মুহাম্মদ কামাল হোসেন

নদীর ওপার থেকে সুমধুর আছরের আজান বাতাসে ভেসে আসে। আজহার উদ্দিন তার জীর্ণ বারান্দায় স্থির হয়ে বসে আছেন। পুবাল বাতাসের ঝাপটায় রোদের শেষ তেজটুকু ম্লান হয়ে আসছে। উঠোনে পড়ে থাকা শুকনো আমপাতার ওপর দিয়ে এক কাঠবেড়ালি খসখস করে দৌড়ে যায়। আজহার উদ্দিনের চোখে এখন আগের মতো জ্যোতি নেই। চারপাশটা তার কাছে এক ধূসর কুয়াশায় ঢাকা মনে হয়। তবে শব্দের ওপর তার দখল এখনো প্রখর। শুকনো পাতার মর্মর ধ্বনি শুনেই তিনি বুঝতে পারেন কোনো এক অলৌকিক আগন্তুকের আগমনী বার্তা। তার কোলের ওপর একটা পুরনো চামড়ার ব্যাগ। ডাক বিভাগের ব্যাগ। চামড়া ফেটে ভেতরের তন্তুগুলো বের হয়ে এসেছে। এই ব্যাগের ভেতরে কোনো চিঠি নেই। আছে এক জীবনের সঞ্চিত বিষণ্নতা আর একজোড়া চশমা। আজহার উদ্দিন একসময় রানার ছিলেন। হাতে এক বর্শা আর ঝুনঝুনি নিয়ে তিনি রাতের অন্ধকারেও বনের পথ পাড়ি দিতেন। তখন তার পায়ে জোর ছিল। বুকে ছিল পাহাড় সমান হিম্মত। আল্লাহ পাক তাকে স্বাস্থ্য দিয়েছিলেন নেয়ামত হিসেবে। আজ সেসব কেবলই ছায়ার মতো স্মৃতি।

রাতের আঁধারে যখন বনের ভেতর দিয়ে আজহার দৌড়াত, তার হাতের বর্শার মাথায় ঝোলানো লণ্ঠনটা বুনো জানোয়ারের চোখের মতো জ্বলত। সেই নিঝুম পথে শেয়ালের হুক্কাহুয়া আর বাঁশঝাড়ের ঘষটানি শব্দে তার মনে হতো সে একা নয়। এক অদৃশ্য জগত তার পিছু নিয়েছে। সেই নিশিরাতের পথে চলতে চলতে আজহার আকাশের নক্ষত্রদের সাথে কথা বলত। সে ভাবত, আসমানের ওই প্রদীপগুলো কি আমিনার ঘরের জানালা দিয়েও দেখা যায়? রানারের জীবন বড় দায়বদ্ধতার। নিজের বুক ফেটে চৌচির হয়ে গেলেও অন্যের চিঠির থলি তাকে বৃষ্টিতে ভিজিয়ে রক্ষা করতে হতো। তার পায়ে ছিল খড়ম আর মনে ছিল এক অমোঘ তৃষ্ণা। ঝুনঝুনি বাজিয়ে সে যখন গ্রাম পার হতো, ঘুমন্ত মানুষেরা পাশ ফিরে শুত। কেউ জানত না এই মানুষটার পিঠের ব্যাগে হাজারো মানুষের খুশির খবর থাকলেও নিজের জন্য এক টুকরো স্বস্তি নেই। তার সারা জীবনের পথ চলা ছিল আসলে এক নিরুদ্দেশ যাত্রার মতো। গন্তব্য চেনা থাকলেও বিশ্রাম ছিল সেখানে নিষিদ্ধ।

