আমার স্বাধীনতা

জাকির আবু জাফর

আমি যেমন আমার কৈশোরের প্রতিটি অসম্ভবকে

সম্ভাবনার তালুতে তুলে নিতাম, তেমন করে আজও

স্বপ্নের সমূহ উত্তাপকেই স্বাধীনতা বলে জ্ঞান করি!

কোনো সীমানাকেই আমি প্রতিবন্ধকতার প্রহসন মানি না।

কোনো আধিপত্যকেই ভাবি না সম্মুখের দেয়াল।

তোমাদের বুলি, তোমাদের বচন,

তোমাদের নির্মিত ইতিহাসের মিথ্যা ইমারত

বিভ্রান্ত করে না আমাকে।

তোমাদের রঙ কখনও আমার রঙের মতো নয়

তোমাদের দৃষ্টি আমার দৃষ্টির সাথে যায় না

তোমাদের রুচির সাথে আমার অভিরুচির বিস্তর ব্যবধান

আমার ভাষণ ভূষণ বন্ধন ও ব্যবধান শুধু আলাদাই নয়

বিলকুল তোমাদের বিরুদ্ধশ্রোতে

তোমাদের অবিশ্বাস এবং বিস্ময়ের পক্ষে!

আমি আমার বিশ্বাসের পালক ছড়ানোর উদ্যানকেই

ভাবি আমার স্বাধীনতা

আমার স্বচ্ছন্দ দিনযাপনের সংগ্রাম

আমার পদক্ষেপের প্রতিটি প্রত্যয়

আমার মানবিক মানচিত্রের স্থিরতা এবং

আমার রাষ্ট্রনৈতিক সামগ্রিক সমাহারের

বাধাহীন উত্থানই আমার স্বাধীনতা।

জাতিস্মর

অমিত মামুন

ছিঁড়ে গেছে শরীর সেই কত শত শতাব্দী আগে;

আজও পূর্বপুরুষের স্মৃতি

থেঁতলে যাওয়া শরীরে কালচে, দুর্লভ রক্তের স্মৃতি,

কিছু পুরনো ছাই রঙা ছবির স্মৃতি,

টেনে যাচ্ছি অবিকল, আমার স্বপ্নের ভেতরে।

মাঝে মাঝে ঘুমের ভেতর আঁতকে উঠি!

কেমন অবাক লাগে সব কিছুই।

কত শত শতাব্দী আগে ছিঁড়ে যাওয়া শরীর

জীবন্ত লাশের মতো স্বপ্নের ভেতরে আজও ঘুমিয়ে আছে।

মানবাধিকারের বুক

ওমর বিশ্বাস

প্রার্থনার ভাষায় না পাই খুঁজে যুদ্ধের কারণ

যুদ্ধের কারণ সব সময় থাকে না জানা ভালো

অহং আবার চায় দাম্ভিকতাকে নিজের পাশে

যুদ্ধ কোন সময় যে বাধে নাগরিকেরা বোঝে না।

প্রার্থনার ভাষা আছে - কোন ভাষায় যুদ্ধের ইচ্ছা!

যুদ্ধের হুমকি যারা দেয় আর ধ্বংসের মতো

অমানবিক হতেই তার পক্ষে সাহায্য কামনা করে

ওরা ওদের প্রভুর কাছে মিথ্যা প্রতারণা করে।

নিজের বড়াই থেকে খুঁজতে থাকে রক্তের নিশান

ওরা মিথ্যুক! নিজেকে বলে না মিথ্যুক!

লাল সাগরের ঢেউ উন্মাদনার ভাষায় যারা বলে

ওরা খুনি! নিজেকে বলে না খুনি!

অযথা আমার প্রভু রক্তপাতের বিপক্ষে

আমরা শেষশেষ খাদে পড়ার আগ পর্যন্ত

চাই না কোনো বুলেট ফুটো করে দিক

কু্ঁেজা হয়ে নুয়ে পড়া মানবাধিকারের বুক।

দীপ নিভে যায়

শাহনেওয়াজ মিঠু

হাওয়া আর সময় নিয়ে দূর্বাদির গল্প -

তখন বাসন্তীকার উঁকিঝুঁকি কোকিলের গানে

সর্পিল পথ

দুপাশে গাঢ় সবুজ গম, ভুট্টা, ধানক্ষেত

সাঁঝলীর হাসি খেলা করে দিগন্ত জুড়ে

জীবন আছে যার সেইই পশ্চিমের যাত্রী-

অনুক্ষণ ভেবে গল্পে বাঁধ সাধে

কুলপল্লবের বাসিন্দা স্বর্ণলতা

সহজ ইশারায় বলে-

ওই-ই দেখো পথিক দিন এবং রাতের মহা মিলনোৎসব

পলকের ব্যবধানে যদিও দীপ নিভে যায় কালোর ঘোরে।

ময়নাতদন্ত

শাহীন সুলতানা

মাতৃউদর থেকে জন্মেছিলাম যেদিন

সেদিনের স্মৃতি ঠিক ততটা প্রখর নয়;

তারপর থেকে অন্তত কয়েক ডজনবার

জন্ম নিয়েছি নিজের অজান্তে...।

যতবার বিশ্বাস ভেঙেছে ঠিক ততবার

শামুকের মতো খোলস শক্ত করে করে

জন্ম হয়েছে আবার।

অর্ধেক মানুষ হয়ে উঠতে উঠতে আবার

কেউ বীরদর্পে বেয়নেটে বেয়নেটে খুঁচিয়ে

মারে বিশ্বাস। কেউ অভিনয়ের ছুরি শানিয়ে

রাখে, কেউবা মিথ্যার নিখুঁত অস্ত্র!

