শেকড়ের নদী

মুসা আল হাফিজ

কী নিবিড় কুমারী, জন্ম নিলো ছায়া থেকে।

তার কোনো শরীর নেই, কিন্তু কী সুন্দর- যেনো একটুকরো নীল কুয়াশা।

সে হাঁটে- খালি মাঠ পেরিয়ে, শূন্য নদীর পাড় ধরে,

খোঁজে- একটি বৃক্ষ, যার নাম ঠিকানা।

প্রথম বাতাসের সাথে কথা বলে সে :

“ওগো, বৃক্ষটি কই?”

বাতাস শুধু হাসে, কয় না কথা। ছড়িয়ে দেয় কেবল অনির্বচনীয়তা।

সামনে আকাশ, নক্ষত্রবিহীন। কুমারি ডাকে, ও আকাশ , বৃক্ষ কোথায়?

আকাশও নিশ্চুপ, শুধু দেখায় অন্তহীনতা।

অবশেষে এক মরুভূমি, যার শেষপ্রান্তে,

বৃক্ষ । গাছটি মৃত নয়, জীবিতও নয়।

তার শেকড় উঠে গেছে জমাট বাঁধা আকাশের দিকে!

আর ডালপালা ডুবে গেছে মাটির গভীরে!

গাছটি কথা কয় ভাষাতীত সুরে :

“আমি তোমার জন্মসনদ,

তুমি আমাকে খুঁজে ফিরছো,

কিন্তু তুমি নিজেই আমার হারানো ডালপালা।”

কুমারী এখন না কাঁদছে, না হাসছে।

সে হাঁটছে আমার বোধে, চোখের অতীতে!

বলে শুধু, বেছে নাও বৃক্ষধর্ম-

যার অন্তরে বয়ে যাচ্ছে নদীনালা।

ও নদী, আমাকে নেবে তুমি সুরেলা আমাতে ?

জন্ম-মৃত্যুর অধিক অর্জনে?

নদী বলে, আমাকে জাগাও তবে নিজের শেকড়ে!

পবিত্র স্লোগানের হাত

মুহাম্মদ হেলাল উদ্দিন

চোখের দুয়ার ভেঙে জেগেছে শহর

যেখানে খুনিরা ঘুমিয়ে ছিল;

বাজারে, আড়তে, মন্ত্রণালয়ে,

রাত অন্ধকার হলে, কালো দেয়ালের

লুকানো মানুষরা হারিয়ে যেত,

এমন সব নিয়মেই চলত কার্যালয়।

বছরের পর বছর; মানচিত্রের শিশু

যে রক্তে রক্তাক্ত করেছে মনকে

বসন্ত নুয়েছে সব সেই জখমে;

ভোরের পবিত্রতা, তার চেয়েও পবিত্র,

স্লোগানে জাগানো হাত-কপালের ঘাম,

যে ধমনী ফেটে রক্ত রাজপথে,

যেন পলাশের দিন উত্তপ্ত ফাগুন

গোধুলি ছুঁয়েছে পথ-মায়ের আঁচল

পতাকায় মুছে, বোনের চোখের জল,

প্রিয়তমার ঠোঁটে তুমুল আলোড়ন

মৃত্যু নয়তো মুক্তি। আমাদের এক পথ।

যেখানে নেমেছে মুক্তিকামিরা,

পিতার হাতে সন্তান-পানি আর খাবার-

নিয়ে ভেজা চোখে মা, এক সমুদ্র

পিপাসা আমাদের বুকে, বিজয়ের

কোন আকাশে আছো বুকের অতিথি?

আমাদের বিপ্লবে গেঁথেছি তোমায়

যেখানে বুক মেলে ধরেছে শান্তির

কবুতর, আমি সেই পথ, দাগ রেখে যাই।

ইতিহাসের সন্তান

আলাউদ্দিন আজাদ

যে মৃত্যু কোটি মানুষের হৃদয়ে ঘাঁটি গড়ে

সে মৃত্যু নয়, সে যুগের ঘোষণাপত্র।

সময় নিজেই মাথা নত করে তার কাছে,

আর ইতিহাস কলম তুলে নেয়।

হাদি কেবল একটি নাম ছিলো না

সে ছিলো অন্যায়ের বুকে জেগে ওঠা আগুনের শিখা।

অন্যায়ের অন্ধকারে সে

জ্বালিয়ে দিয়েছিলো প্রশ্নের আগুন।

ভয়কে ছিঁড়ে সে বলেছিলো

“চুপ থাকাই সবচেয়ে বড় অপরাধ।”

যখন শৃঙ্খলের শব্দে বাতাস ভারী

আর সাহস বন্দি চার দেয়ালে,

হাদির কণ্ঠ তখন বজ্রের মতো স্পষ্ট

সে শিখিয়েছিলো

মাথা নত নয়, মাথা উঁচু করেই বাঁচতে হয়।

তাঁর পা থেমে গেছে

কিন্তু থামেনি পথ।

তাঁর স্বপ্ন হাঁটে আজ

লক্ষ তরুণের চোখে, শপথে, প্রত্যয়ে।

তাঁর চোখ বন্ধ

কিন্তু তাঁর দেখা ভবিষ্যৎ

আজও ঘুমাতে শেখেনি।

ওরা ভেবেছিলো একটি কণ্ঠ থামালেই সব শেষ,

ওরা জানতো না

একটি কণ্ঠ থামলে

হাজার কণ্ঠ জেগে ওঠে।

হাদি মরে যায়নি,

হাদি ছড়িয়ে গেছে

প্রতিবাদের মিছিলে,

সাহসের শপথে,

আর সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো

প্রতিটি অটল কণ্ঠে।

যাঁরা সত্যের জন্য দাঁড়ায়,

তাঁরা কবরের নয়, ইতিহাসের সন্তান!

হাদি তাই অমর

কারণ বিপ্লব কখনো মারা যায় না।