হঠাৎ তার মনে হলো, উঠোনের কোণে সেই রক্তজবা গাছটা আজ কেমন যেন বেশি নুইয়ে পড়েছে। ফুলগুলো লাল নয়। যেন জমাট বাঁধা রক্ত। এই ফুল দেখলে তার বুকটা চিনচিন করে ওঠে। বহু বছর আগে এক দুপুরে এই জবা ফুলের মতোই রাঙা শাড়ি পরে এক কিশোরী দাঁড়িয়ে ছিল পুকুরঘাটে। আমিনা। সেই কিশোরীর চঞ্চল চোখের দিকে তাকিয়ে আজহার উদ্দিন প্রথমবার বুঝতে পারেন, দুনিয়ার সব আলো কেবল আসমান থেকে আসে না। কিছু আলো মানুষের চোখের ভেতরেও লুকানো থাকে। আজহার উদ্দিনের দাড়িগুলো এখন সফেদ। তিনি বিড়বিড় করে দরুদ পড়েন। তসবিহর দানা তার আঙুলের মাথায় ঘোরে। তার জীবনের সব চিঠি বিলি করা শেষ। শুধু নিজের ঠিকানায় একটা চিঠি আসা বাকি। সেই চিঠি কবে আসবে তা কেবল আরশে আজিমের মালিক জানেন। আড়চোখে একবার তাকালেন পুকুরঘাটের দিকে। ছায়া ঘন হয়ে আসছে। পুকুরের পানিতে পা ডুবিয়ে কেউ যেন বসে আছে। না, ওটা ছায়া ছাড়া আর কিছুই নয়। মানুষ একা হলে তার চোখ তাকে ধোঁকা দেয়। এটাই বোধহয় বার্ধক্যের নিয়ম। তিনি ব্যাগটা জড়িয়ে ধরলেন। ভেতরে থাকা সেই হলডেটে খামটা কি এখনো আছে? খামটা তিনি কখনো খোলেননি। সে খামে কারো নাম লেখা নেই। শুধু এক দহনের গন্ধ লেগে আছে। মানুষ যেমন আগুনের কাছে গিয়ে তাপ অনুভব করে, আজহার উদ্দিন সেই চিঠির অস্তিত্ব অনুভব করেই জীবনের এই শেষ বিকেলে একটু উষ্ণতা খুঁজে পান।

আজহার উদ্দিনের মনে পড়ে চৈত্র মাস। মাঠের বুক ফেটে চৌচির। ধানের ক্ষেতে আগুনের হলকা নাচে। কিশোর আজহার পুকুরঘাটে দাঁড়িয়ে ছিল। আমিনা এল কলস কাঁখে। তার গায়ের রঙ তখনো কাঁচা হলুদের মতো উজ্জ্বল। পরনে রাঙা পাড়ের শাড়ি। সে হাঁটার সময় পায়ের নূপুর বোবা হয়ে থাকত। বড় লাজুক মেয়ে ছিল আমিনা। পুকুরঘাটের পানি আয়নার মতো স্থির। আমিনা কলস ডোবাল। পানির কলকল শব্দ কানে এল। আজহার উদ্দিন একটা জবা ফুল ছিঁড়ে ঘাটে রাখল। আমিনা তাকাল। তার চোখে এক বিচিত্র দহন। সেই চাউনিতে কোনো কথা নেই। কিন্তু বুকের বাঁ পাশে এক অদ্ভুত হাহাকার জেগে ওঠে। ভালোবাসা মানুষের ভেতরটা পোড়ায়। তবে সেই পোড়া গন্ধে কোনো কষ্ট নেই। এক রকমের নেশা আছে। আজহার মৃদুস্বরে বলল, আমিনা তোমার জন্য এনেছি। আমিনা ফুলটা হাতে নিল। তার আঙুলের ছোঁয়ায় আজহারের মনে হলো আসমানের সব মেঘ এক পলকে নিচে নেমে এসেছে। সেই প্রথম স্পর্শ। হৃদয়ের ভেতর কে যেন জোরে হাতুড়ি পিটল। আমিনা নিচু স্বরে বলল, বাড়িতে জানলে রক্তারক্তি হবে আজহার ভাই।