প্রতিবারই আমি একটু একটু করে মারা যাই,

একদিন ময়নাতদন্তে মৃত্যুর কারণ লেখা হয়--

অতিরিক্ত বিশ্বাস স্থাপন ও অন্ধ ভক্তি।

জীবন

মতিউর রহমান

একদিন অনেক আশা ছিল -

স্বপ্ন দেখতাম আকাশের মতো বড় হব

বাবা চলে যাওয়ার পর অভাব মাছি

দিনরাত চারপাশে ভনভন করে !

স্বপ্নের হ্যালোজেন নিভে ঘুটঘুটে আঁধার

নিরুপায় হয়ে

তালা দিই স্বপ্নের ঘরে!

শরীরে বেঁধে শীল-নোড়া

ছুটি সকাল-সন্ধ্যা

ছুটতে ছুটতে -

পুব গগনে দেখি আবছা আলো

ভোরের রুমালে বেঁধে রাত্রির গল্প

ভাসিয়ে দিই প্রভাত সাগরে

জীবন এখন মিষ্টি আলোর চড়ুইভাতি!

যাযাবর সময়

নবী হোসেন নবীন

সময় তুমি পথিক যাযাবর

দেখেছ তুমি কত যুগ-যুগান্তর।

কত কাল- মহাকালের সাক্ষী তুমি

তোমার চোখের সামনে কত

দেশ-মহাদেশ হয়েছে জলাভূমি।

কত সাগর-মহাসাগর তোমার সামনে

হয়েছে চারণ ভূমি।

কত নদ-নদী তোমার চরণ চুমি

জলধির বুকে জল ঢেলে হয়েগেছে মমি।

সব জানো তুমি

শুধু তোমার শুরু আর শেষ ছাড়া।

ইতিহাসের সেরা সাক্ষী তুমি

তোমার চরণে মিনতি জানাই আমি

আগামী কাল যেথায় দাঁড়িয়ে মুছিবে

কপালের ঘাম

ক্ষণিকের তরে তথায় স্মরিও এ অধমের নাম।

হৃদয়ের নীল খামে

শাম্মী শফিক জুঁই

তোমার চোখের রোদে

আমার সকাল হাসে,

এক চিমটি ভালোবাসা

মনে মেঘ জমিয়ে ভাসে।

বলোনি যা কোনোদিনও

আজ তবে বলে দাও,

আমার এই হাতটি ধরে

বহুদূর চলে যাও।

হৃদয়ের নীল খামে

হাজারো কথা লেখা,

স্বপ্নরা ডানা মেলে

হবে কি আজ দেখা?

বসন্তের এই দিনে

লাল গোলাপ হাতে,

আমি শুধু থাকতে চাই

সারাজীবন তোমার সাথে।

যুগের হাদী সিন্দাবাদ

সোহেল আব্দুল্লাহ্

ঘুমঘোরে এই স্বপ্ন ডানায় কত আর ওড়া যায়,

দৈত্য দানব ভর করেছে পাহাড়ের মতো গায়।

হঠাৎ যখন ঘুম ভেঙে যায়, আরও বেশি লাগে ভয়,

নির্জন এই দ্বীপটি মোদের দৈত্যরা করে জয়।

সারারাত ওরা দাপটে বেড়ায় মানুষের দ্বারে দ্বারে,

রক্তখেকো হিংস্র দানব ভোর হলে যায় সরে।

ওরাই এখন রাজ্য চালায় রাতের অন্ধকারে,

গুম খুন করে পালিয়ে বেড়ায় দেশে দেশান্তরে।

অন্ধকারের নেশায় ওদের পেয়েছে দারুণ বেশ,

গভীর রাতে রক্ত খাওয়ার কাটেনি সেই রেশ।

হেরার আলোয় চলতে গেলেই লাগে না ওদের ভালো,

মিত্র ওদের জাহেলী যুগের লাত ওজ্জার কালো।

আসবে যখন যুগের হাদী হবে সেই রাহাবার,

ভেঙে দেবে এই নব্য জাহেলী জুলুমের কারাগার।

সিন্দাবাদ ওই পাল তোলা নায়ে হাতে নিয়ে তলোয়ার,

মারবে রাতের পালিয়ে থাকা রাক্ষস জানোয়ার।

সেই স্বপ্ন বুকে বেঁধে আজ দাঁড়িয়ে সাগর তীরে,

নির্জন এই দ্বীপেতে জাহাজ কখন আসিয়া ভিড়ে,

নিয়ে যাবে সেই হেরার আলোয় সোনালী দ্বীপের কাছে,

যেখানে ঐশী আলোয় রাঙানো ইনসাফকারি আছে।

আসবে জাহাজ, হাদী আবার বলুক জিন্দাবাদ,

নতুন পানিতে সফর এবার হে মাঝি সিন্দাবাদ।