(শহীদ শরিফ ওসমান হাদিকে নিবেদিত)

মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন

কুয়াশাবৃত উপত্যকার নাম ছিল ‘অন্ধকূপ’। ভৌগোলিক মানচিত্রে এর অস্তিত্ব থাকলেও সেখানকার মানুষেরা জানত না আকাশ দেখতে কেমন হয়। কারণ, উপত্যকার ওপর ছিল এক অদৃশ্য কাঁচের ছাদ, যা তৈরি করেছিল ‘ছায়াসাম্রাজ্যের’ প্রভুরা। এই ছাদে সূর্যরশ্মি আটকে যেত, কেবল প্রভুদের প্রাসাদে বা তোরণদ্বারে যতটুকু আলো প্রয়োজন, ততটুকু চুইয়ে পড়ত। বাকি জনপদ ডুবে থাকত এক চিরস্থায়ী গোধূলিতে। এই আধো-অন্ধকারে মানুষগুলো ছিল জম্বির মতোÑতারা কাজ করত, ঘুমাত, আর প্রভুদের দেওয়া নির্ধারিত ‘শ্বাসকর’ দিয়ে বেঁচে থাকত। এখানে শ্রেণীভেদ ছিল পাথরের মতো শক্ত। যারা কাচের ছাদের নিয়ন্ত্রক, তারা ছিল ‘আলোকিত শ্রেণী’, আর যারা নিচে কাদামাটিতে গড়াগড়ি খেত, তারা ‘অন্ধকার শ্রেণী’। ন্যায়বিচার বা ইনসাফ শব্দটা এই উপত্যকার অভিধান থেকে মুছে ফেলা হয়েছিল বহু আগেই। বিচারক ছিল তারাই, যারা অপরাধী। নিয়ম ছিল একটাইÑপ্রভুদের পা চাটলে রুটি মিলবে, আর প্রশ্ন করলে মিলবে গর্দানহীন মৃত্যু।

এই মৃতপ্রায় জনপদেই একদিন এক যুবকের আবির্ভাব হলো। তার হাতে কোনো তরবারি ছিল না, ছিল না কোনো জাদুর চাদর। তার হাতে ছিল কেবল একটি প্রাচীন গ্রন্থ আর বুকে ছিল এক অদ্ভুত প্রশান্তি। লোকটির নাম খালিদ। খালিদের চোখ ছিল গভীর দীঘির মতো শান্ত, কিন্তু তার কথায় ছিল আগ্নেয়গিরির লাভাস্রোত। সে উপত্যকার মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে কথা বলতে শুরু করল। তার কণ্ঠস্বর অদ্ভুত। সে চিৎকার করত না, কিন্তু তার ফিসফিসানিও বাতাসের আগে পৌঁছে যেত মানুষের কানে। খালিদ বলত এক ‘মহাজাগতিক ইনসাফ’-এর কথা। সে বলত, “এই যে আঁধার দেখছ, এ তোমাদের নিয়তি নয়। এই যে কাচের ছাদ, এ কোনো সুরক্ষা নয়, এ তোমাদের কারাগার। আসমানের মালিক সবার জন্য আলো পাঠিয়েছেন, কিন্তু কতিপয় বণিক সেই আলো কুক্ষিগত করে রেখেছে।”

খালিদের কথাগুলো প্রথমে বাতুলতা মনে হলো। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দাসত্ব করতে করতে মানুষ ভুলেই গিয়েছিল যে, শিকল ছাড়াও হাঁটা যায়। কিন্তু খালিদ থামল না। সে বস্তিতে গেল, খনিতে গেল, যেখানে মানুষ পশুর চেয়েও অধম জীবন যাপন করত। সে তাদের শোনাল, “তোমাদের রক্ত আর প্রভুদের রক্তে কোনো পার্থক্য নেই। যে বিধাতা আমাকে পাঠিয়েছেন, তিনি আমাকে শিখিয়েছেনÑসাদা বা কালো, ধনী বা দরিদ্র, কারো কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। শ্রেষ্ঠত্ব কেবল তার, যে ন্যায়ের পথে চলে।” সে বোঝাল, এই সমাজ ব্যবস্থা একটা পচা লাশের মতো, যা কেবল দুর্গন্ধই ছড়াচ্ছে। একে দাফন করে নতুন চারাগাছ রোপণ করতে হবে। সেই চারাগাছ হবে ইনসাফের, যার ছায়ায় বিচারক আর আসামী দাঁড়াবে একই সমতলে।