রক্তারক্তি হোক। আজহারের তখন রক্তের তেজ বেশি। সে ভয় পায় না। আমিনা ফুলটা খোঁপায় গুঁজল। তার কালো চুলের ভিড়ে লাল ফুলটা ধিকধিক করে জ্বলছে। যেন শরতের দুপুরে এক টুকরো আগুন। আজহার স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে হলো এই দুপুর কোনোদিন শেষ না হতো। কিন্তু সময় বড় নিষ্ঠুর। সূর্য পশ্চিম দিকে হেলে পড়ে। আজান হয়। আমিনা চলে যায়। তার পায়ের ছাপ ভেজা মাটিতে গেঁথে থাকে। আজহার উদ্দিন সেই ছাপ হাত দিয়ে স্পর্শ করল। মাটিটা ঠান্ডা। অথচ তার হাতের তালু জ্বলে উঠল। ভালোবাসা এমনই। ছোঁয়া যায় না অথচ শরীর পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। আমিনা যাওয়ার সময় একবারও পেছন ফিরে তাকাল না। শুধু তার আঁচলের হাওয়া আজহারের নাকে লাগল। বুনো লতাপাতা আর সাবানের এক মিশ্র ঘ্রাণ। সেই ঘ্রাণ আজো এই বার্ধক্যে তার নাকে ভাসে। রাতের বেলা আজহার আর ঘুমাতে পারল না। বিছানায় এপাশ ওপাশ করে। জানালা দিয়ে আসা চাঁদের আলো তার গায়ে বিঁধছে। মনে হচ্ছে অসংখ্য সুঁই তাকে বিঁধছে। সে আল্লার কাছে দোয়া চাইল। হে পরওয়ারদেগার আমার মনে এ কী যন্ত্রণা দিলে। প্রেমের এই দাহ কি মরণের আগে শেষ হবে না।

দিনগুলো দ্রুত ফুরিয়ে এল। গ্রামের আকাশে তখন মেঘের ঘনঘটা। আমিনার বিয়ের কথা উঠল পাশের গ্রামের এক বিত্তবান গৃহস্থের সাথে। খবরটা আজহারের কানে এল যখন সে নদীর ধারে জাল সারাই করছিল। রোদে তপ্ত জালের সুতোর ঘ্রাণ আর নদীর নোনা বাতাস তার নাকে লাগল। হঠাৎ হাতের সুঁইটা আঙুলে ফুটে গেল। চুঁইয়ে পড়া রক্ত জালের গিঁটে লেগে কালো হয়ে গেল। আজহারের বুকের ভেতর এক অদ্ভুত হাহাকার জেগে উঠল। মানুষের জীবন বড় নিষ্ঠুর। সকালে যে আনন্দ নিয়ে সূর্য ওঠে, বিকেলে তাই আবার কাদা-জলে ডুবে একাকার হয়ে যায়। আজহার এক দুপুরে সাহস করে আমিনার বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ইমান উদ্দিন তখন উঠোনে ধানের গোলা ঠিক করছিলেন। ঘামে ভেজা তার ফতুয়া। আজহারের দিকে তাকিয়ে তিনি এক জোড়া জ্বলন্ত কয়লার মতো চোখ মেলে ধরলেন। আজহার আমতা আমতা করে নিজের মনের কথা পাড়তেই বুড়ো খেঁকিয়ে উঠলেন। নিজের হাড়ের জোর দেখছো আজহার? পেটে নেই ভাত, পরনে নেই ঠিকঠাক কাপড়, আর স্বপ্ন দেখো পরীর! ইমান উদ্দিনের সেই কর্কশ কণ্ঠ আজহারের কানে তপ্ত সীসার মতো ঢুকল। তিনি মাটির দিকে একদলা থুতু ফেললেন। সেই অপমান আজহারের পৌরুষে গিয়ে বিঁধল। সে বুঝল এই জনপদে কেবল প্রেম দিয়ে ভাত জোটে না। বংশ আর বিত্তের কাছে হৃদয় বড় নগণ্য।

বিয়ের দিন আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল। সেই বৃষ্টিতে আমিনার বাড়ির সানাইয়ের সুর ভিজে কর্দমাক্ত। আজহার ঘাটে একা বসে ছিল। ঝমঝম শব্দে কিছুই শোনা যাচ্ছিল না। কেবল তার মনে হলো কেউ যেন হৃদপিণ্ডটা নিংড়ে সবটুকু রক্ত বের করে দিচ্ছে। পালকি এল। কাহারদের হাঁকডাক আর কাদায় পা ডোবানোর শব্দ শোনা গেল। আমিনা চলে যাচ্ছে। আজহারের ইচ্ছা করল দৌড়ে গিয়ে পালকিটা উল্টে দেয়। কিন্তু অভাবের শিকল তার পা দুটো মাটিতে গেঁথে রেখেছে। মানুষ অসহায় হলে পাথরের মতো অনড় আর রুক্ষ হয়ে যায়। আমিনার শ্বশুরবাড়ির জীবন ছিল এক ঘানিগাছের মতো। ভোরে উঠে গোয়াল পরিষ্কার থেকে শুরু করে রাতে সবার শেষে আহার করা পর্যন্ত তার নিঃশ্বাস ফেলার ফুরসত ছিল না। তার স্বামী ছিল রুক্ষ স্বভাবের মানুষ। যার কাছে ভালোবাসা ছিল কেবল অধিকারের নাম। আমিনা মাঝে মাঝে পুকুরঘাটে গিয়ে একা বসত। স্থির পানিতে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে সে আঁতকে উঠত। তার কপালে ভাঁজ পড়েছে। চোখের নিচের সেই চঞ্চল আলো নিভে গেছে। সে ভাবত আজহার ভাই কি এখনো চিঠি বয়ে বেড়ান? আমিনার বাবা ইমান উদ্দিন যখন আজহারকে অপমান করে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন, তখন জানালার আড়ালে দাঁড়িয়ে আমিনা নিজের নখ দিয়ে কাঠের কপাট খামচে ধরেছিল। সেই দিন তার মনে হয়েছিল এই সমাজটা আসলে এক প্রকাণ্ড জেলখানা। যেখানে হৃদয়ের চেয়ে জমির দলিল বেশি দামি। আজহারের সেই রক্তমাখা আঙুল আর অপমানে নুয়ে পড়া কাঁধের কথা মনে পড়লে আমিনার দুচোখ দিয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ত। সেই জল কেউ দেখত না। কেবল রান্নাঘরের ধোঁয়া তাকে আড়াল করে রাখত।

আমিনা চলে যাওয়ার পর গ্রামে আর আজহারের মন টিকল না। বাবার রেখে যাওয়া সামান্য জমিটুকু বর্গা দিল। হাতে তুলে নিল ডাক বিভাগের ব্যাগ আর লাঠি। তার নতুন জীবন শুরু হলো। সে এখন রানার। কাঁধে খবরের বোঝা। কারো সুখের খবর, কারো আবার সীমাহীন দুঃখের। রাতের পর রাত সে বনের পথ ধরে দৌড়ায়। বুনো শেয়ালের হাহাকার আর ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক তার সঙ্গী। মানুষের চিঠি বিলি করতে করতে আজহার এক অদ্ভুত বোধে পৌঁছে গেল। সে লক্ষ্য করল মানুষের আনন্দ বড় ক্ষণস্থায়ী। আজ যে চিঠিতে খুশির খবর আসে কাল সেই একই ঘরে শোকের খবর নিয়ে তাকে যেতে হয়। নিজের দহন সে চেপে রাখল পোশাকের নিচে। সবাই ভাবল আজহার এক নিবেদিতপ্রাণ কর্মচারী। কিন্তু তার হৃদয়ের এক কোণে সেই রক্তজবা ফুলটা তখনো ধিকধিক করে জ্বলছে। সেই দাহ নেভানোর ক্ষমতা কোনো বৃষ্টির নেই।

দশটা বছর কেটে গেল মেঠো পথের ধুলোর মতো। আজহার উদ্দিন এখন বয়সের ভারে খানিক নুইয়ে পড়েছেন। তার চেহারায় এক ধরনের পোড়া তামাটে ছাপ। রোদ আর বৃষ্টির আঁচ তার চামড়াকে খসখসে করে তুলেছে। সে এখন আর শুধু চিঠি পৌঁছে দেয় না। মানুষের অভাব আর অভিযোগের সাক্ষী হয়ে ঘোরে। এক শীতের রাতে আজহারের ডিউটি পড়ল আমিনার শ্বশুরবাড়ির এলাকায়। কুয়াশায় ঢাকা জলার ধার। শেয়ালের ডাক ছাপিয়ে তার পায়ের ঝুনঝুনি বাজছে। তার হাতের লণ্ঠনটা তেলের অভাবে ধুঁকছে। আমিনা কেমন আছে? সে কি এখনো সেই রাঙা জবার মতো আছে? নাকি সংসারের জাঁতাকলে পড়ে সেও এক রুক্ষ পাথরে পরিণত হয়েছে? আজহারের ব্যাগের ভেতর একটা চিঠি আছে। নীল রঙের খাম। সেই চিঠির প্রাপক আমিনা। আজহার সেই বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। প্রকাণ্ড উঠোন। ধান মাড়াইয়ের খড় চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। লণ্ঠনের আলোয় সে দেখল জানালার পাশে একজন নারী বসে আছে। মরা জোছনার আলো তার মুখে পড়েছে। সেই চিবুক, সেই নাক। হ্যাঁ, আমিনা। তবে তার গায়ের সেই হলদেটে আভা আর নেই। সেখানে এখন খরাকবলিত জমির মতো রুক্ষতা। আমিনা এক দৃষ্টিতে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে আছে। আজহারের ইচ্ছা হলো একবার ডাক দেয়। কিন্তু তার গলা দিয়ে কোনো শব্দ সরল না। মনে হলো এই শুকনো শীতে তার কণ্ঠস্বরও বুঝি শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। সে নিঃশব্দে জানালার নিচে চিঠিটা রেখে দিল। কোনো আবেগ দেখাল না। কেবল একটা তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার কুয়াশার ভেতরে মিশে গেল।

