কাল অথবা কংকাল
জসীম উদ্দীন মুহম্মদ
একটা বাজ আজ সামনে দিয়ে হেঁটে গেলো
সন্ধি অথবা দুরভিসন্ধি.---
পোয়াতি মেঘ যেভাবে হাঁটে ঠিক সেভাবে
খোলসের ভেতর থেকেও শামুক যেভাবে ফোঁস
করে উঠে ঠিক সেভাবে!
আমি জানি, ভেতরে ভেতরে সে কাল অথবা
কংকাল, নতুবা উঠতি কাঁচামরিচের মতোন ঝাল
আর বাহিরটা তো আরও নান্দনিক
ঠিক যেন ভরা যৌবনের মাকালের মতোন লাল!
কেউ কেউ হয়ত বলবেন, এসব কেবলই ---
নিছক কিছু কাব্যকথা
অথবা ঘরের এক কোণে অযত্নে পড়ে থাকা
কবিতার খাতার মতোন মনের কিছু দলিত গোপন
ব্যথা; হতেও পারে...
আবার নাও হতে পারে বাসন্তীর পান খাওয়া গাল
এই আমি স্বীকার যেমন করছি না, তেমনি...
অস্বীকার করার মতোন ধৃষ্টতাও দেখাচ্ছি না
সে কাল হউক অথবা হউক কালের কংকাল..!!
এই মাঘ
আহাম্মদ উল্লাহ
এই মাঘ
এই পত্রঝরা শীতের বন
খুন করে ফেলে সহস্র হলুদ পাতা।
এই মাঘ
মাঠের হৃদয় শূন্য করে।
এই মাঘ
ফুল ফোঁটায়, ভ্রমর আনে-কানন বানায়।
এই মাঘ
আশা দেখায় বসন্তের
বাহারী স্বরের।
হিমায়িত করে মানুষের আশা
গৃহ সংকল্পে।
কাছে টানে প্রাণ
সংসারে
বিবাহ আসরে
এই মাঘ।
হোঁচট
হাফিজুর রহমান
অসাবধানতাবশত হোঁচট খেয়ে পড়েছি একবার
ব্যথা পেলেও উঠে দাঁড়িয়েছি সোজা হয়ে
এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন আর না ঘটে
সে জন্যে সাবধানতা অবলম্বন করতেই হবে।
কারণ আমি জানি -
আছড়ে পড়াটা ঠিক কতোটা যন্ত্রণাদায়ক,
উঠে দাঁড়ানোটাও; কতো বড়ো কঠিন কাজ!
একবার পড়ে গিয়েছিলাম বলে তুচ্ছ ভেবো না,
খেয়াল রেখো, ‘এই আমি উঠেও দাঁড়াতে পারি।’
খুঁজছি নিজেকে
তোয়াবুর রহমান
নিজেকে খুঁজে চলেছি বহুদিন থেকে
কিন্তু কোথাও নজরে আসছে না
এদিক সেদিক আনাচে-কানাচে হন্নে হয়ে
যেন পৃথিবীর প্রতিটি কোণা খুঁজে দেখেছি
খুঁজতে খুঁজতে নিজেই হয়ে গেছি ক্লান্ত
চক্ষুদ্বয়ের চারিপাশ ফুলে গেছে কালচে দাগে
ভাবনায় আমি আর আমার অবস দুটি চোখ
বিদ্যুৎ চমকানো রাতে নিজেকে খুঁজেতে থাকি স্বপ্নে।
বিপন্ন সন্ধ্যা
এ কে আজাদ
প্রতিটি সন্ধ্যা বেদখল হয়ে যায়
একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাসের কাছে।
দুটি বাঁকা পথে দুভাগ হয়ে হেঁটে যায়
নিপাট একান্ত কিছু সময়।
কতটা বিপন্ন হলে এমন ভেঙে যায় বিশ্বাসের জোড়া?
তখন সময়ের বড় তাড়া!
জীবনের জ্বলন্ত করাতে কেটে যায়
অনাবিল সুখের দিবস!
শিউলিতলা থেকে কুড়িয়ে আনা ফুলে গাঁথা
মালাটা বিষণ্ন আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়!
যাক, সে ছাইকে না হয় স্মৃতির মমি করে
রেখে দেবো বুকের সুরমাদানিতে,
হয়তো কখনো বের করে কাজলের মতন
পরে নেবো চোখের পাতা জুড়ে!
এটুকুই বা কম কিসে!
কে জানে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে
এই সুখদ রেলগাড়িটা।
উদ্দিষ্ট কোন স্টেশন আছে কি?
জানা নেই। জানা নেই যোগ বা বিয়োগের ফল।
কেবল আঁখির ইশরায় ভিড়ের ভেতরে
হারিয়ে যায় চেনা জানা সময়ের ঘড়িটা।
হয়তো আবার বারোটা বাজবে,
ঘন্টা ও মিনিটের কাঁটা দাঁড়াবে
একই অক্ষ রেখায়,
ততক্ষণে ফুরিয়ে যাবে জীবনের যুবতী আয়ূ!
অসীমে বিলীন হয়ে যাবে কোকিল ডাকা
উৎসুক বায়ূ!
তবুও খানিক সময়ের কাছে তো থেকে গেলাম ঋণী!
হোক না, তাতেই বা কম কি!
যেটুকু সময়ে একে আপরকে চিনি,
সে চেনাই না হয় যত্ন করে রেখে দেবো
হৃদয়ের অ্যালবামে।
জীবন যেখানেই থামে, থামুক,
যেখানেই বৃষ্টি নামে, নামুক।
দুহাত গুটিয়ে অতল সাগরে না হয়
হারিয়েই যাবে হৃদয়ের বিপন্ন শামুক।
অপরাজেয় মানুষ
গাজী আবদুস সালাম
জন্ম থেকে আমৃত্যু
মানুষ স্বপ্ন দ্যাখে।
কত বিয়োগ, কত বিচ্ছেদ
ফ্যাল ফ্যাল করে তাকে চেয়ে দেখতে হয়।
কখনো ঘরছাড়া হতে হয় চিরদিনের জন্য
অদৃশ্য আগুনে আত্মা পুড়ে ছারখার হয়ে যায়
কষ্টের ভারে দুমড়ে-মুচড়ে পড়ে সে।
কখনো কিছুকাল লোকচক্ষুর আড়াল হতে হয়।
তবুও সে আবার জেগে ওঠে
তাকে জেগে উঠতে হয়।
স্বপ্নরা তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে।
উঠে এসো হে ক্লান্ত পথিক!
তুমি তো পরাজিত হবার নও।
অন্তর্দৃষ্টি
শারমিন নাহার ঝর্ণা
দু’চোখের রেটিনাতে অদৃশ্য
দুটি চোখের ছায়া,
নিস্তব্ধতার মাঝে অনুভবে জাগ্রত
অদ্ভুত একটা মায়া।
নিঃশ্বাস যেন খুঁজে পায় নিঃশ্বাসের শব্দ।
চোখের ভাষায় বলা কত কথা
উড়ে উড়ে ভেসে যায়
অপেক্ষাকৃত অন্য চোখে।
পথচারী বৈরী হাওয়া বন্ধু হয়ে
পৌঁছে দেয় অদৃশ্য চিঠি,
খোলা জানালা দিয়ে ধেয়ে
আসে চেনা কথাকলি,
আনমনে মুসাফির সেজে
ভাবনার পথে পথে তার সাথে
হাজারো অসমাপ্ত গল্প বলি।
কারে তা শুধাই
মেজু আহমেদ খান
তোমাকে যায় না ভোলা মনে পড়ো তাই
মন জুড়ে ক্ষত ব্যথা কারে তা শুধাই!
কবিতার চোখে আজো টান সুধা দেখি;
নয়নের পাতা ফেলে, পাহাড়ের গায়-
ধীরে ফেলা পা তোমার ছিলো কী যে মেকি!
ভুলে আছো যত দিন যত কাল পাছে
ব্যথা বয়ে চলা বুকে পাই পাই সে হিসেবও আছে।
শোধ চাই জেনে রেখো নির্দোষ এ আমি
হৃদয়ে হৃদয় রেখে শুধু বদনামী...
যে দেয়াল যে খেয়ালে দূর থেকে দূর
একাকী ব্যথার ভারে কবি হলো চুর,
তুমি আজো তুমি আছো তোমার মতোন
কবি পুড়ে কবিতায় মানিক রতন।
মেঘফুল
ইমন হোসেন মিলন
হাত বাড়াতেই অদৃশ্য হয়ে যায় গোলাপ,
অপ্রিয় আঘাতে ফিরে আসে কাঁটাবিদ্ধ রক্তাক্ত হাত,
আলোতে অবগাহন শেষে দেখি,
তনুর আদি-অন্তে জলের বিন্দুর মতো লেগে আছে অন্ধকার।
যতই ওষ্ঠে ফুটুক হাসির কল্লোল,
মুহূর্তেই টের পাই বুকের নির্জন ব্যথা।
সাতরঙের আয়োজনে যখনই আঁকতে যাই চির হরিৎ ধরিত্রী,
তখনই তুলি বেয়ে ঝরনার মতো নেমে আসে ধূসরতা।
অন্তরীক্ষের অজস্র নক্ষত্রপুঞ্জে,
হৃদয়ের দীপ্ত অরুণ খুঁজে নেয় নিভৃত কৃষ্ণগহ্বর।
নিমেষেই বদলে যায় উচ্ছ্বসিত প্রভাত,
দোয়েলের নির্বাসনে বেজে উঠে হুতোম পেঁচার অনাহুত গান!
প্রকৃতির নিয়ম চলে না বলেই, অপ্রকৃতস্থ মায়াবী ধরিত্রী।
কাজল মেঘের কুঞ্জে কুঞ্জে,
ফুটে উঠি একগুচ্ছ মেঘের কুসুম।