ইফতেখার রবিন

ঔপনিবেশিক শাসন, সামাজিক পশ্চাৎপদতা ও ধর্মান্ধতার আবর্তে বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বাঙালি মুসলমান সমাজ যখন বুদ্ধিবৃত্তিক স্থবিরতায় আক্রান্ত, তখনই একদল প্রগতিশীল চিন্তক ও মননশীল সাহিত্যিক মুক্তবুদ্ধির পতাকা তুলে ধরেন। তাঁদের বিশ্বাস ছিল মানুষের প্রকৃত মুক্তি সম্ভব কেবল যুক্তি, বিজ্ঞানমনস্কতা ও স্বাধীন চিন্তার চর্চার মাধ্যমে। এই বিশ্বাস থেকেই জন্ম নেয় মুসলিম সাহিত্য সমাজ-একটি সাহিত্যিক সংগঠন হলেও যার মূল লক্ষ্য ছিল সামাজিক ও মানসিক জাগরণ। সাহিত্যকে হাতিয়ার করে অন্ধ সংস্কার, গোঁড়ামি ও শাস্ত্রানুগত্যের বিরুদ্ধে যুক্তিবাদী প্রতিবাদ গড়ে তোলাই ছিল এ সংগঠনের মৌলিক ব্রত। ‘বুদ্ধির মুক্তি’এই যুগান্তকারী ধারণাকে কেন্দ্র করে মুসলিম সাহিত্য সমাজ যে চিন্তাচেতনার আন্দোলন গড়ে তুলেছিল, তা শুধু বাঙালি মুসলমান সমাজ নয়, সমগ্র বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠেছে।

বাংলা সাহিত্যে এই মুসলিম সাহিত্য সমাজের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজের কয়েকজন যুক্তিবাদী ও প্রগতিশীল শিক্ষক ও ছাত্রের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এটি। এ সংগঠনের মূলমন্ত্র ছিল বুদ্ধির মুক্তি অর্থাৎ অন্ধ সংস্কার ও শাস্ত্রানুগত্য থেকে মানুষের বিচারবুদ্ধিকে মুক্তিদান। শিখা নামক একটি পত্রিকা ছিল এ সংগঠনের মুখপত্র।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম হল ইউনিয়ন কক্ষে বাংলা ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সভাপতিত্বে ১৯২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি মুসলিম সাহিত্য সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়। সংগঠনটি পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও বাণিজ্য বিভাগের অধ্যাপক আবুল হুসেন, মুসলিম হলের ছাত্র এ.এফ.এম আব্দুল হক, ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজের ছাত্র আবদুল কাদির প্রমুখের ওপর। এরাই ছিলেন প্রথম কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য। নেপথ্যে থেকে দায়িত্ব পালন করতেন ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক কাজী আবদুল ওদুদ ও যুক্তিবিদ্যার অধ্যাপক কাজী আনোয়ারুল কাদির। কাজী মোতাহার হোসেনও ছিলেন এর অন্যতম কর্ণধার। এছাড়াও এ সংগঠনের অন্যতম লেখক ছিলেন মোতাহের হোসেন চৌধুরী, আবুল ফজল প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ। এরা তাদের ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে যেমন বুদ্ধির মুক্তি ঘটাতে চেয়েছেন, তেমনি বাংলা সাহিত্যেও এরা বিশিষ্ট হয়ে উঠেছেন।

মুসলিম সাহিত্য সমাজের কার্যক্রম দশ বছর (১৯২৬-৩৬)সক্রিয়ভাবে চালু ছিল। এ সংগঠনের মুখপত্র শিখার মোট পাঁচটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল। প্রথম সংখ্যা আবুল হুসেন, দ্বিতীয় ও তৃতীয় সংখ্যা কাজী মোতাহার হোসেন, চতুর্থ সংখ্যা মোহাম্মদ আবদুর রশীদ এবং পঞ্চম সংখ্যা আবুল ফজল সম্পাদনা করেন। শিখার মুখবাণী ছিল, “জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব।” মুসলিম সাহিত্য সমাজের লক্ষ্য ছিল ধর্ম ও ধর্ম প্রভাবিত মুসলমান সমাজকে বৈজ্ঞানিক যুক্তির পাটাতনের ওপরর দাঁড় করিয়ে দেওয়া। সংগঠনটি যে নবজাগরণের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে সমাজকর্ম ও সাহিত্যচর্চায় ব্রতী হয়, তার মূলে ছিল তার্কি জাতি প্রতিষ্ঠায় মোস্তফা কামাল পাশার উদ্যম, ভারতের নবজাগরণে বিভিন্ন মনীষীদের প্রয়াস এবং মানবতার উদ্বোধনে সর্বকালের চিন্তাচেতনার সংযোগ। মুসলিম সাহিত্য সমাজের লেখকগণ তাদের চিন্তাধারাকে বাঙালি সমাজের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য তিনটি পথ অবলম্বন করেন: তা হলো পত্রপত্রিকা প্রকাশ, সাময়িক অধিবেশন ও বার্ষিক সম্মেলনের ব্যবস্থা এবং গ্রন্থ রচনা ও প্রকাশ।

