সাগর আহমেদ
টোকন মামা অনেক দিন হলো আমেরিকা গিয়েছেন। নানা কাজে সেখানে তিনি মহাব্যস্ত। টোকন মামার অনুপস্থিতিতে অপু, তিয়ান ও টিয়ানার আর দুর্দান্ত অ্যাডভেঞ্চারে যাওয়া হয় না। তাই তাদের মন খারাপ। এদিকে পটিয়ার ধীপুর গ্রামে কয়েকমাস আগে চালু হয়েছে খেলনা নগর চিলড্রেন থিম পার্ক। পার্কটি সাজানো হয়েছে হরেক রকম পশু ,পাখি, কীট-পতঙ্গের আদলে তৈরি বড় বড় যান্ত্রিক খেলনা এবং সেইসাথে মজাদার সব রাইড দিয়ে । সাথে আছে বিশাল জায়গা নিয়ে তৈরি ওয়াটার ওয়ার্ল্ড। শুধু এটাই শেষ নয়, জনপ্রতি ৫০০০টাকা প্যাকেজ টিকিটের সাথে রয়েছে দুপুরের ভরপুর মজাদার লাঞ্চ ও সফট ড্রিংকস । যারা সন্ধ্যায় আসবে তাদের জন্য রয়েছে বুফে ডিনার । এক্কেবারে এলাহী কান্ড। ধীরে ধীরে এই খেলনা নগর থিম পার্ক জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। শিশু কিশোরদের ভিড়ে পুরো পার্কটি জমজমাট। অপুদের ক্লাসমেটদের অনেককেই খেলনা নগর চিলড্রেন থিম পার্কে গিয়ে এসেছে । অনেকে তো বারবার যাচ্ছে। কি যে মজা! কি যে নেশা! টোকন মামা নেই, তাই অপুদের যাওয়া হচ্ছে না। আর একারণেই তারা মন খারাপ করে বসে আছে। হঠাৎ একদিন টোকন মামা দেশে ফিরলেন। কয়েকদিন পরেই তিনি অপুদের বাসায় এলেন। আসামাত্রই অপু, তিয়ান ও টিয়ানা টোকন মামাকে খেলনা নগরে যাওয়ার জন্য ধরে বসলো। কি আর করা ভাগ্না,ভাগ্নি বলে কথা! পরের শুক্রবার টোকন মামা অপু, তিয়ান, টিয়ানাকে নিয়ে খেলনা নগরে হাজির হলেন। চারদিকে শিশু কিশোরদের ভিড় আর ভিড় । ভিড় ঠেলে টিকিট করে ওরা খেলনা নগরে ঢুকলো। গেট পার হতেই একটা বিশাল যান্ত্রিক বাঘ দাঁড়িয়ে আছে । মাঝে মাঝেই বাঘটা হালুম হালুম করে চিৎকার করে উঠছে। বাঘের গর্জনে খেলনা নগর যেনো কেঁপে কেঁপে উঠছে। রয়েছে বিভিন্ন ধরনের রাইড। অপু, তিয়ান ও টিয়ানা প্রথমেই ম্যাজিক্যাল ভূতুড়ে ট্রেনে চড়লো। একটি সুরঙ্গে ঢুকতেই কয়েকটি কদাকার ভূত হা হা করে ভয়ংকর হাসি হেসে ওদের দিকে তেড়ে এলো। টিয়ানা ভয়ে চিৎকার করে উঠলো। কিছুক্ষণ পরে ভূতের দল অদৃশ্য হয়ে গেল। এরপর ওরা চড়লো ম্যাজিক কার্পেট, তারপর রোলার কোস্টারে। খেলনা নগরের আকাশে উড়ছে দৈত্যাকার যান্ত্রিক প্রজাপতি, ফড়িং এবং তেলেপোকা । তিয়ান ছোটবেলা থেকেই তেলাপোকা ভয় পায়। সে এতবড় তেলাপোকা দেখে আঁতকে উঠলো। টোকন মামা অনেক কষ্ট করে তিয়ানকে বুঝালেন, ওগুলোতে প্রাণ নেই, শুধুই যন্ত্র। এরপর ওরা ওয়াটার ওয়ার্ল্ডে যেয়ে দেখলো একটা পাথরের তৈরি নীল তিমি আকাশের দিকে প্রচুর পানি ছুড়ে দিচ্ছে । পানিগুলো নিচের সুইমিংপুলে যেয়ে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করছে। আর পুরনো ময়লা পানি নল দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। চমৎকার ব্যবস্থা। কিশোর দলের সদস্যরা অনেকক্ষণ সুইমিংপুলে সাঁতার কাটলো। এরপর ভেজা কাপড় বদলে ওরা দুপুরের লাঞ্চ করতে গেল। সেখানে খাবারের বিশাল আয়োজন। টিকিটের বদৌলতে এই মজাদার খাবার দাবার একদম ফ্রি । খাবার শেষে ওদেরকে দেয়া হলো বিশেষভাবে তৈরি চমৎকার স্বাদের স্ট্রবেরি ও মিল্ক মিশিয়ে তৈরি সুস্বাদু আইসক্রিম। এই আইসক্রিমটি একটু অন্যরকম । খেলেই কেমন যেনো নেশা ধরে যায়। আরো খেতে ইচ্ছে করে। খাবার শেষে কিশোর দল যান্ত্রিক খেলনা ঘোড়ায় চড়ে অনেক দূর ঘুরে এলো । আসলে এটাও একটা রাইড। হঠাৎ অপুর চোখে পড়লো পার্কের একেবারে শেষ প্রান্তে একটা ঢাউস ল্যাবরেটরি বিল্ডিং । বিল্ডিংটাকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে আছে একটা যান্ত্রিক ময়ূর। ময়ূরটা এক যায়গায় দাঁড়িয়েই ঘুরে ঘুরে নাচছে। সেখান থেকে কয়েকজন লোক সাদা সাদা কতগুলো প্যাকেট একটা ছোট বস্তায় ভরে কিচেনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তার সন্দেহ হলো । কিচেনে ল্যাবরেটরির রাসায়নিক গুঁড়া কেন? টোকন মামাকে সবকিছু খুলে বলতেই তিনি বললেন,” চলতো, কিচেনে গিয়ে দেখি,কি হচ্ছে?” কিচেনের প্রবেশ মুখে একটা খেলনা ড্রাগন দাড়িয়ে আছে। মুখ দিয়ে তার আগুন বের হচ্ছে। টোকন মামা, অপু, তিয়ান ও টিয়ানা চুপিচুপি কিচেনে উঁকি দিয়ে দেখলো, এই সাদা গুঁড়োগুলো আইসক্রিম পাউডারের সাথে মেশানো হচ্ছে । পরে এগুলো দিয়ে আইসক্রিম তৈরি করে বড় আকৃতির ফ্রিজে ওগুলোকে জমাট বাঁধানো হবে। ল্যাবরেটরির লোকজন কাজ করে সরে যেতেই টোকন মামা ও কিশোর দল কিচেনে ঢুকলো । টোকন মামা একটা ফেলে দেয়া সাদা গুঁড়োর প্যাকেটে আঙ্গুল দিয়ে একটু খানি গুঁড়ো জিভে দিতেই আঁতকে উঠলেন। বিড়বিড় করে বললেন, “এ যে কোকেন! “ কিশোর দল বুঝলো খেলনা নগরের মালিক এক ভয়ংকর খেলায় মেতেছে। আইসক্রিমের সাথে ভয়ংকর মাদক কোকেনের সাদা গুঁড়ো মিশিয়ে দেওয়া হয় । ফলে শিশু কিশোররা এই আইসক্রিম খেয়ে নিজের অজান্তেই নেশাসক্ত হয়ে পড়ে । বারবার তারা খেলনা নগরে আসতে চায়। প্রতিদিনই ভিড় বাড়ে। ফলে খেলনা নগরের ব্যবসা ফুলে ফেঁপে উঠছে দিনকে দিন। টোকন মামা ও কিশোর দল সবকিছু বুঝে কিচেন থেকে বের হতে যেতেই, তিয়ানের পা একটা তারের উপর পড়ে । সাথে সাথে চারিদিকে ওয়ার্নিং বেল বেজে ওঠে। কিশোর দলের সবাই তৎক্ষণাৎ গেটের দিকে দৌড়াতে থাকে। পিছনে তাড়া করে আসে কিচেনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বিশালাকৃতির আগুনমুখো ড্রাগনটি। বড়সড় প্রশস্ত পথ। ওরা এঁকেবেঁকে একেক জন একেক দিক দিয়ে গেটের কাছে পৌঁছতে চেষ্টা করে। ঠিক তখনই আকাশে উড়ে আসে কয়েকটি যান্ত্রিক প্রজাপতি, ফড়িং ও তেলেপোকা । ওদের মুখে বসানো মেশিন গান দিয়ে নিচের দিকে সমানে গুলি করতে থাকে। থিম পার্কে থাকা শিশুকিশোরদের হুড়োহুড়ি ও চিকিৎসা চেঁচামেচিতে চারিদিকে ভয়াবহ অবস্থা। কিশোর দল এঁকেবেঁকে দৌড়ে কোনক্রমে রক্ষা পায়। সবার আগে গেটের সামনে পৌঁছে অপু । সে খেলনা বাঘের পেটের নিচে আশ্রয় নিয়ে ৯৯৯ নাম্বারে পুলিশকে ফোন দেয়। পটিয়ার পুলিশ টোকন মামা ও কিশোর দলকে ভালোভাবেই চেনে। তারা দ্রুত অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে অনেকগুলো গাড়িতে চড়ে এসে খেলনা নগর চিলড্রেন থিম পার্ক ঘিরে ফেলে। বিপুল সংখ্যক পুলিশ এস আই মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে গেট দিয়ে ঢুকতেই টোকন মামার সাথে তাদের দেখা হলো। তারা টোকন মামার সাথে কথা বলে প্রথমে পরিস্থিতি বুঝলো। পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে কাভার নিয়ে সাব মেশিনগানের সাহায্যে গুলি করে আকাশে ও মাটিতে থাকা সশস্ত্র খেলনাগুলোকে ধ্বংস করে দিলো। অতঃপর টোকন মামা ও কিশোর দল তাদের আলামত দেখাতে ল্যাবরেটরি ও কিচেনে নিয়ে গেল। তারপর অনেক খোঁজাখুঁজি করে খেলনা নগরের অফিস বিল্ডিংয়ের একটি গোপন কক্ষ থেকে গ্রেফতার করা হলো মালিক মোখলেছুদ্দিন চৌধুরীকে । গ্রেফতার হলো তার সব সহযোগীরা। পুলিশ খেলনা নগর চিলড্রেন থিম পার্ক সিলগালা করে বন্ধ করে দিয়ে ও কিশোর দলকে ধন্যবাদ জানিয়ে অপরাধীদের হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে চললো থানায়।