নয়ন আহমেদ

কবি কামাল আহসান। বাংলা ভাষার অন্যতম কবি, কথাসাহিত্যিক। তার গল্প নিবিড়তার আকর। জনপদের, মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার কথকতা। তার কবিতা মানেই বোধের ভূমিকা পাঠ করে বহুদূর যাওয়া। যাওয়া মানে জীবনে, যাপনে স্বেচ্ছাকৃত এক জগৎ তৈরি করা। জন্মেছিলেন বরিশালের পটুয়াখালি জেলার বাউফলে। ছায়াসুনিবিড় এক শান্ত গ্রামে। কবিতায় সেই স্নিগ্ধতা, অপার শান্তি কুড়িয়েছেন তিনি। কুড়িয়েছেন বেদনাবোধও। সেই বেদনা সহজ। নরম এবং আবেগী। বলা যায়, প্রেম, করুণা, মমতা এবং একাকিত্ববোধ তার সহজাত প্রবৃত্তি হয়ে ধরা পড়েছে। এ যেন এক স্বনির্ভর নির্মিতি। যেখানে নিজের বোধই বড়। নিজের খাঁচায় বাস করা কোনো কৃষকের মতো, যে নিজের জগৎ নিয়েই সন্তুষ্ট। আহসান এমনই। হতে চেয়েছিলেন কবি। একমাত্র কবি হওয়া ছাড়া অন্য কোনো ধ্যান ছিলো না। কোনো লক্ষ্য ছিলো না। ছিলো না আর কোনো সাধনা। পথ চলতে চলতে যা কুড়িয়েছেন তাই কবিতা। “ নিজেকে আজকাল কুড়িয়ে আনি- কারখানা শ্রমিক ঠেলে ঠেলে বলি, ধরতে নেই! মুখে নিতে নেই এই নাম- বেলা অবেলায় এ বালক নিখোঁজ হতে চায়, একাকী তার কখনো কি পোষায়? মাঠের ওপাশে সাবালকের খাল, জলে ভাসে সে ছদ্মবেশে একাকী ডিঙ্গায়।” -কুড়িয়ে পাওয়া মন - এমনই ছিলেন কামাল আহসান। শব্দ কুড়িয়ে তিনি ভাব ও বোধের প্রাসাদ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন।

আহসানের সঙ্গে অনেক স্মৃতি আছে। তাতে মিশে আছে সকালের রোদ, দুপুরের উজ্জ্বলতা। কখনো বিকেলের নরম আলো। আবার সন্ধ্যার আবির মাখা কথকতা। সময়টা ঠিক মনে নেই। হয়তো ১৯৯৪ হবে। তখন আমরা কবিতা পরিষদে যাই। কোনো কোনো দিন অক্ষর সাহিত্য সংসদে। লেখালেখি নিয়ে প্রবল আগ্রহ-উদ্দীপনা। ফ্যাসিস্ট মানসিকতাসম্পন্ন লোকদের চিনতে চিনতে আমরা একটা সাহিত্য সংগঠন দাঁড় করাই। এ দলে ছিলেন অনেকেই। আল হাফিজ, সালমান রাইয়ান, জাহাঙ্গীর ওবায়দুল্লাহ প্রমুখ। প্রতি শুক্রবার বিকেলে আড্ডা দেই। জমজমাট আড্ডা। একদিন হঠাৎ আসেন কামাল আহসান। পরিচয় হয়। লেখা পড়েন। তিনি গল্প লিখতে পছন্দ করেন। সেসময় লিখতেন এম কামাল হোসেন নামে। পিতৃপ্রদত্ত নাম। এ নাম টিকেছিলো ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত। কবি আল হাফিজ নতুন নামের প্রস্তাব করলেন সাহিত্য আসরে। হয়ে গেলেন কামাল আহসান। নামকরণ উপলক্ষে খাওয়া দাওয়া হলো। অনেক খুশি দেখলাম