মুসলিম সাহিত্য সমাজের সদস্যবৃন্দ তাদের প্রতিষ্ঠানের নামের সঙ্গে মুসলিম শব্দটি ব্যবহার করলেও তারা সাম্প্রদায়িক ছিলেন না। মুসলিম সাহিত্য সমাজের কেন্দ্রীয় ও ভাবযোগী পুরুষ ছিলেন কাজী আবদুল ওদুদ। তিনি সততা ও সহিষ্ণুতার সঙ্গে, মেধা ও মননের সাহায্যে চেয়েছেন মুক্তবুদ্ধির চর্চা করতে। তিনি চেয়েছিলেন বিচারবুদ্ধির অন্ধ সংস্কার ও শাস্ত্রানুগত্য থেকে মুক্তি। তিনি ও তার সহযাত্রীরা সমগ্র বাঙালি জাতিসত্তার মধ্যে মুক্তচিন্তার এ বীজ বপনে সমর্থও হয়েছিলেন। কারণ তারা মুসলমান সমাজকে বাংলার বৃহত্তর জাগরণের সঙ্গে মিলিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। এজন্য তিনি হিন্দু-মুসলমানের বিরোধের কারণগুলোকে চিহ্নিত করে শাশ্বত বঙ্গে হিন্দু-মুসলমানের সম্মিলিত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি বাঙালিকে মনোযোগী করে তোলেন। অনগ্রসর মুসলমান সমাজে জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে মনে-মননে, মেধা ও মনীষায় কাজী আবদুল ওদুদ ছিলেন ভাবনাযোগী পুরুষ। তিনি তার প্রবন্ধের মাধ্যমে বরাবরই বাঙালি মুসলমান সমাজের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা, বুদ্ধির আড়ষ্টতা এবং চিন্তার অসারতা দূর করতে সচেষ্ট হয়েছেন। তার চিন্তাচেতনার একটি উজ্জ্বল স্বাক্ষর শাশ্বত বঙ্গ প্রবন্ধ গ্রন্থটি। এ গ্রন্থের বিভিন্ন প্রবন্ধে সাহিত্য, স্বদেশ, স্বসমাজ, ইসলামের মূল আদর্শ, মহৎ ব্যক্তিত্ব, সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মমত প্রভৃতি বিষয়ে ওদুদের চিন্তাচেতনার প্রকাশ ঘটেছে। ধর্মকে মেনে নিয়েও ধর্মচেতনার নতুন সংস্কার দাবি করেছেন আবদুল ওদুদ। যুক্তিবাদ ও ব্যক্তিগত বিচারবুদ্ধির চর্চাকে তিনি সর্বাগ্রে স্থান দিয়েছিলেন বলে ধর্ম বিষয়েও তার প্রয়োগ তিনি প্রত্যাশা করেছেন।

মুসলিম সাহিত্য সমাজের অন্যতম পুরোধা আবুল হোসেন ছিলেন অত্যন্ত প্রতিভাবান, শক্তিধর সাহিত্যিক। প্রবন্ধ সাহিত্যে তার অবদান গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তিবাদ ছিল তার সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য। তিনি সাহিত্যকে ব্যবহার করেন প্রগতিবাদী আন্দোলনের হাতিয়ার হিসেবে। তার মননশীল, বিশ্লেষণধর্মী ও বাস্তবমুখী রচনা মুসলিম-সমাজহিতৈষণার এক আদর্শ দৃষ্টান্ত। তার প্রবন্ধগুলোতে ধর্ম, দর্শন, বিজ্ঞান, সাহিত্য প্রভৃতি বিষয়কে আশ্রয় দিয়ে বাঙালি সমাজ ও মানস পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনি ধর্মের চেয়ে মানবতাকে বড় করে দেখেছেন। তার মানবতাবোধের ভিন্নতর পরিচয় পাওয়া যায় মানব কল্যাণ প্রবন্ধে। এ প্রবন্ধ মানবকল্যাণের স্বরূপ নির্ণয় করে তার সাথে সমাজ, রাষ্ট্র ও পরিবারের সম্পর্ক, মানব কল্যাণে ধর্মীয় প্রভাব ও মানব কল্যাণের । সাথে পরালৌকিক সম্পর্ক বিষয়ে মতামত ব্যক্ত করেছেন।

মুসলিম সাহিত্য সমাজের বিশেষ পুরোধা হলেন মোতাহের হোসেন চৌধুরী। এর নানা সভা ও সম্মিলনে তিনি অংশগ্রহণ করে বিভিন্ন প্রবন্ধ পাঠ করেন। তার রচিত আমাদের দৈন্য, ও আদেশপন্থী ও অনুপ্রেরণাপন্থী ও মুসলমান সাহিত্যিকদের চিন্তাধারা প্রবন্ধ সাহিত্য সমাজের সম্মেলনে পঠিত হয়। মুক্তবুদ্ধির প্রবক্তা, উদার মানবতাবাদী ও মননশীল প্রবন্ধকার হসেবে তিনি বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। সংস্কৃতি কথা তার প্রধান প্রবন্ধগ্রন্থ। তার রচনায় সংস্কৃতি, ধর্ম, মানবতাবোধ ও মানুষের জীবনধারণের মৌলিক বিষয়গুলো সংজ্ঞায়িত ও প্রকাশিত হয়েছে। মোতাহের হোসেন চৌধুরী ধর্মপন্থি এবং অনুপ্রেরণাপন্থি বলে মানুষকে দুভাগে ভাগ করেছেন। তার পরামর্শ হচ্ছে, সবার অনুপ্রেরণাপন্থি হওয়া উচিত। আর অনুপ্রেরণাপন্থি হতে হলে তাকে সংস্কৃতিবান হতে হবে।

