ইয়াছিন ইবনে ফিরোজ
বিকেলের নরম রোদ তখনো মিলিয়ে যায়নি। উঠোনের আমগাছের ছায়ায় বসে দাদা পায়ের কাছে শীতল পানির কলস রেখে প্রকৃতির মৃদু বাতাস উপভোগ করছেন আর বই পড়ছেন। দূরে স্কুল ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে বাড়ি ফিরছে নাতি সায়েম। তার মুখে অস্থিরতার ছাপ স্পষ্ট। দাদা মৃদু হেসে ডাকলেন, কিরে সায়েম, আজ বুঝি পাঠশালার হাওয়ায় মনটা বিষণ্ন? মুখখানা এমন শুকনো কেন? সায়েম ব্যাগটা একপাশে রেখে দাদার পাশে বসে পড়ল। দাদাভাই, আজ ক্লাসে আমার খুব মন খারাপ হলো। আমাদের এক সহপাঠী নিজেকে খুব জ্ঞানী বলে জাহির করে। যেকোনো আলাপে সে কেবল একটাই কথা বলে, আমি জানি! কিন্তু তার কথা অনেক সময়েই ভুল হয়, আর তার ব্যবহারও ভালো নয়। সে কি তাহলে সত্যিই জ্ঞানী? দাদা হালকা হাসলেন। হাসিটি যেন শীতের সকালের নরম আলো। তা হলে তো তার জ্ঞানের চেয়ে অহংকারটাই বেশি। দাদা বইটা বন্ধ করে রাখলেন। তারপর অত্যন্ত গাম্ভীর্যের সাথে বললেন, সায়েম মনে রাখিস, জ্ঞানের ধর্মই হলো মানুষকে নিচু করা নয়, বরং নিজেকে আরও বিনয়ী করা। প্রকৃত জ্ঞানীকে চেনার জন্য আমাদের মহাপুরুষদের বাণী আর ধর্মগ্রন্থের দিকে তাকাতে হয়। সায়েম কৌতূহলী হলো, কেমন বাণী দাদাভাই? দাদা তখন ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন, গ্রীক দার্শনিক সক্রেটিস বলতেন, আমি কেবল এটাই জানি যে, আমি কিছুই জানি না। অর্থাৎ জ্ঞানের প্রথম ধাপই হলো নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করা। যে ভাবে সে সব জানে, সে আসলে জ্ঞানের মহাসমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে কেবল নুড়ি কুড়োচ্ছে। দাদা একটু থেমে যোগ করলেন, পবিত্র কুরআনের সূরা বনি ইসরাইলের ৮৫ নম্বর আয়াতে এই কথাটি বলা হয়েছে যে, যেখানে আল্লাহ মানুষকে বলেছেন যে মানুষের জ্ঞান খুবই সীমিত এবং রূহ বা আত্মার প্রকৃত জ্ঞান শুধু আল্লাহর কাছেই রয়েছে। তোমাকে তারা আত্মা সম্পর্কে প্রশ্ন করে। তুমি বল, আত্মা আমার প্রতিপালকের আদেশ বিশেষ; আর তোমাদেরকে সামান্য জ্ঞানই দান করা হয়েছে। (রূহ বা আত্মা) এমন অশরীরী বস্তু যা কারো দৃষ্টিগোচর হয় না। কিন্তু প্রত্যেক প্রাণীর শক্তি ও সামর্থ্য এই রূহের মধ্যেই লুকায়িত। এর প্রকৃত স্বরূপ কি? তা কেউ জানে না। ইয়াহুদীরাও একদা মুহাম্মদ (সা.)-কে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। (বুখারী: বনি ইসরাইলের তাফসীর ) আয়াতের অর্থ হল, তোমাদের জ্ঞান আল্লাহর জ্ঞানের তুলনায় অনেক কম। আর এই রূহ (আত্মা), যে সম্পর্কে তোমরা জিজ্ঞাসা করছ, তার জ্ঞান আল্লাহ তাঁর আম্বিয়া সহ অন্য কাউকেও দেননি। কেবল এতটুকু জেনে নাও যে, এটা আমার প্রতিপালকের নির্দেশ মাত্র। অথবা এটা আমার প্রতিপালকেরই খাস ব্যাপার; যার প্রকৃতত্ব কেবল তিনিই জানেন।
তুই কি জানিস, প্রকৃত জ্ঞানী মানুষকে চেনা যায় কোন উপায়ে? সায়েম কৌতূহলী চোখে দাদার দিকে তাকাল। তুমি বলো দাদাভাই। তোমার কথা তো মন ছুঁয়ে যায়। দাদা তাঁর ধূসর দাড়িতে হাত বুলিয়ে গভীর স্বরে বলতে শুরু করলেন, প্রথম কথা, প্রকৃত জ্ঞানীর মনে অহংকারের স্থান নেই। সে কেবল ভাবে আমি যা জানি, জানার জগৎ তার চেয়ে বহু বিস্তৃত। তাই সে প্রশ্ন করে, ভুল স্বীকার করে। আল-কোরআনে যেমন বলা হয়েছে, হে আমার প্রতিপালক, আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করো (সূরা ত্বাহা, ২০:১১৪) থেকে এটি স্পষ্ট যে জ্ঞানী ব্যক্তিরা সর্বদা জ্ঞানের তৃষ্ণায় থাকেন এবং কখনো নিজেদেরকে পূর্ণ মনে করেন না; বরং আল্লাহ কাছে জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য দোয়া করেন, যা প্রমাণ করে যে জ্ঞানার্জন একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং এতে কোনো শেষ নেই। সায়েম চোখ বড় করে বলল, তাহলে যে যত বেশি শেখে, সে তত বেশি নম্র হয়? যেমন, একটা গাছ যত ফলে ভরে, তার ডাল ততই নুয়ে থাকে? একদম তাই, দাদা মাথা নেড়ে বললেন।