কামালকে। তার প্রথম বই ছিলো গল্পের। নাম-প্রণয় দষ্টিতা। আটটি গল্প নিয়ে বইটা। শেকড় সাহিত্য সংসদ থেকে বের হয় এটি। কী উচ্ছ্বাস ছিলো তার! তার সৃষ্টিকর্ম আলোর মুখ দেখবে। কালো হরফে ভাষা হয়ে উঠবে। আবেগ আর বোধ রোদ হয়ে ছড়াবে। এই বইটার প্রচ্ছদ করেছিলেন গল্পকার নিজেই। একটা নারীর মুখ। কিছু রেখা। এসব নিয়ে জীবন্ত হয়ে উঠল তার বই। বানান সংশোধন করলাম। ফ্লাপও লিখে দিয়েছিলাম আমি। তার ভালো লেগেছিল। কৃতজ্ঞতাবোধ ছিলো তার। কখনো প্রথম বই প্রকাশের এই সামান্য সহযোগিতার কথা ভুলেননি। একদিন কামাল নিজেই সেই বইটা হাতে হাতে বিক্রি করছিলেন বৈশাখী মেলায়। বরিশাল বিএম স্কুলের মেলায়। বললেন, নয়ন ভাই, ভালোই বিক্রি হয়েছে। পাঠকদের সাড়া পাচ্ছি। এভাবে তিনি অল্প সময়ের মধ্যেই পাঠকপ্রিয় হয়ে উঠলেন। ইতোমধ্যে জানলাম তিনি বিয়ে করে ফেলেছেন। আগে থেকে তাদের পরিচয় ছিলো। কামাল পরিচয় করে দিয়েছিলেন হাফিজ আর আমার সাথে। সুন্দরী। মার্জিত। বিনয়ী। বিএম কলেজেই পড়েন। সমাজবিজ্ঞানে অনার্সে। কয়েকবার বেড়াতে এসেছেন আমাদের বাসায়। পরে এই মেয়েটি সরকারি কর্মকর্তা হয়েছেন। কাইফা নামে একমাত্র একটা মেয়ে তাদের। কামাল এই একমাত্র সন্তানকে নিয়ে ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। সন্তানের আলোয়ে পৃথিবী দেখা।

২. কিছু টুকরাটাকরা স্মৃতি স্থায়ী হয়ে আছে মনে, মস্তিষ্কে। তখন ১৯৯৫ সাল। পত্রিকার কাজ ছেড়ে একটা ডিগ্রি স্তরের মাদরাসায় চাকরি পাই। একদিন কিছু কেনাকাটার জন্য শপিং করতে বের হই। দেখা হয়ে যায় কামাল আহসানের সঙ্গে। একটা ব্রিফকেস বা ভালো ব্যাগ কিনতে হবে। কামাল বললেন, এখন কেনার দরকার নেই। আমারটা আপাতত ব্যবহার করেন। তারপর ধীরেসুস্থে কেনা যাবে। কামাল তখন কোনো একটা জব করেন। রিপ্রেজেনটিভ। ওষুধ কোম্পানির হবে হয়ত। ভালো করে মনে নেই। তিনমাস পর ফেরত দিলাম সেই ব্রিফকেসটা। ওর ব্রিফকেসটা পেয়ে অনেক উপকার হয়েছিলো। আমরা একটা অভিনব অনুষ্ঠানের প্রবর্তন করেছিলাম। এর নাম ছিলো “খাইদাই” অনুষ্ঠান। আল হাফিজ, মুশাররফ, আলাউদ্দিন, কামাল এসব অনুষ্ঠানের সাথে জড়িত ছিলেন। পরিচিত বন্ধুবান্ধবদের বাড়িতে যেতাম। আগেই ঠিক করতাম কার বাড়িতে যাবো। তারপর জানিয়ে দিতাম। বেশ মজা হতো। ঘোরাঘুরি হতো। কামালকে এমন দুটি অনুষ্ঠানে পেয়েছিলাম। প্রচুর আনন্দ, উল্লাস হতো এতে। কামাল তো অনেক মজা করতে পারতেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করে