জুবায়ের হুসাইন
বকুলের আজ বেশ শীত করছে। মনে হচ্ছে, কনকনে ঠাণ্ডা ওর চামড়া ভেদ করে শিরা-উপশিরায় ঢুকে যাচ্ছে। আর সেখান থেকে মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ছে সমস্ত শরীরে।
গত শীতের সময়ই ওর জ্যাকেটটা ছিঁড়ে গিয়েছিল। আম্মু দু’জায়গায় তালিও লাগিয়ে দিয়েছেন। শীত শেষে যত্ন করে তুলে রেখেছিলেন ওর আম্মু। কিন্তু এবার বের করতেই দেখে, জ্যাকেটটা আর গায়ে দেয়ার মতো নেই। কোত্থেকে শলা ইঁদুর এসে কুচিকুচি করে কেটে দিয়েছে কয়েক জায়গায়।
রাগ করে কয়েকদিন গায়ে দেয়নি বকুল। কিন্তু আজ নিরুপায় হয়েই ওটা পরতে হয়েছে।
বেলা প্রায় এগারোটার কাছাকাছি। অথচ এখনও রোদের দেখা নেই। পাশ থেকে লোকজনকে যাতায়াতের সময় বলতে শুনেছে, এ রকম অবস্থা পুরো সপ্তাহ জুড়েই নাকি থাকবে।
বকুল বাদাম বিক্রি করে। আম্মু বাদাম ভেজে ঝুড়িতে তুলে দেন। বকুল ঝুড়িটার দু’পাশে বাঁধা গামছাটা গলায় পরিয়ে পেটের ওপর ঝুলিয়ে রাখে। ফুটপাথ দিয়ে হাঁটে আর বাদাম বিক্রি করে।
বয়স আর কতই বা হবে বকুলের? এই আট অথবা নয়। এই বয়সেই জীবিকার তাগিদে বাদামের ঝুড়ি গলায় ঝুলিয়ে ফেরি করতে হচ্ছে।
শীতে আর হাঁটতে পারছিল না বকুল। আরামবাগের কালভার্ট রোডের পূর্ব প্রান্তে রাস্তাটা যেখানে মেইন রাস্তার সাথে মিলেছে, তার একটু বামেই নটরডেম কলেজ। কলেজের ঠিক আগ মুহূর্তেই ঝুড়িটা ফুটপাতে রেখে বসে পড়ল বকুল। হাঁটু মুড়ে বসে দু’পায়ের মাঝে মাথাটা লুকালো। কান দুটো চেপে ধরল হাঁটুর মাঝে।
ঘন ঘন যাত্রীবাহী বাস ছুটে যাচ্ছে রাস্তা দিয়ে। সেই বাতাস তো আছেই, সঙ্গে আছে হিম জরজর উত্তরী বায়ু। তাই ওভাবে শীত আগলে রাখতে চাইলেও পেরে উঠছে না বকুল। ‘ইশ্!’ মনে মনে ভাবল ও। ‘আজ যদি লেপ মুড়ি দিয়ে ঘরে শুয়ে থাকতে পারতাম! কী আরামটাই না লাগতো তাহলে।’
আরও কী সব ভাবছিল ও চোখ বুঁজে। সম্বিৎ ফিরে পেল কোমল হাতের একটা স্পর্শে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও চোখ তুলে তাকাল।
মায়াভরা একজোড়া চোখ ওর দিকে তাকিয়ে আছে। চোখাচোখি হতে আর বসে থাকতে পারলো না। উঠে দাঁড়াল। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো মেয়েটার দিকে। নাফিজা এই পথ দিয়েই প্রতিদিন স্কুলে যায়। সাথে থাকেন আম্মু।
খুবই কোমল হৃদয়ের একটা মেয়ে নাফিজা। টিভিতে আর ইউটিউবে বিভিন্ন ভিডিওতে ও দেখে ওরই বয়সী ছেলেমেয়েদের শীতে কষ্টের দৃশ্যগুলো। আর মনে মনে দারুণ কষ্ট পায়। নিজেকে কল্পনা করে ওসব শিশুদের জায়গায়। তখন ওদের সবার শীতগুলো যেন ওরই শরীরে এসে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। ভীষণভাবে কাঁপতে থাকে তখন।
