মনসুর আহমদ
পাহাড়ের চূড়ায় জন্ম নিয়ে নদী বিভিন্ন ভূভাগের উপর দিয়ে বয়ে চলে এক সময় মিলিত হয় সাগরে। চলার পথে বভিন্ন এলাকার মাটির রসÑগন্ধ, বিভিন্ন ঝরাপাতা, ফুলÑফল, লতাÑগুল্ম নিজ বক্ষে ধারণ করে একান্ত নিজের করে সঙ্গোপনে সাগরকে উপহার দেয়। নদীর ধারা কাউকে গ্রহণে অস্বীকার করে না বলেই তো নদী বেঁচে থাকে। নদী তার নাব্য উপহার দেওয়ার সাথে সাথে জীবন ও সৌন্দর্যের উপাদান যুগিয়ে দু’কূলের অধিবাসীদেরকে বাঁচিয়ে রাখে, সভ্যতা সংস্কৃতিকে অপরূপ রূপে গড়ে তোলে।
নদীর স্রোতের মতনই প্রবাহমান মানুষের মুখের ভাষা। এক চিররহস্যে ঘেরা উৎসে জন্ম নিয়ে শত যোজন পাড়ি দিয়ে, অযুত শতাব্দীর চিহ্ন বুকে নিয়ে কত শত মানব সভ্যতার জন্ম দিয়ে ভাষা এগিয়ে চলছে সম্মুখ পানে। এক অভিন্ন উৎস থেকে ভাষা জন্ম নিয়ে আজ হাজার হাজার শাখায় বিকশিত হচ্ছে, মধুর রস ও আনন্দধারা সৃষ্টি করে চলেছে। নদীর স্রোতের মতই ভাষা তার গতি পথে যাকে যে অবস্থায় পেয়েছে সে অবস্থায় তা গ্রহণ করে বিশ্বসিন্ধুর ভাষা তরঙ্গে মিলিয়ে দিচ্ছে।
ভাষা মানব সভ্যতার জ¦ালা মুখ, যার প্রতি রয়েছ সমস্ত মানুষর সাধারণ অধিকার। কোন এক বিশেষ ভাষার সীমারেখায় নিজকে আবদ্ধ রাখলে বিশ্বকে জানা যায় না। গোটা বিশ্বমানবতার অন্তরতলে বেদনা যে আনন্দের রস প্লাবন বয়ে চলে তা উপভোগ করার অধিকার বা ক্ষমতা জন্মে না। তাই সকলের উচিত বিভিন্ন ভাষার জলসায় যোগদান করে নিজের জ্ঞানালঙ্কারকে সমৃদ্ধ করা।
এক্ষেত্রে সাহিত্যসেবীরা যখন উদার হবেন তখনই ভাষা সমৃদ্ধ হবে। কিন্তু এ ব্যাপারে মাঝে মাঝে দেখা যায় কবি-সাহিত্যিকদের মাঝে ছুঁৎমার্গের দুর্বলতা। এমনকি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও পীড়িত হয়েছেন বাংলাভাষায় আরবী শব্দের ব্যবহার দেখে। একবার কবি নজরুল ইসলাম একটি গানে লিখেছিলেন, ‘ উদিবে সে রবি আমাদের খুনে রাঙিয়া পুনর্বার’। খুন শব্দের ব্যবহারে কবিগুরু খুব নাখোশ হলেন। কবি নজরুল ইসলাম জওয়াবে লিখেছিলেন,“ এই অভিমন্যুর রক্ষী মনে করে কবিগুরু আমায়ও বাণ নিক্ষেপ করতে ছাড়েননি। তিনি বলেছেন আমি কথায় কথায় রক্তকে ‘খুন’ বলে অপরাধ করেছি। কবির চরণে ভক্তের সশ্রদ্ধ নিবেদন, কবি ত নিজেও টুপি- পায়জামা পরেন, অথচ আমরা পরলেই তাঁর এত আক্রোশের কারণ হয়ে ওঠে কেন, বুঝতে পারিনে। এই আরবী ফার্সি শব্দ প্রয়োগ কবিতায় শুধু আমিই করিনি। আমার বহু আগে ভারতচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, সত্যেন্দ্রনাথ প্রভৃতি করে গেছেন।...আমি শুধু ‘খুন’ নয়Ñ বাংলায় চলতি আরো অনেক আরবীÑফার্সি শব্দ ব্যহার করেছি আমার লেখায়।আমার দিক থেকে ওর একটা জবাবদিহি আছে। আমি মনে করি বিশ্বÑকাব্য লক্ষ্মীরও একটা মুসলমানী ঢং আছে। ও সাজে তাঁর শ্রীর হানি হয়েছে বলেও আমার জানা নেই। স্বর্গীয় অজিত চক্রবর্তীও ও ঢং-এর ভূয়সী প্রশংসা করে গেছেন।