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় জ্ঞানী ব্যক্তির লক্ষণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে, তিনি ‘অমানিত্বম্’ অর্থাৎ বিনয়ী এবং নিরভিমান। জ্ঞানী মানুষ জ্ঞানের ভারে নিজেকে নত রাখেন। ঠিক যেমন, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের এত জ্ঞানের ভার ছিল, তবুও তাঁর মতো বিনয়ী মানুষ বিরল। সায়েম একটু চিন্তায় পড়ল। কিন্তু দাদাভাই, কেবল বইয়ের অনেক কথা জানলেই কি মানুষ জ্ঞানী হয়ে যায়? আমার বন্ধুটা তো খুব বই পড়ে। দাদা শান্তভাবে হেসে বললেন, শুধু বই নয় রে দাদা ভাই, জ্ঞান হলো বই, অভিজ্ঞতা, বিবেক এই তিনের স্রোত ধারা। বই শেখাবে তথ্য ও নিয়ম, অভিজ্ঞতা শেখাবে জীবনের বাস্তবতা, আর বিবেক শেখাবে সেই জ্ঞানকে মানবকল্যাণে কীভাবে ব্যবহার করতে হয়। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, কেবল পুঁথিগত বিদ্যা আর কতগুলো ভাষা শেখা জ্ঞান নয়। তিনি চেয়েছিলেন মানুষের মধ্যেকার ব্রহ্মকে জাগিয়ে তোলা। সায়েমের চোখে ঝিলিক খেলল। তাহলে আমার বন্ধুটা বই পড়লেও আচরণে রুক্ষ। সে মানুষের সাথে খারাপ কথা বলে, ছোট করে দেখে। সে কি জ্ঞানী না? দাদা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। শোন, জ্ঞান মানুষকে সংযমী ও সহনশীল করে তোলে। বাইবেলেও বলা হয়েছে, “জ্ঞানীর হৃদয় তার মুখের কথা সংযত করে এবং তার ঠোঁটে প্রজ্ঞা বৃদ্ধি করে।” (হিতোপদেশ ১৬:২৩)। যে বড়াই করে, অন্যকে তুচ্ছ করে, সে বিদ্যা লাভ করলেও জ্ঞানের আলো পায়নি। জ্ঞানের প্রদীপ জ্বললে ভেতরে শান্তি আসে, বাইরে ঔদ্ধত্য নয়।
একটু থেমে দাদা রাহিমের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। জ্ঞানী মানুষকে খুব সহজে চেনা যায় তার আচরণে ও ব্যবহারে। তার কথা কম, ভাবনা গভীর; রাগ কম, যুক্তি প্রবল; অহং কম, মানবতা প্রস্ফুটিত।
সায়েম শ্রদ্ধার চোখে দাদার দিকে তাকাল। দাদাভাই, তোমার কথা শুনলে মনে হয় তুমিই তো সবচেয়ে জ্ঞানী! দাদা হেসে বললেন, আরে না রে! আমি তো এখনও শিখছি। উপনিষদে বলা আছে, ‘চরৈবেতি, চরৈবেতি’Ñ অর্থাৎ চলতে থাকো, চলতে থাকো এবং এটি ঐতরেয় ব্রাহ্মণের অংশ, যা জীবনের নিরন্তর গতিশীলতা, কর্মযোগ এবং লক্ষ্যে অবিচল থাকার এক গভীর দার্শনিক বার্তা বহন করে। এটি শুধু শারীরিক চলা নয়, বরং জ্ঞানার্জন, আধ্যাত্মিক বিকাশ এবং জীবন সংগ্রামে নিরলসভাবে এগিয়ে যাওয়ার প্রতীক। শেখার কোনো শেষ নেই। যতদিন শ্বাস, ততদিনই তো শেখার সাধনা।
সায়েম দাদার হাতটা ধরে বলল, তাহলে আমিও শিখব দাদাভাই। কিন্তু কেমন করে শুরু করব? দাদা আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, একটাই উপায়, তুই কৌতূহলী থাকিস। প্রশ্ন করিস। ভুল হলে ভয় পাবি না, কারণ ভুল থেকেই সঠিক পথে ফেরা যায়। আর সবসময় মানুষের প্রতি সদয় থাকিস। জ্ঞান তখনই পূর্ণতা পায় যখন তুই বিনয় ও করুণার সঙ্গে মিশে যাবি। জ্ঞান তখন নিজেই তোর কাছে এসে ধরা দেবে।
সায়েম চোখ তুলে দেখল, আকাশের রংটা যেন দাদার কথায় আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। দাদা মৃদু গলায় যোগ করলেন, মনে রাখিস সায়েম, যেদিন তুই বুক ফুলিয়ে বলবি, আমার জানার আর কিছুই নেই, সেদিনই তুই সব থেকে কম জানিস। জ্ঞানের সমুদ্র চিরকালই বিশাল। সায়েম হেসে বলল, বুঝেছি দাদা ভাই। আজ থেকে আমি প্রশ্ন করা আর শেখা বন্ধ করব না। আমি বিনয়ী আর কৌতূহলী হবো। দাদা নাতিকে বুকে টেনে নিলেন। এই তো আমার প্রকৃত জ্ঞান-পিপাসু নাতি। উঠোনের বাতাস আরও নরম হয়ে এলো। আমগাছের পাতায় ঝিরঝিরে শব্দ। সেই শান্ত বিকেলে মনে হলো দুই প্রজন্মের মাঝে যেন জ্ঞানের এক অদৃশ্য ও চিরন্তন আলো ছড়িয়ে পড়ল।