নদী ও সারশ

মুসা আল হাফিজ

নদীটি হাঁটছে—

সে কারো দিকে তাকালো না,

কিন্তু জানালা খুলে গেলো

দীর্ঘশ্বাসের মতো।

বকেরা জানে, নদীটি ক্ষুধার্ত।

তার পায়ের নিচে নড়ে ওঠে পাথর

যেন পূর্বপুরুষেরা জেগে উঠেছে।

নদীটি হাঁটে হেমন্তের ঘুমের ওপর ,

মাঠের শিরায় বয়ে যায় ধানের প্রথম কল্পনা।

নদী কি একা হাঁটছে?

না, তার সঙ্গে আছে মৃত জেলেদের কণ্ঠস্বর,

ডুবে যাওয়া সংসারগুলোর হাসি,

আর সেই সব রমণী—

যারা গোসলের নামে বুকে লুকিয়েছিলো নদীকে

সেই নদী সংসারে বুনে বন্ধনের ঢেউ!

একেকটা ঢেউ যেন একেক চোখ,

চোখগুলো পাঠ করে সেই সব কথা,

যা আমরা বলতে পারি না।

নদীটি কথা বলে রাতে ,

কথাগুলো বাতাসে মিশে আদর বিলায়

ঘুমন্ত শহরের মনে!

জাগিয়ে তোলে কত স্বপ্ন

যা কেউই মনে রাখতে পারি না ভোরে।

তবু ভোরের আলোয় শুনি—

নদীর আমন্ত্রণ, স্বপ্নের সুরে বোনা। যেন

কালের মর্মপীড়া ধুয়ে নেবে জল ঢেলে!

একটা সারশ পাড়ি দেয় নদী

ডাকে স্মৃতি খুঁড়ে !

তখনই মনে পড়ে—

এই নদীর স্রোতে একদা পাঠিয়েছিলাম চিঠি

যার জবাব আজো ফেরেনি।

ঢেউয়ের মুখে ভেসে ওঠে সেই মুখ—

অস্পষ্ট হলেও খুব চেনা,

মুখটিতে আমারই মনের বানান ।

সেই মুখ হারিয়ে আমি ভুল বানানের জঙ্গলে

এলোমেলো লিখে চলছি খসড়া জীবন!

আমার স্মৃতির শালবনে সারশ বসে আছে-

: বলবে কি সারশ তুমি নদীর নিয়ম?

নদী কি ফেরায় কাউকে ? দেখেছো কখনো?

সারশটি দীর্ঘশ্বাসে বলে, তুমি জাগো । বাস্তবে দেখো-

হাঁটতে থাকা নদী কি আদৌ বেঁচে আছে?

না কি আমরা সবাই নদীর স্বপ্নে মৃত হয়ে আছি বহুকাল?

জীবন হারানো নদীর খুঁজছো নিয়ম?

হাহাকার

আবুল খায়ের নাঈমুদ্দীন

কি হাহাকার জাগে হৃদে

শান্তি আসে না নিদে

পেটে লাগে না খিদে

কি হাহাকার লাগে হৃদে।

অদ্ভূত এক মায়ায় আছি

সব কিছুতে ছায়ায় দেখি

সকাল বিকাল কায়া মাখি

মায়া পাওয়ার আশায় নাচি।

একাকী আকাশের চাঁদখানি

ফজিলা ফয়েজ

সেই একাকী আকাশে ঝুলন্ত চাঁদখানি

প্রতি রাতে আসে আমার জানালার ধারে।

বুকের ভিতর দহরম মহরম ভালোবাসার স্পন্দনে

চুপচাপ আশ্রয় খোঁজে।

বুকে জমা বিরহ প্রবণ পাথরের সমাহার—

খসে পড়া তারার মতো

ঝরে পড়ে সংবরণ করা ব্যথা।

নিঃসঙ্গতার সূক্ষ্ম কঙ্কর,

আর বেদনার শুকনো পাতা মরমর

শব্দে বেজে ওঠে বুকের ভিতর।

যেদিন কেউ একজন হাত বাড়িয়ে একটু ভালোবাসা দিবে।

আমাবস্যার রাতের লেগে থাকা আলোটুকু তার নামে লিখে দিবো।

অদৃশ্য ধোঁয়া

এম আব্দুল হালীম বাচ্চু

জানালার কাচে ঝুলে আছে ভাঙা চাঁদের

এক টুকরো মুখ, রাত্রির শরীর কেঁপে ওঠে আতঙ্কে।

টিভির নীল আলোয় মৃত্যুর বিজ্ঞাপন চলে অবিরত,

সময়ের ফুসফুসে জমে থাকে অদৃশ্য ধোঁয়া!