বাংলা কাব্যলক্ষ্মীকে দুটো ইরানী ‘জেওর’ পরালে তাঁর জাত যায় না, বরং তাঁকে আরও ‘খুবসুরত’ই দেখায়।
শুধুমাত্র ‘খুবসুরত’ই দেখায়ই নয় বরং মানুষের কাছে লেখাকে অধিক বোধগম্য করার জন্য, অধিক মধুময় করার জন্য সার্থক কবি সাহিত্যিকেরা বাংলায় প্রচুর আরবীÑফার্সি ব্যবহার করেছেন। এ ব্যাপারে কবি নজরুলের পরে কবি র্ফরুখের নাম করতে হয়। এ কারণে তাঁদের মাঝে থেকেই সাম্প্রদায়িকতা গন্ধ খুঁজেছেন।
ভাষা বিশেষ সম্প্রদায়ের সম্পদ নয় বরং তা সর্বজনীন। তাই কাব্যÑ সাহিত্যের সমৃদ্ধির জন্য, জাতীয় সংস্কৃতি ও স্বরূপের বৈশিষ্ট্যের জন্য সাহিত্যে শব্দ প্রয়োগের ব্যাপারে উদার হওয়া উচিত। এই ঔচিত্য বোধের ব্যাপক প্রকাশ ঘটেছে অসাম্প্রদায়িক কথাশিল্পী সৈয়দ মুজতবা আলীর সাহিত্য শিল্পে।
সৈয়দ মুজতবা আলী ছিলেন শান্তিনিকেতন ও রবীন্দ্রনাথের প্রিয় ছাত্র। ভাষাÑ সমুদ্রে ডুব দিয়ে তিনি সংগ্রহ করেছেন প্রচুর মণিমুক্তা। তিনি আরবী ফার্সি জার্মান ফরাসী প্রভৃতি পনেরটি ভাষার জাদুকর ছিলেন। অসাম্প্রদায়িক ভাবধারায় বর্ধিত সংবেদনশীল চিত্তের অধিকরী সৈয়দ সাহেবের মতো কথাশিল্পী বাংলা সাহিত্যে কমই আছেন। তিনিও বিভিন্ন ভাষার শব্দ প্রয়োগে ছিলেন অত্যন্ত উদার। তিনি অতি নিপুণতার সাথে প্রয়োজনমতো প্রচুর আরবী ফার্সি শব্দ তাঁর লেখায় ব্যবহার করেছেন। তাঁর ‘চতুরঙ্গ’ থেকে উদাহরণস্বরূপ কিছু আরবী ফার্সি শব্দের ব্যবহার পাঠককুলের জন্য ইশারা হিসেবে তুলে দেওয়া যেতে পারে। যেমনÑ
‘হলফ’Ñ ‘ এবং গল্পটি আদৌ তার নিজের বানানো না অন্যের কাছ থেকে নেওয়া, সে কথাও হলফ করে বলতেতো পারবো না।’
‘জেব’Ñ‘ গুরুদেব আবার মৃদু হাস্য করে জোব্বার নিচে হাত চালিয়ে ভিতরের জেবে সেটি রেখে দিলেন।’
‘খয়রাত’Ñ‘ মনে নেই, তুই দান খয়রাত পর্যন্ত করতিস?’ ‘ওতে আপনার কি হবে? আমি খবর পেয়েছি, আপনি দানÑখয়রাতে দাতা কর্ণ।’
‘ কেতাব’Ñ ‘ শেষ মোগল বাদশা সালামত বাহাদুর শাহের হারেমেও কথাবার্তা তুর্কি ভাষাতেই হত এবং তুর্কী সাহিত্যের সর্বোৎকৃষ্ট না হলেও অন্যতম উৎকৃষ্ট কেতাব বাবুর বাদশার জীবনী।’
‘তসবীর’Ñ আজ যদি বেহেশ্ৎ থেকে ফিরিশতা (দেবদুত) ইস্তাম্বুলে নেমে বিশ্বজনের কাছে সপ্রমাণ করে যান যে ইমাম নস্রুদ্দীন খোজা নামক কোনো ব্যক্তি এ ধরায় জন্মগ্রহণ করেননি তবুও তুর্কীর লোকেরা সেই তসবীরই বয়ান করবে।’
‘তাজ্জব’Ñদীন- দুনিয়ার মালিক বাদশা তো তাজ্জব।’
‘ হাল’Ñ‘ বাদশার তখন ঐ হাল।’
‘ না হক্ক’Ñনা হক্ক বে ইজ্জৎ হলে মানুষ যে রকম বেদনাতুর কণ্ঠে কাকিয়ে ওঠে, খোজা সেই রকম বললেন, জাঁহাপনা কুল্লে দুনিয়ার মালিক।’
‘ মেকদার’Ñ‘ আর খাবেনও পেট ভরে। বন্ধুর বাড়ীতে মেকদারটা একটু কম পড়েছিল।’
‘ইরাদা’Ñ স্বভাবতই আপনার মনে বাসনা, দিলে ইরাদা জাগাবে খোজার গোরস্তান দেখবার জন্য।’
