শফিকুল আলম টিটন

রোজ রোজ আব্বুর কাছে একই বায়না চুইংগাম আনতে হবে। অফিস থেকে ফেরার পথে বেবি লজেন্স আর ডেইরি মিল্ক চকলেট আনতে হবে।

ইদানীং টিভি দেখে দেখে আর মোবাইল ঘেঁটেঘুঁটে দুষ্টের শিরোমণি হয়ে উঠছে হিমু। যতসব ফ্যাকরা ফ্যাসাদ আব্বুর অফিস যাবার সময়।

আজ নতুন করে আবদার জাদুর পোশাক আনতে হবে। আব্বু কারণ জানতে চাইলে এক গাল হাসি উপহার দেয় হিমু। বলে, বারে বার্সিলোনার খেলা হচ্ছে জানো না।

হুম জানি। তো কি হয়েছে?

বুঝলাম তোমার জন্যে জাদুর পোশাক আনতে হবে। শুধু পোশাক নয়, একটা জাদুর বাইকও আনতে হবে। পানি খাওয়ার মতো ঢোক গিলে আব্বু। বলে, আচ্ছা বাবা সব দেবো। তুমি এখন পড়তে যাও।

তুমি টিভিতে দেখনি। জাদুর পোশাক পড়ে জাদুর বাইক চড়ে উড়ে উড়ে যাচ্ছে।

আহা বুঝলাম। কিন্তু তুমি উড়ে উড়ে এই দেশ থেকে কোথায় যাবে হিমালয় সোনা।

আব্বু সব সময় হিমুকে হিমালয় বলে ডাকে। মাসহ আর সবাই ডাকে হিমু বলে।

আব্বু চায় হিমুর মন মহাসাগরের মতন গভীর, আকাশের মত বিশাল আর হিমালয়ের মত প্রশস্ত।

আব্বু আমি জাদুর পোশাক পরে জাদুর বাইক চড়ে বার্সেলোনায় চলে যাব খেলা দেখতে।

তাই নাকি? হিমালয় সোনার বার্সিলোনা যাবার শখ জেগেছে। ঠিক আছে আজ সব মার্কেটগুলো খুঁজে দেখবো। কোথায় পাওয়া যায় জাদুর পোশাক আর জাদুর বাইক। তুমি এখন হাতমুখ ধুয়ে নাস্তা খেয়ে পড়তে বসো গে।

যাচ্ছি আব্বু। তুমি কিন্তু মনে করে নিয়ে আসবে।

আচ্ছা বলে বেরিয়ে যায় অফিসের উদ্যেশে।

সময়টা যেনো কাটতে চায় না হিমালয়ের। সকাল এগারোটা পর্যন্ত এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ায় ও। মাথায় ভাবনার ফসল রোপণ করে। একা একা গাছের সাথে কথা বলে। ফুলের ঘ্রাণ নেয়, প্রজাপতির পেছন পেছন ছুটতে থাকে।

ওর বয়স দশ ছুঁই ছুঁই করছে। এই বয়সে সোনা জয়ের ভাবনাগুলো জড়ো হয় মাথার ভেতর। আব্বু আম্মু আপু গল্পের আসর জমায় রাত দশটার পর। কাজের বুয়া চা করে এনে কাপে কাপে ঢেলে দেয়। হিমু বিছানায় শুয়ে ছিল। ঘুম আসছে না তবু দুই চোখ বুঝে বিছানায় পড়ে থাকা। হিমু চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে টিভিতে খেলা দেখবে তার কোনো উপায় নেই। আম্মু ধমক দিবেন তাই। হিমু দেখে গোপাল ভাঁড়ের কার্টুন আর টম এন্ড জেরি। আর ফুটবল খেলা।

গোসল সেরে আম্মুর কাছে যায় হিমালয়। আম্মু ডিম সেদ্ধর খোসা ছাড়াতে ছড়াতে জানতে চায়, আজ কি আনতে বল্লিরে হিমু?

জাদুর পোশাক! জাদুর বাইক !!

অবাক হন আম্মু। কেনো রে এগুলো দিয়ে কি হবে ?

কিছুই না। আমি জাদুর পোশাক পড়ে জাদুর বাইক চড়ে উড়ে উড়ে বার্সেলোনা যাবো অলিম্পিক খেলা দেখতে। সোনা জিতে আনব দেশের জন্যে। সেই সোনা দিয়ে তোমার গলার একটা হার গড়িয়ে দেবো আম্মু।

আম্মু এবার অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল।

তাই নাকি হিমু সোনা! এত দারুণ খবর। ব্যস আর পাকামো করতে হবে না। ডিমটুকু খেয়ে নাও। টেবিলের ওপর গ্লাসে দুধ ঢাকা আছে। দুধ খেয়ে চুপচাপ বসে থাকো। দুষ্টামি করো না।

মুখে ডিম পুড়তে পুড়তে আম্মুকে বলে হিমালয়।

আম্মু আজ রাতে খেলা দেখতে দেবে তো? শুধু এই কয়দিন।

ওদের দেশ কত সুন্দর ! দুঃখ নেই, কষ্ট নেই, কান্না নেই। কত সুন্দর ওদের থাকার জায়গা। গতকাল টিভিতে আমাদের দেশের কত গরীব লোক দেখিয়েছে। ভিক্ষা করে খায়। তিনবেলা খেতে পায় না। রাতে ঘুমাবার ভালো জায়গা নেই। ফুটপাতে শুয়ে পড়ে। অনেকের রাত কাটাবার নিরাপদ জায়গা নেই।

বাংলাদেশে কি প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয় আম্মু ?

