মুহাম্মদ কামাল হোসেন
আবছা অন্ধকার আর ন্যাপথলিনের তীব্র ঘ্রাণ মাখা পুরনো ট্রাঙ্কটার দিকে তাকিয়ে রাবেয়া বেগম অনেকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। বয়স বাড়ার সাথে সাথে মানুষের স্মৃতিশক্তি ফিকে হয়ে আসার কথা থাকলেও তার ক্ষেত্রে হয়েছে ঠিক উল্টো। প্রতিটি ছোটখাটো ঘটনা, প্রতিটি না বলা কথা এখন আরও বেশি স্বচ্ছ হয়ে বুকের ভেতর বিঁধছে। পঁচিশ বছর আগে যেদিন তার স্বামী মনসুর আহমেদ নিখোঁজ হয়েছিলেন, সেদিনও আকাশটা এমনই মেঘলা ছিল। এক বুক প্রত্যাশা আর কিছু জরুরি কাগজপত্র নিয়ে তিনি ঘর থেকে বেরিয়েছিলেন, কিন্তু আর ফেরেননি। সেই থেকে রাবেয়া বেগমের দিন কাটে এই মফস্বল শহরের একতলা জীর্ণ দালানটিতে, যে বাড়ির প্রতিটা ইটের ভাঁজে ভাঁজে জমা হয়ে আছে এক অনন্ত অপেক্ষার দীর্ঘশ্বাস।
রাবেয়া বেগমের দিন শুরু হয় ফজরের আজানের সময়। জায়নামাজে বসে তিনি যখন দুহাত তুলে মোনাজাত করেন, তখন তার ঠোঁট শুধু একজনের নামেই কাঁপে। তিনি বিশ্বাস করেন, জগতের সব রহস্যের সমাধান মানুষের হাতে নেই। মনের কোণে এক চিলতে আশা এখনো সলতের মতো জ্বলছে যে, কোনো এক বিকেলে গেটের জং ধরা তালাটা খোলার শব্দ হবে। কেউ একজন ক্লান্ত গলায় ডেকে উঠবে, “রাবেয়া, ও রাবেয়া, এক গ্লাস পানি দাও তো।” এই একটি অলীক কল্পনাই তাকে গত আড়াইটা দশক বাঁচিয়ে রেখেছে। অথচ বাস্তব বড় কঠোর। তার একমাত্র ছেলে সাজিদ এখন বড় হয়েছে, সে শহরে প্রতিষ্ঠিত এবং তার সংসার নিয়ে ব্যস্ত। সাজিদ চায় মা তার সাথে শহরে থাকুক, কিন্তু রাবেয়া অনড়। তার ধারণা, তিনি যদি এই ঘর ছেড়ে চলে যান, তবে মনসুর ফিরে এসে কাকে খুঁজে পাবেন?
আজ সাজিদ এসেছে মাকে নিয়ে যেতে। ড্রয়িংরুমে বসে সে তার দীর্ঘদিনের বিরক্তি প্রকাশ করছে। সাজিদ এখন বেশ ওজনদার মানুষ, গলায় চেইন আর দামী পারফিউমের ঘ্রাণ। সে তার মাকে বুঝিয়ে বলছে, “মা, বাবা আর ফিরবেন না। এটা তোমাকে বুঝতে হবে। পঁচিশ বছর কোনো খোঁজ নেই, কোনো মানুষ এভাবে উধাও হয়ে থাকতে পারে না। তুমি শুধু শুধু এই পোড়ো বাড়িতে একাকী নিজেকে কষ্ট দিচ্ছ। চলো আমার সাথে শহরে, সেখানে নাতনিদের সাথে সময় কাটবে।”
রাবেয়া বেগম জানালার বাইরে তাকিয়ে ধীর লয়ে চিবুক নাড়লেন। তিনি সাজিদের চোখের দিকে তাকাতে পারছেন না। তিনি জানেন সাজিদ যা বলছে তা যুক্তিতে সঠিক। কিন্তু ভালোবাসার কোনো যুক্তি থাকে না। তিনি খুব শান্ত গলায় বললেন, “তুই যা বাবা। আমার এই ঘরটাতেই শান্তি। তোর আব্বা যে গেট দিয়ে বেরিয়েছিলেন, আমি সেই গেটের দিকে তাকিয়েই শেষ নিঃশ্বাসটুকু ছাড়তে চাই। অপেক্ষাও তো এক ধরণের ইবাদত সাজিদ।”
সাজিদ আর কথা বাড়াল না। সে জানে মাকে টলানো সম্ভব নয়। সে বেরিয়ে যাওয়ার পর বাড়িটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল। রাবেয়া বেগম রান্নাঘরে গিয়ে চুলা জ্বালালেন। এক কাপ চা বানাতে বানাতে তার মনে পড়ল মনসুর আহমেদের সেই ডায়েরিটার কথা। ট্রাঙ্কের একদম নিচে কাপড়ের ভাঁজে লুকিয়ে রাখা সেই ডায়েরিটা আজ বের করতে ইচ্ছে করছে। আলমারির চাবিটা হাতে নিয়ে তিনি শোবার ঘরে ঢুকলেন। ঘরের