শফিকুল আলম টিটন
বস্তাটা ভালভাবে কাঁধে নিয়ে এগিয়ে গেলো সামনে। পরনে পুরনো ময়লা একটা জামা। সামনের দিকে সেলাই খুলে গিয়ে হা হয়ে আছে। শীতে জবুথবু। তবু বাম হাত দিয়ে নাকের সিকনি মুছে এগিয়ে গেলো সামনে। করার কিছুই নেই। শীত নিবারণের জন্যে একটাও গরম কাপড় নেই। কনকনে শীত। যেতে যেতে চায়ের দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। খাবারের দোকান দেখলে বুঝি পেটের ভেতর চোঁ চোঁ বেড়ে যায়।
নিজেকে সামলে নিয়ে লোকটার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। টঙ দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে কেক খাচ্ছে। তার পাশে বেঞ্চে বসে আরও দুতিনজন কাস্টমার চা পান করছে আর গল্পে মেতে ওঠে। সবার দিকে একবার করে চোখ বুলিয়ে নেয়। ধীরে ধীরে পা বাড়ায় ভদ্র লোকটির দিকে। পেছন থেকে ব্লেজার ধরে টান দেয়।
একবার দুইবার তিনবার .........
হঠাৎ পেছন ফিরে তাকায় লোকটি।
-কিছু বলবি।
-আমারে একটা রুটি কিন্ন্যা দেন স্যার। আমার ক্ষুধা লাগছে। সকাল থেইক্ক্যা না খাওয়া।
-তোর নাম কি ?
- ফুলি। কাগজ টোকাই। বোতল টোকাই ।
-তোর বাবা কি করে ?
মাথা নিচু করে। মুখটা ভারি হয়ে আসে। কিছু বলে না।
-বাবা নাই ?
- বাবা চইলা গেছে।
-হুম।
-মা বাইত্তে কাম করে। আমি ভাঙ্গারি টোকাই। থাকি রহমতের বস্তিতে।
লোকটি দোকানদারের দিকে তাকিয়ে বলে, ভাই ফুলিকে একটা বনরুটি দাও।
ফুলির দিকে তাকিয়ে বলে, নে এখানে বস। বসে রুটি খা ।
দোকানদার প্যাকেট থেকে একটা বনরুটি এগিয়ে দিলো ফুলির দিকে। ফুলি হাসিমুখে রুটিটা হাতে নিয়ে খেতে শুরু করলো। একটু পড়ে উঠে গিয়ে এক গ্লাস পানি ঢেলে নেয় পানির জার থেকে। বনরুটি খেয়ে হাতে লেগে থাকা ক্রিমটুকু চেটেপুটে খেতে লাগলো। এতোটাই ক্ষুধা লেগেছিল ওর। আরেক গ্লাস পানি নিয়ে ঢক ঢক করে খেয়ে ফেললো। ডান হাত দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে তৃপ্তির হাসিতে লোকটির দিকে তাকায়।
-চা খাবি। লোকটা জানতে চায়।
হাসিমুখে সাড়া দেয় তাতে ফুলি। ভাই ওকে এক কাপ চা দাও। বিল আমি দিয়ে দেবো।
দোকানদার এক কাপ চা বানিয়ে দেয়। গরম চা। তাতে ফু দিয়ে খেতে শুরু করে। খুব মজা পায়। এতক্ষণ পরে শরীরে উষ্ণতা অনুভব করছে। শীতের আমেজ যেন কমে যাচ্ছে। খুব ভালো লাগতে শুরু করে ওর মনে। চা খাওয়া শেষ করে উঠে দাঁড়ায় ফুলি।
-যা। বাসায় চলে যা। লোকটি বলল। মাকে গিয়ে বলবি আমার কথা। তোকে যেন স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেয়। সরকারি স্কুল আছে। অনেক এনজিওর স্কুল আছে। টাকা পয়সা কম লাগে। এই নে আমার কার্ড। স্কুলে ভর্তি হতে চাইলে ফোন দিতে বলবি। আমি ভর্তি করিয়ে দেবো। মনে থাকবে ?