পঁচিশ বছর পর আজহার উদ্দিন তার নিজ গ্রামে ফিরে এলেন। তার শরীরে এখন বয়সের ছাপ। লাঠিতে ভর দিয়ে হাঁটতে হয়। আমিনা এখন একাই থাকে। তার ছেলেরা শহরে থাকে। বড় বড় দালান তুলেছে। আমিনা কিন্তু তার পুরনো ভিটা ছাড়েনি। আজহারের ইচ্ছা হলো একবার চোখের দেখা দেখবেন। সন্ধ্যা নামার ঠিক আগে তিনি আমিনার দুয়ারে গিয়ে দাঁড়ালেন। উঠোনে সরষে শুকোতে দেওয়া হয়েছে। তপ্ত গন্ধে চারপাশ ম ম করছে। আমিনা বারান্দায় বসে তসবিহ পড়ছিল। তার পরনে সাদা শাড়ি। কাঁচা-পাকা চুলগুলো কপালের ওপর লেপ্টে আছে। আজহারকে দেখে সে থমকে দাঁড়াল। দুইজন মানুষের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইল দুই যুগের দীর্ঘ নীরবতা। কেউ কোনো কথা বলল না। কথা বলার আর কী-ই বা বাকি আছে। আমিনা এক সময় উঠে এসে সামনে দাঁড়াল। তার চোখে জল নেই। সেখানে এখন কেবল এক ধরনের পবিত্র জ্যোতি। একটি বুনো শালিক উড়ে এসে তাদের মাঝখানের আমগাছের ডালে বসল। সেই পাখির চোখও যেন তাদের নীরবতাকে দেখছে। আমিনা আজহারের হাতের ব্যাগটার দিকে তাকাল। সেই ব্যাগ এখন মলিন। আমিনা খুব নিচু স্বরে বলল, আজও কি কোনো চিঠি আছে আজহার ভাই? আজহার উদ্দিনের বুকটা কেঁপে উঠল। তিনি ব্যাগ থেকে সেই পুরনো হলদেটে খামটা বের করলেন। খামটা তিনি বহুকাল আগে লিখেছিলেন। কোনো দিন আমিনার হাতে দেওয়া হয়নি। আজ সেটি বের করে আমিনার দিকে বাড়িয়ে দিলেন। আমিনা চিঠিটা হাতে নিল। তার আঙুলের ছোঁয়ায় আজহারের মনে হলো সেই পুরনো দহন আবার নতুন করে জেগে উঠছে। কিন্তু এই দহনে এখন আর কষ্ট নেই। আছে এক ধরনের মুক্তি। আমিনা চিঠিটা খুলে পড়ল না। সে সযত্নে সেটা বুকের কাছে চেপে ধরল। তার ঠোঁট কাঁপছে। সে বিড়বিড় করে বলল আমি জানতাম আপনি আসবেন। আল্লাহ সবুরকারীকে পছন্দ করেন। আজহার উদ্দিনের দুচোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। এই চোখের জল কোনো শোকের নয়। দীর্ঘ প্রতীক্ষার শেষে যে শান্তি মেলে এ যেন তারই প্রকাশ। আকাশ তখন রক্তিম হয়ে উঠেছে। দিগন্তের ওপারে সূর্য ডুবছে। তপ্ত রোদের দিন শেষ হয়ে আসছে।

