খাতুনে জান্নাত কণা

বিকেল সময়টা বেশ ভালো লাগে হিয়ার। চকলেট চুষে খাওয়ার মতো মিষ্টি একটা সময়। আকাশটা কেমন এক মায়াঘেরা রঙ নিয়ে হাজির হয়।রোদ যখন ছায়াগুলো লম্বা করতে শুরু করে, সে তখন, জানালা দিয়ে বাইরে চেয়ে দেখে। পড়ন্ত রোদের দিকে তাকিয়ে, উঠোনে নেমে আসে। বাঁশঝাড়ের ফাঁক গলে আসা হলুদ রোদের ঝিকিমিকি, মুগ্ধ চোখে চেয়ে দেখার সময়, মায়ের ডাকে ফিরে তাকায় ।

ঃ আয় মা, তোর চুল বেঁধে দিই।

মুখ ভার করে, মায়ের সাথে, প্রায় আটফুট লম্বা, ডালপালা ছড়ানো, কামিনি গাছটার নিচে গিয়ে বসে। গাছের নিচে, ফুলের ঝরে পড়া পাপড়িগুলো, দুধসাদা সৌন্দর্য্যরে সাথে সুগন্ধ ছড়িয়ে দিয়েছে।

ঃ আচ্ছা মা, প্রতিদিন চুল না বাঁধলে হয় না? চুলে এত জট লেগে থাকে। আঁচড়ানোর সময় খুব ব্যথা পাই।

ঃ ব্যথা যাতে না পাও সেভাবেই আঁচড়ে দেব। বসো।

মা বসে জামকাঠের তৈরি , ছোট জলচৌকির মত, দেড় হাত দৈর্ঘ্য বিশিষ্ট সাদা কাঠ রঙের টুলে। তার সামনে সামান্য উঁচু পিড়িতে বসে হিয়া। মায়ের এতে সুবিধে হয়। মাথাটা নিচুতে না থাকলে দেখেশুনে তেল দেয়া, বিনুনী করা, কোনোটাই সম্ভব নয়। চুলে তেল মেখে চিরুণী চালানোর সময়, হিয়া “উহ! আহ!” শব্দ করতে থাকে।

ঃ মা, একটু আস্তে আস্তে আঁচড়ান না! উহ! ব্যথা পাই

ঃ হ্যাঁ হ্যাঁ, আস্তে দিচ্ছি। এই তো আর একটু বাকি আছে। নড়িস না মা।

হিয়ার রীতিমত কান্না পেয়ে যায়। ওর চুলগুলো এত বেশি ঘন আর কোঁকড়ানো যে, সহজেই জট বেঁধে যায়। ছোট ছোট গুচ্ছে ভাগ করে, তেল দিয়ে না আঁচড়ালে, আঁচড়ানো কঠিন। ওর মা ফিতা দিয়ে চুলের গোড়ায় শক্ত একটা করে বাঁধন দিয়ে নেন। তারপর, দুই কানের উপর দুটো বেণী করে, চুলের শেষ প্রান্তের ফিতার বাঁধনগুলো টাইট করে বেঁধে, বেণী উল্টে, শেষ মাথার ফিতাগুলো বেণীর গোড়ায় বেঁধে, ফুলের আকৃতিতে বাঁধন দিয়ে দেন। ঠিক যেমন করে জুতার ফিতা বাঁধতে হয়। হিয়া জানে, এটাকে সবাই বলে কলা বেণী। চুলের গোড়া টাইট করার সময়, ওর মা সব সময় বলেন, এতে চুল তাড়াতাড়ি নাকি লম্বা হয়। মজবুত হয়।

১৯৮৩ সাল। জামালপুর জেলার, ইসলামপুর থানার, ঢেংগারগড় গ্রাম। মাদারদৌ বিলের ধারে, গাছপালায় ঘেরা হিয়াদের বাড়ি দিনের শেষ বেলা। ক্লাস সিক্সে পড়ুয়া হিয়া, কলা বেণী দুলিয়ে, ফ্রকের ঘের ছড়িয়ে, কখনো লাফাতে লাফাতে কখনো দৌড়াতে দৌড়াতে, বাড়ির বাইরে খেলতে চলে যায়।