কেনো নয় বাবা। আছে। কিন্তু সবাই নিজ নিজ উন্নয়ন নিয়েই ব্যস্ত থাকে।

আমাদের দেশে একতার অভাব। আমাদের সবার উচিত দেশ নিয়ে ভাবার। কিন্তু ভাবছে না।

খেলায় আমাদের দেশ অনেক সোনা রূপা ব্রোঞ্জ পদক ছিনিয়ে আনে অলিম্পিকে।

ভালো কোচারের অভাব এখানে। কৌশল শিখিয়ে দেবার মতো ভালো প্রশিক্ষক দরকার আমাদের দেশে। ভালো প্রশিক্ষণ আর সুযোগ সুবিধা পেলে অনেক ভালো করবে আমাদের সোনার ছেলে মেয়েরা। সুযোগের অভাবে এদেশে এত দুঃখ ! এত কষ্ট ! এতটাই হতাশা আর বেদনার গ্লানি!

আম্মু তুমি আমায় সুযোগ দেবে ।

কেনো রে পাগল ! আমি তো তোর সব রকম সুযোগ সুবিধা দিয়েই বড় করছি।

তা দিচ্ছ। এভাবে নয়। রাতে খেলা দেখার সুযোগ করে দিবা। আমি খেলা দেখে কৌশলগুলো রপ্ত করবো। খেলা দেখতে দেখতে আর ভালো প্রশিক্ষণ নিয়ে ভালো খেলোয়াড় হয়ে দেশের জন্যে সোনা বয়ে আনবো।

দুষ্টু ছেলে। যাও আগে ওই ঘরে গিয়ে দুধটুকু খেয়ে শেষ করো।

কথার পাশ কাটিয়ে যায় আম্মু। হিমু এড়াতে পারে না কথা। তাই বুক জুড়ে দুঃখ নিয়ে চলে যায় পাশের ঘরে।

দুধটুকু শেষ করতে দুধের গ্লাসের দিকে হাত বাড়ায় হিমালয়।

সময় গড়িয়ে যায় সকাল থেকে দুপুর। দুপুরের খাবার খেয়ে আম্মুর পাশে গিয়ে শুয়ে পড়ে হিমু। ঘুম নেই চোখে। আম্মু পিঠে আস্তে আস্তে চাপড় দিয়ে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করে। মাথায় বিলি কেটে দেয়। আর হিমালয় সেই সুবাদে স্বপ্নের রাজ্যে চলে আসে স্পেনের বার্সিলোনায়।

বন্দুকের গুলি ছোঁড়ার ইভেন্টে নাম লিখিয়েছে হিমু। সব দেশের নির্বাচিত প্রতিযোগীদের পাশে হিমু। শ্যুটার ইভেন্টে সোনা জিততেই হবে ওকে। বুক ভরা অসীম সাহস আর মনোবল নিয়ে দাঁড়িয়েছে ও। সবাই একে একে গুলি ছোড়া শেষ করেছে। এবার হিমুর পালা। গোল চাকতির মাঝখান বরাবর কেউ নিশানা লাগাতে পারে নি । কেউ ধারে কাছে। কেউবা দূরে। মাঝখানের কালো রাউন্ডের মধ্যে নিশানা লাগাতে হবে। মাথা উচুঁ করে নিশানা ঠিক করে নিল ও।

গুলি ছুঁড়লে সেটা সোজা কালো রাউন্ডের ভেতর ভেদ করলো। হিমুর মুখে তৃপ্তির হাসি। দুই হাত উঁচিয়ে চিৎকার দিয়ে ওঠে ও। মাইকে ঘোষণা হলো ওর নাম। বাংলাদেশের হিমু বিজয়ী হয়েছে। পর পর তিনটা গুলি ছুঁড়লে তিনটাই একই জায়গায় ভেদ করে।

ঘোষণা আসলো শ্যুটার ইভেন্টে সোনা জয় করলেন হিমু।

হিমুর মুখ দিয়ে যেনো কথা বেরুচ্ছে না। ঝলক ঝলক হাসি উপচে পড়ে চোখেমুখে। ওর হাতে তুলে দেওয়া হলো সোনার মেডেল। চিৎকার জুড়ে সেই সোনা সবাইকে দেখাতে দেখাতে ঘুম ভেঙে গেল ওর। দেখে ঘর অন্ধকার। ডিম লাইট জ্বলছে।

হিমুর চিৎকারে ছুটে আসে আম্মু। সুইচ টিপতেই টিউব লাইটের আলো অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। আম্মুকে দেখে ভরসা পেলো যেনো। বলে,

আম্মু আমি সোনার মেডেল পেয়েছি এয়ার পিস্তল শ্যুটার ইভেন্টে। এই দেখ আম্মু মেডেল।

হিমুর কথা শুনে মোটেই অবাক হননি আম্মু। বুকে জড়িয়ে ধরে বলে ওঠো, সন্ধ্যে হয়ে গেছে। হাত মুখ ধুয়ে নাও। আমি নাস্তা দিচ্ছি।

হিমালয় স্বর্ণ জয়ের স্বপ্ন ধুয়ে আসতে বাথরুমের দিকে এগিয়ে গেলো। আম্মু ওর দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো ।