদেশ-চেতনা ও মাতৃভাষার প্রতি অপার নিষ্ঠা ছিল। তখনকার সাহিত্য রচিত হয়েছে গণমানুষের মুক্তির আকাক্সক্ষা ও সামাজিক বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে। সেই সময়কার সাহিত্য ছিল জীবন্ত। কিন্তু একুশ শতকে এসে নতুন প্রজন্মের ভাষা ও সংস্কৃতি চর্চায় পশ্চিমা ভাবধারা ঢুকে পড়ার কারণে বাংলা সাহিত্য চর্চায় ধস নেমেছে। পাঠকের রুচির পরিবর্তন ঘটলে সাহিত্যিক ভাবধারা আপনা-আপনি বদলে যায়। কিন্তু, হঠাৎ করে কোনো পরিবর্তন সুফল বয়ে আনে না। আজকাল যেকেউ মুহূর্তেই একাধিক বই লিখে ফেলছে এবং জাতীয় বইমেলায় সেই বইগুলো বিক্রির জন্য স্বীকৃতিও পাচ্ছে। বইয়ের মান যাচাই-বাছাইয়ের খুব বেশি কোনো প্রয়োজন পড়ছে না। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের যুগে এসে দিনকে দিন মৌলিক সাহিত্য সৃষ্টি দুরূহ হয়ে পড়ছে। অননুমোদিত প্রকাশনার মাধ্যমে, ব্যক্তিগতভাবে, কিংবা অনেক নামকরা প্রকাশনাও আজকাল এমন সব অসামাজিক ও তাৎপর্যহীন বই প্রকাশ করছে, যার ন্যূনতম সাহিত্যিক মূল্য নেই।

এখনকার শিক্ষার্থীরা অনায়াসে বলে ফেলে, বাংলা ভাষায় আমি ভালো লিখতে-বলতে পারি না। একজন বাঙালি হয়ে এ কথা বলা খুবই লজ্জাজনক। অনেক শিক্ষক ও সরকারি কর্মকর্তারাও এই লজ্জার ভাগীদার। শুনতে অবাক লাগলেও একথা সত্য যে, আমাদের দেশে শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রধান পরিচয় এখন ইংরেজি ভাষার ওপর উত্তম দখল। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের এই দুরবস্থা যে শুধু বিদেশি ভাষা ও সংস্কৃতির অনুকরণ ও পরাধীন মনোবৃত্তি তা নয়। এ হচ্ছে দেশপ্রেমের অভাব, জাতীয় মর্যাদাবোধের অভাব এবং সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের পরিচয়।

ভাষা সৈনিকদের করুণ আত্মত্যাগের বিনিময়ে যে মাতৃভাষা রক্ষিত হয়েছে, সে ভাষায় ভালো লিখতে-বলতে জানি না বললে আর যাইহোক অন্তত তাকে দেশপ্রেমিক বলা যায় না। কোনো দেশের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতির সাথে এসবেরই স্রষ্টা, সে দেশের মানুষকে বাদ দিলে দেশ বলতে আর কিছু থাকে না। জোর দিয়ে একথা বলা যায়, কোনো শিক্ষিত ইংরেজিভাষী নির্লজ্জভাবে একথা বলতে পারবে না যে, ইংরেজি ভাষায় আমিতো ভালো লিখতে-বলতে পারি না। যে দেশের শিক্ষিত সমাজ মাতৃভাষার প্রতি বিমুখ, সে দেশের ভাষা ও সাহিত্যের ভবিষ্যৎ কি এবং সংস্কৃতিরই বা ভবিষ্যত কি?