হিয়া ভাবে, মা মনে হয় ঠিকই বলেছেন। চুলগুলো টাইট হয়ে এঁটে থেকে মাথায় ব্যথা ধরিয়ে দিয়েছে। রাবার যেমন টানলে লম্বা হয়ে যায়, চুলও হয়তো টান পড়ে পড়ে এক সময় ভেতর থেকে লম্বা হতে থাকবে। পাশের বাড়ির রূপা আপারা দল বেঁধে বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। মাটির এই সরু পথ দিয়ে কোনোমতে গরুর গাড়ি একটা ঢুকে যেতে পারে। অবশ্য, আশেপাশের গাছের ডালপালার সাথে গাড়িগুলো হাঁচড়ে পাঁচড়ে যায়। হিয়া, রাস্তা পাড়ি দিয়ে বিলের ধারে গিয়ে বসে। বাড়ির বাউন্ডারির বাইরের অংশ এটা। রাস্তা পার হলে, পাশে কিছু গাছপালা আর মাদারদৌ বিলের উঁচু পাড়। সব বাড়ির ঘাট আলাদা। শান বাঁধানো কোনো পাড় নেই। নিজেদের ঘাটের পাড়ের, জাম আর আমগাছের ফাঁকা অংশে এসে বসে হিয়া। এখানে আমগাছের শিকড়ে আরাম করে বসে থাকা যায়। তবে, বন্যার সময় ছাড়া, হিয়া ওদের ঢেউ খেলানো শরীরের জামগাছে , পা ঝুলিয়ে বসে থাকে। বন্যার সময় এই গাছের শরীর গলা পর্যন্ত ডুবে যায়। তখন, গোসলের সময় বেশ মজা হয়। সাঁতরে এসে গাছ ধরে জিরিয়ে নেয়া যায়। গাছে, পাকা কালোজাম থাকলে, হাত বাড়িয়ে, পেড়ে নিয়ে, টুপটাপ মুখে দিয়ে খেয়ে ফেলা যায়। গোলাকৃতির বেঞ্চের মত জামগাছটা, কিছুদূর এগিয়ে বকের মত গলা উঁচু করে উপরে উঠে গেছে। আশেপাশের বাড়িতে গিয়ে খেলাধূলা করা বারণ। তাই ওর প্রিয় জায়গা এই বিলের ধার। এর নিচে ওর সমবয়সীদের সাথে “ফুল টুক্কা” আর “টু পলান্তি” (লুকোচুরি ) খেলে। অনেক সময় খেলনা হাঁড়ি- পাতিল নিয়ে “টুগামালি”(চড়ুইভাতি) খেলতে বসে যায়। ফাঁকি ফাঁকি ধূলা-বালি দিয়ে রান্না করে। এই খেলাটা অবশ্য রাস্তার পাশের, দশ জন মানুষের মত মস্ত শরীরের, “লাল কাঁঠাল গাছ” আর মোটাসোটা, আট মানুষ সমান প্রশস্ত “মিঠে আমগাছের” নিচেই বেশি খেলে। বিলের ধারে বসে রোদটাকে যেমন সুন্দর লাগে দেখতে, তেমনি, বিলের ঐ পাড়ে, দিগন্ত বিস্তৃত ধান ক্ষেত, আখ ক্ষেত, আকাশ, পানিতে ছোট বড় ঢেউগুলো, ওর খুব ভালো লাগে। নদীর ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে ওর এত ভালো লাগে ! মন খারাপ হলে, কিংবা অনেক খুশী হলেও, হিয়া চলে আসে নদীর ধারে। স্বচ্ছ পানির ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে , মনটাও যেন টলটলে নির্মলতায় ভরে ওঠে। কোথাও বেশিদিনের জন্য গেলে, এই নদীর কথা ভেবে, ওর মনটা আনচান করে ওঠে। কবে বাড়িতে আসবে! নদীতে নেমে গোসল করবে, সাঁতার কাটবে, আর, পাড়ে বসে ঢেউ গুনবে ।

