আব্দুস সালাম
ময়নার সংসার গড়ে উঠেছিল দারিদ্র্যের মাটিতে, তবু সেই মাটির ফাটল ভেদ করেই আলো বেরোত। টালির চালের ঘর, মাটির উঠোন, ভাঙা খাট আর দুখানা কাঠের চেয়ার সব মিলিয়ে অভাবের চিহ্ন স্পষ্ট; অথচ সেই ঘরের ভেতরে ছিল হাসির উষ্ণতা। দশ বছরের দাম্পত্যে তিনটি সন্তান দুটি ছেলে আর একটি মেয়ে, ময়নার বুকজুড়ে ছিল আশার মতো। তারা যেন জীবনের কঠিন পথে হাঁটার জন্য সৃষ্টিকর্তার দেওয়া তিনটি প্রদীপ।
স্বামী দিনমজুরি করতেন। ভোরে বেরিয়ে সন্ধ্যায় ফিরতেন হাতে যা আসত তাই নিয়ে। কখনো আলু-লবণ, কখনো একমুঠো শাক। ময়না সেই সামান্য উপকরণেই এমন যত্নে রান্না করত যে পাঁচজনের মুখে হাসি ফুটত। চাল কম ছিল, ভালোবাসার অভাব ছিল না। অর্থ কম ছিল, হতাশা তখনও দরজায় কড়া নাড়েনি।
হতাশা এলো একদিন আচমকা। নির্মম এক দুর্ঘটনায় স্বামীর মৃত্যু হলো। যে মানুষটি সকালে হাসিমুখে বেরিয়েছিল, সন্ধ্যায় আর ফিরল না। শোকের সঙ্গে সঙ্গে নেমে এলো অনিশ্চয়তার অন্ধকার। ময়নার চোখের সামনে যেন সবকিছু ধসে পড়ল ঘর, ভরসা, ভবিষ্যৎ।
বাবার বাড়ি ছিল না; শৈশবেই বাবা-মা দুজনকেই হারিয়েছে সে। আত্মীয়স্বজনও এগিয়ে এলো না। শেষ ভরসা ছিল ছোট বোনের সংসার। বোনের স্বামী কুদ্দুস চুপচাপ স্বভাবের মানুষ। চায়ের ছোট্ট দোকান চালিয়ে কোনোরকমে নিজের পরিবার টানেন। নিজের সংসারেই যেখানে টানাটানি, সেখানে আরেকটি পরিবার নেওয়া সহজ কথা নয়।
তবু একদিন কুদ্দুস ধীরে বলেছিলেন, “কষ্ট আছে, ময়না। কিন্তু ঘর তো ঘরই। দরকার হলে আমার এখানে থাকিস।
ময়না সেদিন কিছু বলেনি। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল। সেই নীরবতায় ছিল কৃতজ্ঞতার ভাষা, কিন্তু কৃতজ্ঞতা দিয়ে সন্তানের পেট ভরে না। তাই শেষপর্যন্ত ময়নাই রোজগাড়ে নেমে পড়ে। কখনো ঝাড়ুদারের কাজ, কখনো মাটিকাটার কাজ, কখনো আবার গৃহকর্মীর কাজ। মানুষের বাড়িতে কাজ করে যা পেত, তা দিয়ে কোনোরকমে ময়নাদের দিন চলত। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার খরচ তো দূরের কথা, ঠিকমতো খাওয়াটাও জুটত না। বড় ছেলে বাশার তখন আট বছরে পা দিয়েছে। চোখে তার বয়সের তুলনায় বেশি দায়িত্বের ছাপ। কখনো মাকে দেখে চুপচাপ বসে থাকত যেন না বলেও বলছে, “আমি বড় হলে সব ঠিক করে দেব। দিনের পর দিন ক্লান্তি আর দুশ্চিন্তায় ময়নার শরীর ভেঙে পড়ল। একদিন কাজে গিয়ে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে সে। হাসপাতালে সাদা দেয়ালের ভেতরে শুয়ে বুঝতে পারল শরীরের চেয়ে মনটাই বেশি ক্লান্ত।
চিকিৎসক নরম গলায় বলেছিলেন, “একলা লড়াই করলে মানুষ ভেঙে পড়ে। ভালো থাকার জন্য কারোর সাহায্য চাইতে লজ্জা নেই।
কথাগুলো ময়নার মনে গেঁথে গেল। তবু সে চাওয়া শিখতে পারল না। রাতে বাচ্চারা ঘুমিয়ে পড়লে সে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকত। কষ্টের ভার তার মনে এমনভাবে জমে উঠেছিল যে সে প্রায়ই বলত আর পারছে না। কিন্তু তার কথাগুলো কেউ সময়মতো গুরুত্ব দেয়নি।
