নিশাত রহমান নিশি
আমি মিতু। দরিদ্র বাবার মেয়ে। আমার ছোট বোন লামিয়া ও বৃদ্ধ দাদীকে নিয়ে আমাদের ছোট সংসার। পরিবার সামলাতে বাবার হিমশিম খেতে হয় প্রায়ই। আর্থিক সংকট যেন লেগেই থাকে। তবে এবার কিছুটা হলেও বাবা দুশ্চিন্তা মুক্ত হবে। বাবার খরচ কমবে। আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে। আগামীকাল বৃহস্পতিবার খুলনার এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সাব্বির হোসেন নামের এক ছেলের সাথে। বাবার থেকে শুনেছি ছেলেটা ভীষণ ভদ্র, শিক্ষিত। বাবা-মা ভীষণ খুশি। এমন ভালো-ভদ্র ছেলে বর্তমানে খুঁজে পাওয়া বেশ বিরল।
আজ আমার গায়ে হলুদ অনুষ্ঠান সম্পূর্ণ হলো। হলুদ শাড়ি, খোঁপায় ঘন গাঁদা ফুলের মালা, গলায় ফুলের মালা দিয়ে সেজেছি। সাব্বিরের গায়ে ছোঁয়া হলুদ তার পরিবারের সদস্য আমার জন্য এনেছে। আমাকে সেই হলুদ মাখানো হবে। আমি বসে পড়লাম পিঁড়িতে। একজন একজন করে আমার গায়ে হলুদ মাখিয়ে দিচ্ছে। হলুদ মাখানো শেষে বৃদ্ধ দাদী সহ আরও কয়েকজন মিলে আমায় গোসল করিয়ে দিচ্ছে। এই গোসলের দৃশ্যটা আমার বেশ ভালো লাগে। ছোটবেলা থেকেই যখন নববধূদের সকলে মিলে গোসল করাতো আমি চুপ করে তাকিয়ে দেখতাম। আমার ভীষণ ভালো লাগতো। কলসের পানি যখন মাথা থেকে হলুদ মাখা মুখ গড়িয়ে পড়তো কি সুন্দর লাগতো নববধূদের। একটি মেয়েকে এমন সুন্দরী এক জীবনে কখনোই লাগে না।
সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত পোহালো। আমার সকল আত্মীয়-স্বজন এসেছে। বৃদ্ধ দাদী, খালা, চাচীরা মিলে গান গাচ্ছে। গানগুলো সাধারণত শোনা যায় না। সেকেলে গান, তবে বেশ মজার। বাবা বাবুর্চির সাথে বসে আলাপ-সালাপ করছে। কাল কয়েকশো মানুষের খাবারের আয়োজন করা হয়েছে। তাদের কেউ যেন অসম্মানিত না হয়। বাবা আমার গরিব হলেও মনটা ভীষণ বড়। মানুষকে সম্মানিত করতে তিনি কোনদিনই কার্পণ্য করেননি। ছোট বাচ্চারা এদিক সেদিক ঘোরাফেরা করছে।
রাত গভীর হলো। হঠাৎ দেখি বাবা-মা আমার কক্ষে। বাবা বললেন, মা, মিতু। আগামীকাল তুই আমাদের ছেড়ে চলে যাবি। আমি তোকে পড়ালেখা আর শিখাতে পারলাম না। তোর অনেক কিছু প্রাপ্য ছিলো মা। আমি তার কিছুই দিতে পারি নি। যদি সম্ভব হতো নিজের রক্ত বেঁচে তোরে রাজকন্যা করে আজীবন আমার ঘরে রাখতাম। কিন্তু তা সম্ভব না। প্রত্যেক মেয়েকে স্বামীর ঘরে যেতে হয়। এটাই জগতের নিয়ম। তুই সবসময় একটা কথা মাথায় রাখবি, এই গরিব বাবার ঘরের একমাত্র রাজকন্যা তুই। পৃথিবীর সবাই তোর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেও আমি তোর পাশে থাকবো। বলেই বাবা কাঁদতে লাগলেন।
আমি বাবাকে জড়িয়ে ধরলাম। আমার নতুন জীবনের জন্য দোয়া চাইলাম। বাবা প্রাণভরে আমার জন্য দোয়া করলো। মা বললো, সাব্বির অনেক ভালো ছেলে। নেশা করে না, ভদ্র, পরিশ্রমী ছেলে। তুই অনেক সুখী হবি মা দেখিস। আমি মায়ের কাছ থেকেও দোয়া চেয়ে নিলাম।
সাব্বিরের সাথে দেখা হয়েছে একবার। তার পরিবারসহ যেদিন আমায় দেখতে এসেছিলো। ছেলেটি আমার সমবয়সী প্রায়। লাজুক প্রকৃতির ভীষণ। আমাদের আলাদা কথা বলার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়। ছেলেটি আমায় বললো,
এতো দ্রুত বিয়ে করছো যে, পড়াশোনা করতে বুঝি ভালো লাগে না?
