রেজাউল করিম খোকন
সৌভাগ্য বলা যায়! বাসা থেকে হাসপাতালে যাওয়ার পথে রাস্তায় তাদের তেমন ট্রাফিক জ্যামের মধ্যে পড়তে হয় না। সাধারণত এই সময়ে গুলশানের রাস্তায় গাড়ির ভিড় লেগে থাকে। পথে পথে কেবলই দাঁড়িয়ে পড়তে হয় সেগুলোকে। আজ তেমন পরিস্থিতি নেই। এই মুহূর্তে সময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান ব্যাপার। একটু দেরি করে হাসপাতালে গেলে অনেক সময় শোচনীয় অবস্থা হয়ে যাবে রোগীর। তখন হাসপাতালের ডাক্তারদের করার মতো আর কিছু থাকবে না। বিশাল এই হাসপাতালের ইমার্জেন্সি বিভাগের সামনে গাড়িটা গিয়ে দাঁড়াতেই কয়েকজন নার্স হুইল চেয়ার নিয়ে ছুটে আসে। অসুস্থ আশরাফ সাহেব কাতর গলায় বলতে থাকেন, ‘এই আইরিন, তুই আর তোর আম্মু মিলে আমাকে কোথায়, কোন হসপিটালে নিয়ে যাচ্ছিস? আই হ্যাভ নো আইডিয়া অ্যাবাউট দিস ম্যাটার। তোরা আমাকে কিছুই বলছিস না কেন? বড় কোনো হসপিটালে যাবার দরকার নেই। আমার বুকের পেইনটা তো আগেও আরও হয়েছে। এবারও সেরে যাবে হয়তো। এটা নিয়ে তোদের এত দুশ্চিন্তার দরকার নেই।’ হাসপাতালের নার্সরা গাড়ি থেকে রোগীকে নামিয়ে ইমার্জেন্সিতে নিয়ে একটা বেডে শুইয়ে দেয়। সঙ্গে কয়েকজন ডাক্তার, নার্স ছুটে আসে বেডের পাশে। তারা দ্রুত বিভিন্ন যন্ত্রপাতি লাগিয়ে পরীক্ষা-নিরিক্ষা শুরু করে। রোগীর সাথে কথা বলে, তার কন্যা ও স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় তথ্যগুলো জেনে নেয়। তারপর তাদের বাইরে গিয়ে অপেক্ষা করতে বলে। ইমার্জেন্সির বাইরে মা ও মেয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। খুব অসহায় মনে হয় তাদের নিজেদের। অপরিচিত লোকটা নিজে যেচে তাদের এই ভয়ংকর বিপদে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। গাড়িতে করে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে আসতে সহায়তা করেছে। সেই মুহূর্তে ওটার দরকার ছিল সবচেয়ে বেশি। কিন্তু রহস্যময় মানুষটা নিজের পরিচয় দিচ্ছে না। মুখে মাস্ক পরা থাকায় তার মুখটাও দেখা যাচ্ছে না। চোখেও কালো সানগ্লাস পরে আছে। উপকার করতে গিয়ে তাদেরকে নতুন করে মস্ত বড় বিপদের মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে না তো সে? এই মুহূর্তে আইরিনের কাছে মনে হয়। উদ্বিগ্ন, চিন্তিত চেহারা নিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মায়ের দিকে তাকায়। তার মনেও চলছে অনেক দুশ্চিন্তার ঝড়। শুকনো বিষণ্ন ম্লান মুখ দেখেই সেটা অনুমান করা যায়। সেই মানুষটা ইমার্জেন্সিতে তাদেরকে রোগীসহ রেখে কোথায় যে উধাও হয়ে গেছে, কে জানে। আশপাশে কোথাও তাকে দেখা যাচ্ছে না। আইরিনের কেন জানি মনে হয়, রহস্যময় লোকটা আসলে পরোপকারী কোনো মহামানব, দেবদূত নয়। আসলে সে এই হাসপাতালের একজন দালাল। রোগী এনে দিতে পারলে ভালো কমিশন পায় হয়তো-বা। আজকাল ঢাকা শহরে এমন অনেক দালাল রয়েছে, তারা বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালের পক্ষে রোগী জোগাড় করে আনে। অনেক সময় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এবং অন্যান্য সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের নানা ফাঁদে ফেলে বের করে এনে বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিক, হাসপাতালে নিয়ে যায়। ‘তোর সঙ্গে আসা লোকটা কোথায় গেল? তুই কি চিনিস তাকে?’ মায়ের এমন প্রশ্নের জবাবে শুধু মাথা নাড়ে আইরিন। কী বলবে সে? আসলেই তো রাস্তায় গাড়ির জোগাড় করে আনা মানুষটিকে কোনোভাবেই চেনে না। ভার্সিটিতে যাওয়ার সময় পাশের সিটের যাত্রী ছিল মানুষটা। কোনো কথাবার্তা, আলাপ-পরিচয় হয়নি। আজ ভার্সিটিতে যাওয়ার পথে আগে থেকেই পাশের সিটে বসে থাকা মানুষটিকে একনজর দেখে কেমন যেন অস্বাভাবিক মনে হয়েছিল। তার বেশভূষা পরিপাটি, সুন্দর, ভদ্র, রুচিশীল মনে হলেও মুখে মাস্ক, চোখে কালো সানগ্লাস আবার মাথায় ক্যাপ পরা মানুষটিকে কেমন রহস্যময় লাগছিল। কিন্তু মানুষটি তাকে একবার একনজর দেখার পর আর একবারও তার দিকে ফিরে তাকায়নি। আড়চোখে সতর্কভাবে আইরিন কয়েকবার ব্যাপারটা দেখার চেষ্টা করেছে। এটা লোকটি ধরতে পেরেছে কি না কে জানে। ততক্ষণে বাসা থেকে বাবার হঠাৎ মারাত্মক অসুস্থ হওয়ার খবর জানিয়ে তার মায়ের ফোন পেয়েছিল আইরিন।
দ্রুত এত কিছু ভাবছিল সে। এর মধ্যে দুয়েকবার ইমার্জেন্সির ভেতর চিকিৎসাধীন বাবার অবস্থা দেখার জন্য উঁকি দেওয়ার চেষ্টা করেছে সে। কিন্তু তার বাবার বেডের চারপাশে অনেক ডাক্তারের ভিড় এবং ব্যস্ততা ছাড়া কিছুই দেখার সুযোগ হয়নি। এখন বাবার শারীরিক অবস্থা কেমন, ভয়ানক কিছু কি হয়েছে? তার সুস্থ, স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সম্ভাবনা কতটাÑএসব ভাবতে ভাবতে এই হাসপাতালে জটিল রোগীর চিকিৎসার খরচের কথাটা মাথায় আসতেই কেমন যেন টলে ওঠে শরীরটা। এই মুহূর্তে তাদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা শোচনীয় পর্যায়ে রয়েছে। তার প্রাইভেট ভার্সিটির লেখাপড়ার খরচ মেটানোর অবস্থাও নেই। আইরিন কয়েকটা টিউশনি জুটিয়ে নিয়ে কোনোভাবে ম্যানেজ করছে নিজের পড়াশোনার খরচটা। কয়েক বছর আগেও তাদের পরিবারের এমন আর্থিক দুরবস্থা ছিল না। দৈন্য, অভাব, অসচ্ছলতা কিছুই ছিল না। সরকারি চাকরি থেকে রিটায়ারমেন্টের পর তার বাবা ব্যাংকে জমানো সারা জীবনের সঞ্চয়, রিটায়ারমেন্টের বেনিফিট, পেনশন ফান্ডের সব টাকা বেশি মুনাফার আশায় একটা ব্যাংকে ফিক্স ডিপোজিট করেছিলেন। বেশ ভালো মুনাফা পাচ্ছিলেন। সেই টাকায় সংসারটা চমৎকার স্বচ্ছন্দে চলে যাচ্ছিল। কোনো অভাব, অভিযোগ, সীমাবদ্ধতা ছিল না। সুখে, আনন্দে, পরম নিশ্চিন্তে ফুরফুরে দিন কাটছিল পরিবারের তিনটি মানুষের। কিন্তু হঠাৎ দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্যাংকিং সেক্টরে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বেশ কয়েকটি ব্যাংকের উদ্যোক্তা, মালিক তাদের অতীত কর্মকাণ্ড, জালিয়াতি, লুটপাট, বিদেশে অর্থ পাচারের দায়ে অভিযুক্ত হয়ে আটক হয়। আরও অনেকজন দেশ ছেড়ে বিদেশে পালিয়ে কোনোভাবে গ্রেফতার থেকে রক্ষা পায়। সারা জীবনের সঞ্চয়, পেনশন, গ্রাচুইটি, প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা বেশি মুনাফার আশায় যে ব্যাংকে জমা রেখেছিলেন আইরিনের বাবা আশরাফ সাহেব, সেই ব্যাংকেরও অবস্থা একইভাবে খারাপ হয়ে পড়েছে। আমানত জমা রাখা গ্রাহকদের মুনাফার টাকা প্রতি মাসে নিয়মিতভাবে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। দুই-তিন মাসে ছিঁড়ে ছিঁড়ে আংশিকভাবে দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। সারাজীবনের সঞ্চয় একসাথে করে রাখা ফিক্স ডিপোজিটের এতগুলো টাকা শেষ পর্যন্ত ফেরত পাওয়া যাবে কি না তারও ভরসা নেই। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এ সম্পর্কে সুস্পষ্ট করে কিছু বলছে না। নিজের জমানো এতগুলো টাকা ফেরত না পাওয়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ায় ষাটোর্ধ্ব মানুষটি মহাদুশ্চিন্তায় পড়ে গেছেন। ব্যাংক থেকে নিয়মিতভাবে প্রতি মাসে মুনাফার টাকা না পাওয়ায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। আশরাফ সাহেব ভেবেছিলেন, গাজীপুরে কিনে রাখা একখণ্ড জমিতে রিটায়ারমেন্টের পর বাড়ি তৈরি করবেন। সেখানেই অবসর জীবনটা কাটিয়ে দেবেন। একমাত্র সন্তান মেয়ে আইরিনের পড়াশোনা শেষ হলে তাকে বিয়েশাদি দেবেন। ভবিষ্যৎ জীবনের একটা ছক তৈরি করে রাখা মানুষটি হঠাৎ আচমকা ব্যাংকে সংকট সৃষ্টি হওয়ায় মারাত্মকভাবে শকড হয়েছেন। একেবারেই ভেঙে পড়েছেন তিনি। তার জীবনের সাজানো ছক ভেঙে তছনছ হয়ে গেছে। কেমন যেন এলোমেলো অস্বাভাবিক হয়ে পড়েছেন। এর মধ্যে একবার ছোটখাটো স্ট্রোক হয়েছে তার। তখনই ডাক্তার তাকে সাবধানে থাকতে পরামর্শ দিয়েছেন। রাতে ঘুমের ওষুধ খেয়েও ঘুম আসছে না দু’চোখে।
২.
আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবদের কাছ থেকে ধারকর্জ করে আর কতদিন চলা যায়। ব্যাংকের ঝামেলাটা মিটে গেলেই সব টাকা পরিশোধ করে দেবেন বলেছেন তাদের। কিন্তু দেশের যে পরিস্থিতিÑসংকটের আবর্তে পড়ে যাওয়া ব্যাংকগুলো কবে যে তাদের আমানতকারীদের টাকাপয়সা ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করবেÑতা এখনও বলা যাচ্ছে না জোর দিয়ে।
এ কারণে আজকাল কারও কাছে ধার চাইতেও কেমন সংকোচবোধ হচ্ছে। মাঝখানে গাজীপুরে কিনে রাখা জমিটা বিক্রির চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন আশরাফ সাহেব। জায়গাটা ভালো হলেও কেনার মতো তেমন কাস্টমার পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে অথৈ সাগরে যেন পড়ে গেছেন আশরাফ সাহেব। হতাশা, বিষাদ, অনিশ্চয়তা তাকে গ্রাস করেছে প্রবলভাবে। তিনি সরকারি উঁচু পদে চাকরি করেছেন। সারা জীবন সততার সাথে চাকরি করেছেন। অসৎ পথে টাকা উপার্জনের ধান্ধা করেননি। বিশেষ মর্যাদা ও সম্মান নিয়ে কাজ করে গেছেন। সহকর্মীদের মধ্যে কেউ কেউ দুর্নীতি-অনিয়ম করে অনেক সম্পদ, অর্থবিত্ত অর্জন করে অবসর গ্রহণের পর বিলাসী জীবনযাপন করছে। স্ত্রী জেসমিনও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া একজন মেয়ে। একটা কিন্ডারগার্টেন স্কুলে শিক্ষকতা করেছে অনেকদিন। করোনা মহামারির পর দেশের বহু কিন্ডারগার্টেন স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে ছাত্রছাত্রীর অভাবে। এখন যেগুলো চালু আছে সেগুলোও কোনোভাবে টিকে আছে। অনেক কম বেতনে অল্পবয়সি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মেয়েদের দিয়ে চালাচ্ছে কিন্ডাগার্টেন স্কুলের মালিকপক্ষ। তারও বয়স হয়ে গেছে। শরীরেও আর কুলোয় না। এত কম বেতনে এই বয়সে ছোট্ট বাচ্চাদের পড়ানোর কাজটা পোষায় না বলে শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে ঘরসংসারেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রেখেছেন জেসমিন। সারাটা জীবন বিত্তবৈভবে না কাটালেও সচ্ছলতার মধ্যে পরিবারের সব চাহিদা পূরণ করতে পেরেছেন। টানাটানির মধ্যে পড়তে হয়নি তাদের।
৩.