দেখতে দেখতে সময় গড়িয়ে যায়। হিয়া এখন রাজধানী শহর ঢাকায়ই বেশি থাকে। থাকে বলতে, থাকতে হয় আর কি। সময়টা ১৯৯৫ সাল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের, বেগম রোকেয়া হলে থাকে সে। ওর আবাসিক হল কক্ষের, জানালার পাশে বসে আছে। এটা হিয়ার খুব পছন্দের জায়গা। তিন তলার এই জানালার পাশে, কৃষ্ণচুড়া গাছের কয়েকটা ডাল ছড়িয়ে আছে। ফুলগুলো হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখা যায়। কখনো কখনো ছোট্ট ডালসহ ভেঙে এনে, পড়ার টেবিলে, ফুলদানীতে সাজিয়ে রাখে। ওর জন্মদিনে কোনো এক বান্ধবী ফুলদানীটা গিফ্ট করেছিল। বিকেলের পড়ন্ত রোদে, মাঝে মধ্যে দু’একজন বান্ধবীর সাথে বের হয়ে, টিএসসির ঘাসের উপর বসে গল্প করে। ফুসকা অথবা চটপটি, তা না হলে, সমুচা, সিঙ্গারা বা পেঁয়াজু খেয়ে রুমে ফিরে আসে। মাগ¦রিবের আজানের পর, নিজের রুমের বাইরে থাকাটা তার পছন্দ না। ভালোও লাগে না। ওদের ক্লাসের এবং ব্যাচমেট অনেক মেয়ে আছে, যারা সন্ধ্যার পরও, বাইরে থাকতে পছন্দ করে। সিনিয়র আর জুনিয়র অনেক মেয়েকেও হিয়া, হলের “সূর্যাস্ত আইন”কে উপেক্ষা করতে দেখেছে। ওরা রীতিমত আন্দোলন করে, সন্ধ্যার পর, হলের বাইরে থাকার সময়টাকে, ছয়টা থেকে বাড়িয়ে আটটা পর্যন্ত করে নিয়েছে। গ্রীস্মকালে , সাড়ে পাঁচটার মধ্যেই সূর্য্য ডুবে যায় ।

ছয়টার মধ্যে সন্ধ্যা মুটামুটি গাঢ় হয়ে নামে।হিয়ার মত মানসিকতার কিছু মেয়ে আছে।যারা, অতিরিক্ত স্বাধীনতার কথা বলে, বাইরে বেশি সময় থাকে না। তাদের সাথে সে, অবসর সময়ে, হলের রুমে বসে আড্ডা দেয়। হৈ চৈ করে। কখনো ক্যান্টিনে একসাথে চা নাশতা খায়। মাঝে মধ্যে, বিকেলে, ক্যাম্পাসে একটা চক্কর দিয়ে আসে। গোধূলীর সূর্যটাকে দেখতে, খোলা মাঠে গিয়ে, বান্ধবীদের সাথে বসে থাকে। কখনো ছাদে গিয়ে , রেলিঙের পাশ ঘেঁষে দাঁড়ায়। ছেলেবেলার কথা খুব মনে পড়ে । এখানে , ক্যাম্পাসে কিছু সবুজ গাছপালা থাকলেও , বাইরের জন অরণ্য আর যান বাহনের ভীড় খুব বিরক্তিকর মনে হয়। খুব প্রয়োজন ছাড়া সে মার্কেটে যায় না। একটা ব্যাপার হিয়াকে খুব বিচলিত করে। এখানে বেশিরভাগ ছেলে - মেয়ে ভালোবাসার কথা বলে জুটি বেঁধে ঘুরে। সিনেমা, নাটক , থিয়েটার দেখে সময় কাটায়। রেস্টুরেন্টে খেতে যায়, ছুটির দিনে কোথাও না কোথাও ঘুরতে বেরিয়ে যায়। এটাকে হিয়ার কাছে, স্বাধীনতার অপব্যবহার বলে মনে হয়। হিয়া, বড়জোর পাঁচ-ছয়জন মেয়ে বন্ধুর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে মেশে। কোনো এক গাছের পাশে, সবুজ ঘাসের উপর পা বিছিয়ে, দু’দন্ড কথা বলে ওরা, যে যার রুমে ফিরে যায়। পাবলিক লাইব্রেরিতে গিয়ে, রেফারেন্স বুক ঘেঁটে নোট করে । ন্যাশনাল মিউজিয়াম চিড়িয়াখানা এবং বোটানিক্যাল গার্ডেনেও, পরিবারের সদস্যদের ছাড়া গেলে, ঐ একইভাবে, কয়েকজন বান্ধবী মিলে, বেড়াতে যায়। দলবদ্ধ হয়ে, শুধু মেয়েরা মিলে, ঘুরে বেড়াতে মজাই লাগে। এই জীবনের অন্য এক আনন্দ আছে। তবে, ছুটির দিনে যখন ওদের ক্লাসের শুধু নয়, সিনিয়র আর জুনিয়র মেয়েদেরও ভালোবাসার মানুষটা দেখা করতে আসে, লাভার বা বয়ফ্রেন্ড যাইই বলা হোক, নিজেদের কেমন যেন, বিচ্ছিন্ন এক পরিবেশের মানুষ মনে হয় । হিয়ার কোনো কোনো বান্ধবী তো মজা করে বলেই ফেলে,

