হানিফ ওয়াহিদ
ড্রয়িংরুমে বসে টিভি দেখছি। দূরসম্পর্কের ভাতিজা রফিক এসে হাজির । হাতে এক কেজি মিষ্টির প্যাকেট। সালাম দিয়ে বলল, কেমন আছেন চাচা?
আমি সালামের জবাব দিয়ে বললাম, ব্যাপার কী রফিক? তুমি হঠাৎ কী মনে করে? এদিকে তো তুমি আসোই না,,,,
রফিক আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে মিষ্টির প্যাকেট খুলে একটা মিষ্টি আমার মুখের সামনে ধরে বলল, হা করেন তো চাচা।
আমি হা করতে দেরি, মুখে মিষ্টি ঢোকাতে দেরি নাই।
আমি উম উম করে মিষ্টি চাবাতে চাবাতে বললাম, ফাইন মিষ্টি। বেশ সুস্বাদু। হঠাৎ মিষ্টি কেন?
সে জোর করে আরেকটা মিষ্টি আমার মুখে ঢুকিয়ে দিয়ে সামনে রাখা টি টেবিল থেকে একটা টিস্যু নিয়ে হাত মুছতে মুছতে বলল, বাজারে একটা কনফেকশনারি দোকান দিব। আগামীকাল উদ্বোধন হবে। আসলাম আপনার দোয়া নিতে।
আমি ঠোঁটে লাগা মিষ্টির রস জিভ দিয়ে চাটতে চাটতে বললাম, মাশাল্লাহ, মারহাবা। অবশ্যই তোমার জন্য দোয়া করি। তুমি আমাদের বংশের ছেলে। আমাদের গৌরব।
আগামীকাল বাদ আছর দোকান উদ্বোধন হবে। আপনি কিন্তু অবশ্যই উপস্থিত থাকবেন, চাচা।
অবশ্য অবশ্যই থাকবো। আরে, তুমি আমাদের বংশের ছেলে না!
রফিক হাত কচলাতে কচলাতে বলল, ইয়ে চাচা, একটা কথা বলতে চাইছিলাম।
আমি তার পিঠে হাত রেখে বললাম, আরে কী বলবে বল। সংকোচ কর কেন? আমি কি তোমার পর?
সেটাই তো চাচা, আপনি তো আর পর নন, আপনাকে বলাই যায়। ইয়ে চাচা, কালকে তো দোকান উদ্বোধন হবে, কিছু টাকা সর্ট হয়ে গেছে। কিছু টাকার জন্য মাল তুলতে পারছি না। যদি ঘরে থাকে,,,,আমি এক সপ্তাহ পরই ফিরিয়ে দিব।
কত টাকা দরকার?
সামান্যই চাচা, হাজার পঞ্চাশ হলেই হয়ে যায়।
আমি ভিতরে গিয়ে গিন্নিকে বিষয়টা জানালাম। গিন্নি সব শুনে বলল, কতজনকেই তো টাকা ধার দিয়েছো, কেউ তো ঠিক সময়ে ফেরত দেয় নাই।
আমি মাথা চুলকাতে চুলকাতে বললাম, তা ঠিক, কী করা যায় বল তো?
গিন্নি কিছুক্ষণ ভেবে বলল, বাড়িতে মিষ্টি নিয়ে এসেছে, না করবে কীভাবে? চিন্তা করে দেখো,,,,
সেটাই। তাছাড়া রফিক আমাদের বংশের লোক। আউল ফাউল বংশের লোক হলে না হয় কথা ছিল। আমাদের বংশের একটা ইজ্জত আছে না?
আমি আলমারি খুলে পঞ্চাশ হাজার টাকার কচকচে একটা বান্ডিল রফিকের হাতে তুলে দিলাম। টাকা পেয়ে রফিক টুস করে আমার পায়ে সালাম করে বলল, এই তল্লাটে যদি একটাও ভালো মানুষ থাকে, সেটা আপনি। টেনশন নিবেন না, চাচা। আমি এক সপ্তাহ পরই আপনার টাকা ফেরত দিয়ে যাবো। আর হ্যাঁ, আগামীকাল কিন্তু আপনি অবশ্যই থাকবেন। বাদ আছর মিলাদ। মনে থাকবে তো চাচা?
