মাহমুদুল হাসান মুন্না
অয়ন শীতের ছুটিতে দাদাবাড়িতে বেড়াতে এসেছে। তার বাবা পুলিশ অফিসার। তিনি চাকরির সুবাদে দেশের নানা প্রান্তে থাকেন। আর অয়নেরও স্কুল বদল করতে হয়। তখন তার ভীষণ মন খারাপ হয়। নতুন স্কুলে সহপাঠীদের সাথে যখন সখ্য গড়ে উঠে, তখনই তাদের মাঝে দূরত্ব বেড়ে যায়। অয়নের দাদাবাড়ি দ্বীপ এলাকায়। মেঘনার উত্তাল ঢেউ পাড়ি দিয়ে সেখানে যেতে হয়। তার বাবা মাঝে মাঝে সেখানে যান। অয়ন ছোট হওয়ায় তাকে কখনো নিয়ে যাননি। এবার বাবা-মায়ের সাথে লঞ্চে করে দাদাবাড়িতে এসেছে। সে খুব খুশি। এতদিন ভিডিও কলে দাদাদাদিকে দেখত, কিন্তু আজ সামনাসামনি দেখছে। পড়ন্ত বিকেল। সবাই রোদ পোহাচ্ছিল। তখন অয়নের দাদা অজু করে সেখানে এলেন। আসরের নামাজ পড়তে মসজিদে যাবেন। অয়নকে সাথে নিয়ে চললেন। সে দাদুভাইয়ের হাতের আঙ্গুল ধরে রেখেছে। রাস্তার ধারে সারি সারি তাল ও খেজুরগাছ। একজন গাছি হাড়ি নিয়ে খেজুরগাছে উঠল। অয়ন দেখল গাছি গাছটির উপরিভাগে ছোট ছোট করে কাটতেছে। তারপর দুটি খুঁটির সাথে হাড়িটি আটকিয়ে দিলো। অয়ন বলল, দাদুভাই, লোকটি কেন গাছটিকে সামান্য কেটে হাড়ি লাগালো? দাদা বললেন, শীতকালে গাছিরা খেজুরগাছ থেকে রস সংগ্রহ করেন। এভাবে অল্প করে কেটে দিলে ফোঁটায় ফোঁটায় রস ঝরে পড়ে। এক সময় হাড়িটি পূর্ণ হয়ে যায়। খেজুর রস দিয়ে ফিরনি,পায়েস তৈরি করা হয়, যা খেতে সুস্বাদু ও সুমিষ্ট। এই রস থেকে গুড়ও হয়, লালি হয়।
অয়ন গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থেকে দেখল ফোঁটাগুলো পড়তে দেরি হয়। তার বিশ্বাস হচ্ছে না এভাবে হাড়িটি রসে ভরে যাবে। অয়ন বলল, দাদুভাই, সত্যি কি হাড়িটি রসে টইটুম্বুর হয়ে যাবে? দাদা বললেন, হ্যাঁ, দাদুভাই। সকালবেলা তোমাকে নিয়ে আসব, তখন নিজ চোখে দেখতে পাবে।
অয়নের দাদা ফজরের নামাজ শেষ করে তাকে নিয়ে রস আনতে গেলেন। আজকে খেজুর রসের ফিরনি বানানো হবে। অয়ন দাদার হাত ধরে গাছের নিচে দাঁড়িয়ে রইল। গাছি অতি সাবধানে হাড়িটি নিয়ে নিচে নামল। অয়ন দেখল হাড়ি ভর্তি রস। তখন দাদা বললেন, কী দাদুভাই! এবার বিশ্বাস হলো তো? সে বলল, হ্যাঁ, বিশ্বাস হয়েছে। আল্লাহর কী অপরূপ সৃষ্টি! গাছ থেকে খেজুর হয়, আবার সুমিষ্ট রসও হয়। দাদা বললেন, দাদুভাই, একটা কথা সবসময় মনে রাখবা, “ বিন্দু থেকেই সিন্ধু হয়”। ছোট কিংবা সামান্য বলেই কোনোকিছুকে অবহেলা করবা না। সদা সত্য বচন বলবা। অল্প অল্প নেক আমল দিয়েই একদিন নেকের পাল্লা ভারী হবে। অয়ন বলল, ইনশাআল্লাহ। দাদুভাই, তোমার এই উপদেশ আমি মনে রাখব। তারপর দাদা-নাতি রসের হাড়ি নিয়ে বাড়ির দিকে রওয়ানা দিলো।