হাসপাতালের ইমার্জেন্সির বাইরে দাঁড়িয়ে জেসমিন স্বামীর সুস্থতা কামনা করে দোয়া-দরুদ পড়ছেন। ভেতরে ডাক্তাররা তার স্বামীর চিকিৎসা এবং চেকআপে বেশ সময় নিচ্ছেন। বড় ধরনের কোনো বিপদ না হলে তো এত সময় নেওয়ার কথা নয়! কিছুক্ষণ পর ভেতর থেকে দুজন ডাক্তার বেরিয়ে এলেন। উদ্বিগ্ন চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মা ও মেয়ের সামনে এসে দাঁড়িয়ে একজন ডাক্তার বললেন, ‘এখন আপাতত বিপদমুক্ত হলেও রোগীকে অ্যাডমিশন নিতে হবে হসপিটালে। এনজিওগ্রামসহ আরও বেশ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে। আপনারা দুশ্চিন্তা করবেন না। আল্লাহকে ডাকুন, তার সাহায্য চান। আপনারা আইপিডিতে যান। সেখানে কিছু ফরম ফিলআপ করতে হবে। কাগজপত্রে সই দিতে হবে। আমরা রোগীকে সিসিইউতে নিয়ে যাব তার অ্যাডমিশনের পর। প্লিজ, ডোন্ট ওরি। উইশ ইয়্যু গুড লাক।’ ডাক্তারের ব্রিফিং শেষ হলে হাসপাতালের ইমার্জেন্সির একজন পোশাক পরা মানুষ আইরিন ও তার মা জেসমিনকে উদ্দেশ করে বলে, ‘ম্যাডাম আপনারা চলেন আইপিডিতে, অফিসিয়াল ফর্মালিটিজ শেষ না করলে রোগীকে সিসিইউতে নিতে পারব না আমরা।’ তার কথার প্রেক্ষিতে জেসমিন বলে ওঠে, আইপিডি মানে কী? কোথায় যেতে হবে এজন্য?
‘আমার সাথে চলেন, ওদিকে হলো আইপিডি।’ হাত তুলে আঙুল উঁচিয়ে বলে লোকটা। ততক্ষণে মা ও মেয়ে লোকটির পিছু পিছু তাকে অনুসরণ করে হাঁটতে শুরু করেছে। আইপিডিতে হাসপাতালের নতুন রোগী ভর্তি করা হয়। ভর্তির আগে রোগীর নাম-ঠিকানা, বয়সসহ নানা তথ্য উল্লেখ করতে হয় তাদের দেওয়া ফরমে। তবে এই ফরম পূরণের সাথে সাথে বেশ ভালো একটা অ্যামাউন্টের টাকা জমা করতে হয়। এখন তো তাদের কারও কাছে কোনো টাকা-পয়সা নেই। তাহলে কীভাবে কী হবে? টাকা জমা না করলে রোগীকে ভর্তি করাবে না তারা। এই ইমার্জেন্সি থেকে বের করে দেবে। এটা দয়ামায়া দেখানোর জায়গা নয়। টিপটপ সব ব্যবস্থা। কোনো হাঙ্গামা নেই। রোগী হাসপাতালে আসামাত্র তার চিকিৎসা শুরু হয়ে যাচ্ছে। এক মুহূর্তও দেরি নেই। এসবই টাকার খেলা।
হাঁটতে হাঁটতে মেয়ের অনুচ্চস্বরে বলা কথাগুলো শুনতে শুনতে বেশ ভয় পেয়ে যান জেসমিন। একটা ঠাণ্ডা শীতল স্রোত তার মেরুদণ্ড বেয়ে নিচে নেমে যেতে থাকে। দু’পায়ে হাঁটার মতো শক্তি হারিয়ে ফেলেন। মাথাটা টলে ওঠে যেন। এরপর কী হবে, ভাবতেই তার হাত-পা সব ঠাণ্ডা হয়ে আসছে যেন। তখনই ইমার্জেন্সি থেকে সঙ্গে আসা লোকটা তেমন একটা ফরম আইরিনের সামনে এগিয়ে দেয়। তারপর বলে, ‘ম্যাডাম, আপনি শুধু আপনার আব্বুর নাম, ঠিকানা, বয়স এবং অন্যান্য তথ্য লিখে সই করে দিন। বাকিটা আমরা ফিলআপ করে নেব। প্লিজ, একটু তাড়াতাড়ি করুন। অ্যাডমিশনের জন্য রোগীর ইনফরমেশনগুলো খুব প্রয়োজন। অ্যাডমিশন হয়ে গেলেই রোগীকে আমরা সিসিইউতে নিয়ে যাব। দেরি হলে সেখানে বেড খালি নাও পাওয়া যেতে পারে। তখন প্রবলেম হবে।’