দেয়াল ঘড়িটা অনেক আগেই থেমে গেছে, কিন্তু রাবেয়া বেগমের জীবনের ঘড়ি যেন আজও সেই শেষ বিদায়ের মুহূর্তে আটকে আছে। তিনি যখন ট্রাঙ্কটা খুললেন, তখন এক ঝলক ঠান্ডা বাতাস তাকে স্পর্শ করল। হঠাৎ তার মনে হলো, ঘরের কোণে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। তিনি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন কেউ নেই, শুধু জানালার পর্দাটা বাতাসে নড়ছে। রাবেয়া বেগম ডায়েরিটা বের করে খাটের ওপর বসলেন। ধুলোমাখা সেই ডায়েরির পাতায় আজও লেগে আছে এক অমীমাংসিত জীবনের গল্প। জীবনের এই প্রান্তে এসে আজ কি সেই রহস্যের জট খুলবে? তার পঁচিশ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার সমাপ্তি কি তবে আসন্ন?
রাবেয়া বেগম কাঁপাকাঁপা হাতে ডায়েরির প্রথম পৃষ্ঠাটা উল্টালেন। হলদেটে হয়ে যাওয়া কাগজের বুকে মনসুর আহমেদের সেই সুনিপুণ হাতের লেখাগুলো দেখে তার বুকের ভেতরটা হুহু করে উঠল। প্রতিটি অক্ষর যেন এক একটি জীবন্ত স্মৃতি। ডায়েরির শুরুর দিকের লেখাগুলো বেশ সাধারণ। বাজার সদাইয়ের হিসাব, সাজিদের স্কুলের বেতন, কিংবা কোনো এক জোছনা রাতে রাবেয়া বেগমের হাতের রান্না নিয়ে দুই লাইনের প্রশংসা। পড়তে পড়তে রাবেয়া বেগমের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। মানুষটা ডায়েরি লিখতেন খুব গোপনে, যেন এটা তার একান্ত এক নিজস্ব পৃথিবী।
পৃষ্ঠা উল্টাতে উল্টাতে রাবেয়া বেগম হঠাৎ এক জায়গায় এসে থমকে গেলেন। নিখোঁজ হওয়ার ঠিক তিন মাস আগের তারিখ দেওয়া একটি পাতা। সেখানে লেখা, “রাবেয়াকে আজ খুব বলতে ইচ্ছে করছিল যে আমি হয়তো বড় কোনো বিপদে জড়াতে যাচ্ছি। কিন্তু ওর নিষ্পাপ মুখটার দিকে তাকিয়ে কিছুতেই বলতে পারলাম না। জমিজমা নিয়ে এই মামলাটা আমাকে ক্রমে অন্ধকারে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। পৈত্রিক ভিটেমাটিটুকু বাঁচাতে গিয়ে আমি কি তবে নিজের অস্তিত্বই বিপন্ন করে তুলছি?” রাবেয়া বেগমের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। পঁচিশ বছর আগে তিনি জানতেন জমি নিয়ে একটা বিরোধ চলছিল, কিন্তু সেটা যে এতটা গুরুতর ছিল, তা মনসুর কখনো তাকে বুঝতে দেননি।
বাইরে তখন বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়ে আকাশটা আরও ঘন কালো হয়ে এসেছে। বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দে জানালার পাল্লাগুলো সজোরে আছাড় খাচ্ছে। রাবেয়া বেগম সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করলেন না। তিনি ডায়েরির শেষ দিকের পাতাগুলো দ্রুত উল্টে চললেন। প্রতিটি পাতায় মনসুর আহমেদের উৎকণ্ঠা যেন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। এক জায়গায় লেখা আছে, “আজ রাতেও কেউ একজন গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। আমি টর্চ নিয়ে বের হতেই সে অন্ধকারের ভেতর মিলিয়ে গেল। সাজিদ আর ওর মায়ের নিরাপত্তার কথা ভেবে আমার ঘুম আসে না। কাল হয়তো শহরে যেতে হবে উকিল সাহেবের সাথে দেখা করতে। যদি ফিরে না আসি, তবে রাবেয়া কি আমায় ক্ষমা করবে?”
