গোপাল রায়

আমাদের পাড়াটা বেশ শান্ত। বিকেলে রাস্তায় ক্রিকেট খেলা, সন্ধ্যায় বেশ হইহট্টগোল হলেও রাত নামলেই নিরব হয় যেন। রাতে মাঝে মাঝে দূরের কুকুরের ডাকে নিস্তব্ধতা ভেঙে যায়। শীতকালে কুয়াশা নেমে এলে রাস্তার বাতিগুলো যেন হলুদ জোনাকির মতো ঝাপসা আলো ছড়ায়। এমন পাড়ায় বড় ধরনের কোনো ঘটনা ঘটবে এটা কেউ কল্পনাও করেনি। কিন্তু গত এক সপ্তাহে সব বদলে গেছে। কারণ হল সাইকেল চুরি।

প্রথমে হারাল রতনের সাইকেল। সে ভেবেছিল, হয়তো বন্ধুর বাড়িতে রেখে এসেছে। সারা বিকেল খুঁজে না পেয়ে শেষে কেঁদে ফেলেছিল।

দুই দিন পর নিখোঁজ হলো বাবলুর নতুন গিয়ার সাইকেল। মাত্র তিন দিন আগে তার মামা শহর থেকে এনে দিয়েছিলেন। বাবলু সাইকেলের হ্যান্ডেলে হাত রেখে বলেছিল, “এটাই আমার সবচেয়ে প্রিয় জিনিস।” সেই সাইকেলটাই উধাও। পাড়ার মানুষ তখনও বিষয়টাকে কাকতালীয় ভাবছিল। কিন্তু শুক্রবার ভোরে যখন ঘুম থেকে উঠে স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, গেট খুলে দেখি আমার সাইকেলটা নেই।

আমি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।

আমার লাল রঙের সাইকেলটা, বাবা গত জন্মদিনে কিনে দিয়েছিলেন। সামনে ছোট ঝুড়ি আর একটা চকচকে মজার ঘণ্টা। স্কুলে যাওয়ার সময় আমি ইচ্ছে করে ঘণ্টা বাজাতাম, যেন সবাই জানে, রকি আসছে!

সেই সাইকেল ছাড়া যেন আমি অর্ধেক হয়ে গেলাম। আমি দৌড়ে বাসায় গিয়ে চিৎকার করলাম,

—মা! আমার সাইকেল নেই!

মা প্রথমে ভেবেছিলেন আমি মজা করছি। কিন্তু আমার কাঁপা গলা আর চোখের পানি দেখে তাঁর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

—চুরি হয়েছে নাকি?

আমি কোনো কথা বলতে পারলাম না। শুধু মাথা নেড়ে বসে পড়লাম।

সেদিন বিকেলে পাড়ার মোড়ে জরুরি সভা বসল। সবাই উদ্বিগ্ন, কেউ রাগান্বিত, কেউ কেউ সন্দেহে ভরা। রতনের বাবা বললেন,

—এটা সাধারণ চুরি না। পরিকল্পিত চক্র।

বাবলুর বড় ভাই বলল,

—রাতে পাহারা নেই। চোরেরা সুযোগ নিচ্ছে।

একজন বললেন,

—বাইরের লোক না হলে গেটের ভেতর থেকে সাইকেল নিতে পারত না।

সন্দেহের বাতাস ছড়িয়ে পড়ল। সবাই যেন সবাইকে সন্দেহ করছে। আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলাম। পাড়ার এ জরুরি সভাতেও কোনো কাজ হলো না। আমার মাথায় একটাই নাম ঘুরছে এখন, আমার প্রিয় পুলু মামার নাম। আমি বাসায় ফিরে পুলু মামাকে ফোন করলাম।

—মামা, আমাদের পাড়ায় সাইকেল চোর চক্র!

ওপাশে পুলু মামার হালকা হাসি,

“চক্র? নাকি সুযোগসন্ধানী চোর?”

—না মামা, এক সপ্তাহে তিনটা সাইকেল গেছে!

তিনি একটু চুপ থেকে বললেন,

“ঘটনার সময়, স্থান, মিল- সব লিখে রাখ। কারণ রহস্যের উত্তর লুকিয়ে থাকে তথ্যের ভেতর।”

আমি মামার নির্দেশ মতো ডায়েরি খুললাম।

সাইকেল, কোন দিন, কয়টার সময় এবং কোথা থেকে চুরু হচ্ছে লিখলাম। যেমন,

রতনের সাইকেল চুরি হল সোমবার রাতে বাসার বারান্দা থেকে, বাবলুর সাইকেল চুরি হল বুধবার সন্ধ্যায় বাজারের দোকানের সামনে থেকে, রকি অর্থাৎ আমার সাইকেল চুরি হল শুক্রবার ভোর রাতে বাসার গেটের ভেতর থেকে।

এসব শুনে মামা বললেন,

“দেখ, সময় আলাদা, স্থান আলাদা। কিন্তু একটি মিল আছে- সাইকেলগুলো এমন জায়গা থেকে নেওয়া হয়েছে যেখানে কয়েক মিনিট নজরদারি না থাকলেই সুযোগ তৈরি হয়। চোর পর্যবেক্ষণ করছে।”

আমার বুক কেঁপে উঠল। আমি মামাকে বললাম,

—মানে সে আমাদের পাড়ায় ঘোরে?