ধীরে ধীরে খালিদের চারপাশে ভিড় জমতে শুরু করল। তার কথায় মানুষ এক অদ্ভুত সাহস পেল। সে কেবল আধ্যাত্মিক মুক্তির কথা বলত না, সে বলত রুটির অধিকারের কথা, সে বলত শ্রমের মর্যাদার কথা। সে বলত, “তোমার ঘাম শুকানোর আগে পারিশ্রমিক পাওয়া তোমার দয়া নয়, এটা সেই ঐশ্বরিক আইনের অংশ, যা আমি বহন করছি।” খালিদ কোনো নতুন ধর্ম বানাচ্ছিল না, সে কেবল ধুলোমাখা সেই শাশ্বত সত্যগুলোকে ঝেড়ে-পুঁছে মানুষের সামনে তুলে ধরছিল, যা মানুষ ভুলে গিয়েছিল। সে বলত, “আধিপত্যবাদ বা হেজিমনি কোনো মানুষের ওপর মানুষের চলতে পারে না। হুকুম চলবে একমাত্র তাঁর, যিনি এই আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন।”

ছায়াসাম্রাজ্যের প্রভুরা নড়েচড়ে বসল। তাদের গোয়েন্দারা খবর দিল, এই যুবক কোনো সাধারণ বিদ্রোহী নয়। সে কোনো পদ চায় না, সে কোনো স্বর্ণমুদ্রা চায় না। সে চায় ‘আমূল পরিবর্তন’। সে চায় কাচের ছাদ ভেঙে দিতে। প্রভুদের প্রধান, যাকে সবাই ‘মহামহিম অন্ধকার’ বলে ডাকত, সে খালিদকে নিজের প্রাসাদে তলব করল। খালিদ গেল, কিন্তু মাথা নিচু করল না। মহামহিম তাকে বলল, “ হে যুবক, তুমি কী চাও? আমাদের প্রাসাদের একটি স্তম্ভ তোমাকে দিয়ে দেব। তুমি সুখে থাকবে। কেবল ওই ‘ইনসাফ’ আর ‘সাম্য’-এর বুলি আওড়ানো বন্ধ করো। ওসব কেবল বইয়ের পাতায় মানায়, বাস্তবে নয়।”

খালিদ মৃদু হাসল। সেই হাসিতে কোনো অবজ্ঞা ছিল না, ছিল করুণা। সে বলল, “আপনারা আমাকে প্রাসাদ দিতে চাইছেন, অথচ আমি এসেছি আপনাদের এই প্রাসাদকে গণমানুষের পাঠশালা বানাতে। আমি আমার নিজের জন্য এক টুকরো রুটি চাই না, আমি চাই এই উপত্যকার শেষ শিশুটি যেন পেট ভরে খেতে পায়। আমি সেই ব্যবস্থার কথা বলছি, যেখানে খলিফা আর সাধারণ নাগরিকের কুর্তা হবে একই কাপড়ের। আপনারা যাকে ভয় পাচ্ছেন, তা আমি নই, তা হলো সত্য। আর সত্যের ধর্মই হলো প্রকাশিত হওয়া।”

মহামহিম ক্রুদ্ধ হলো। সে বুঝল, এই যুবককে কেনা যাবে না। তাকে ভয় দেখানো হলো। তার অনুসারীদের ওপর নির্যাতন নেমে এল। কিন্তু খালিদ যেন এক ইস্পাত কঠিন পাহাড়। সে বলল, “তোমরা আমার শরীরকে আঘাত করতে পারো, কিন্তু আমার বিশ্বাসকে স্পর্শ করার ক্ষমতা তোমাদের নেই। আমি সেই মৃত্যুঞ্জয়ী আদর্শের সৈনিক, যারা রক্ত দিয়ে ইতিহাস লেখে।” সে সাম্রাজ্যবাদীদের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে কথা বলল। সে দেখাল, কীভাবে ভিনদেশী বেনিয়ারা এই উপত্যকার সম্পদ লুটে নিচ্ছে আর প্রভুরা তাদের দালালি করছে। সে বলল, “আমাদের আইন হবে আমাদের গ্রন্থের, কোনো ভিনদেশী প্রভুর নির্দেশিকার নয়।”

