প্রেসক্রিপশন
মুজতাহিদ ফারুকী
আমার ঠাকুর, মানে মেন্টর বলতে পারেন, খুব ভেবে
বললেন,
দেখ, মাটি কামড়ে পড়ে আছো যদি পোড়া দেশে
বিশ্বাস থাকুক নিঃশ্বাসে, ভক্তিটা ঠিকঠাক শেখো।
জেনে রাখ, শাসনে ও প্রশাসনে আছেন প্রভুরা
বাদবাকি সব্বাই প্রজা, ঠিকঠাক নিও কিন্তু চিনে।
কুকুর-স্বভাব আনো মনে, আখেরে সুফল দেবে।
দেখ না, পা চেটে, নাদুস নুদুস আজ কত সারমেয়!
কেন দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগো, পৃথিবীতে কে পুরো স্বাধীন?
গলার বাকল্ অলংকার বৈ নয়, শিকল প্রতীকমাত্র
লনে নেমে তুমিই তো খেলোয়াড়, ছুটবে, লাফাবে
লুফে নেবে ছুঁড়ে দেয়া বল, ফ্রিজবি, রঙিন রুমাল
ছুটে এসে নামাবে চরণে, উপহার জুটবে নিশ্চিত।
যদি বুঝে নিতে পারো ইশারার ভাষা, মনোরঞ্জনে
হও যদি নাচুনে বানর, বিশেষ কদর পাবে।
কত বুনো পোষ মানে, চোখ ঢাকে কালো চশমায়
কোকিল ও সুশীলেরা, শুধু দুটো রুটির আশায়
দোহার ধরেন নামগানে, আড়ালে আবডালে হাতে
তোবরানো বাটির দীনতা, ফুটপাতে ঘেঁয়ো কুষ্ঠরোগী।
অন্তর্যামী
কুলসুম বিবি
বিদঘুটে আঁধারের বুক চিরে স্বপ্নেরা কুঁড়ি মেলে,
কত শত সীমানা পেরিয়ে অসীমের প্রান্তে।
সময়ের ফুঁড়ে ফুঁড়ে দিন ক্ষণ যায় ঘুরে,
নিরুপায় হয়ে মিনতির স্বরে ডাকি তোমারে।
স্বপ্নরা রোজ মরে নিরবে যায় ঝরে─
তবু আশার দুয়ার খুলে,
নিরাশার প্রদীপ নিভিয়ে রাখি।
তোমার আরশ তলে অসহায়ের ছায়া,
ভাবি দিবসযামী─
অগ্নিবৈঠা
হেলাল আনওয়ার
এই পৃথিবী চক্রবাঁকের মতো
কেবলই ঘূর্ণায়মান।
আজ নিচে কাল উপরে এভাবে
এভাবেই পার হয় সময়, কাল।
মগডালে বসে বসে হয়তো
গোঁফে তানা কেটে বলতে পারে-,
কিংবা হাসতে পারে নিচে তাকিয়ে
কিন্তু কাল মানে, আগামীকালই
তাকেও নামতে হবে নিচে।
প্রবাদ নয়; প্রকৃত বাক্য।
গোলাকার পৃথিবী,
ঘূর্ণায়মান পৃথিবী,
কাউকে উপেক্ষা নয়,
অবজ্ঞা, অবহেলা কিংবা উপহাস নয়।
ধনুকের তীর যতুই ঊর্ধ্বে উঠুক
একসময় নিচের দিকে আসবেই।
সুতরাং নিজকে সামলে নাও-।
সামুদ্রিক লোনা জল, ফেনিল তরঙ্গ
এখন তোমার ভাগে।
কেমন লাগে হে নাবিক?
এবার বাইতে থাকো ভয়াল রাতে
দুঃসহ, দুর্বিষহ অগ্নিবৈঠা-।
অমর্যাদা
হাফিজুর রহমান
অপমান করতে চাইনি বলেই
সাহস করিনি এতোদিন,
চোখে চোখ রেখে কথা বলার।
এখন আর ভয় পাই না দেখাতে
একজোড়া উত্তপ্ত আগ্নেয়গিরির
নির্দ্বিধায় নির্গত লাভা-দৃষ্টি;
পশু-প্রকৃতি ব্যক্তিকে প্রতিহতের
সকল প্রস্তুতি সম্পূর্ণ,
যথাযথভাবে - কৈফিয়ত নেয়ার।
সরলতাকে - দুর্বলতা ভাবতে নেই
সুযোগ নিতে নেই নিরবতার;
আজ দরকার, সেই শিক্ষা নেয়ার।
শূন্য থাকা সমীচীন
সাজ্জাদ সাদিক
আকাশ থেকে বহু নক্ষত্র খসে পড়েছে,
পাতা, ফুল কালে কালে সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ছে হেমন্ত
শহরের অলি-গলি সব ছেয়ে গেছে হারানো বিজ্ঞপ্তিতে,
প্রত্যাশার ফিরিস্তি বোধ হয় শূন্য থাকা সমীচীন ।
ভীষণ ভালো আছি এখন আকাশের চাঁদ না চেয়ে
বরং নিজেকে তুষ্ট রেখে জ্যোৎস্নায় কিংবা আঁধারে ।
সেইটুকু জ্যোৎস্না পেলে রাত চলে যায় অন্য রাতে
সেইটুকু অমাবস্যায় রাত পড়ে থাকে না অন্ধ রাতে
সময়ের নিয়মে সময় হেঁটে যায়
শিশিরভেজা ঘাস পিষে, কুয়াশার ঘোর ঝাপসা মাড়িয়ে,
আমিও ভেসে যাই সময়স্রোতে সমানুপাতে ।
মা
হাসান ওয়াহিদ
বিকেল ফুরিয়ে আসছে আর বিষণ্নতা
জড়িয়ে ধরছে বিষ হয়ে ---
তিরতিরে স্রোতহারা আর নিঃসঙ্গ
হয়েছিল অনেক আগেই,
ধর্মভীরু চোখে ডাকে ‘আয়’
মার মনে পড়ছে না ফেরবার কথা
দেয়ালের প্রাচীন ছবিতে মা নেই,
আফসোস আর হাওয়াই চপ্পল পড়ে থাকে
তীব্র সন্ধ্যায়।
নতুন রবি
জসিম উদ্দিন মনছুরি
হে ঘুমন্ত জাতি
আর কতকাল ঘুমিয়ে রবে?