ঃ আমাদের কেউ নেই রে। আমরা তো এতিম। কোনো লাভার নেই। যার বগলদাবা হয়ে ঘুরে বেড়ানো যায়। রেষ্টেুরেন্টে গিয়ে, মজাদার খাবার খাওয়া যায় ।

ঃ কী যে সব বলিস না রুমা? লাভার না থাকলে কি এতিম হয় নাকি ? আস্তাগ¦ফিরুল্লাহ। মা-বাবা বেঁচে থাকতে এমন কথা বলতে নেই রে ।

ঃ সরি দোস্ত। মনে ছিল না। আল্লাহ মাফ করে দাও ।

ঃ তুই কি জানিস, এভাবে অবিবাহিত ছেলে- মেয়েদের একসাথে ঘুরে বেড়ানো কত গুনাহর কাজ? পবিত্র কোরআন শরীফে, সূরা বনি ইসরাইলের ৩২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, “তোমরা ব্যাভিচারের নিকটবর্তী হয়ো না। নিশ্চয়ই তা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট আচরণ । ”

ঃ বাহ, তোর তো দেখি কোরআনের আয়াতও মুখস্থ ?

ঃ আমার সাবসিডিয়ারী সাবজেক্ট ইসলামী স্টাডিস। ভুলে যাচ্ছিস কেন ?

ঃ ও আচ্ছা। তাই তো! যাক বাবা, আমরা তাহলে মারাত্মক সব গোনাহ থেকে বেঁচে যাচ্ছি।

ঃ ঠিক তাই। তবে, মনে আফসোস থাকলে কিন্তু চলবে না। ওরা যা করছে, এটা মন্দ কাজের মধ্যে পড়ে, এ কথা মাথায় রাখতে হবে। বিয়ের উপযুক্ত, একজন ছেলে আর মেয়ে, যখন কাছাকাছি আসে, স্বাভাবিকভাবেই, তারা, একজন আরেকজনের প্রতি যৌন আকর্ষণ বোধ করে। তাদের সেই আকর্ষণের কারণে, আনন্দ পাওয়ার জন্য, ভালো লাগার জন্য, পরস্পরের প্রতি, যদি তারা কোনো অনুভূতির প্রকাশ ঘটায়,সেটাই নাকি জ্বেনার গোনাহের মধ্যে পড়ে যায়। প্রেমের দৃষ্টিতে তাকানো, হাত ধরা, চুমু খাওয়া, জড়িয়ে ধরা সবই গোনাহ। চরম কোনো পরিস্থিতিতে গেলে, সেটা তো কঠিন শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ভাবতে পারিস ?

ঃ সন্ধ্যার পর পর, কলা ভবনের পাশে বসে, কয়েকজন ছেলে-মেয়ে গাঁজা টানে, শুনেছিস ? এদের মধ্যে কেউ কেউ ছিনতাইয়ের কাজে জড়িয়ে পড়েছে। ওদেরকে চিনে রাখিস। ভুলেও ওদের সাথে মিশতে যাবি না। কখন কোন বিপদে পড়তে হয়, কে জানে। সব সময় দূরত্ব রেখে চলবি। আর, চারুকলার ছেলে - মেয়েদের বেশিরভাগই একটু অন্যরকম। কেউ একটু বেশি ন্যাকা, কেউ একটু পাগলাটে, আবার কেউ আছে, নিজেকে সব সময় ইসলামের বিরোধী শিবিরের পরিচয় দিতে উৎসাহী। এরা সবাই বিপজ্জনক।

ঃ আমি তো চারুকলার ওদিকটাতে খুব কম যাই। আমাকে রক্ষণশীল মনে করে, ওরা নিজেরাই দেখি এড়িয়ে চলে। মাথায় স্কার্ফ পড়ি দেখে, ওদের অনেকেই আমাকে পছন্দ করে না। এদিক দিয়ে বেশ সুবিধা হয়েছে।

