বিনষ্টের সন্নিহিত জীবন
জাকির আজাদ
জীবিত তাই আমার সকাল আসে আসারই কথা,
জানতে কতটা অনিবার্য দুঃখ দুঃখিত করে আছে
এই জীবনের ওঠানামায় পরতে পরতে
বেঁচে থাকা এই জীবনের প্রতিটি স্পন্দনে।
আমার দুপুর আসে দুরমুর,
অপরিমান বেদনা ভিড়ে এই অস্তিত্বে আসে ফিরে ফিরে
ওয়াকিবহাল হতে কী যে অপরিসীম কায়দায়
আমাকে পোড়ায় জ্বালায় দগ্ধ করে।
আমার সন্ধ্যা আসে নিয়ত বন্ধ্যা,
কতোটা কষ্ট আমাকে ছুঁয়ে থাকে
ব্যথিত করে যায় অবলীলায় সবটুকু জানতে
চুরমার করে প্রতিদিনের স্বপ্নের সৌধ।
আমার রাত আসে ধীরলয়ে,
জ্ঞাত হতে কী অসীম যন্ত্রণা আমাকে শোষিত করে
অনিদ্রা ইতর প্রাণীদের মতো আক্রান্ত করে
বার বার আমি মরে বেঁচে উঠি।
আমার সকাল, দুপুর, সন্ধ্যা রাত,
এই প্রকৃতি চক্রে নির্দয়ভাবে আমি শাসিত
মানুষের বড় নিম্ন আমার স্থান
নিঃসঙ্গ নিঃস্তেজ প্রবাহিত প্রাণ।
কোনো অভিযোগ নেই নেই অভিমান,
সবকিছু কৃতকর্মের যোগফল
ভালোবাসা গচ্ছিত রয় প্রকৃতির আদলে
আমি প্রকৃতির প্রবহমানকে বিনষ্ট করেছি কারো ছলনায়।
ভুলোমনা
মেজু আহমেদ খান
পাশাপাশি শুয়ে থাকলেও বহু ক্রুশ দূর নিজেরে হারাই ফের
পাশ ফিরে শুলে দেখি - সব ভুলে যাই, সব ভুলে যাই!
ভুলোমনা সব ভুলে তাও রব ভুলে না,
সুখের নাগাল না পেলেও
শোক ব্যথার উৎসব ভুলে না।
ভুলোমনা ভুলের ঘোরেই চল্লিশোর্ধ্ব পথ মাড়ালো
তবুও তার হয়নি জানা কোথায় আপন পর হারালো!
আমাদের স্বাধীনতা
মান্নান নূর
আগন্তুক শকুন-চোখে দেখে নেয়,
কেবল চোখের ভালো লাগায়, মায়া লাগায়।
দু-চারজন বন্ধু কাছে পেলে প্রাণ খোলে
কয়েকটি স্বপ্নের ইমারত গড়ে; তারপর
একসময় উঠতে উঠতে ঝেড়ে নেয়
কাপড়ে লেগে থাকা ধুলো, সঙ্গে মায়ার বাঁধন।
দিন শেষে আমরা আমাদেরই থাকি।
এই লোকারণ্য, এই কোলাহল, এই ফসলের মাঠ-
নাড়ির সঙ্গে লেপটে থাকা এই মৃত্তিকা;
আমৃত্যু ডানা খুলে দিই; আসো, স্বাধীন রাখি
আমাদের স্বাধীনতা-ঠোঁটে ঠোঁটে রটে যাক শুধু।
বড্ড দেরি হয়ে গেল
মোহাম্মদ নূরুল্লাহ্
রাতের মতোই আঁধার নামবে
জীবনের কোনো এক ক্ষণে।
মরীচিকার পিছে ছুটে জীবনকে
যন্ত্র বানিয়ে কেবল যন্ত্রণা দিলে!
যোগফল শূন্য ভেবে কি দেখেছো কভু?
বাড়ি একটার পর একটা
ফ্ল্যাটের পর ফ্ল্যাট।
শুধুই আফসোস চোখে মুখে...
‘যদি নিজের একটা গাড়ি থাকতো!’
শুধুই আকাক্সক্ষার চাদর বিছায়ে
শূন্য করে হতভাগা দীন হয়ে বেঁচে থাকা!
এর নামই কি জীবন?
পার্থিব লোভ লালসায় মোড়ানো এক অলীক;
জীবনকে নিয়ে যাচ্ছে অন্ধকার থেকে আরো অন্ধকারে।
যোগফল এবারও শূন্য, ভেবে কি দেখেছো কভু?
সেকেন্ড, মিনিট, ঘন্টা, দিন, রাত, মাস, বছর,
যুগ আরো কতো কী!
এরই যোগফল হয়তো জীবন!
এর বেশি কিছু আছে কী?
এটুকু বুঝতে
বড্ড দেরি হয়ে গেল।
জীবন ছলনাময়, তবে প্রভুর দেয়া এক
অফুরন্ত নেয়ামত।
মোহাচ্ছন্ন হতে এখনই কেটে পড়ো,
নাই যে সময় নাই আর।
কীসের নেশায় আসল ঠিকানা ভুলে,
সফরের ক্ষুদ্র এ ক্ষণে,
নিজেকে রেখেছো শশব্যস্ত করে।
আমরা জন্মেছি মুক্তির জন্য
আলাউদ্দিন আজাদ
শির উঁচু করে বাঁচতে শিখো, পূর্বপুরুষদের মতো
যারা তোমাকে মুক্তি শিখিয়ে গেছেন
সকল অন্যায় অনিয়মের বেড়াজালের বিরুদ্ধে।
যারা টুঁটি ধরতে চায় সত্য বলার জন্য
যেখানে পারদের মতো বিস্ফোরণ ফাটাবে, মুক্তির জন্য
এই দেশের মানুষ খুব শান্তপ্রকৃতি
তাঁরা শুধু শৃঙ্খলের বাইরে হাঁটতে চেয়েছে।
কেউ যদি বলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে চুপ থাকো,
তাহলে তাঁরা চিৎকার করবে
তাঁদের কণ্ঠে ভেঙে যাবে অনিয়মের দেয়াল।
বিদ্রোহ করতে শিখো, পূর্বপুরুষদের মতো
তোমাদের হাতে মুছে দাও পৃথিবীর সব অনিয়ম
পৃথিবীর কোনায় কোনায় ছড়িয়ে দাও সত্যের বার্তা
বিদ্রোহ করো সকল দেশদ্রোহী পাপাচারের বিরুদ্ধে
আমাদের দম নেই বাঁধার কাছে
আমরা বাতাসের মতো উড়ি
কেউ যদি শৃঙ্খল পরায়
আমরা তা ছিঁড়ে ফেলি কণ্ঠ দিয়ে।
শির উঁচু করো পূর্বপুরুষদের মতো
বিশ্ব দেখুক, আমরা জন্মেছি মুক্তির জন্য।