পি এম শরিফুল ইসলাম

বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম। হঠাৎ কপালে কারো স্পর্শে জেগে উঠলাম। ঘুমের ঘোরে মনে হলো, পরিচিত স্পর্শ। জেগে দেখি বুকের ওপর বই। কপাল ঘেমে আছে। লোডশেডিং চলছে তাই। পাশে দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসছে ফাতিমা। ওর ওড়না দিয়ে আমার কপালের ঘাম মুছে দিতে দিতে বলল,

এই ভরদুপুরে কেউ এভাবে ঘুমায়? জোহরের আজান হয়েছে সেই কখন! দ্রুত অযু সেরে মসজিদে যান।

আমি ফাতিমার মায়াবী মুখাবয়বের দিকে তাকিয়ে রইলাম। আর আল্লাহর নিকট শুকরিয়া আদায় করলাম আলহামদুলিল্লাহ! তিনি আমাকে এমন একজন নেককার জীবনসঙ্গিনী উপহার দিয়েছেন।

পরক্ষণেই শোয়া থেকে উঠে অজু সেরে মসজিদের উদ্দেশে রওনা হলাম। যেতে যেতে দুআ পড়তে লাগলাম।

“হে আমাদের রব! আমাদের নিজেদের স্ত্রীদের ও সন্তানদেরকে চক্ষু শীতলকারী বানাও এবং আমাদের করে দাও মুত্তাকীদের ইমাম।”

(সূরা ফুরকান: ৭৪)

ফাতিমা আমার প্রিয়তমা স্ত্রী। আমার অর্ধাঙ্গিনী। আমার জন্য তার যত্ন-আত্তির কোনো শেষ নেই! সারাক্ষণ আমাকে নিয়ে তার ভাবনারও কোনো সমাপ্তি নেই। কীভাবে আমাকে খুশি করবে, কোন খাবারটা আমার পছন্দ, কোন পাঞ্জাবিটা পড়লে আমাকে সুন্দর দেখায়, অফিসে যাবার সময় দুআ করে দেয়া— আমার জীবন ও সময় জুড়ে যেন সে থাকবেই।

আমি মাঝে মাঝে ভাবি, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ’লা আমাকে এমন একজন দ্বীনদার সহধর্মিণী দান করেছেন, যার চেহারার দিকে তাকালে দু’চোখ শীতল হয়ে যায়। অফিস থেকে ক্লান্ত শরীরে বাসায় ফিরলে ও যখন দরজা খুলে মুচকি একটা হাসি দেয়, তখন যেন আমার সকল ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। রুমে ঢুকে ফ্যান ছেড়ে খাটে বসা মাত্রই আমার জন্য এক গ্লাস ঠান্ডা লেবু শরবত নিয়ে আসে।

ও আমাকে এতটাই ভালোবাসে আলহামদুলিল্লাহ!

আজ ছুটির দিন হওয়ায় অফিস বন্ধ। সকাল থেকে বই পড়েই সময় কাটছে। অবশ্য মাঝখানে ওকে রান্নাবান্নার কাজে সহযোগিতা করেছিলাম।

নামায শেষ করে বাসায় আসলাম। ফাতিমা আমার জন্য দুপুরের খাবার বেড়ে বসে আছে। দেখলাম, খাবার টেবিলে হরেক রকম সুস্বাদু খাবারের আইটেম। বললাম, কী ব্যাপার, এত তাড়াতাড়ি এতসব আয়োজন আজকে?

তেমন কী আর করলাম? আপনার প্রিয় লাউশাক ভাজি, মাছের ভর্তা, চিংড়ি দিয়ে লাউ তরকারি, মুরগির রোস্ট, টেংরা মাছের ঝোল, মাসকলাই ডাল আর হাঁসের ডিম ভুনা রান্না করলাম। ব্যস, এতটুকুই তো!

আদুরে কোমল কণ্ঠে জবাব দিল ও।

আমি চাপা হাসি দিয়ে খাবার টেবিলে বসতে বসতে বললাম,

ছয় আইটেম! বলছো, এতটুকুই? মাশাআল্লাহ!

ফাতিমা আমার পাতে খাবার বেড়ে দিয়ে বলল,

আচ্ছা হয়েছে, এবার খাওয়া শুরু করুন তো। খাবার ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন অফিসে কী খান না খান, সপ্তাহে এই একদিনই তো ভালো-মন্দ কিছু রান্না করার চেষ্টা করি আমার প্রাণাধিক প্রিয় সোয়ামীর জন্য!