ঃ ভালো হয়েছে ।

ফেব্রুয়ারিতে যখন বইমেলা হয়, বাংলা একাডেমি আর পুরো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস জুড়ে এক উৎসব মুখর পরিবেশ থাকে। নতুন নতুন বইয়ের সাথে জানাশোনা, আর, বেশকিছু বই সংগ্রহে রাখার সুযোগ ঘটে তখন। বইমেলার বাইরে, গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী, নানা জিনিসের পসরা নিয়ে দোকানীরা বসে থাকে। প্রয়োজনীয় কিছু পণ্য খুব সহজেই সেখান থেকে কেনা যায়। সেই সময়গুলোতে, বিকেলগুলো কোনদিক দিয়ে চলে যায়, টেরই পায় না হিয়া। অবশ্য, বিকেলের জনসমাগমের ভিড়ে, প্রকৃতির আসল সৌন্দর্যকে খুঁজে পাওয়ার সুযোগ হয় না। ক্যাম্পাসে বিকেল মানেই, ছেলে- মেয়েদের উপচে পড়া ভিড়ের সাথে, নিজেকে মানিয়ে নেয়া। চটপটি আর ফুচকার সাথে হিয়ার পরিচয়, ঢাকায় এসে। বিকেলের নাশতা হিসেবে ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে যা দারুণ জনপ্রিয়। এগুলোর চেয়ে হিয়া পছন্দ করে, সিঙ্গাড়া- সমুচা। চা অথবা সফ্ট ড্রিংকস মাঝে মধ্যে খাওয়া হয়। সব সময় না। এগুলো হিয়ার কাছে এক রকম খাদ্য বিলাসিতা মনে হয়। পানীয়ের মধ্যে লেবুর শরবত, অথবা যে কোনো সুস্বাদু ফলের রস চিপে শরবত বানালে, সেটা খেতেই বেশি ভালো লাগে।

ব্যস্ত, দূষণপূর্ণ বায়ুতে ভরপুর, ধুলোবালি আর যন্ত্রযানের জ্যামে আবদ্ধ, রাজধানী শহর ঢাকা। হিয়ার জীবনের সাথে ২৭ বছর আরো যুক্ত হয়ে গেছে। ২০২২ সালের দ্বিতীয় মাস। বিকেলগুলোতে কিছু জরুরী কাজ সারা হয়। শীত যাব যাব করছে। পুরোপুরি যায়নি। রাতে লেপ গায়ে দিলে, শরীর ঘেমে ওঠে। অথচ, কাঁথা গায়ে দিলেও, শীত একটু লাগেই। তাই, উভয়সংকট অবস্থা। হিয়া তাই, পাতলা কম্বলটাই গায়ের উপর টেনে নিয়ে , ঘুমাতে চেষ্টা করে । বাচ্চারা সব আছরের নামাজের পর খেলতে চলে যায়। কিন্তু, হিয়া তার কাজগুলো, দ্রুত গুছিয়ে নিয়ে, একটু হাঁটতে বের হয় । মানুষের জীবন, ঘড়ির কাঁটার মত। অনবরত, চলছে তো চলছেই। এক সময় এই কাাঁটাটা স্থির হয়ে যাবে কোন সংখ্যার উপর, কেউ জানে না। ডায়াবেটিস, এখন প্রায় অধিকাংশ মানুষের শরীরে, জায়গা করে নিয়েছে। তাই, সকাল আর বিকেলের হাঁটাহাঁটির সময়, কিছু মুখ, প্রতিদিনই চোখে পড়ে ওর। ওরা কেউ বয়স্ক, কেউ প্রবীণ বয়সের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে এমন ।

