মীর ফয়সাল নোমান

তেপান্তরের মাঠ—এ যেন এক অদৃশ্য হাত। সেই হাত প্রতি মুহূর্তে ডাকে, “আসো কাছেৃ আরো কাছেৃ”

মনে হয় যেন বলছে, “আয় মানুষ, তোকে আমি ছাড়ব না।”

যে কেউ এই মাঠে যায়, সে আর ফিরে আসে না।

দিনের বেলা মাঠটি ঝকঝকে, সুন্দর; কিন্তু রাতে এটি হয়ে ওঠে ভয়ানক।

গ্রাম থেকে মাঠ পেরিয়ে জঙ্গল পার হলেই তেপান্তরের মাঠ। সেখানে যে একবার গেছে—সে নাকি আর বেঁচে ফিরে আসেনি।

এ কথা এমনভাবে ছড়িয়েছে যে দিন যত যায়, মানুষের মনে এই মাঠ ততই রহস্যময় হয়ে ওঠে। তাদের ভেতরে বাড়তে থাকে ভয়, উদ্বেগ আর আতঙ্ক।

একদিন এক সহজ-সরল মানুষ জঙ্গল দিয়ে যাচ্ছিল। তাকে ছলে-বলে কৌশলে তেপান্তরের মাঠের দিকে নিয়ে যাওয়া হলো।

অদৃশ্য হাত হাসতে হাসতে বলল,

“আজ তোকে আমি খেয়ে ফেলব!”

মানুষটি কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,

“আমাকে মারো না, আমার বাড়িতে ছোট ছোট বাচ্চা আছে।”

অদৃশ্য হাত খিক-খিক করে হেসে বলল,

“তোকে না খেলে আমি বাঁচব কীভাবে? হাৃ হাৃ”

লোকটি তখন বলল,

“ঠিক আছে, মেরে ফেলো—সমস্যা নেই। কিন্তু একদিন এই রাস্তায় এমন একজন মানুষ আসবে, যে তোমাকে মেরে ফেলবে।”

অদৃশ্য হাত আরও জোরে হেসে উঠল,

“আসুক! আগে তোকে খাই!”

লোকটি আর্তনাদ করে চিৎকার করতে লাগল।

এদিকে একজন মসজিদের ইমাম তাঁর শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার জন্য রওনা হয়েছেন। তাঁর হাড়িতে কিছু মিষ্টি ছিল। গ্রাম পার হয়ে জঙ্গলে ঢোকার সময় একজন লোক তাঁকে আটকায়, “হুজুর, এ পথে যাবেন না! ওই পথে অদৃশ্য হাত থাকে। যে যায়, সে আর ফেরে না!”

হুজুর মৃদু হেসে বললেন,

“আমি যাব। আর ইনশাআল্লাহ আমি ফিরেও আসব।”

জঙ্গল পার হওয়া মাত্রই অদৃশ্য হাত তাঁকে জোরে টেনে তেপান্তরের মাঠে নিতে লাগল।

হুজুর বুঝলেন—কথা সত্যি।

তিনি দ্রুত হাড়ির মিষ্টিতে দোয়া পড়ে ফুঁ দিলেন। তারপর সাহস করে সামনে এগোলেন।

অদৃশ্য হাত আশ্চর্য হয়ে বলল,

“এ কে? এত দূর পর্যন্ত এসে বুঝতেও পারছে এটি তেপান্তরের মাঠ! আজ এর আর রক্ষা নেই। আচ্ছা, মরেই যখন যাবে—শেষ ইচ্ছা থাকলে বল।”

হুজুর বললেন,

“তুমি আমাকে মারবে—তা ঠিক আছে। কিন্তু আমার একটি শেষ ইচ্ছা আছে।”

অদৃশ্য হাত বলল,

“কি ইচ্ছা? বলো।”

হুজুর বললেন,

“আমার হাড়িতে মিষ্টি আছে। তুমি কি খাবে?”

অদৃশ্য হাত অবাক হলো।

“কেউ তো শেষ ইচ্ছায় আমাকে কখনো কিছু খেতে দেয়নিৃ আচ্ছা, খাই।”

যেই সে মিষ্টি খেতে শুরু করল, সঙ্গে সঙ্গে তার শরীর আগুনের মতো জ্বলতে লাগল।

কিছুক্ষণের মধ্যেই সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে মারা গেল।

তারপর থেকে তেপান্তরের মাঠে যে-ই যায়—তার আর কোনো ক্ষতি হয় না।