এই লাইনটা পড়ার পর রাবেয়া বেগমের হাতের ডায়েরিটা বিছানায় পড়ে গেল। তার মনে হলো ঘরটা ক্রমে ছোট হয়ে আসছে। দীর্ঘ পঁচিশ বছর তিনি ভেবেছিলেন মনসুর হয়তো কোনো দুর্ঘটনায় পড়েছেন কিংবা স্মৃতি হারিয়ে কোথাও ভবঘুরে হয়ে আছেন। কিন্তু ডায়েরির এই স্বীকারোক্তি বলছে অন্য কিছু। মনসুর জানতেন তার বিপদ হতে পারে। তিনি জানতেন তার শত্রু কারা। তবুও তিনি একাকী সেই লড়াই লড়তে গিয়েছিলেন। রাবেয়া বেগমের চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়তে লাগল। পঁচিশ বছর ধরে তিনি যে মানুষটার অপেক্ষায় প্রতিদিন সন্ধ্যায় গেটের সামনে প্রদীপ জ্বালিয়েছেন, সেই মানুষটা তাকে এক পাহাড় সমান অনিশ্চয়তার মুখে রেখে বিদায় নিয়েছেন।
ঘরের এক কোণে রাখা পুরনো আলনাটার দিকে তাকিয়ে রাবেয়া বেগমের মনে হলো, মনসুর আহমেদ যেন সেখানে দাঁড়িয়ে আছেন। তার সেই সাদা পাঞ্জাবি আর চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। রাবেয়া বেগম ফিসফিস করে বললেন, “কেন লুকিয়েছিলে এত বড় সত্যি? আমি কি তোমার পাশে দাঁড়ানোর যোগ্য ছিলাম না?” উত্তরের অপেক্ষায় ঘরটা আরও নিস্তব্ধ হয়ে গেল। শুধু ঘড়ির কাঁটার শব্দহীন চলা আর বৃষ্টির ফোঁটা টিনের চালে আছাড় খাওয়ার শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা গেল না।
হঠাৎ বারান্দায় কোনো এক আগন্তুকের পায়ের আওয়াজ পাওয়া গেল। ভারী জুতো আর লাঠির ঠকঠক শব্দ। রাবেয়া বেগম ধড়মড় করে উঠে দাঁড়ালেন। সাজিদ তো চলে গেছে, তবে এই অসময়ে কে এল? তার বুকটা ধক করে উঠল। পঁচিশ বছর ধরে এই একটি শব্দের জন্যই তো তিনি কান পেতে ছিলেন। তিনি দ্রুত পায়ে বারান্দার দিকে এগিয়ে গেলেন। অন্ধকার বারান্দায় একজন দীর্ঘদেহী মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখটা ছায়ার নিচে ঢাকা। রাবেয়া বেগমের গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে এল। তিনি কোনোমতে অস্ফুট স্বরে ডাকলেন, “কে? কে ওখানে?” মানুষটি কোনো কথা বলল না, শুধু একটা খাম বাড়িয়ে ধরল তার দিকে। এই খামটাই কি তবে সেই দীর্ঘ অপেক্ষার শেষ গন্তব্য? নাকি নতুন কোনো রহস্যের শুরু?