আসর জমানোর দক্ষতা ছিলো। একসময় কামাল চলে যান বগুড়ায়। ওখানে তার জব হয়েছে। জয়েন করতে হবে। আগে যাননি কখনো। সেজন্য হাফিজ ভাই ফোন করে দেন সাজ্জাদ বিপ্লবকে। কবি সাজ্জাদ বিপ্লব। তিনি তখন “ স্বল্পদৈর্ঘ্য” নামে একটা পত্রিকা করতেন। তিনি কামালকে রিসিভ করেন অত্যন্ত আন্তরিকভাবে। বাসা ঠিক করে দেন। ভাইয়ের মতো খোঁজখবর নেন। আপ্যায়ন করান। পত্রিকায় যতœ করে লেখা ছাপান। একটা কবিতার বই বের করে দেন। এটা তার দ্বিতীয় বই। আর কবিতার বই হিসেবে প্রথম। নামÑ “ আহসান জেনে গেছে বরফের ছল”। কামাল ভুলেননি সাজ্জাদ বিপ্লবের কথা। প্রসঙ্গক্রমে বগুড়ার গল্প বলতেন প্রায়ই। ওখানকার কবিদের কথা দরদ দিয়ে শোনাতেন। বরিশালের সালমান রাইয়ান, পথিক মোস্তফা, শামীম রসুল, সজীব তাওহিদ, ইয়াসিন হীরা, মৃন্ময় হাসান, কাওসার আহমেদ প্রমুখ কবিদের সঙ্গে তার আন্তরিক ভাব ছিলো। তিনি সবাইকে আপন করে নিতে পারতেন। মুহূর্তের মধ্যেই হয়ে যেতেন পরিবারের একজন। ভাই, বন্ধু। পথিক মোস্তফা একটা প্রকাশনাসংস্থা গড়ে তোলেন। পথিমিতা। তিনি কামালের তৃতীয় বই বের করেন এখান থেকে। “ মানুষ মানুষ বলে সুনাম ছড়াবো”। কবিতার বই। জীবিত থাকা কালে এটাই সর্বশেষ প্রকাশিত বই তার। কামাল আহসানের মৃত্যুর পর কবি ও গবেষক পথিক মোস্তফা দায়িত্ব নেন সৃষ্টিসমগ্র বের করার। এটা তার প্রতি ভালোবাসারই স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ।

৩. কামাল ছিলেন আসর মাতানোর অসাধারণ ব্যক্তিত্ব। বরিশালে বিবির পুকুড়ের পাড়ে কত আড্ডা জীবন্ত হয়ে আছে! চায়ের কাপে কাপে সেই স্মৃতিগুলো অম্লান। একবার ঢাকায় যাই। উঠি কমলকুঁড়ি একাডেমিতে। ততদিনে আল হাফিজ ঢাকায় স্থির হয়েছেন। কামালকেও পেলাম সেখানে। পেলাম সালমান রাইয়ানকে। রাতে বসলো গানের আসর। “ উগার ভইরা থুইলাম এ ধান খাইয়া তুষ বানাইলো। রঙের বাড়ুই, ও বাড়ুই রে! বিষম ইন্দুরা নাগাল পাইলো।” হাসন রাজার এই গানে পূর্ণ হয়ে উঠল আসর। হাততালি পড়ল। আবার গান শুরু হলো কবিশ্রোতাদের অনুরোধে। “ সুরমা নদীর জল দিলেও নেভে না যে ক্যানে! হাসান রাজার মনে আগুন লাগাই দিলো কোনে? “ এভাবে মরমী সাধনার গানে এক অন্তরের ঢেউ বইতে লাগলো। বরিশালে ফিরবো। সদরঘাট আসতে হবে। সাথে আল হাফিজ ও কামাল ভাই আসছেন এগিয়ে দিতে। বাসে। বাসভর্তি জনতা অবাক হয়ে শুনলো কামালের গান। হাসন, লালনের মনমাতানো গান। এর কি কোনো তুলনা