এভাবে তিনি তাঁর লেখায় ব্যবহার করেছেন ‘ সাকী’,‘ আইন ওক্ত’, ফুরসৎ, আকছার, কুল্লে, গোরস্তান, মুর্শীদ, খুন, এন্তেজার, অছিলা ., ওস্তাদ, রোশনাই, কুর্তা , খুদাদাদ এ রকম শত শত আরবী ফার্সি শব্দ।
বহু ভাষাবিদ পণ্ডিত সৈয়দ মুজতবা আলী ভাষার উন্নতি ও শ্রী বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনে লেখায় বিদেশী শব্দ গ্রহণের পক্ষে ছিলেন। এ ব্যাপারে তিনি লিখেছেন, “ বিদেশী শব্দ নেওয়া ভালো না মন্দ সে প্রশ্ন অবান্তর। নিয়েছি এবং এখনো সজ্ঞানে আপন খুশীতে নিচ্ছি এবং শিক্ষার মাধ্যম রূপে ইংরেজীকে বর্জন করা বাঙলা নেওয়ার পর যে আরো প্রচুর ইউরোপীয় শব্দ আমাদের ভাষায় ঢুকবে, সে সম্বন্ধেও কারো সন্দেহ নেই। আলু-কপি আজ রান্নাঘর থেকে তাড়ানো মুশকিল, বিলিতি ওষুধ প্রায় সকলেই খান, ভবিষ্যতে আরো নতুন নতুন ওষুধ খাবেন বলেই মনে হয়। এই দুই বিদেশী বস্তুর ন্যায় আমাদের ভাষাতেও বিদেশী শব্দ থেকে যাবে, নতুন আমদানিও বন্ধ করা যাবে না।. . . বিদ্যাসাগর ‘সাধু’ রচনায় বিদেশী শব্দ ব্যবহার করতেন না, বেনামীতে লেখা ‘অসাধু’ রচনায় চুটিয়ে আরবী-ফার্সি ব্যবহার করতেন। আর অতিশয় ব্রাহ্মণ পণ্ডিত হরপ্রসাদ আরবীÑফার্সি শব্দের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করা আহাম্মুখী বলে মনে করতেন।. . . স্বয়ং প্রেমেন্দ হিন্দীতে বিস্তর আরবীÑফার্সি ব্যবহার করেছেন।”
হাল যামানায় যারা বাংলা ভাষা ব্যবহারের ব্যাপারে অভিধান খোঁজেন, আরবী-ফার্সি তুলে দিয়ে সে স্থানে অনুবাদ করে খাঁটি বাংলা ইস্তেমালের কসরৎ করেন তারা প্রকৃতপক্ষে বাংলা ভাষার হিতাকাক্সক্ষী নন। কারণ আমরা দেখতে পাই ফার্সী শব্দ আরবী থেকে শব্দ ও ভাব সম্পদ গ্রহণ করে বিশ্বে সাহিত্যে রূমী, হাফিজ , সাদী , খৈয়ামের মতো বিশ্বজনের কাছে বিস্ময়ের বস্তু উপহার দিতে পেরেছে। বাংলা ভাষায়ও যদি আরবীÑফার্সী তাবৎ প্রচুর বিদেশী শব্দ স্বাভাবিকভাবে স্থান পায় তা হলে বাংলা ভাষায় অধিকতর ঐশ্বর্যশালী সাহিত্য সৃষ্টি সম্ভব হবে।
সৈয়দ মুজতবা আলী যেমন লেখাকে আকর্ষণীয় করার জন্য অনায়াসে বিদেশী ভাষাকে গ্রহণ করেছেন তেমনি কথাবার্তায় দৃঢ়তা ও প্রভাব বিস্তারকারী শক্তি অর্জনের জন্য বিভিন্ন ভাষাকে ব্যবহার করেছেন। বিভিন্ন ভাষা শেখার ব্যাপারে সাফাই গাইতে গিয়ে লিখেছেন, “অনেকের অনেক রকমের ভাষা, কেউ শ্ল্যাং ব্যবহার করে, কারো বা ইডিয়ম জোরদার। কেউ কথায় কথায় প্রবাদ ছাড়ে, কেউ ভশ্চার্যের সংস্কৃতÑঘেঁষা, কেউ কিঞ্চিৎ যাবনিক। সবকটা করাত্ত না থাকলে ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণীর লোকের কথাবার্তা পড়হারহপরহম ধরনের প্রয়োগ করা য়ায় না।”(পাঠকের নিকট নিবেদনঃ রচনাবলী, ১০ম খণ্ড)
যারা নজরুল র্ফরুখকে বাঁকা চোখে দেখেন, আশা করি তারা সৈয়দ সাহেবকে দেখে বাংল ভাষা থেকে আরবীÑফার্সী নিসূদন যজ্ঞে মেতে ওঠা থেকে বিরত থাকবেন।