আজহার উদ্দিনের শেষ সময় ঘনিয়ে এল। তিনি এখন শয্যাশায়ী। জানালার ওপাশে সেই রক্তজবা গাছটা এখনো টিকে আছে। ফুলগুলো ফুটছে আর ঝরে পড়ছে। জীবনের রঙও তেমনই। আজ আছে কাল নেই। আজহার উদ্দিনের নাতি তার পাশে বসে সুরা ইয়াসিন তিলাওয়াত করছে। সেই সুরের মূর্ছনায় ঘরের পরিবেশ শান্ত হয়ে উঠেছে। আজহারের মনে হচ্ছে তিনি এক বিশাল ছায়ার নিচে বিশ্রাম নিচ্ছেন। সেখানে কোনো রোদ নেই। কোনো দহন নেই। তার শিয়রের কাছে সেই পুরনো ব্যাগটা রাখা। আমিনা কয়েক দিন আগে খবর পাঠিয়েছিল। সে ভালো আছে। তার হাতে এখন সেই দহনফুলের ঘ্রাণ। আজহারের মনে হলো তার জীবনের সব চিঠি বিলি করা শেষ। এখন কেবল নিজের মালিকের সাথে সাক্ষাতের পালা। তিনি চোখ বুজলেন। তার মনের আয়নায় ভেসে উঠল এক বিশাল সবুজ মাঠ। সেই মাঠে আমিনা দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে একটি নয় অসংখ্য দহনফুল। কিন্তু সেই ফুলগুলো আর কাউকে পোড়ায় না। তারা এখন জান্নাতের সুগন্ধ ছড়াচ্ছে। আজহার উদ্দিন শেষবারের মতো শ্বাস নিলেন। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। তার ঠোঁটে এক টুকরো হাসি ফুটে উঠল। বাইরের আকাশ তখন মেঘমুক্ত। একঝাঁক সাদা বক উড়াল দিল দূরের বিলের দিকে। মানুষের আত্মা যখন মুক্তি পায় তখন সে বোধহয় ওই সাদা বকের মতোই হালকা হয়ে যায়। গ্রামজুড়ে শোকের ছায়া নামল। রানার আজহার উদ্দিন আর নেই। কবরের ঠান্ডা মাটিতে তাকে যখন নামানো হলো তখন আজহারের মনে হলো এই সেই পরম ঠিকানা। এখানে কোনো বিচ্ছেদ নেই। কোনো সামাজিক বাধা নেই।

আজহার উদ্দিনের দাফনের পর সেই রাতটা ছিল অলৌকিক স্তব্ধতায় ঘেরা। কবরের ওপরের বাঁশঝাড়ে তখন বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ। গ্রামবাসীরা কেউ কেউ বলল তারা নাকি রাতে ঝুনঝুনির শব্দ শুনেছে। যেন আজহার উদ্দিন তার শেষ চিঠিটা পৌঁছে দিতে এখনো কোনো এক অজানার পথে দৌড়াচ্ছেন। আসমানে মেঘের আড়ালে চাঁদটা তখন এক ফালি হাসির মতো ঝুলে ছিল। আমিনা তার জানালার পাশে বসে তসবিহ গুনছিল। সে অনুভব করছিল আজহার ভাই এখন আর কোনো দহনের মধ্যে নেই। আল্লাহ পাক তার বান্দাকে এক শান্ত শীতল নহরে জায়গা দিয়েছেন। এই দুনিয়ায় যা অপূর্ণ ছিল তা তো ওই পাড়ে গিয়ে পূর্ণ হওয়ার জন্যই রাখা। পুকুরঘাটের সেই রক্তজবা গাছটা যেন রাতারাতি আরও বেশি সতেজ হয়ে উঠল। পরদিন সকালে দেখা গেল কবরের নরম মাটির ওপর এক জোড়া সাদা বক স্থির হয়ে বসে আছে। তারা যেন কোনো এক দূর আসমান থেকে আজহারের জন্য শান্তির পয়গাম নিয়ে এসেছে। ভালোবাসা যখন খাঁটি হয় তখন প্রকৃতিও তার শোক পালন করে। মাটির নিচে শুয়ে আজহার উদ্দিন যেন শুনতে পেলেন আমিনার কান্নার সুর নয় বরং এক পবিত্র দোয়া। ভালোবাসা কখনো মরে না। মানুষের দেহ মাটিতে মিশে যায় কিন্তু আত্মার দহন সেই মহাপ্রলয়ের দিন পর্যন্ত টিকে থাকে।