ফাতিমার এমন আদরমাখা, মায়ামোহ সুরে কথাগুলো শুনতে আমার দারুণ ভালো লাগে।

আমার প্লেটে ভাত-তরকারি দিয়ে ও নিজেও প্লেট হাতে নিলো। আমি বাম হাত দিয়ে ওর ডান হাতটা ধরে থামিয়ে দিলাম।

আলতো হেসে বললাম,

আজকে আমরা একসাথে এক প্লেটে খাবো।

আমার কথা শুনে ফাতিমা খানিকটা লজ্জা পেয়ে মিটিমিটি হাসতে লাগল। আমি ওর পাশে গিয়ে বসলাম। ভাত-তরকারি মেখে লোকমা দিয়ে খাইয়ে দিলাম। ও-ও আমাকে খাইয়ে দিতে লাগল।

মুরগির একটা রান পাতে তুলে নিয়ে বললাম,

এটা তুমি খাও।

ও রানের একটা অংশ খেয়ে প্লেটে রেখে দিল। আমি সেটা তুলে, ও যেখানে মুখ লাগিয়ে খেয়েছে আমিও সেখানটায় মুখ লাগিয়ে খেলাম এবং হাড়সহ চিবিয়ে খেতে লাগলাম।

খেয়াল করলাম, ও এবার লজ্জা পাওয়ার পাশাপাশি খানিকটা অবাকও হলো। আমি তখন আম্মাজান আয়েশা (রাঃ) ও রাসূল (সঃ)-এর একসাথে গোশত খাওয়ার সেই বিখ্যাত হাদীসটি শুনিয়ে দিলাম।

আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন,

“আমি ঋতুস্রাব অবস্থায় গোশতের হাড় খেতাম। সেটি যদি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দিতাম, আমি যেখানে মুখ লাগিয়ে খেয়েছিলাম, তিনি সেখানেই মুখ লাগিয়ে খেতেন।”

(সহীহ মুসলিম: ৫৭৯; ইবনে মাজাহ: ৬৪৩)

হাদীসটি শুনে ফাতিমা কেঁদে ফেলল। আদর করে মাথায় হাত বুলিয়ে বললাম,

আহা, কাঁদছো কেন? আমি তো হাদীস বললাম। যা সত্য, সহীহ।

আপনার মুখে হাদীসটা শুনে রাসূল (সঃ) এর কথা স্মরণ হলো। আহা! কতই না দয়ালু ও কোমল হৃদয়ের অধিকারী ছিলেন রাহমাতাল্লিল আলামিন।

শেষ বিকেলে হঠাৎ করে ঝুম বৃষ্টি শুরু হলো। আমি আসর নামাজ পড়ে এসে বারান্দায় চেয়ারে বসে বই পড়ছি। এমন সময় ফাতিমার আগমন।

সাথে ট্রেতে করে নিয়ে এলো দুই কাপ ধোঁয়া ওঠা আদা-লেবু দিয়ে লাল চা আর ওর জাদুময়ী হাতে বানানো আমার প্রিয় স্পেশাল স্যান্ডউইচ।

নাশতা খেতে খেতে ফাতিমা বলতে লাগল,

সুবহানাল্লাহ! দেখেছেন, প্রকৃতিটা আজ কত সুন্দর। গাছগাছালির সবুজের সমারোহ, অদূরে দিগন্তবিস্তৃত গ্রামের সবুজতা, রিমঝিম বৃষ্টির হৃদয়কাড়া শব্দ মহান রাব্বুল আলামিন-এর সৃষ্টি কতই সুন্দর, তাই না?

হুম, অনেক সুন্দর রবের সৃষ্টি। এখন তো বৃষ্টি হচ্ছে। আসো, আমরা দুআ করি।

আমার কথা শুনে খানিকটা অবাক হলো ফাতিমা।

কেন? এখন দুআ করার মাঝে কি আলাদা কোনো ফজিলত আছে নাকি?

আমি ওর কাঁধে হাত রেখে মোলায়েম কণ্ঠে বললাম,

হুম, আছে। বৃষ্টির সময় দুআ করলে সেই দুআ আল্লাহ তায়ালা কবুল করেন।

সাহল ইবনে সাদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত,

“দুইটি সময়ের দুআ প্রত্যাখ্যান করা হয় না:

(১) আজান হওয়ার সময়,

(২) বৃষ্টি হওয়ার সময়।”

(মুসনাদ আহমাদ: ১৬৫৪১; সহীহ আল-জামিদ: ৩০৭৮)

লক্ষ করলাম, খুশিতে ওর দু’চোখ ঝলমল করছে। চোখ দুটো বন্ধ করে, দু’হাত তুলে মনে মনে দুআ করতে লাগলো ও।

আমি জানি, ওর দুআর অনেকটা জুড়ে আমি আছি আমার ভালো থাকা, কল্যাণ, বারাকাহর জন্য ও দুআ করে সবসময়ই।

আজ এই বিশেষ মুহূর্তে ও আমার জন্য দুআ করবে না, তা কী হয়?

আমার প্রিয়তমার এমন দুরন্তময়, চঞ্চল, কোমল, মায়াময় চোখ আর মিষ্টভাষিণীর মুখাবয়বের দিকে তাকিয়ে আমার দু’চোখ অশ্রুতে ছলছল করে উঠল।

আমিও দু’হাত তুলে আল্লাহর নিকট ওর জন্য দুআ করতে লাগলাম

“ইয়া রাব্বুল আলামিন!

আমার সুহাসিনীকে ভালো রেখো, সুস্থ রেখো, সুখে রেখো সবসময়।

দুনিয়ার মতো জান্নাতেও আমাদেরকে একসাথে রেখো, ইয়া রব।”