আমি একটু অস্বস্তি নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে বললাম,
আমার পড়াশোনার ইচ্ছে আছে। তবে বাবার পক্ষে আমাদের দুই বোনের একসাথে পড়াশোনার খরচ চালানো কষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
পারিবারিক অক্ষমতার কথা আমি তাকে জানালাম। নিজের দুর্বলতা জানানোর মধ্যে ছোট হওয়ার কিছু নেই। বরং দুর্বলতা স্বীকার করার মধ্যেই রয়েছে মহত্ত্ব।
আচ্ছা, তবে বিয়ের পর খুলনার এক কলেজে তোমায় ভর্তি করে দিবো। পড়বে তো?
আমি খুশি হয়ে সম্মতি জানালাম।
আর একটা কথা বলার ছিলো মিতু। কিন্তু কিভাবে বলবো বুঝতে পারছি না।
জ্বী, বলেন।
তোমায় শাড়িতে ভীষণ সুন্দর লাগছে। বিয়ের পর সবসময় শাড়ি পরে থাকবে বলেই তিনি ভ্যাল ভ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। আমি লজ্জায় পড়ে গেলাম।
বিবাহের তারিখ ঠিক হলো। এরপর ছেলেটার সাথে কয়েকবার টেলিফোনে কথা হয়েছে।
আমি লাল শাড়ি পরেছি। মাথায় লাল ঘোমটা। ঘোমটা কপাল পর্যন্ত টানা। গা ভর্তি গহনা। বাবা অনেক আগেই গহনাগুলো বানিয়ে রেখেছিলেন। দাওয়াতের লোকজন আসতে শুরু করেছে। বাড়ি মানুষে মুখরিত হয়ে উঠেছে। কিছুক্ষণ পরই বরযাত্রী চলে এলো। চারিদিকে হই-হুল্লোড়। এমা সাব্বির দেখি আমার সামনে।
“আমার বউকে লাল শাড়ীতে কেমন মানাচ্ছে দেখার জন্য আর বিয়ে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারলাম না।”
কক্ষের সবাই হেসে গড়াগড়ি। আমি ভেবেছিলাম ছেলেটি লাজুক, এখন দেখছি বেশ নির্লজ্জ আছে। তবে বর সেজে সাব্বিরকে বেশ সুন্দর লাগছে।
বিবাহ সম্পন্ন হলো। আমায় চলে যেতে হবে। নতুন গন্তব্যে। এরপর থেকে নিজের বাড়িতে মেহমান হয়ে আসবো। চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো। মা কাঁদছে, বাবা কাঁদছে , কাছের মানুষজন কাঁদছে। সাব্বির আমার হাতটা শক্ত করে ধরে মাইক্রো গাড়ির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। গাড়িতে ওঠার আগে পিছন ফিরে চিরচেনা বাড়িটির দিকে তাকালাম। কতশত স্মৃতি। চোখ গড়িয়ে অনবরত পানি পড়ে যাচ্ছে আমার।
গাড়িতে উঠলাম। সাব্বির আমার পাশে। পিছনের সিটে আমার ছোট বোন লামিয়া, আমার দাদী সহ আরও বেশ কিছুজন। ড্রাইভার গাড়ি ছাড়লেন। বেশ অনেকটা পথ চললাম। আমি কেঁদেই চলেছি। সাব্বির চোখের পানি মুছে দিলো। বললো, যত পারো কেঁদে নাও এরপর আর কখনো কাঁদতে দিবো না। আমি হাসলাম। ছেলেটি বেশ মজার। খেয়াল করলাম সাব্বির আমার হাতটা এখনও ধরে আছে।
আপনি কি হাতটা ছাড়বেন না?
কোনদিনও না। এইযে আজ হাত ধরেছি মৃত্যুর আগে ছাড়বো না। কথা দিলাম।
ছেলেটি আসলেই মহান। সে তার কথা রেখেছে। এই বিশাল পৃথিবীতে খুব কম মানুষই পারে কথা দিয়ে কথা রাখতে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সে তার কথা প্রমাণ করেছে। আমরা ব্রিজ পার হলাম। খেয়াল করলাম একটা নৌবাহিনীর যাত্রীবাহী বাস অপর পক্ষ থেকে ধেঁয়ে আসছে। দ্রুত গতিসম্পন্ন বাস। আমাদের সকলের নজর কাড়লো। মুহূর্তের মধ্যেই সেই বাস আঘাত করলো আমাদের গাড়িকে। দুই গাড়ির মুখোমুখি সংঘর্ষে আমাদের গাড়ি ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। গাড়িতে অবস্থানরত প্রায় সকলেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লো। খেয়াল করলাম, সাব্বির আমার হাত ছেড়ে দিয়েছে। আমি অভিমানী চোখে তার দিকে তাকালাম। রক্তাক্ত চেহারা। সাব্বিরকে আমি চিনতেই পারছি না। সাব্বির মারা গেছে। ছেলেটি তার কথা রেখেছে ভেবে আমি খুশি হলাম।
সাব্বির এর মাথার মুকুট, আমার চুড়ি দুই দিকে পড়ে আছে। মাঝখানে রক্তের বন্যা। আমাদের দুজনের মধ্যে কি আকাশ পরিমাণ দূরত্ব সৃষ্টি হলো অথচ আজ সমস্ত দুরত্ব ঘুচিয়ে এক হওয়ার কথা ছিলো।
আমার মাথার লাল ঘোমটা দিয়ে আমার পুরো শরীর ঢাকা হয়েছে। লাল ঘোমটা রক্তে লাল গাঢ় বর্ণ ধারণ করেছে। আমার শরীরের সকল অলংকার খুলে ফেলা হচ্ছে।
আমরা চিরকালের মতো পরবাসী হয়ে গেলাম। আমি বিশ্বাস করি সাব্বির এর সাথে সেই অনন্তকালে আমার দেখা হবে। আমার সংসার হবে। এমন অসম্ভব ভালো ছেলের সাথে সংসার না করলে হয়?
মোংলা কবরস্থানে পাশাপাশি ৯ টা কবর খোঁড়া হলো। আমি, আমার বোন,দাদীসহ বাকি সদস্যদের দাফন করা হলো। বাবা-মা কান্নায় ভেঙে পড়েছে। মুহূর্তেই বিয়ে বাড়ির সকল আলো নিভে গেছে। সাব্বির এর মা আমাদের বরণ করবে বলে মিষ্টি নিয়ে অপেক্ষা করছে। তার ছেলে ফিরলো লাশ হয়ে। আসলেই মায়েরা খুব দুঃখিনী হয়। তারা সবকিছুতে ভীষণ কান্নাকাটি করে। মায়েরা কিছুতেই বুঝে না প্রকৃতির নিয়ম বড় কঠিন। এখানে সবকিছু আমাদের পরিকল্পনায় হবে না।
“এমন অনেক ঘটনা ঘটবে যা কোনভাবেই উচিত নয়। তারপরও সেগুলো ঘটবে। এবং মানুষকে সাদরে তা গ্রহণ করতে হবে। তার ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় প্রকৃতির আদৌ কিছু যায় আসে না।