আমাদের দেশের অফিস-আদালত থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাংলার মধ্যে অবাধে ইংরেজি ভাষার প্রচলন রয়েছে। বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচারিত অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বাঙালিরা বিদেশি ভাষা ও সংস্কৃতির দ্বারা অত্যন্ত নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে। বাংলাদেশি পণ্য ও বিভিন্ন ব্যানার, প্ল্যাকার্ডে বাংলার চেয়ে ইংরেজি ভাষার শব্দই বড় করে লেখা হয়। বর্তমানে শিশুদের জন্মের পর থেকেই ইংরেজি শব্দ ও ভাষায় প্রতি বেশি আগ্রহী করে তোলা হয়। শহরের শিশুদের ক্ষেত্রে অপরিণত বয়সেই ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি করে দেওয়া হয়। স্নাতক পর্যায়ে বাংলা বিভাগ ছাড়া প্রায় সব বিভাগেই অধিকাংশ কোর্স পড়ানো হয় ইংরেজি ভাষায় এবং বেশিরভাগ বিভাগে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ক আলাদা কোনো কোর্স করানো হয় না। বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে, বিশেষ করে অনলাইনভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাংলা ও ইংরেজির মিশ্রণে একধরনের জগাখিচুরি ভাষা ব্যবহার করছে তরুণরা। বাংলা ভাষার জন্য এটা হুমকিস্বরূপ। ইংরেজি ভাষা শিক্ষা যে একেবারেই অপ্রয়োজনীয় তা বললে ভুল হবে। আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে ইংরেজি চর্চারও প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু, তা যদি সংক্রামক ব্যাধির মতো বাংলা ভাষাকে জরাজীর্ণ করে তোলে, তখন তা সহ্য করা যায় না। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি উক্তি স্মরণীয়, “আগে চাই বাংলা ভাষার গাঁথুনি, তারপর ইংরেজি ভাষার পত্তন। এছাড়া, অনলাইন কেন্দ্রিক বিনোদন মাধ্যমের সহজলভ্যতার কারণে বর্তমানে তরুণদের মধ্যে সাহিত্যের প্রতি ব্যাপক অনীহা তৈরি হয়েছে। শিল্প-সাহিত্যের রস ও তাৎপর্যের সাথে অনেকের পরিচয়ই নেই। অনলাইন গেমের খপ্পরে পড়ে লাইব্রেরিতে তরুণদের নিয়মিত যাতায়াত বন্ধ হয়ে গেছে। অনেকে বই ক্রয় করে এনে বাড়িতে সাজিয়ে রাখেন শুধু ফ্যাশনের জন্য। চিন্তার বিষয় হলো এখনো আমাদের সুনির্দিষ্ট কোনো ভাষা নীতি নেই, নেই কোনো ভাষা পরিকল্পনা। বাংলা ভাষার গবেষণা ও নীতি নির্ধারণের জন্য একটি সুপরিকল্পিত ভাষা কমিশন গঠন করা অত্যন্ত জরুরি। বাংলা ভাষার গবেষণার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে ১৯৫৫ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলা একাডেমিও বাংলা ভাষার উন্নতিতে খুব বেশি ভূমিকা রাখতে পারেনি।

যদি বাংলা ভাষা কার্যকারীভাবে রাষ্ট্রীয় কাজকর্ম এবং ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় এবং সেই সাথে বাংলা মাধ্যমে শিক্ষাপদ্ধতি ও পরিবেশের উন্নতি হয়, তাহলে অবশ্যই বাংলা সাহিত্যে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। তবে কর্মক্ষেত্রে ভাষার ব্যবহার যাই হোক না কেন বাংলা ভাষার প্রতি মনোভাবটাই আসল। ইউরোপীয় লেবাস দেখলেই আমাদের মুখে ইংরেজি বুলি ফোটে। অথচ, আমাদের দেশের শিক্ষিতদের মধ্যেই বাংলা বানান ভুলের প্রশ্ন উঠলে আমরা অনায়াসে বলতে পারি, বাংলা ভাষায় আমি তো ভালো লিখতে-বলতে পারি না। প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা শহীদদের স্মরণে নানা আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে দিনটি উদযাপন করা হয়। কিন্তু, সত্যিই কি আমরা বাংলা ভাষার চেতনা অন্তরে ধারণ করতে পেরেছি? বিদেশি সংস্কৃতি চর্চা, দেশপ্রেম এবং জাতীয় সম্ভ্রম বোধের অভাব থেকেই আমাদের পরাধীন মনোবৃত্তির জন্ম হয় এবং মাতৃভাষার প্রতি অনীহা তৈরি হয়। এই মনোবৃত্তির অবসান ঘটলেই আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে একটা নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।

(তথ্যসূত্র: ‘সাহিত্য ও দেশপ্রেম’ প্রবন্ধ- আবদুল হক)