রফিকের আদব লেহাজ দেখে মনটা ভরে গেল। আমি তার মাথায় হাত রেখে দোয়া দিতে দিতে বললাম, অবশ্যই যাবো। অবশ্যই।
পরদিন তার দোকান উদ্বোধন করে আবার একটা মিষ্টি খেয়ে এলাম।
এক সপ্তাহ গেল, দুই সপ্তাহ গেল, মাসও পার হয়ে গেল, রফিক টাকার কথা মুখে আনে না। আমি প্রায়ই সকাল বেলা হাঁটতে বের হই, ইচ্ছে করেই রফিকের দোকানের সামনে দিয়ে যাই, যদি আমাকে দেখেও টাকার কথা মনে পড়ে।
এভাবে কেটে গেল তিন মাস।
তিন মাস পর একদিন রফিকের দোকানে গিয়ে হাজির হলাম। দোকানে প্রচুর বেচাকেনা হচ্ছে। অনেক কাস্টমার। রফিক লম্বা একটা সালাম দিয়ে টুল এগিয়ে দিল বসার জন্য। আমি বসে থেকে কিছুক্ষণ উসখুস করে চলে আসার সময় বললাম, ইয়ে রফিক, আমার টাকাটা,,,
রফিক আমার কথা শেষ করতে না দিয়েই বলল, চাচা, টেনশন নিবেন না। আগামী সপ্তাহে দিয়ে দিব। আমি খুশি মনে বের হয়ে আসলাম। দিক, এক সপ্তাহ পর দিলেও আমার সমস্যা নাই।
এরপর কেটে গেছে আরও দুই মাস।
দুই মাস পর এক রাতে রফিক বাসায় এসে হাজির। যাক, দেরিতে হলেও তাহলে টাকা পাচ্ছি। সে সাথে করে একটা ছোট ব্যাগ নিয়ে এসেছে। ব্যাগে হাত দিতেই খুশিতে আমার মন নেচে উঠল, অবশেষে টাকা পাচ্ছি।
ব্যাগ থেকে টাকা বের হল না, বের হল দাওয়াতের কার্ড। সে কার্ডটা আমার হাতে দিতে দিতে বলল, ইয়ে চাচা, হঠাৎ করে আয়োজন। আগামী শুক্রবার আমার বিয়ে। আপনি কিন্তু চাচীকে নিয়ে অবশ্যই থাকবেন। আমি বিগলিত হাসি দিয়ে বললাম, অবশ্যই থাকবো, অবশ্যই।
রফিক আমাকে আর কথা বলার সুযোগই দিল না। বেরিয়ে গেল।
এক শুক্রবার গিয়ে রফিকের বিয়ের দাওয়াত খেয়ে এলাম। এরপর কেটে গেছে আরও তিনমাস।
বিয়ের তিনমাস পর আবার একদিন রফিকের দোকানে গেলাম। দোকানে প্রচুর ভিড়। ঠিক মতো কথা বলা যায় না। একথা সে কথার পর টাকার কথা তুললাম। রফিক বিরক্ত গলায় বলল, এইটা আপনার কেমন বিবেচনা বলেন তো চাচা? সবেমাত্র বিয়ে করলাম,,,,কত খরচ,,,
আমি আমার ভুল বুঝতে পেরে জিভ কেটে বললাম, অবশ্যই, অবশ্যই। দিও তুমি, কয়দিন পরই দিও।
রফিকের বিয়ের সাত মাস পেরিয়ে গেছে।
একদিন রফিকের সাথে দেখা। বউকে নিয়ে রিকশায় চড়ে কোথাও যাচ্ছে। আমাকে দেখেও না দেখার ভান করে চলে যাচ্ছে। আমি ডাকলাম, এই রফিক, এই,,,,
রফিক বিরক্ত মুখে রিকশা থামালো। ইদানীং লক্ষ করছি, এখন আর আমাকে দেখে সে সালাম দেয় না। আমি বললাম, যাও কই?
