বিচিত্র কুমার

ভুল-এ যেন এক চিরসঙ্গী শব্দ, জীবনের প্রতিটি বাঁকে যার দেখা মেলে। ভুল শুধু একটা ঘটনার নাম নয়, এটা কখনো অনুশোচনা, কখনো শিক্ষা, কখনো আবার সম্পর্কের অবসান কিংবা এক নতুন শুরুর বীজও হয়ে ওঠে। মানুষ মাত্রই ভুল করবেÑএই কথাটি আমরা প্রায়শই বলি, কিন্তু এই কথাটির অন্তর্নিহিত গভীরতা আমরা ক’জনই-বা উপলব্ধি করি?

মানুষ জন্মগতভাবে নিখুঁত নয়। প্রতিটি মানুষ বড় হয় শেখার মধ্য দিয়ে, আর শেখার পথচলায় ভুল একটি অবধারিত অংশ। একজন শিশুর হাঁটতে শেখার প্রথম চেষ্টাটি ভুলেরই প্রতিচ্ছবিÑসে পড়ে যায়, ঠোকর খায়, আবার উঠে দাঁড়ায়। জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে, প্রতিটি সম্পর্ক, কর্মক্ষেত্র, পরিবার, সমাজ কিংবা রাষ্ট্রÑসব জায়গায় মানুষ ভুল করে এবং সেই ভুলই তাকে মানুষ করে তোলে।

আমরা যখন কোনো একটি ভুল করি, তখন তা তাৎক্ষণিকভাবে আমাদের কষ্ট দেয়। অনেক সময় সেই কষ্ট সাময়িক হলেও, কোনো কোনো ভুলের পরিণতি এতটাই গভীর হয় যে তা আজীবনের পাপবোধে রূপ নেয়। যেমন কোনো সন্তানের অবহেলায় তার মায়ের মৃত্যু হলে, সন্তানের মনে যে অপরাধবোধ তৈরি হয়, তা কেবল সময়ের সাথে ক্ষয় হয় না। বরং এই ভুল একটি জীবনের মানে বদলে দিতে পারে। এমন বহু সন্তান রয়েছে যারা জীবনের প্রথমার্ধে পিতা-মাতাকে বোঝা মনে করলেও, তাদের মৃত্যু বা দূরে চলে যাওয়ার পর বুঝতে পারে—তারা আসলে জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ ছিলেন। তখন সেই অনুশোচনা একেকটি ভুলের পাহাড় হয়ে বুকের ওপর চাপা পড়ে থাকে।

ভুল শুধুমাত্র আবেগগত দিক থেকে নয়, কর্মক্ষেত্রেও বিশাল ভূমিকা রাখে। একজন চিকিৎসক যদি ভুল প্রেসক্রিপশন দেন, একজন প্রকৌশলী যদি ভুল নকশা করেন, একজন শিক্ষক যদি ভুল শিক্ষা দেন কিংবা একজন সাংবাদিক যদি ভুল তথ্য দেনÑতাহলে তা শুধু একটি ব্যক্তির ক্ষতি করে না, বরং সমাজব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। এই ভুলগুলো থেকে আমরা প্রতিনিয়ত শিক্ষা নিই, এবং এই শিক্ষাগুলোই ভবিষ্যতের ভুলগুলো কমিয়ে আনতে সহায়ক হয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমাদের সমাজে “ভুল” কে প্রায়শই শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে দেখা হয়, ফলে অনেকেই ভুল স্বীকার করতে ভয় পান। আর এই ভয় থেকে জন্ম নেয় মিথ্যা, দ্বিচারিতা এবং আত্মপ্রবঞ্চনা।

জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলগুলো সাধারণত হয় সম্পর্কের জায়গায়। সম্পর্কÑতা হোক বন্ধুত্ব, ভালোবাসা, দাম্পত্য কিংবা রক্তেরÑএমন এক নাজুক পরিসর যেখানে একটি ভুল শব্দ, একটি ভুল সিদ্ধান্ত বা একটি ভুল বোঝাবুঝি বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা বিশ্বাসকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে। আমরা অনেক সময় কথার মাধ্যমে কাউকে আঘাত করি, যা বুঝতে পারি অনেক দেরিতে। তখন “সরি” বলেও আর কিছুই ফিরিয়ে আনা যায় না। কোনো ভুল আচরণ কিংবা অবহেলার কারণে সম্পর্ক ভেঙে যায়, এবং মানুষ সারাজীবন সেই ভুলটির ভার নিয়ে ঘুরে বেড়ায়।

তবে, ভুলের এক বিশেষ গুণ হলোÑএটি মানুষকে মানুষ করে। এমন বহু মানুষ আছেন, যারা জীবনে একাধিক বড় ভুল করেছেন, কিন্তু সেই ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুনভাবে জীবন গড়েছেন। একজন আসামি যিনি জেলে গিয়ে তার জীবনের ভুল বুঝে আলোকিত জীবন যাপন শুরু করেছেনÑতিনি আমাদের শেখান যে, ভুল মানেই শেষ নয়। বরং ভুলের সঠিক স্বীকৃতি এবং তার থেকে শিক্ষা নেওয়া মানেই এক নতুন শুরু। আমরা যদি আমাদের সমাজে “ভুল” কে শুধুমাত্র অপরাধ হিসেবে না দেখে, একে একজন ব্যক্তির শেখার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে মূল্যায়ন করিÑতবে হয়তো অনেক অনুশোচনার জীবন মুক্তি পাবে।