রাস্তার গায়ে জেগে ওঠে ফাটলের বর্ণমালা,

পিঁপড়েরা বয়ে বেড়ায় ইতিহাসের ছেঁড়া মানচিত্র

যেখানে মানুষ হাঁটে নিজের মুখের প্রতিলিপি পরে!

ভয় এখানে নতুন ফ্যাশনের অলংকার

পুকুরের জলে দুলে ওঠে স্মৃতির মরিচা;

মাছেরা চিবিয়ে খায় ভুলে যাওয়া সময়ের খোলস!

ড্রোনেরা উড়ে বেড়ায় অভিশপ্ত শূন্যতায়

শিশুরা ঘুড়ি ওড়ায় তবু যেন লেজে বাঁধা অন্ধকার;

আমি তখন লিখি, পৃথিবীর কান্নায় ইতিহাস!

ফিলিস্তিনের লাল সূর্য

রুশো আরভি নয়ন

রক্ত ঝরুক, হাসি ফুটুক, ভাঙুক শূন্য বাঁধ,

ফিলিস্তিনের মাটির কোলে উঠুক জয়ের চাঁদ!

জ্বলুক আগুন, দেহান্ত হোক সব শত্রুর বুক,

বজ্রকণ্ঠে ধ্বনিত হোক শিশুর রক্তমুখ!

বিচূর্ণ হোক লৌহ প্রাচীর, ঝরুক আগুনধারা,

মাটির বুকে ফুটে উঠুক মুক্তি অগ্নিসরা!

বুকের রক্ত রণদামামা বাজাক গগনভেদি,

সিনাই কাঁপুক, ধ্বনিত হোক জয়ের মহাবেদী!

রক্তস্নাত মাটির কোলে ফুটুক আশার ফুল,

শিশুর হাসির সুরে বাজুক বিজয়ের বকুল!

ফিরে আসুক স্বাধীন শপথ, মুছুক দুঃখ-গ্লানি,

আল-আকসার মিনার জুড়ে উঠুক নূরের বাণী!

ফিলিস্তিনের আকাশ জুড়ে উঠুক জয়ের ধার,

তাকবির এই ধ্বনি তুলুক মুক্তির মহাদ্বার!

দাসত্ব হোক ছিন্নভিন্ন, গর্জুক বজ্রহাসি,

শত্রুর গর্দান নামুক নিচে, শেষ হোক সর্বনাশী!

তপ্ত রোদে জ্বলুক তারা, নাশ হোক ঘর সব,

ফিনিক্স পাখির ডাকে উঠুক স্বাধীনতার রব!

সততার প্রদীপ হাদী

কুলসুম বিবি

হাদীরা সততার প্রদীপ জ্বালায় পৃথিবীর বুকে,

দাসত্বের শিকল ভেঙ্গে উড়ে দ্যুলোকে।

হাদীরা কভু স্বার্থন্ধ হয় না,

বীর হাদীদের দীপ্ত বিবেক জাগে।

অরাজকতার মাঝে তুলে মানবতার গীতি।

হাদীরা বদলে দেয়,

ভেঙ্গে চুরমার করে আগ্রাসী মসনদ।

একা বলিষ্ঠ কণ্ঠে গায় সততার নীতি।

হাদীরা সত্যের আলো ছড়ায় দিগন্তের এপাড়ে,

ন্যায়ের পথ দেখায় অনন্তকাল ধরে।

ক্রোনোলজি

বশির আহমেদ

মোহের বাতাসে মিশে যায় দুপুরের সংযম,

আমি নিজেই নিজেকে আটকাতে পারি না।

মায়ার সিম্ফনিতে কেটে যায় আরাধ্য বিকেল,

বহুদূর হেঁটে গিয়ে যদি মনে হয় ভুল পথে আত্মভোলা,

চারিদিকে আসন্ন অন্ধকার,

পাখিগুলো স্বগৃহে ফিরে গেছে আগে

পাপিষ্ট মুসাফির নিঃসহায়

নিঝুম তেপান্তরে বিভার পথ খুঁজি

হাঁটু গেড়ে বসে যায় ক্লান্ত পথিক

বিবর্ণ আক্ষেপে ভরপুর জীবনের ক্রোনোলজি!