রাবেয়া বেগমের সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে। বারান্দার অস্পষ্ট আলোয় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির অবয়ব দেখে তার মনে হলো, সময় যেন আচমকা উল্টো দিকে হাঁটা শুরু করেছে। কিন্তু আগন্তুক যখন ছায়া থেকে আলোর নিচে এল, রাবেয়া বেগম দেখলেন এটি তার পরিচিত কেউ নয়। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া এক বৃদ্ধ লোক, যার পরনে মলিন পোশাক আর চোখে এক গভীর বিষাদ। আগন্তুক কাঁপা গলায় বললেন, “আম্মা, আমি কাসেম। অনেক বছর আগে মনসুর সাহেবের সাথে এক বাড়িতে কাজ করতাম।”
রাবেয়া বেগমের মনে পড়ে গেল কাসেমের কথা। মনসুর আহমেদের সেই বিশ্বস্ত সহচর, যে তার নিখোঁজ হওয়ার কিছুদিন আগে হঠাৎ গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল। রাবেয়া বেগম খামটি হাতে নিয়ে খুব নিচু স্বরে বললেন, “এত বছর পর কাসেম? আজ কেন এলে? তিনি কোথায়?” কাসেম কোনো উত্তর না দিয়ে শুধু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রু সাদা দাড়িতে গিয়ে মিশছে। রাবেয়া বেগমের বুঝতে বাকি রইল না যে, এই অশ্রু কোনো সুসংবাদ বহন করে আনেনি।
তিনি ঘরে ঢুকে টেবিল ল্যাম্পের আলোয় খামটি খুললেন। ভেতরে একটি পুরনো দলিল আর হাতে লেখা একটি ছোট চিরকুট। চিরকুটটি মনসুর আহমেদের নয়, বরং অন্য কারো। সেখানে লেখা ছিল, “রাবেয়া ভাবি, আপনার স্বামীর পৈত্রিক জমিটুকু যারা দখল করতে চেয়েছিল, তারা মনসুর সাহেবকে আর ফিরতে দেয়নি। সেদিন শহরে যাওয়ার পথে মাঝরাস্তায় যা ঘটেছিল, তা দেখেও আমি ভয়ে মুখ খুলিনি। কাসেম সব জানে। পঁচিশ বছর এই পাপের বোঝা বয়ে বেড়িয়েছি, আজ মৃত্যুর আগে সত্যটা জানিয়ে গেলাম।” রাবেয়া বেগমের চোখের সামনে চারপাশটা যেন দুলতে লাগল। যে পঁচিশ বছর তিনি প্রহর গুনেছেন, যে পঁচিশ বছর তিনি প্রতিটি পদশব্দে আশার আলো খুঁজেছেন, সেই সময়টা ছিল এক বিরাট মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা বালুর প্রাসাদ।
কাসেম এবার বারান্দার মেঝেতে বসে পড়ল। ডুকরে কাঁদতে কাঁদতে সে বলল, “আম্মা, আমাকে মাফ করে দেন। ওরা আমাকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছিল। মনসুর সাহেব শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আপনার আর সাজিদ বাবার নাম নিয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন আপনারা যেন এই ভিটেমাটি না ছাড়েন। আজ সেই পাপীরা মরে মাটি হয়ে গেছে, তাই ভাবলাম আপনাকে এই সত্যটা জানিয়ে যাই।” রাবেয়া বেগম আর কাঁদলেন না। তার চোখের জল যেন শুকিয়ে পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেছে। তিনি জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখলেন, পঁচিশ বছর পর আজ মেঘ কেটে গিয়ে চাঁদ উঠেছে। এই সেই চাঁদ, যার দিকে তাকিয়ে তিনি অসংখ্য রাত কাটিয়েছেন প্রিয় মানুষের ফেরার অপেক্ষায়। হঠাৎ রাবেয়া বেগমের মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি নেমে এল। এত বছর যে যন্ত্রণাময় অনিশ্চয়তা তাকে কুরে কুরে খেত, আজ তার অবসান হয়েছে। মানুষটা ফেরেনি ঠিকই, কিন্তু সে কোনো বেইমানি করেনি। সে তার পরিবারকে রক্ষা করতে গিয়েই নিজের জীবন বিসর্জন দিয়েছে। রাবেয়া বেগম ধীর পায়ে শোবার ঘরে গিয়ে ডায়েরিটা আবার হাতে নিলেন। ডায়েরির শেষ পৃষ্ঠার সেই শূন্য জায়গাটিতে তিনি আজ নিজের কলম দিয়ে শুধু একটি বাক্য লিখলেন, “অপেক্ষা আজ শেষ হলো, তবে হার দিয়ে নয়, এক পরম সত্যের জয় দিয়ে।” রাবেয়া বেগম অনুভব করলেন, ঘরের ভেতর জমে থাকা সেই ভারী বিষণ্নতাটুকু যেন এক নিমেষে জানালার বাইরে উড়ে গেল। তার জীবনের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হলো এক বিষাদময় প্রাপ্তিতে।