উঁকি দিচ্ছে নতুন রবি
হৃদয়ে জ্বালাতে আলো
গোমরাহীর পথ ছেড়ে
এসো নতুন সভ্যতায়।
ছুড়ে ফেলো পুরাতন পুঁথির রাজ্য
মিথ্যা বিভ্রান্তি ছেড়ে-
নতুন জোয়ারে জেগে উঠো
সত্যের কেতন উড়িয়ে।
ওরা আসে বারবার তোমাদের স্বাধীনতা হরণে
সুখের প্রতিশ্রুতিতে শত আশার ছলনায়
মুক্তির স্বপ্ন দেখিয়ে
শিকল পায়ে বন্দিশালায়।
আর কতকাল বোকা হয়ে খোকার মতো
বিকিয়ে দেবে নিজের স্বপ্ন?
জেগে উঠো এবার সত্যের জোয়ারে
অন্ধকার অমানিশা দূর করতে
সাহসী বীর হয়ে স্বাধীনতার উৎসবে
মুক্তির নেশায়, সত্যের বিপ্লবে।
নতুন কবি আনিয়াছে রবি
ঝলমলে সূর্য উঠেছে গগনে
সত্যের ফুল ফুটেছে সুবাসিত কাননে
জেগে ওঠো এবার
স্বাধীনতার সুখে, সকল গোমরাহী রুখে।
ইবলিশ সেতারা বাজায়
মান্নান নূর
’লা তাকরাবা হাজিহিশ শাজারাহ-
নিষেধাজ্ঞার চূড়ান্ত নিদর্শন দেখেছে আদম,
দেখেছে সীমান্তের কাঁটাতার বেয়ে গেলে
কী করে হওয়া যায়-“ফাতাকুনা মিনায্-য¦ালিমীন”।
পিতার অভিজ্ঞতা লব্ধজ্ঞান শিখেছে কী সন্তান?
সাড়ে তিনশত বছর লোনাজলের দীক্ষা আজও ধারণ করতে পারেনি
যে শান্তির জন্যে আসা, তার পরিবর্তে কতটা দুঃসাহস
হৃদয়ে ভরে অবাধ্যতার মহাপ্রাচীর দাঁড় করায়-
“লা তুফসিদূ ফিল আরদি” এর বিপরীতে!
অথচ তুমিই সর্ব শ্রেষ্ঠ ছিলে, কী অমিয় বাণী ছিল
তোমার সম্মানে-“উসজুদূ লি আদাম”।
আমরা মধুর পেয়ালাতে মদ ঢেলে কলকল হাসি,
ইবলিশ সুখের সেতারা বাজায়, আর আমরা!
কেবল নিমজ্জিত হচ্ছি জাহান্নামের অতল তলে।
ভাবনার ফুল
আল পারভেজ
কুয়াশার গভীরতায়, মায়া বাড়ে শীতেরÍ
গভীর হয় নিশীথের অন্ধকারের আলিঙ্গন।
শূন্য উদ্যানে ভ্রমরের আনাগোনা,
যেন অপরূপ রেণুর তরে ব্যাকুল অন্বেষণ।
দৃশ্যত রিক্ত সব, তবু অন্তরে ফোটেÍ
স্মৃতির সুবাসমাখা একাকী ভাবনার ফুল।
সে ফুলের গায়ে মাখা নেই কোনো পার্থিব রং,
আছে কেবল অনুভবের বিমূর্ত স্পর্শ।
বাইরে যখন ঝরে পড়ে হিমেল শিশির,
গোপনে পল্লবিত হয় ব্যথাতুর হর্ষ।
সূর্যালোকহীন নিভৃত কোণে তার আজন্ম বাস,
বেদনার নোনাজলে সে যে আরও হয় অমলিন।
কুয়াশা মোড়ানো এই নশ্বর যামিনী শেষেÍ
থেকে যায় শাশ্বত সে; মৃত্যুহীন, সুবাসহীন।