বসুদেব রায়

বিষণ্ন আকাশে চারিপাশের থমথমে নিস্তব্ধ পরিবেশ। মাঝেমাঝে এদিক-ওদিক থেকে আসা হালকা বাতাসে দুই-এক খানা কানা মেঘের ঝরঝরে বৃষ্টি। স্থায়িত্বের রেশ খুবেই সামান্য বটে। সেই হালকা বাতাসের সাথে লড়াই করে পশ্চিমের লম্বা চওড়া পতিত জমিতে এলোপাতাড়িভাবে জেগে ওঠা শুভ্র ফুলগুলো মাথা নেড়ে না না প্রতিবাদে আজ ব্যাকুল হয়ে উঠেছে। মনে হয় কিছু হারানোর ভয় আছে তাদের। সেখানে সঞ্চিত এক প্রাণ, এক অভ্রভেদী অট্টালিকার কোণে, সেখানকার ছোট জানলার অবাক করার মতো দৃষ্টিপাদ। এ বিস্তৃত আকাশে ধবল তপস্যায়ীর মেঘবালিকাকে ছুঁয়ে দেখার অভিপ্রায়, এ অচিন পাখির অলীক কল্পনা ছাড়া আর কি বা হতে পারে! পুবের কালো মেঘের দ্রুম শব্দে হঠাৎ যখন ক্ষণপ্রভার নিস্তেজ করার মতো আলোকবার্তা, তখন আপাদমস্তক প্রাণে ভয়ের সঞ্চয়। জিরিয়ে নেওয়ার সাথে সাথে টুস শব্দে একটা নোটিফিকেশন। অপরূপ সৌন্দর্য! মায়ার ঢংয়ে তাকিয়ে থাকা বৃষ্টিতে পুষ্ট স্নানৃত একটুকরো কাঠগোলাপ। আহা! বেশ শোভা, কুন্তলগুলো সেজে ছড়িয়ে রেখেছে। পরণের মিষ্টি শাড়ি, স্বচ্ছ কাঁচের চুরি, ললাটে তিলবিন্দু টিপ,সাঁজোয়া দৃষ্টিতে ইলিশ বলার ভঙ্গিতে মুখগহ্বর থেকে শঙ্খের হাঁসি নিমেষে চারপাশের প্রকৃতিকে নন্দিত করে রেখেছে। এরুপ সৌন্দর্য প্রকৃতিরেই কাম্য। কেননা প্রকৃতিই তো সৌন্দর্যের পূজারী। তাই কবি আজ দিশেহারা, বিহ্বলিত,পথহারা মুসাফির,পদের পথিক।

মুগ্ধ পথিক জিজ্ঞেস করিলো,

-এইযে জীবনানন্দ দাসের নারী, কেমন আছো?

- হুম ভালো, আপনি?

- এই তো চলছে। তোমাকে কিছু বলতে চাই, শুনবে তো?

- জ্বি বলেন,

- তোমার ওই বেনারসি শাড়ির আঁচল কতখানি লম্বা বলতে পারো?

- কেন?

- সেখানে যে হারিয়ে গিয়েছে বাউলের উদাস মন। আটকা পড়েছে দোদুল মন।

মায়াবী মুখে আর না আনিলেন কথা অবাক ইমোজিতে দিয়ে দিলো বাউলের অন্তরে ব্যথা। বাউল আবারও জিগাইলো,

-কি হলো, বলবে না কথা?

- কি আর বলি কিছুই বলার নাই যে,

হতাহত কবি পশ্চাৎ না ভেবে আবারও শুধাইলো

- সেখানে বেঁধে রাখা কি সম্ভব পদের পথিককে?

- ভেবে দেখা যাবে,

- কত অপেক্ষায় থাকতে হবে?

- জানি না।

আর হল না কোনো কথা। নীরবে কাটলো কয়েক প্রহর। সময়ের পরিবর্তন, আলো সরে গিয়ে অন্ধকার এলো। দিন গড়িয়ে রাত, রাত গড়িয়ে দিন। আকুলতার স্রোতে আশাবাদী আবার জিগাইলো,

-ভেবে কি দেখা হয়েছে, ভানুমতী?

ইমোজির মুচকি হাসিতে কবি মনে বাঁধলো খানিকের স্বস্তি। কবি আবারও শুধাইল,

-চুপ কেন? উত্তরে আসো..

- সম্ভব না! আমার পক্ষে সম্ভব না!

- কেন?

- জানি না..

- এ জগতে কে আর কি জানে? অন্তর্যামী ছাড়া। হয়তো জানি না বলে বলে এক জীবন পাড় করা সম্ভব।

- মায়ায় জড়িয়েন না। ভুলে যান।

- ভুলে যাওয়াই তো কঠিন। ভুলে গেলে তুমি থাকবে ভালো?

- হয়তো, আর কিছু বলিয়েন না।

- মানুষকে ভুলা যায় হয়তো, স্মৃতিকে ভুলা অসম্ভব। পারবে না ভুলতে এ মন। তবে আর কিছু শুনাতে চাচ্ছি না। অপেক্ষমাণ, শুভ কামনা রইল নিজের খেয়াল রেখো।