রাবেয়া বেগম সারা রাত ঘুমাননি। ভোরের আলো যখন জানালার পর্দা চিরে ঘরের মেঝের ওপর আলপনা আঁকল, তখন তিনি অদ্ভুত এক নির্ভার বোধ করলেন। পঁচিশটি বছর তার কাঁধের ওপর যে পাথরের মতো ভারী অনিশ্চয়তা চেপে ছিল, আজ যেন তা ধুলো হয়ে বাতাসে মিশে গেছে। তিনি আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। ঘোলাটে কাঁচের ওপারে যে বৃদ্ধা তাকে দেখছে, তাকে আজ আর অপরিচিত মনে হলো না। মানুষটা ফেরেনি ঠিকই, কিন্তু এক অমীমাংসিত সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রাবেয়া আজ নিজেকে খুঁজে পেয়েছেন।
সকাল দশটার দিকে সাজিদ আবার এল। সে ভেবেছিল তার মা হয়তো গতকালের মতোই অনড় থাকবেন, কিন্তু ড্রয়িংরুমে ঢুকে সে অবাক হয়ে গেল। রাবেয়া বেগম ছোট ছোট কিছু পোটলা বেঁধে গুছিয়ে রেখেছেন। সাজিদ অবাক চোখে বলল, “মা, তুমি কি তবে যাওয়ার জন্য রাজি হয়েছ?” রাবেয়া বেগম ম্লান হাসলেন। তিনি সাজিদের মাথায় হাত রেখে ধীরস্থির কণ্ঠে বললেন, “আমি তোর সাথে শহরে যাব সাজিদ, তবে স্থায়ীভাবে থাকার জন্য নয়। আমি চাই তোর বাবার এই জমিটুকু উদ্ধার করতে। এই সম্পত্তির প্রতিটি কণা তোর বাবার শেষ নিঃশ্বাসের সাক্ষী। আমি থাকতে এগুলো আর কেউ দখল করতে পারবে না।”
সাজিদ ডায়েরি আর খামটির দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল। তার চোখেও জল চিকচিক করে উঠল। এত বছর সে তার বাবাকে কেবল এক দায়িত্বহীন মানুষ ভেবেছিল, যে তার পরিবারকে বিপদে ফেলে হারিয়ে গিয়েছে। আজ সে নিজের ভুল বুঝতে পারল। সাজিদ তার মায়ের হাত ধরে বলল, “আমি সব করব মা। আজ থেকে বাবার এই বসতভিটা আর তোমার এই দীর্ঘ প্রতীক্ষা আমার কাছেও পবিত্র হয়ে রইল।” রাবেয়া বেগম জানতেন, সাজিদ এখন তার বাবার যোগ্য উত্তরসূরি হতে পারবে।
যাওয়ার আগে রাবেয়া বেগম একবার পুরো বাড়িটা ঘুরে দেখলেন। প্রতিটি ঘর, বারান্দার প্রতিটি কোণ যেন তাকে কিছু একটা বলতে চাইছে। তিনি উঠানের সেই পুরনো শিউলি গাছটার নিচে এসে দাঁড়ালেন। শিউলি তলায় সাদা ফুলের স্তূপ জমে আছে। তিনি নিচু হয়ে একমুঠো ফুল হাতে নিলেন। পঁচিশ বছর আগে তিনি এই ফুলগুলো দিয়ে মালা গেঁথে প্রিয় মানুষের অপেক্ষায় থাকতেন। আজ সেই মালা নেই, কিন্তু আছে এক তৃপ্ত হৃদয়ের দোয়া। তিনি বিড়বিড় করে বললেন, “তুমি যেখানেই থাকো, শান্তিতে থাকো। আজ থেকে আমি আর তোমার পথ চেয়ে বসে থাকব না, বরং তোমার রেখে যাওয়া আদর্শটুকু আগলে রাখব।”
গাড়ি যখন গেট ছেড়ে বড় রাস্তায় উঠল, রাবেয়া বেগম একবার পেছন ফিরে তাকালেন। তার মনে হলো, বাড়ির বারান্দার ইজিচেয়ারটায় মনসুর আহমেদ ঠিক আগের মতোই বসে আছেন, পরনে সেই তালি দেওয়া পাঞ্জাবি। তিনি যেন হাসিমুখে হাত নেড়ে তাকে বিদায় জানাচ্ছেন। রাবেয়া বেগমের ঠোঁটের কোণেও এক প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল। কিছু অপেক্ষা ব্যর্থতায় শেষ হয়, আর কিছু অপেক্ষা শেষ হয় এক মহৎ উপলব্ধিতে। রাবেয়া বেগমের কাছে এই সমাপ্তি পরাজয়ের নয়, বরং এক অনন্ত প্রেমের সার্থকতা।
শহরমুখী গাড়ির জানালায় মাথা রেখে রাবেয়া বেগম চোখ বন্ধ করলেন। বাইরের তপ্ত বাতাস তার চুলে দোলা দিয়ে যাচ্ছে। তার মনে হলো, পঁচিশ বছর পর আজ তিনি প্রথম মনভরে নিঃশ্বাস নিতে পারছেন। আকাশটা আজ বড্ড বেশি নীল, আর তার ভেতরে বয়ে চলা হাহাকারটুকু আজ এক সুরহীন গানে পরিণত হয়েছে। অপেক্ষা যেখানে শেষ হয়, সেখান থেকেই জীবনের এক নতুন পথ শুরু হয়। রাবেয়া বেগম এখন সেই নতুন পথের যাত্রী।