আব্দুস সাত্তার সুমন
বসন্তের রমযান যেন আলাদা এক মাধুর্য নিয়ে আসে। গাছের পুরোনো পাতাগুলো ঝরে পড়ে মাটিতে সোনালি কার্পেট বানিয়েছে, আর নতুন কচি পাতা সবুজের নরম হাসি ছড়িয়ে দিচ্ছে চারদিকে। রোদ আছে, তবে তার তেজের ভেতর হঠাৎ এক পশলা বৃষ্টি এসে বাতাসকে নাতিশীতোষ্ণ করে দিচ্ছে। মাদ্রাসার খোলা মাঠে দাঁড়ালে মনে হয় প্রকৃতি নিজেই যেন ইফতারের দাওয়াত সাজিয়ে রেখেছে।
ক্লাস সেভেনের দশজন বন্ধু ঠিক করল, এবার তারা নিজেরাই ইফতার মাহফিলের আয়োজন করবে। কিছু গরিবদেরও এই ইফতারিতে দাওয়াত করবে। নাম দিল “সবুজ দাওয়াত”। জায়গা ঠিক হলো মাদ্রাসার আঙিনা, বড় গাছের নিচে।
দলের নেতৃত্বে সাইদুল ইসলাম। সে বলল, আমরা দোকান থেকে কিছু আনব না। সব নিজের হাতে বানাবো। মাটির চুলায় রান্না হবে!
এই প্রস্তাবে সবার মনের ভেতরে উচ্ছ্বাসিত হয়ে উঠল। যেন এক ছোট্ট অভিযানের ডাক।
দল ভাগ হলো, আনাস আর হাসান বানাবে পিয়াজু। সাকিব আর তানভীর ছোলা ভিজিয়ে মসলা মেখে প্রস্তুত করবে।
হাসিব ও আদিল বানাবে বেগুনি। আরিফ আর মাহিন আলুর চপের দায়িত্ব নিল। সব কিছুর তদারকিতে সাইদুল নিজে।
এই আয়োজনে সাহায্য করতে রাজি হল সাইদুল ইসলামের বাবা। তিনি বললেন,
মাটির চুলা বানাতে হলে আগে শক্ত করে মাটি কাদা করতে হবে।
মাঠের এক কোণে ছেলেরা হাত গুটিয়ে কাদা মাখতে শুরু করল। কেউ মাটি কাটছে, কেউ পানি ঢালছে। তাদের হাসি আর কোলাহলে বসন্তের পাখিরাও যেন থেমে শুনছে।
সাইদুলের মা বাসা থেকে ডেকে পাঠালেন সুবাহকে সাইদুলের ছোট বোন।
দেখো, পাকোড়া বানাতে হলে বেসনে পানি মাপমতো দিতে হয়। বেশি দিলে পাতলা হবে, কম দিলে শক্ত।
সুবাহ খুব মন দিয়ে শিখল। সে বলল, আমি কিন্তু আজকের ইফতারে বিশেষ দায়িত্বে আছি!
সত্যিই, সে ছিল দলের সবচেয়ে ছোট অথচ সবচেয়ে দায়িত্বশীল সদস্য।
ইফতারের আগের দিন বিকেলে মাঠে শুরু হলো মহড়া। মাটির চুলায় আগুন জ্বালানো সহজ ছিল না। প্রথমে ধোঁয়া, তারপর ছাই উড়ে সবার চোখ জ্বালা করতে লাগল। রাকিব হেসে বলল,
এই ধোঁয়াই আমাদের পরীক্ষা নিচ্ছে!
অবশেষে আগুন জ্বলে উঠল। কড়াই চাপানো হলো। পিয়াজুর মিশ্রণ যখন তেলে পড়ল, তখন “ছ্যাঁক্ ছ্যাঁক্” শব্দে চারদিক ভরে গেল। গন্ধ ছড়িয়ে পড়তেই ছোট ভাই-বোনেরা দৌড়ে এল।
সুবাহ তার পাকোড়ার কড়াই নিয়ে দাঁড়িয়ে। সে সাবধানে এক এক করে তেলে ফেলছে। তার চোখে এমন মনোযোগ, যেন সে বড় কোনো শেফ!
হঠাৎ আকাশ কালো হলো। বসন্তের হালকা মেঘ জমে এক পশলা বৃষ্টি নামল। ছেলেরা দৌড়ে ত্রিপল টানিয়ে দিল। কেউ কড়াই ধরে রাখল, কেউ আগুন বাঁচাতে শুকনো কাঠ জোগাড় করল।
এই ছোট্ট বিপদই যেন তাদের আরও ঐক্যবদ্ধ করল। বৃষ্টি থামতেই মাঠে এক অদ্ভুত শীতলতা নেমে এল। ভেজা মাটির গন্ধে ইফতারের সুবাস মিশে এক স্বপ্নময় পরিবেশ তৈরি হলো।
মাগরিবের আজান ভেসে এল। সবাই গোল হয়ে বসেছে। সামনে খেজুর, ছোলা, পিয়াজু, বেগুনি, আলুর চপ আর সুবাহর পাকোড়া।
সাইদুলের বাবা দোয়া পড়ে ইফতার শুরু করালেন। প্রথম কামড়ে সবাই একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসল। নিজেদের হাতে বানানো খাবারের স্বাদ যেন আলাদাÑ এর ভেতর ছিল শ্রম, বন্ধুত্ব আর বসন্তের বাতাস।
সুবাহ গর্ব করে বলল, আমার পাকোড়া কিন্তু সবার আগে শেষ! সবাই হাততালি দিল।
ইফতারের পর তারা মাঠ পরিষ্কার করল। কেউ ময়লা ফেলেনি, কেউ অপচয় করেনি। সাইদুল বলল, আমরা শুধু ইফতার করিনি, আমরা শিখেছি একসাথে কাজ করলে আনন্দ দ্বিগুণ হয়।