সময় যত গড়াল, পরিস্থিতি তত উত্তপ্ত হলো। খালিদের ডাকে লাখো মানুষ রাজপথে নেমে এল। তারা আর আঁধারে থাকতে চায় না। তারা চায় সেই ইনসাফভিত্তিক সমাজ, যার স্বপ্ন খালিদ দেখিয়েছে। প্রভুরা দেখল, তাদের পায়ের তলার মাটি সরে যাচ্ছে। তারা সিদ্ধান্ত নিল, খালিদকে সরিয়ে দিতে হবে। কিন্তু গোপনে হত্যা করলে সে বিদ্রোহী হয়ে বেঁচে থাকবে। তাই তারা চাইল তাকে জনসমক্ষে অপমান করে হত্যা করতে, যাতে কেউ আর সাহস না পায়।

একটি সাজানো বিচারের আয়োজন করা হলো। অভিযোগÑখালিদ রাষ্ট্রের শত্রু, সে শান্তি নষ্ট করছে, সে পুরনো প্রথা ভাঙছে। বিচারক ছিল তাদেরই লোক। খালিদ কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে কোনো আত্মপক্ষ সমর্থন করল না। সে কেবল জনতার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমার মৃত্যু যদি এই ঘুমন্ত জাতির জাগরণ হয়, তবে সেই মৃত্যুই আমার জন্য বাসররাত। আমি চলে যাব, কিন্তু আমি যে বীজ বুনে গেলাম, তা তোমাদের অশ্রু দিয়ে জল পাবে। মনে রেখো, জালিমের তলোয়ারের চেয়ে শহীদের রক্ত অনেক বেশি শক্তিশালী।”

সেদিন ভোরবেলা, যখন আকাশের ওপারে সূর্য ওঠার সময় হয়েছে, তখন শহরের মাঝখানে বধ্যভূমিতে খালিদকে নিয়ে আসা হলো। হাজার হাজার মানুষ ব্যারিকেডের ওপাশে দাঁড়িয়ে। তাদের চোখে ভয় আর বিস্ময়। জল্লাদ যখন তলোয়ার তুলল, খালিদের মুখে কোনো ভীতি ছিল না। সে বিড়বিড় করে সেই মহান প্রভুর নাম জপছিল, যার আইনের জন্য সে জীবন দিচ্ছে।

তলোয়ার নেমে এল। ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সেই রক্ত মাটিতে পড়ে কালো হলো না। তা যেন তরল আগুনের মতো জ্বলতে লাগল। খালিদ মাটিতে লুটিয়ে পড়ল, কিন্তু তার মুখটা ছিল সেজদারত, যেন সে শেষ বারের মতো এই মাটির কৃতজ্ঞতা স্বীকার করছে। ঠিক সেই মুহূর্তে, প্রকৃতির এক অদ্ভুত খেলায়, অথবা অলৌকিক কোনো ইশারায়, উপত্যকার ওপরের সেই অদৃশ্য কাচের ছাদে ফাটল ধরল। একটা তীব্র আলোর রেখা আকাশ থেকে নেমে এসে খালিদের রক্তাক্ত দেহের ওপর পড়ল। মনে হলো, আকাশ নিজেই তাকে আলিঙ্গন করছে।

খালিদ নেই। তার দেহটা পড়ে আছে নিথর। কিন্তু জনতা স্তব্ধ হয়ে গেল। এক সেকেন্ড, দুই সেকেন্ড... তারপর হঠাৎ বাঁধ ভাঙা জোয়ারের মতো কান্না নামল। লাখো মানুষের কান্না। এ কান্না দুর্বলতার নয়, এ কান্না শপথের। তারা দেখল, তাদের প্রিয় নেতা, তাদের ভাই, তাদের আলোর দিশারী আজ তাদের জন্য জীবন দিয়েছে। তার রক্তে ভিজে গেছে অন্ধকূপের মাটি।

প্রভুরা ভেবেছিল, খালিদকে হত্যা করলেই সব শেষ। কিন্তু তারা জানত না, শহীদের মৃত্যু নেই। শাহাদাত মানে শেষ নয়, শাহাদাত মানে এক অনন্ত জীবনের শুরু। খালিদের মৃত্যুর খবর বাতাসের বেগে ছড়িয়ে পড়ল প্রতিটি ঘরে, প্রতিটি হৃদয়ে। যে মানুষগুলো আগে ভয়ে কথা বলত না, তারা আজ রাজপথে নেমে এল। তাদের হাতে কোনো অস্ত্র নেই, আছে খালিদের শেখানো সেই সাহসের মন্ত্র। তারা স্লোগান দিল, “ইনসাফ চাই, জাস্টিস চাই।” তাদের কণ্ঠে খালিদের কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।