একদিন সেই নীরবতাই সর্বনাশ ডেকে আনল। অসহনীয় মানসিক চাপের কাছে হার মেনে ময়না নিজের জীবন শেষ করে দিল। কোনো বিদায় ছিল না, শুধু তিনটি শিশুর জীবনে নেমে এলো শূন্যতার ভার। সেদিন প্রমাণ হয়ে গেল মানুষ একা পড়ে গেলে সবচেয়ে ভয়ংকর শত্রু হয়ে ওঠে তার নিজের ক্লান্ত মন। নিজের সুখের জন্য ময়না আত্মহত্যাকেই উত্তম পন্থা বলে মনে করলো। সন্তানদের ভবিষ্যৎকে তুচ্ছ মনে সে পরপারে পাড়ি জমায়।
শেষপর্যন্ত ময়নার তিন সন্তানের আশ্রয় জুটল কুদ্দুসের ঘরে। চায়ের ছোট্ট দোকান, সামান্য আয় জেনেও কুদ্দুস পিছু হটেনি। বুক শক্ত করে বাচ্চাগুলোকে নিজের সংসারের সঙ্গে জুড়ে নিল। রাতে দোকান বন্ধ করে সে চুপচাপ বসে থাকত; চোখে ক্লান্তি, তবু ভাঙন নেই।
এই খবর একদিন প্রশাসনের কানে পৌঁছাল। জেলা প্রশাসক নিজে এলেন। তিনটি শিশুর দিকে তাকিয়ে তাঁর চোখ ভিজে উঠল। কুদ্দুসের সঙ্গে কথা হলো। নরম গলায় তিনি বললেন, “এই পরিবারটা শুধু আপনার নয়, সমাজেরও দায়। আপনার অনুমতি থাকলে আমরা বাচ্চাদের পড়াশোনা আর খাবারের দায়িত্ব নিতে চাই।
কুদ্দুস কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। মাটির দিকে তাকিয়ে থেকে দৃঢ়কণ্ঠে বললেন, “স্যার, কষ্ট আছে। তবু বাচ্চাগুলো আমারই রক্তের মতো। সাহায্য নেব, কিন্তু ভাঙব না। ওদের মানুষ করার দায়িত্ব আমার হাতেই রাখতে চাই।
জেলা প্রশাসক মাথা নাড়লেন। “এই ভরসাটাই দরকার ছিল। সাহায্য মানে আলাদা করা নয়, পাশে থাকা।
পরদিন থেকেই প্রশাসনের সহায়তায় ওদের ভাগ্য বদলাতে শুরু করে। বাশার স্কুলে ভর্তি হলো। খরচের একাংশ এল সহায়তা থেকে, বাকিটা কুদ্দুস নিজের ঘাম দিয়ে জোগালেন। পাড়ার লোকজন পাশে দাঁড়াল। কেউ পুরোনো বই দিল, কেউ জামা। ময়নার বোনের মনও নরম হলো; অভাবের রাগ গলতে শুরু করল মমতায়। দিন গড়াল। সংসারে সচ্ছলতা আসেনি, কিন্তু স্থিরতা এসেছে। রাতে বাশার বই হাতে পড়ত। কুদ্দুস দোকান বন্ধ করে বসে শুনতেন। তখন তাঁর মনে হতো জীবন কঠিন হলেও দায়িত্ব ছেড়ে পালানো কোনো সমাধান নয়।
ময়নার প্রদীপ নিভে গেছে; কিন্তু তার আলো পুরোপুরি অন্ধকারে মিশে যায়নি। সেই আলো আজ তিনটি শিশুর চোখে, কুদ্দুসের নীরব দায়িত্বে, আর সমাজের শেখা পাঠে জ্বলে আছে।
যদি কেউ সেদিন ময়নার ক্লান্ত কথাগুলো গুরুত্ব দিয়ে শুনত, যদি কেউ বলত “একটু দাঁড়াও, আমরা আছি তবে হয়তো তিনটি শিশুকে এত বড় শূন্যতার ভার বইতে হতো না। এই বোধই পাড়ার মানুষকে বদলে দিল। কেউ বেশি চুপ থাকলে, কেউ ভেঙে পড়লে এক কাপ চা নিয়ে পাশে বসত। কথা না হলেও উপস্থিতিটুকু থাকত। সবাই বুঝে গেল কষ্ট লুকিয়ে রাখা শক্তি নয়; কষ্ট ভাগ করে নেওয়াই সাহস।
একদিন স্কুলে শিক্ষক বাশারকে বলেছিলেন, “দুঃখ মানেই শেষ নয়। শেষ হয় তখনই, যখন মানুষ কথা বলা বন্ধ করে দেয়।
বাশার সেই কথা মনে বেঁধে নিল। সে শিখল নিজে ভাঙলে সাহায্য চাইতে হয়, আর অন্যকে ভাঙতে দেখলে হাত বাড়াতে হয়। কারণ আত্মহত্যা কোনো সমাধান নয়; এটি শুধু যন্ত্রণাকে অন্যের কাঁধে তুলে দেয়।
ময়নার গল্প তাই কেবল এক মায়ের পরাজয়ের গল্প নয়; এটি সমাজের জন্য এক সতর্কবার্তা। যে সমাজ কষ্ট দেখেও চুপ থাকে, সে সমাজই অনিচ্ছাকৃতভাবে মৃত্যুর পথ প্রশস্ত করে। আর যে সমাজ সময়মতো কথা বলে, পাশে দাঁড়ায়, সাহায্যের হাত বাড়ায় সেই সমাজই জীবন বাঁচায়।