কিন্তু সমাজ ঠিক এই জায়গাটিতেই পিছিয়ে আছে। সমাজ একজন মানুষের ভুলকে চিরকাল ধরে রাখে, এমনকি সে তার ভুল শোধরালেও তাকে “ভুলকারী” তকমা থেকে মুক্তি দেয় না। এই কারণে অনেকেই নিজের ভুল গোপন করে, মুখোশ পরে সমাজে বাঁচে, নিজের ভেতরের অপরাধবোধে ভুগে অথচ স্বস্তির নিশ্বাস নিতে পারে না। অথচ যদি আমরা বুঝতাম, ভুল করা স্বাভাবিক, ভুল স্বীকার করা সাহসিকতা, আর ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া প্রকৃত জ্ঞানÑতাহলে আমরা হয়তো আরও সহনশীল, আরও মানবিক সমাজ গড়তে পারতাম।

ভুল কখনো অভিশাপ নয়, বরং এক আত্মবিশ্লেষণের দর্পণ। একজন মানুষ যখন নিজের ভুলটি উপলব্ধি করে, তখন সে নিজেকে নতুন করে চিনতে শেখে। এই উপলব্ধির ভেতর দিয়ে আত্মশুদ্ধির পথ খুলে যায়। আমাদের সমাজে বহু ধর্মীয়-আধ্যাত্মিক পথিকৃৎ কিংবা মহান ব্যক্তিত্ব আছেন, যাঁরা জীবনের প্রথমার্ধে অনেক বড় বড় ভুল করেছেন, কিন্তু সেই ভুল তাদের মানবিক বোধকে জাগ্রত করেছে এবং তারা পরিণত হয়েছেন এক মানবদরদী মহাপুরুষে।

তবে, ভুল শুধুমাত্র ব্যক্তিগত নয়, অনেক সময় এটি পারিবারিক, সামাজিক, এমনকি রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও ঘটে। একজন শাসকের ভুল সিদ্ধান্ত একটি জাতিকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিতে পারে। যুদ্ধ, দাঙ্গা, সাম্প্রদায়িকতাÑসবই কিছু ভুল সিদ্ধান্ত, ভুল মূল্যায়নের ফসল। আবার কোনো একটি ভুল নীতিমালায় লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু রাষ্ট্র বা সমাজ কি তার ভুল সহজে স্বীকার করে? অধিকাংশ সময় না। আর এখানেই ব্যর্থতা। কারণ যে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নিজের ভুল স্বীকার করতে জানে না, সে কখনো সত্যিকারের উন্নতির পথে চলতে পারে না।

এই প্রসঙ্গে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার কথাও বলা যায়। শিক্ষার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত একজন মানুষকে কেবল পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার উপযোগী করে তোলা নয়, বরং তাকে এমনভাবে গড়ে তোলাÑযাতে সে জীবনের ভুলগুলোকে বুঝে তা থেকে শেখে। আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা কিন্তু সেই জায়গায় এখনো খুব দুর্বল। ছাত্রের ভুলকে শিক্ষক অপমানের মাধ্যমে তুলে ধরেন, ফলে ছাত্র আত্মবিশ্বাস হারায়। অথচ উচিত ছিল, তাকে বোঝানো যে সে যেখানে ভুল করেছে সেটাই তার শেখার মোক্ষম সুযোগ।

ভুলের ভিন্ন আরেক রূপ দেখা যায় আমাদের অভিভাবকত্বের মাঝে। বাবা-মায়েরা প্রায়ই সন্তানদের জীবনে তাদের স্বপ্ন চাপিয়ে দিতে গিয়ে ভুল করে ফেলেন। সন্তানকে তার নিজস্ব পথে চলতে না দিয়ে, তার উপর নিজেদের অপূর্ণতা পূরণের বোঝা চাপিয়ে দেন। পরে যখন সেই সন্তান মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে, তখন অনুশোচনা হয় ঠিকই, কিন্তু অনেক সময় তা হয় দেরি হয়ে যাওয়ার পর।

ভুল মানুষের জীবনকে তছনছ করে দেয়Ñএ কথা যেমন সত্য, ঠিক তেমনি কিছু ভুল মানুষের জীবন বদলে দেয়। ভুলের মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি, কে আমাদের আপন, কে আমাদের ক্ষমা করতে জানে, কে দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে পাশে দাঁড়ায়। অনেক সময় ভুল মানুষের সম্পর্কের গভীরতাকেও মেলে ধরে।

একজন মানুষ যদি ভুল না করতো, তবে সে বুঝতে পারতো নাÑবুঝে ওঠা কাকে বলে। ভুল না করলে অনুশোচনা থাকত না, অনুশোচনা না থাকলে আত্মশুদ্ধি সম্ভব হতো না, আর আত্মশুদ্ধি না থাকলে মানবিকতা কেবল বইয়ের পাতায় বন্দি থাকতো।

শেষে এসে বলা যায়Ñভুলের ভয় নয়, বরং ভুলকে গ্রহণ করার সাহসই মানুষের আসল শক্তি। ভুল করা দোষ নয়, কিন্তু একই ভুল বারবার করা অপরিণামদর্শিতার পরিচয়। ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়াই জীবনের মূল সার্থকতা। তাই জীবন যখন ভুলের পথে হাঁটে, তখন তা থেকে পালিয়ে না গিয়ে, তাকে সম্মান দিয়ে, সেই ভুলের মাঝে নিজের নতুন পথ খুঁজে নেওয়াই মানুষের আসল কৃতিত্ব।

ভুল এক নিঃশব্দ শিক্ষক, যে চিৎকার করে নয়, ধীরে ধীরে শেখায়। ভুল আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়Ñআমরা কোথায় মানুষ ছিলাম না। তাই ভুলকে ভয় না পেয়ে, তার হাত ধরে হেঁটে চলাই শ্রেষ্ঠ মানবিকতা।