সে বিরক্তি লুকিয়ে বলল, বউকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাচ্ছি চাচা। আপনার বউমা পোয়াতি। দোয়া করবেন।
আমি বললাম, অবশ্যই দোয়া করি। আচ্ছা যাও। সাবধানে যেও।
এরও পাঁচ মাস পর আবার তার দোকানে গেলাম। ইদানীং সে আমাদের মহল্লায় আর আসে না। সে দূর থেকে আমাকে দেখেই বলল, ভাবছিলাম এই মাসেই আপনার টাকাটা দিয়ে দিব। কিন্তু আপনাদের বউমার সিজারে বাচ্চা হয়েছে। কীভাবে টাকা দেই বলেন। টেনশন নিয়েন না, দেখি আগামী মাসে পারি কি-না!
আমি হতাশ হয়ে ফিরে এলাম। এর কিছুদিন পরই খবর পেলাম, সে আরেকটা কনফেকশনারি দোকান নিয়েছে। সেই দোকানে তার শালাকে বসিয়েছে।
এরও এক বছর পর একদিন হঠাৎ করে আমার পুরনো ফ্রিজটা নষ্ট হয়ে গেল। গিন্নি বলল, এতো পুরানো ফ্রিজ ঠিক করে লাভ নাই। দুইদিন পর আবার নষ্ট হয়ে যাবে। তারচেয়ে বরং নতুন ফ্রিজ কিনে আনাই ভালো। ব্যাপারটা আমারও পছন্দ হল। কিন্তু হাত একদম খালি। ঘরে টাকা নাই। এদিকে ব্যবসায় লস খেয়ে বসে আছি। পাওনাদার তাগাদা দিচ্ছে।
গিন্নি তীর্যক ব্যাঙ্গ করে বলল, তোমার বংশের গৌরব ভাতিজা রফিককে বলে দেখ, টাকাটা দেয় কি-না। খুব তো গৌরব করছিলা!
আমার যেতে ইচ্ছে করল না। ইদানীং রফিকের ওখানে গেলে পাত্তা দেয় না। ভিখারির মতো দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। প্রশ্ন করলে হু হা করে উত্তর দেয়। বেশিরভাগ কথা শুনেও না শোনার ভান করে। এমন চোখে তাকায়, মনে হয় আমি ভয়ংকর অপরাধী!
আমি রফিককে ফোন দিলাম।
পাঁচ ছয়বার দেওয়ার পর সে বিরক্ত হয়ে ফোন ধরল। রাগান্বিত গলায় বলল, মাত্র পঞ্চাশ হাজার টাকার জন্য এতো তাগাদা দেওয়া লাগে? মনে হয় যেন কোটি কোটি টাকা পাইবেন আমার কাছে। টাকা হাতে থাকলে আমি আপনার টাকা দিতাম না?
আমি কাচুমাচু গলায় বললাম, রফিক, আমার ফ্রিজ নষ্ট হয়ে গেছে। একটা নতুন ফ্রিজ,,,,
আরে রাখেন আপনার ফ্রিজ। এই দোকান বাদ দিয়ে নতুন বড় একটা দোকান নিছি, সেই দোকানে মাল তুলতে পারছি না। টাকার জন্য আমার কুত্তা পাগল অবস্থা, আপনি আছেন ফ্রিজ লইয়া। টাকা লইয়া কবরে যাইবেন? জীবনে বহুত খারাপ মানুষ দেখছি, আপনার মতো খারাপ মানুষ জীবনেও দেখি নাই। দুই একদিন পর পরই তাগাদা দেওয়া লাগে? যান, টাকা হইলে আমি নিজে গিয়ে দিয়ে আসবো। আর তাগাদা দিতে আইসেন না।
রফিকের কথা শুনে আমার পায়ের নিচের মাটি যেন সরে যেতে লাগল। হঠাৎ অসুস্থ বোধ করা শুরু করলাম। ফোন রাখতে রাখতে ক্লান্ত গলায় বললাম, ঠিকই বলছো রফিক। আমি আসলেই একজন খারাপ মানুষ।