মুখ নেড়ে সায় দেয় ফুলি। এতো আনন্দ আজ ভাষায় প্রকাশ করতে পারছে না।
লোকটিকে সালাম দিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে যায় সামনে। ওর চোখে মুখে চাঁদের হাসি ঝরছে। আর সবার মতো স্কুলে পড়তে পারবে। স্কুল ভবনের সামনে বিশাল বড় মাঠ। ওর বান্ধবীদের সাথে কানামাছি খেলছে। ছোঁয়াছুঁয়ি খেলছে। লুকোচুরি খেলছে। স্কুলের ঘন্টা বেজে উঠতেই সবাই হইহই রইরই করে বেরিয়ে যাচ্ছে স্কুল গেট দিয়ে।
চার রাস্তার মোড়ে এসে একটু থেমে রাস্তা পার হওয়ার প্রস্তুতি নিতেই উল্টো দিক থেকে একটা বাস এসে ধাক্কা দিয়ে চলে যায়। ছিটকে পড়ে বেশ কিছু দূরে । হাতের বস্তাটা ছুটে যায় হাত থেকে। বাসটি ধাক্কা মেরেই এলোপাতাড়ি চালিয়ে সটকে পড়ে জায়গা থেকে। পথচারিরা এগিয়ে আসে। মাথা দিয়ে রক্ত ঝরতে শুরু করলো। মুখ দিয়ে ঝরতে লাগলো রক্ত। দুতিনজন রিক্সা থামিয়ে ফুলিকে কোলে তুলে নিয়ে ছুটল হাসপাতালের দিকে।
সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত ছুঁই ছুঁই। ফুলির মা ফুলিকে দেখতে না পেয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলো। খুব অল্প সময়ের মধ্যে বস্তির সব লোক জড় হয়ে গেলো।
আমার কলিজা কই ? আমার পরাণডারে কে ধইরা নিয়া গেলো। আমার ফুলিরে আমার কাছে নিয়া আয়।
গায়ের কাপরের দিকে খেয়াল নেই। পাগলের মতো ছুটতে ছুটতে বড় রাস্তায় উঠে এলো। পথচারিদের ধরছে আর জানতে চাইছে, এই যে ভাই আপনি আমার ফুলিরে দেখছেন ? দশ বছর বয়স। আমার একটা মাত্র মাইয়া।
- না দেখি নাই।
আবার ছুটতে লাগলো বড় রাস্তা ধরে আরও সামনে। ছুটতে ছুটতে চার রাস্তার মোড়ে এসে ফুটের ওপর বসে কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। মুহূর্তের মধ্যেই জটলা পেকে যায় ওখানে।
অনেকক্ষণ ধরে চায়ের দোকানদার ফলো করছিল মহিলার কান্নাকাটি। এগিয়ে এসে বলে, তুমি কান্দ ক্যা মাতারি?
চায়ের দোকানদারের দিকে তাকিয়ে বলে, ও ভাই, ভাই, আপনি চা ব্যাচেন এখানে। আমার ফুলিরে দেখছেন। দশ বছর বয়স।
হ দেখছি তো ?
দেখছেন ? অনেক কষ্টের মধ্যেও একটু আশার আলো দেখতে পায় ফুলির মা।
-কই দেখছেন ভাই ? কন না ? আমি ফুলিরে নিয়া বারিত ফিরা যামু।
এখানে একটা বাসের সাথে ধাক্কা খাইয়া পইড়া গেছে। রক্ত বাহির হইয়া গেছে।
- কি কন ভাই ? আমার ফুলি মইরা গেছে ? হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে ফুলির মা।
-হাসপাতালে আছে যাও দেইক্ষ্যা আসো। ওই দিকে হাসপাতাল ।
আমার ফুলি বাইচ্ছ্যা আছে । ঝটপট উঠে দাঁড়ায়। হাসপাতালের রাস্তা ধরে দৌড়াতে থাকে ফুলির মা।
রিসিপশনের সামনে এসে কাঁদতে কাঁদতে বলে এই যে আফা, আমার ফুলি কই ? আমার মাইয়া। বয়স দশ। চৌরাস্তায় এক্সিডেন্ট করছে। আমার মাইয়া কই।
-অজ্ঞান অবস্থায় যেই মেয়েটাকে আনা হয়েছে সেই মেয়েটা আপনার ?