“অবশ্যই,” মামা বললেন। “চোর দূর থেকে আসে না। সে আশপাশেই থাকে বা নিয়মিত আসে।”

সেদিন সন্ধ্যায় আমি মোড়ে বসে ছিলাম। মন খারাপ। হঠাৎ দেখি, এক ভ্যানগাড়ি যাচ্ছে। তাতে পুরোনো লোহার জিনিস; ভাঙা ফ্যান, মরিচা ধরা রড, ছেঁড়া চুলা এসব।

ভ্যানওয়ালা জোরে ডাকছে, “পুরান লোহা বিক্রি করেন...... এই লোহা......!”

হঠাৎ আমার চোখ আটকে গেল। ভ্যানের নিচে লুকানো একটা লাল রঙের ফ্রেম। আমার হৃদপিণ্ড ধড়ফড় করতে লাগল। এটা কি আমার সাইকেলের রং? আমি দৌড়ে ভ্যানের দিকে গেলাম। কিন্তু ভ্যান তখন গলি পেরিয়ে অদৃশ্য।

আমি হাঁপাতে হাঁপাতে ফোন করলাম পুলু মামাকে।

—মামা, একটা ভ্যানৃ পুরোনো লোহাৃ লাল ফ্রেমৃ

তিনি শান্ত গলায় বললেন—

“কাল ভোরে উঠে দেখ, ভ্যান কোথা থেকে আসে। চোর সবসময় নিজের ঘাঁটিতে ফিরে যায়।”

পরদিন ভোরের আগেই আমি বের হলাম। কুয়াশা এত ঘন যে রাস্তার বাতি ঝাপসা। হঠাৎ দূরে চাকার কর্কশ শব্দ। আমি দেয়ালের আড়ালে লুকিয়ে দেখলাম, সেই ভ্যান। আমি নিঃশব্দে অনুসরণ করতে লাগলাম। ভ্যানটা আমাদের পাড়া পেরিয়ে পুরোনো বাজারের দিকে গেল। সেখানে এক পরিত্যক্ত গুদামঘর, বহুদিন বন্ধ, ভাঙা টিনের ছাদ, জং ধরা গেট খুলে ভ্যান ঢুকে গেল ভেতরে। আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল। আমি আবার পুলু মামাকে ফোন করলাম,

—মামাৃ গুদামঘর!

মামা দৃঢ় গলায় বললেন,

“একলা ঢুকবি না। চোরের চেয়ে সাহসী হওয়া ভালো, কিন্তু বোকা হওয়া নয়। পুলিশে খবর দে।”

কিছুক্ষণের মধ্যে বাবা, পাড়ার কয়েকজন, আর পুলিশ এসে গেল। আমার বুক ধড়ফড় করছে।

গুদামের দরজা ঠেলে খোলা হলো। ভেতরে ঢুকে আমরা যা দেখলাম, ডজন ডজন সাইকেল।

স্কুলের, গিয়ার, ছোটদের, বড়দের সারি সারি সাজানো সাইকেল। যেন সাইকেলের কবরস্থান।

আর কোণায় দাঁড়িয়ে সেই ভ্যানওয়ালা। সে পালাতে গিয়ে ধরা পড়ল।

পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেল, সে একা নয়। শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে সাইকেল চুরি করে পুরোনো লোহা হিসেবে বিক্রি করত। কম দামে বিক্রি হওয়ায় কেউ সন্দেহ করত না। পরে সেগুলো ভেঙে যন্ত্রাংশ আলাদা করে বিক্রি করা হতো। এসব শুনে আমার বুক কেঁপে উঠল। আর একটু দেরি হলে আমার সাইকেলটাও হয়তো টুকরো টুকরো হয়ে যেত। কোণায় দাঁড়িয়ে ছিল আমার লাল সাইকেল। আমি দৌড়ে গিয়ে ঘণ্টা বাজালাম।

টিং টিং

শব্দটা যেন আমার বুকের ভেতর প্রতিধ্বনিত হলো। মনে হলো, আমার হারানো বন্ধু ফিরে এসেছে।

পাড়ার সবাই আমাকে বাহবা দিল।

রতনের বাবা বললেন,

—রকি না থাকলে আমরা কিছুই বুঝতাম না।

বাবলু এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল। পুলিশের একজন এসে আমাকে বলল, “ওয়েল ডান মিস্টার রকি”।

আমি পুলু মামাকে ফোন করলাম। মামা হাসলেন আর বললেন,

“চোর যতই চতুর হোক, যুক্তি তার চেয়েও বেশি শক্তিশালী।”

আমি সাইকেলে চড়ে বাড়ির দিকে ফিরছিলাম। বাতাস মুখে লাগছে। সূর্য উঠছে। পাড়াটা আবার শান্ত। আমার মনে হলো, আমি শুধু সাইকেল পাইনি, সাহসও পেয়েছি আর বুঝেছি ছোট মানুষও বড় কাজ করতে পারে।