আছে? কী আবেগ! কী ঋদ্ধ এদের গান! কামাল জব উপলক্ষে ঘুরেছেন বাংলাদেশের আনাচে কানাচে। সাহিত্য আসরে যেতেন নিয়মিত। উত্তরবঙ্গে কাটিয়েছেন দীর্ঘদিন। সেখানকার স্বজনরা মনে করেন এখনও। কবি তৌফিক জহুর, কবি-গবেষক ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ, ড. ফজলুল হক তুহিন প্রমুখ তার প্রিয়জন ছিলেন। ঢাকার আর এক প্রিয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন কবি হাসান আলীম। তিনি কামালকে ওখানে একটা জবের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। আমাদের কাছে এইসব উপকারের কথা বলতেন কামাল আহসান। কবি রেদওয়ানুল হকের কথা বলতেন। কবি জাকির আবু জাফরের কথাও বলতে ভুল করতেন না। তারা যতœ করে লেখা ছাপেন। এমন কৃতজ্ঞতা ছিলো তার মধ্যে। কখনো টাকা ধার চাইতেন। বলতেন, নয়ন ভাই, কিছু টাকা পাঠান। মাসের শেষ তো। খুব দরকার। পাঠাতাম যতটুকু পারি। আবার সময়মতো পরিশোধ করতেন।

৪. কামাল আহসান কবিতা এবং গল্প উভয় ক্ষেত্রেই সমান উজ্জ্বল। এটা আমার ব্যক্তিগত অভিমত। তিনি প্রথমে গল্পই লিখতেন। আমরা লিখতাম কবিতা। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন কবিতা লিখবেন। প্রচুর লিখেছেন তিনি। কবিতার সংখ্যা চার হাজারের অধিক। মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়েছে নতুন একটা কবিতার বই। “ রঙের রাধিকা”। ক্রমে ক্রমে সব লেখাই প্রকাশ করা হবে। তার সাহিত্যিক জীবন যখন সফলতার দরোজাগুলো অতিক্রম করতে শুরু করে মৃত্যু তখন সব কিছু থামিয়ে দেয়। ২০২১ সালে তিনি এক দুর্ঘটনার শিকার হন। তিনি বাসায় ফিরছিলেন হেঁটে। শেষ আশ্রয় ছিলো চট্টগ্রামে, তার বোনের বাসায়। পথে, ট্রাক তার ওপর দিয়ে চলে যায়। ইনতিকালের খবর পাই আল হাফিজ ও সালমান রাইয়ানের কাছ থেকে। আমাদের সাহিত্যের জন্য এ এক অপূরণীয় ক্ষতি। ক্ষণস্থায়ী এ জীবনে মানুষ এখানেই অসহায়। তবে আমাদের আছে পরকাল। অনন্ত জীবন। সেই জীবনে আল্লাহ আমাদের দেখা করাবেন, এই আশা করে আছি। “ অমন কইরা গাইছ না ও মন, অমন কইরা গাইছ না। মনে আছে মনভিখারি তার খবর তো লইছ না। কেমন কইরা জাইগা আছো? পাতারা পায় শরম। ধ্যানে আছে পাটপাতারা বাতাস কইরা নরম। “ ধ্যান / কামাল আহসান, এই ধ্যানের কবিতার মধ্যেই আশ্রয় খুঁজছিলেন তিনি। কামাল আহসানের কবিতায় আত্মনিবেদনের সুর। কল্যাণের আবহ আছে। “ গ্রামীণ দেয়ালে লেখা ছোট্ট এ নাম মাঠের রোদের মতো বিলিয়ে দিলাম।”