-হ ম্যাডাম।
আপনি ৩ ওয়াডের ৩০ নাম্বার বেডে আছে। অইদিক দিয়ে যান।
ফুলির মা খুঁজতে খুঁজতে ৩ নাম্বার ওয়াডের সামনে এসে উঁকিঝুঁকি মারতে শুরু করেছে। ভেতরে ঢুকে পড়ে ফুলির মা। দেখে একটা চওড়া টেবিলের সামনে দুইজন নার্স আপা বসে আছে। ধীর পায়ে টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ায়। কাঁদতে কাঁদতে বলে আফা গো আমার মাইয়া কই ? আমি ফুলির মা। হের বয়স দশ বছর। ৩০ নাম্বার বেড কোনডা ? ইশারায় দেখিয়ে দেয় ফুলির মাকে। ওই যে ওই বেড। ওখানে কান্নাকাটি করবেন না। চুপচাপ বসে থাকেন। চোখ খুললে কথা বলা যাবে। এর আগে না।
-আইচ্ছা আফা।
ফুলির বেডের সামনে এসে দাঁড়ায়। মনে মনে বলে আমার মাইয়াডারে এমন ক্ষতি করলো কিডা ?
ফুলি গভীর ঘুমে অচেতন অবস্থায় পড়ে আছে। মাথার কাছে ফুলির মা চুপচাপ বসে আছে।
রাতের গভীরতা বেড়েই চলেছে। দূর মসজিদ থেকে আজানের শব্দ ভেসে এলো। ধীরে ধীরে অন্ধকার আকাশ পরিষ্কার হতে লাগলো। ফুলির মাথার কাছে তখনও ঝিমুচ্ছে ফুলির মা। পাখি ডাকতে শুরু করলো। আচানক মায়ের হাতের ওপর একটা কচি হাত এসে পড়লো। চোখ খুলতেই দেখে ফুলি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
মেয়েকে সজাগ পেয়ে মা জড়িয়ে ধরে বুকের মধ্যে। দুই চোখ দিয়ে অঝরে পানি ঝরতে থাকে অভাগা মায়ের।
-তোরে আর কাম করতে দিমু না মা ? তোর কিছু হইলে আমি বাচুম না মা ?
- মা, আমি স্কুলে পড়মু।
-আইচ্ছা মা। তুই সুস্থ হ মা, তোরে আমি স্কুলে ভর্তি করায় দিমু। তুই লেখাপড়া শিখবি মা।
আইচ্ছা মা। বলতে বলতে পায়জামার কোমরে গুজে থাকা কার্ডটা বের করে দেয় ফুলি।
-এই নাও মা। এই স্যার আমারে চা রুটি খাইতে দিছে। কইছে স্কুলে ভর্তি করায় দিব। মাগো আমরা গরীব। লেখাপড়া শিখতে পারলে তোমারে আর মাইনসের বাড়িত কাম করতে দিমু না। আমি অনেক বড় ডাক্তার হমু মা।
আইচ্ছা মা। আল্লায় যেন তোর মনের আশা পূর্ণ করে মা।
ফুলির মা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করে।
সকালের রাউন্ডে বেডের সামনে এসে দাঁড়ায় ডাক্তার। ওর চোখ টেনে হাতের নাড়ি ধরে চেক করতে করতে বলে, এখন কেমন আছো মা ?
ফুলি এক গাল হেসে বলে, খুব ভালো আছি ডাক্তার কাকু। মাকে কাছে পাইছি। আর ভয় নাই আমার।
ফুলি খুব বুঝতে পারে, এই পৃথিবীতে সবচেয়ে নিরাপদ মানুষ হল মা। ফুলি পালটা জানতে চায়, তুমি কেমন আছো কাকু। আমার কি হয়েছে ?
ডাক্তার এক গাল হেসে বলে, নাতো তোমার কিচ্ছু হয়নি মা ? তুমি এখন তোমার মায়ের সাথে বাসায় ফিরে যেতে পারো।
আইচ্ছা।
মায়ের হাত ধরে যেতে যেতে পেছন ফিরে তাকায় ও। ডাক্তার অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ফুলির দিকে। ফুলি হাত তুলে টা টা বাই বাই দেয়।
মায়ের সাথে হাসপাতাল ছেড়ে আসতে আসতে ওর মনে পড়ে গেলো স্কুলের কথা। চোখে মুখে চাঁদের হাসির জোয়ার বইছে। এই প্রথম স্কুলে ভর্তি হবার স্বপ্ন যেনো ওর দুই চোখে আনন্দের ঝিলিক খেলে যায়।