নানীআম্মা, আম্মা-আব্বা, কারো ডায়াবেটিস ছিল না। তবে, উচ্চরক্তচাপ সবারই ছিল। হিয়ার কেন ডায়াবেটিস হয়ে গেল, ভেবে পায় না। নিজের হাতে ঘরের কাজ সারে। ছেলে - মেয়েকে স্কুলে আনা নেয়ার কাজও করে। তার বড় ছেলে এখন দশম শ্রেণীর ছাত্র। অথচ, ওর বয়সী, যেসব বান্ধবীদের আগে বিয়ে হয়েছে, তাদের ছেলে - মেয়েরা বড় হয়ে গেছে। হিয়া, মাস্টার্স পাশ করে, চাকরিতে জয়েন করার পর তার বিয়ে হয়। এখন তো পারিবারিক সিদ্ধান্তে বিয়ে হওয়া বেশ কমে গেছে। যেহেতু, হিয়ার পারিবারিক আবহ বেশ রক্ষণশীল ছিল, তার নিজের মানসিকতাও ছিল তেমনই, তাই, পরিবারের পছন্দেই বিয়েটা হয়েছে। এখনকার পরিবেশ - পরিস্থিতি, তাদের বেড়ে উঠার সময় থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। ছেলে- মেয়ে নিজেদের পছন্দে বিয়ে করবে, এটাই এখনকার সংস্কৃতি। ঢাকার বেইলী রোডে ওদের বসবাস। সেই সুবাদে রমনা পার্কে হাঁটতে চলে যায়। সকালে একটা সহনীয় পরিবেশ থাকলেও, বিকেলে সেখানে হাঁটতে যাওয়া খুব বিড়ম্বনার। জুটি বেঁধে ছেলে- মেয়েরা সব বসে থাকে। হিয়া যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিল, তখনও ছেলে- মেয়েরা, এভাবে, পার্কে বসে প্রেম করতো। কিন্তু, সেই সংখ্যাটা এত বেশি ছিল না। তারা কিছুটা আড়াল খুঁজে নিত। এখন তো নানান ধরনের, নানা বয়সের মানুষকে এভাবে জুটি বেঁধে বসে থাকতে দেখা যায়। ঘরের ভেতরে, একান্ত পরিবেশে, স্বামী-স্ত্রীরা যা করে, এরা লোকচক্ষুর তোয়াক্কা না করে, তেমন কিছুই করতে থাকে। হিয়ার খুব বিরক্ত লাগে। আমরা আসলে কোনদিকে যাচ্ছি ? এসব অসভ্যতা, নোংরা সংস্কৃতি থেকে আমাদের মুক্তির উপায় কি? “হে আল্লাহ! আমাদের সমাজকে, সমস্ত কলুষতা থেকে মুক্ত করে দাও।” বিকেলগুলো কলুষিত করে দেয়া, অসভ্য তরুণ - তরুণীদের মা-বাবাকে অভিসম্পাত দিবে, নাকি, দেশের শাসন অবকাঠামোর সাথে সম্পৃক্তদের উপর আল্লাহর লানত কামনা করবে, হিয়া তা বুঝে পায় না। মাঝে মাঝে মনটা খুব বিক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। বিকেলে হাঁটতে বের হয়ে, রমনা পার্কের গাছগুলোর ফাঁক গলে ঢুকে পড়া লালচে হলুদ রোদ দেখে, হিয়ার মনে পড়ে, ফেলে আসা সময়ের সেই ছেলেবেলার বিকেলগুলো। আহা! কি মধুময় স্মৃতি! যদি সেই সময়গুলোতে, আবার কখনো ফিরে যাওয়া যেত! মা, পরিণত বয়সে গিয়ে, অনন্তলোকের বাসিন্দা হয়ে গেছেন। সেও তো অনেকদিন হয়ে গেল। এখন হিয়া যদি নিজে থেকে নিজের চুল বাঁধে, তাহলেই কেবল চুলগুলো পরিপাটি হয়ে ওঠে ।

তা না হলে, কাজের ব্যস্ততার জন্য, সারাদিন এলোচুলই থাকে। মাথায় আর সেই ঘন চুলের অরণ্য নেই। পাতলা হয়ে আসা চুলের গুচ্ছে, হালকা পাতলা পাক ধরেছে। ওদের গ্রামের বাড়িতে, এখন আর কেউ থাকে না। তালাবদ্ধ ঘর, বাইরে থেকে সেবার দেখে এসেছে হিয়া। ইস্! একটা দিন, নিজেদের ঘরে গিয়ে আর থেকে আসা হয় না। অন্য আত্মীয়দের বাড়িতে বেড়িয়ে, নিজেদের উঠান, গাছ-পালা, ঘর দেখে, কিছু সময় কাটিয়ে , চলে আসতে হয়, যান্ত্রিক এই শহরে। শৈশবের সেই বিকেলগুলো, হিয়াকে মাঝে মাঝে স্মৃতিকাতর করে তোলে। ধুলো উড়া পথ বেয়ে, বাসায় ফেরার সময়, গ্রামের বাড়ির বাইরের সেই মাটির রাস্তাটার কথা তার বড্ড মনে পড়ে ।