শারমিন নাহার ঝর্ণা

বাগানে বাগানে ঘুরে নিলু কিছু খড়ি যোগাড় করল, উনুন জ্বালাবার মতো কিছু নেই বাড়িতে। চৌধুরী বাড়িতে সারাদিন খাটেন নিলুর মা। খড়ি যোগাড় করার মতো সময়টুকু নেই। সাত বছর বয়সের নিলু এখন ওর লেখাপড়া করার সময়, কিন্তু সেটা বাদ দিয়ে সারাদিন খড়ি কুড়ানো নিয়ে ব্যস্ত, না কুড়ালেও তো ভাত জুটবে না কপালে। বাবা মারা গেছেন নিলুর জন্মের পর, নিলুর মা কত কষ্ট করেই মানুষের বাড়ি কাজ করে দিন পার করেছেন। কোনদিন শুধু পানি খেয়েই কেটেছে সারারাত। শীত পড়ছে খুব। চারিদিকে ঘন কুয়াশা। নিলু মায়ের আঁচলে মুখ লুকিয়ে বলে মা তোমারে একটা কতা কমু রাগ করবা না তো? নিলুর মা নিলুর মাথায় স্নেহের হাত রেখে বললেন কী কইবা সোনা?

কইয়া ফেলাও, কত দিন হইল পিডা খাই না।

আমারে ভাপা পিডা খাওয়াইবা মা?

আমারো তোরে খাওয়াইতে মন চায় তয় গুড় পাডালীর যে দাম বাড়ছে কেমনে খাওয়ামু, দেহি কী করা যায়। তুমি সাবধানে থাইকো সোনা আমি কামে গেলাম, দেরি হইলে চৌধুরী গিন্নী আবার রাগ করব।

নিলুর মা, আজকে ভাপা পিঠা বানাতে হবে। নারকেলগুলো কুড়ে ফেল। আমি সব গুছিয়ে আনছি আমার ছেলে বাড়িতে এসেছে ওর ভাপা পিঠা খুব পছন্দ, সব গুছিয়ে নিলুর মা পিঠা বানানো শুরু করলেন, পিঠা বানায় আর চোখের জল টপ টপ করে গাল বেয়ে পড়ে। হঠাৎ চৌধুরী গিন্নী বলে উঠলেন হলো নাকি বানানো? গরম গরম খাবে ছেলেটা।

হ্যাঁ আটখানা হইছে গিন্নী মা নিয়া যান।

শোন নিলুর মা যাওয়ার সময় নিলুর জন্য চারখানা পিঠা নিয়ে যেতে ভুলিস না যেন।

নিলুর মা কাজ শেষ করে আঁচলে চারখানা পিঠা বেঁধে নিয়ে বাড়ি ফিরলেন।

নিলু দৌড়ে এসে বলল মা- মাগো আজকে অনেক খড়ি কুড়াইছি পিডা বানাইতে তো অনেক খড়ি লাগব। আঁচল থেকে পিঠা বের করে নিলুর সামনে রাখলেন। মা পিডা কই পাইলা? চৌধুরী গিন্নী দিছে হাত ধুঁইয়া খাইয়া লও সোনা।

নিলু পিঠা খায় আর বলে মা অনেক মজা হইছে, চৌধুরী গিন্নী খুব ভালা মানুষ, আমগো মতো গরিবদের তো পিডা বানাইয়া খাওন হয় না, মন খাইবার চাইলেও পারি না। কয়জনে বুঝে আমগো দরদ? মন ভইরা খাইলাম মা। দোয়া করি চৌধুরী গিন্নীর মতো এমন দয়ার শরীর যেন সক্কলের হয়, যাতে আমগো মতন গরিবদের পাশে এমন কইরা দাঁড়াইবার পারে। সকলে যদি বুঝতো মা তয় আমগো মতন গরিবদের আর কষ্ট থাকতো না।