অনুবাদ ঃ আ. শ. ম. বাবর আলী

[নবম শতাব্দির মধ্যভাগে ৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে তাজিকিস্তানে সামানিয়া বংশের রাজত্বকালে ইরানের সমরকন্দের রুদাক এলাকাতে কবি ফরিদউদ্দিন মুহম্মদ আবদুল্ল জাফর রুদাকী’র জন্ম। জন্মস্থান রুদাক-এর নামানুসারে ‘রুদাকী’ নামেই তিনি পরিচিত।

তিনি জন্মান্ধ ছিলেন। কিন্তু তাঁর ছিল অশেষ প্রতিভা। মাত্র আট বছর বয়সেই তিনি কোরআন শরীফে হাফেজ হন। রুদাকী মূলত কাছিদা, গজল. রুবাই, মর্সিয়া ইত্যাদির রচয়িতা ছিলেন। তাঁর কবিতার সংখ্যা লক্ষাধিক। প্রখ্যাত সুফি ওমর খৈয়ামের তিনি ছিলেন কাব্যগুরু। অর্থাৎ তাঁর মানসিক আদর্শেই ওমর খৈয়ামের কাব্য-মানসিকতার জন্ম এবং লালন।

সারাটা জীবন গভীর আর্থিক অনটন ওবিপদ আপদের মধ্যে কাটিয়ে ৯৪০ খ্রিস্টাব্দে ৮১ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

এখানে কবি রুদাকী’র কয়েকটি অধ্যাত্মবিষয়ক কবিতার কাব্যানুবাদ করা হলো]

যৌবন ও বার্ধক্য

আমার মুখের দন্তগুলো খ’সে গেছে আজকে হায়!

রাখতে ধরে ওই ক’টিরে হলাম আমি নিরুপায়।

দন্তগুলি ছিল আমার প্রদীপসম কী উজ্জ্বল!

আজকে তো হায় নেইকো তাহা খ’সে গেছে ওই সকল।

ভাবছো এসব শনির দশা কিংবা অমঙ্গলের চিন্,

তাইতো হলাম আজ অসহায় হলাম আজি দন্তহীন।

নয়তো ইহা সত্যকথা, শনি বয়স কিছুই নয়,

বিধির বিধান থাকলে পরে পরিণাম তার এমনি হয়।

চন্দ্রমুখি প্রিয়তমা ঘন তোমার কালো চুল,

দীর্ঘ তাহা অনেক বেশি সুঘ্রাণে তার নেইকো তুল।

তাইতো কিগো বুকের মাঝে গর্ব তোমার ধরছে না?

গরবিনী তাই কি তোমার মাটিতে পা পড়ছে না?

এই কবিকে দেখেও তোমার ভাঙছে না কি মনের ভুল?

একদিন ছিল এই মাথাতে ঘন কালো বাবরী চুল।

গালিচারই মতোই ছিল এই এ মুখের ছবিটাই,

কুঞ্চিত আর ঘন কালো-সেই কেশ তার কিছুই নাই।

জীবন ছিল সুখে ভরা আনন্দেরই বিষম ঘোর,

কম ছিল যে দুঃখটুকু আনন্দ তায় হয় বিভোর।

হাতখানি তার থাকতো সদা প্রিয়তমার কুন্তলে,

জ্ঞানী-গুণীর বাক্য শুনে যেতো যে তার দিন চলে।

সুখে ভরা জীবন ছিল দুঃখটাক মানতো না,

আনন্দেতে মত্ত ছিল অন্য কিছু জানতো না।

সংসার এবং স্ত্রী-পুত্র অভাব নাহি ছিল তার,

অভাববিহীন জীবন ছিল হৃদয় ছিল শান্তিধার।

অনেক ছিল অর্থকড়ি হিসাব তাহার থাকতো না,

বিলাতো তা সুন্দরীদের একটি কড়ি রাখতো না।

বাসতো ভালো সুন্দরীরা সেই সে কড়ির বিনিময়,

চলতো তাদের প্রেম অভিসার, রাত্রি যখন আঁধার হয়।

এই কবিরই কবিতা যে রাখতো লিখে সর্বজন,

গর্বেতে পা পড়তো যে তার করতো যখন পথ গমন।

চলে গেছে সেইসব দিন আজকে তাহার কিছুই নাই,

কোথায গেল সেইসব দিন, কারে বলো আজ শুধাই?

খোরাসানে ছিল তখন রুদ্কী কবির বাসস্থান,

বুলবুলিদের মতন সে তো করতো সদাই মিষ্টি গান।

ধন্য হতো মানুষ যখন অন্যের কাছে হাত পাতি’,

রাজার কাছে কবির তখন কেটে যেতো দিন-রাতি।

খোরাসানের সম্রাট দিল চল্লিশ হাজার দেরহাম দান,

তার পাঁচ গুণ দান করিল দাতা রাজা মীর মাকান।

গুজরে গেছে সেইসব দিন আজকে তাহার কিছুই নাই,

যষ্টি একটা আনোগো আজএকটা ভিক্ষার ঝুলি চাই।

দওলত

অঢেল ধনের মালিক তুমি-কিবা আছে খুশির তায়?

হারানো ধন স্মরণ করে করছো কেন দুঃখ হায়!

ভোগ করিয়া ধন-দওলত অন্যকেও করলো দান,

জেনে রেখো এই ধরাতে সেইতো পরম ভাগ্যবান।

নিজেও যেজন করলো না ভোগ বিলাইলো না অন্যকে,

আফ্সোস হায়! দুর্ভাগা সেই অবোধ বান্দার জন্য যে।

”ঞ্চল আর ক্ষণস্থায়ী যেমন মেঘ আর ওই বাতাস,

এই পৃথিবীর আয়ু তেমন দেখছো নাকি তার আভাস?

জীবন

কত দীর্ঘ জীবন তোমার হিসাব করে লাভ কি তার?

সাঙ্গ একদিন হবে খেলা শক্তি যতই থাকুক যার।

হতে পারে জীবনসূত্র দীর্ঘ তোমার অতিশয়,

মৃত্যু নামের নীল আসমান হবেই যে পার সুনিশ্চয়।

সুখ-সম্পদ আছে তোমার অথবা দুখ্ জীবন ভর,

ধরার বুকে পাইলে তুমি অনেক কিছু আপন-পর।

‘রায়’ হইতে ‘হেজাজের’ পাইলে তুমি রাজত্ব,

সবই ছেড়ে করতে হবে মরণেরেই দাসত্ব।

ছোট বড় সবারই যে শেষ পরিণাম একটি ঠাঁই,

কেন তবে মানুষেরে করছো তুমি ভেদ বৃথাই?

সুখ

দুঃখ তুমি করো নাকো দেখে কারো সুখের দিন,

তোমার সুখে হিংসে করে হয়তো কোনো অর্বাচীন।