খালিদের রক্তবিন্দু থেকে যেন হাজারো খালিদ জন্ম নিল। যে তরুণরা আগে হতাশায় নিমজ্জিত ছিল, তারা এখন চোখে আগুনের মশাল নিয়ে ঘোরে। তারা বুঝতে শিখল, জীবন মানে কেবল বেঁচে থাকা নয়, জীবন মানে আদর্শের জন্য লড়াই করা। খালিদ তাদের শিখিয়ে গেছে, কীভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হয়। কীভাবে সকল প্রকার তাগুত আর আধিপত্যবাদের চোখের দিকে তাকিয়ে ‘না’ বলতে হয়।

সেই উপত্যকায় এখন আর কাঁচের ছাদ নেই। জনতার উত্তাল তরঙ্গে তা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে। কিন্তু মানুষগুলো ভোলেনি তাদের সেই নেতাকে। তারা কোনো মিনার বানায়নি, কোনো মূর্তি গড়েনি। কারণ খালিদ শিখিয়েছিল, পাথরের মূর্তিতে মুক্তি নেই, মুক্তি আছে ইনসাফ কায়েমে। তাই তারা গড়ে তুলল এমন এক সমাজ, যেখানে এতিমের সম্পদ কেউ লুণ্ঠন করে না, যেখানে বিচারক কারো মুখের দিকে তাকিয়ে রায় দেয় না।

আজও যখন সেই উপত্যকায় সন্ধ্যা নামে, মায়েরা তাদের সন্তানদের গল্প শোনায়। কোনো রূপকথার রাজপুত্রের গল্প নয়, তারা শোনায় এক ‘খালিদ’-এর গল্প। তারা বলে, “এক ছিল মানুষ, যার বুকে ছিল আকাশ সমান সাহস। সে আমাদের জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছে। তার নাম ছিল খালিদ, কিন্তু আমরা তাকে ডাকি ‘শহীদ’।”

খালিদের কবরটা খুব সাধারণ। মাটির একটা ঢিবি, তার ওপর কিছু বুনো ফুল। কিন্তু সেই কবরের পাশ দিয়ে যখন কেউ যায়, সে নিজের অজান্তেই থমকে দাঁড়ায়। তার চোখ ভিজে ওঠে। মনে হয়, মাটির নিচ থেকে কেউ একজন ফিসফিস করে বলছে, “ভয় পেও না। সত্যের পথে থাকো। আমি আছি তোমাদের সাথে, প্রতিটা ভোরের আলোয়, প্রতিটা ন্যায়বিচারে।”

লাখো মানুষের হৃদয়ে খালিদ আজ এক অবিনশ্বর নাম। তার শাহাদাত তাকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে, যেখানে কোনো শাসকের হাত পৌঁছাতে পারে না। সে মিশে গেছে ধুলোয়, বাতাসে, আর মানুষের প্রার্থনায়। তার সেই স্বপ্নÑইনসাফভিত্তিক সমাজÑ আজ আর স্বপ্ন নয়, তা এক জীবন্ত বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেই জনপদে। আর যতদিন পৃথিবীতে সূর্যের আলো থাকবে, যতদিন মানুষ ন্যায়ের জন্য তৃষ্ণার্ত হবে, ততদিন খালিদের গল্প বেঁচে থাকবে। কারণ, আদর্শকে হত্যা করা যায় না, আর শহীদের রক্ত কখনো বৃথা যায় না। সেই রক্তে আঁকা ভোর কখনো অন্ধকার হতে পারে না।

এখনো, অনেক বছর পর, যখন কোনো মজলুমের ওপর অত্যাচার হয়, যখন কেউ ক্ষুধার্ত থাকে, তখন সেই সমাজের যুবকরা আকাশের দিকে তাকায় না, তারা তাকায় নিজেদের হৃদয়ের দিকেÑ যেখানে খালিদ বেঁচে আছে। তারা শপথ নেয়, “আমরা হারব না। কারণ আমাদের ধমনীতে সেই শহীদের রক্ত বইছে।” খালিদের মৃত্যু তাকে কেড়ে নেয়নি, বরং তাকে দান করেছে অমরত্ব। সে আজ কেবল একটি নাম নয়, সে একটি বিপ্লব, একটি চেতনা, একটি অনন্ত জাগরণ।