লোকটির তাড়ার কারণে ঘাড় গুঁজে দ্রুত আইপিডিতে ফরমটা ফিলআপ করতে থাকে আইরিন। মাঝে মাঝে মাথা তুলে কাউন্টারের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে লোকজনের ফরম জমা দেওয়ার কার্যক্রম দেখছে সে। সবাই ফরম জমা দেওয়ার সময় ব্যাগ থেকে নগদ টাকা বের করে, আবার কেউ সাথে থাকা কার্ডের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় অর্থ জমা দিচ্ছে। টাকা গণনার মেশিনে মৃদু শব্দ হচ্ছে।
টাকা বুঝে পেয়ে সিল মেরে প্রত্যেক রোগীর জন্য আলাদা ফাইল তৈরি করে অল্প সময়ের মধ্যেই হাতে তুলে দিচ্ছে আইপিডিতে কাজ করা স্যুট-কোট-প্যান্ট পরা নারী-পুরুষগুলো। রোগীর আত্মীয়-স্বজন সেই ফাইল হাতে নিয়ে ছুটে যাচ্ছে ইমার্জেন্সির দিকে, যেখানে হাসপাতালে ভর্তির অপেক্ষায় তাদের রোগী শুয়ে কিংবা বসে অপেক্ষা করছে। অসুস্থ বাবার নানা তথ্যের বিবরণ ফরমে লিখতে লিখতে আইরিন ভাবতে থাকেÑআইপিডিতে ফরমটি জমা দেওয়ার সময় সেখানকার দায়িত্ব পালনরত লোকটি টাকা জমার কথা বলবে নিশ্চয়ই। তখনকার পরিস্থিতি কী হবেÑভাবতে গিয়ে তার হাতের কলমটি আর যেন চলতে চায় না। সামনে কিছু দেখতে পায় না সে। দু’চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে।
দুটি চোখ পানিতে ভরে উঠেছে। দুয়েক ফোঁটা ফরমের ওপরও পড়েছে। সব বোধশক্তি হারিয়ে ফেলেছে আইরিন। লোকটির তাড়ার কারণে নির্ধারিত জায়গায় স্বাক্ষর করে দিতেই লোকটি ফরমটি তার হাত থেকে নিয়ে আইপিডি কাউন্টারে জমা দিতে দ্রুত ছুটে যায়। হা করে তাকিয়ে থাকে আইরিন। চোখের সামনে কী ঘটছে, সে সম্পর্কে ধারণা করতে পারে না। সে শুধু ভাবছে, এই হাসপাতালে তার অসুস্থ বাবাকে ভর্তি করাতে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা প্রয়োজন। তাদের তো টাকা জোগাড় হয়নি। টাকা ছাড়া তো কিছুই হবে না এখানে। শুধু শুধু সে রোগী হিসেবে তার বাবার বিভিন্ন তথ্য উল্লেখ করে এই ফরম ফিলাপ করেছে। অনর্থক এখানে সময় নষ্ট করছে তারা। তার চেয়ে অসুস্থ বাবাকে নিয়ে বাসায় ফিরে যাওয়াটাই ভালো।
এখানে অপমানিত হওয়ার কোনো মানে হয় না। এসব কথা ভেবে ভেবে মনটা তখন অনেক কষ্ট আর বেদনায় ভারী হয়ে উঠতে থাকে।