নাফিজার আম্মু-আব্বুও জানেন মেয়ের এমন স্বভাবের কথা। জন্মের পর থেকে মেয়েকে কোনো প্রকার দুঃখকষ্টের আঁচ পেতে দেননি। সেই মেয়েটা কীভাবে যে এমন কোমল হৃদয়ের হয়ে উঠল, তা বুঝতে পারে না কিছুতেই। অবশ্য এ নিয়ে তাদের কোনো আক্ষেপও নেই। বরং গর্বে বুকটা ফুলে ওঠে। আরও আনন্দিত হয় যখন শহীদ শরীফ ওসমান হাদীকে নিয়ে ভাইরাল হওয়া গানটা অত্যন্ত বলিষ্ঠতার সাথে সিনা টান করে গাইতে থাকে। নিজেদের ভেতরে অন্য রকম একটা ফিলিংস কাজ করে নাফিজার আম্মু-আব্বুর। চব্বিশের জুলাই বিপ্লব সত্যিই বদলে দিয়েছে ছেলেমেয়েগুলোকে। নৈতিকতা, মানবিকতা আর যত সব উত্তম গুণগুলো যেন এমনিতেই গ্রো করেছে ওদের ভেতরে। কে আছে এমন যে ওদের এই নবচেতনাকে ঠেকিয়ে রাখবে?
আম্মুর কাঁধে দুটো ব্যাগ। একটাতে নাফিজার বই-খাতা। আর অন্যদিকে দুই জোড়া শীতের পোশাক। একটা ছেলেদের আর একটা মেয়েদের। নাফিজার আবদারে ওগুলো কিনে আনতে হয়েছে আব্বুকে। বাড়িতে অবশ্য আরও কয়েকটা আছে। তবে আজকের জন্য এই দুটোই।
‘তোমার খুব শীত করছে, তাই না?’ বকুলের কাছে জানতে চাইল নাফিজা।
বকুল আস্তে করে উপর-নিচ মাথা নাড়ল।
‘আমি তোমাকে একটা উপহার দিতে চাই। শীতের উপহার। নেবে?’
বকুল কিছু বুঝতে পারে না। ফ্যালফ্যাল করে মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়েই থাকে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ওর আম্মুর দিকেও তাকায়। ভেতরে ভেতরে একটু ভয় ভয়ও করতে থাকে।
নাফিজা বকুলের জবাবের অপেক্ষা না করেই আম্মুর কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ থেকে ছেলেদের শীতের পোশাক বের করে। দারুণ একটা হুডি, একটা কানটুপি, একজোড়া হাতমোজা ও একজোড়া পা-মোজা।
‘তোমার ওই ছেঁড়া জ্যাকেটটা খুলো তো ভাইয়া!’
মেয়েটার মুখে ভাইয়া ডাক শুনে চোখে পানি চলে আসে বকুলের। তবে আর দেরি করতে পারে না। নিজের শরীর থেকে জ্যাকেটটা খুলে ফেলে।
এবার নাফিজা নিজের হাতে হুডিটা বকুলের গায়ে পরিয়ে দেয়। একে একে অন্য পোশাকগুলোও।
পাশাপাশি দাঁড়ায় বকুল ও নাফিজা। আম্মু ওদের একটা জয়েন্ট ছবি তোলেন মোবাইলে।
একটু পর নাফিজার যওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে থাকে বকুল। নাফিজা একবার পেছন ফিরে তাকায়। বকুল হাত নাড়ে। খুশিতে দু’গণ্ড বেয়ে দু’ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।