মুসলিম সাহিত্য সমাজের অন্যতম কর্ণধার ছিলেন কাজী মোতাহার হোসেন। বাংলাদেশের প্রবন্ধ সাহিত্যে কাজী মোতাহার হোসেন এক অনন্য প্রতিভা। তিনি একাধারে সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, সংগীত এবং বিজ্ঞানী হিসেবে বিচিত্র প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। বৃদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের অন্যতম প্রবক্তা হিসেবে তিনি শিখা পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেছেন। ধর্ম, সমাজ, সাহিত্য, শিল্প, সংগীত, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান বিষয়ে প্রবন্ধ রচনা করেছেন তিনি। তার রচনাকর্মে মননশীলতা এবং গভীর জীবনবোধের পরিচয় নিহিত। অসাম্প্রদায়িক বোধবুদ্ধি দ্বারা পরিশীলিত ছিল তার সাহিত্য চিন্তা। মূলত বিশ শতকের প্রথমার্ধে শিল্প, সংস্কৃতি ও ধর্ম নিয়ে বাঙালি মুসলমান সমাজে যে নতুন চিন্তার উদ্ভব হয়, নবজাগরণের সেই চিন্তার ধ্বনি কাজী মোতাহার হোসেনের চিন্তাক্ষেত্রে আশ্রয় গ্রহণ করে। গোঁড়ামি আর প্রগতিবিমুখতার বিরুদ্ধে তিনি তার অন্য সহযাত্রীদের নিয়ে সেদিন যে ভূমিকা রেখেছিলেন, পরবর্তীকালে বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যে তার ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব সুস্পষ্ট।

মুসলিম সাহিত্য সমাজের অন্যতম প্রাণপুরুষ আবদুল কাদির ছিলেন একাধারে ছান্দসিক, কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক, সাহিত্য সমালোচক, সাময়িকপত্র সম্পাদক। শিখা পত্রিকার প্রথম সংখ্যার প্রকাশক ছিলেন তিনি।

মুসলিম সাহিত্য সমাজের মতো সংগঠন সে যুগে ছিল ব্যতিক্রমধর্মী ও বিস্ময়কর। যারা ঐ সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলেন তারা প্রত্যেকেই উচ্চশিক্ষিত ছিলেন। সাহিত্যিক, ঐতিহাসিক, দার্শনিক, সাংবাদিক, আইনবিদ প্রভৃতি গুণীজনের সমাবেশে সাহিত্য সমাজ অন্য সংগঠনের তুলনায় ভিন্নমাত্রা লাভ করে। শিখাগোষ্ঠীর চিন্তার জগৎ ছিল বিচিত্র, বিস্তৃত এবং গভীর। তাদের চিন্তা ও মতাদর্শ ব্যক্তি ও সমাজের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

সার্বিকভাবে বলা যায়, মুসলিম সাহিত্য সমাজ ছিল কেবল একটি সাহিত্যিক সংগঠন নয়; এটি ছিল বাঙালি মুসলমান সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক মুক্তির এক ঐতিহাসিক আন্দোলন।

অন্ধ সংস্কার, শাস্ত্রানুগত্য ও গোঁড়ামির বিরুদ্ধে যুক্তি, বিজ্ঞানমনস্কতা ও মানবতাবোধকে প্রতিষ্ঠা করাই ছিল এ সমাজের মৌলিক সাধনা। শিখা পত্রিকাকে কেন্দ্র করে যে মুক্তচিন্তার অনুশীলন গড়ে উঠেছিল, তা বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যকে দিয়েছে নতুন দিগন্ত, নতুন ভাষা ও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। কাজী আবদুল ওদুদ, আবুল হুসেন, মোতাহের হোসেন চৌধুরী, কাজী মোতাহার হোসেন, আবদুল কাদির প্রমুখ চিন্তকেরা তাদের মননশীল রচনার মাধ্যমে সমাজ ও মানুষের চিন্তার জগতে আলো জ্বালিয়েছেন। তারা ধর্মকে অস্বীকার না করে ধর্মচেতনার পুনর্বিন্যাস ঘটাতে চেয়েছেন যুক্তিবাদের আলোয়; মানবতাকে স্থাপন করেছেন ধর্মীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে।

মুসলিম সাহিত্য সমাজের কার্যক্রম সময়ের বিচারে সীমিত হলেও এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী।

এ সংগঠনের চিন্তাধারা পরবর্তী প্রজন্মের লেখক, চিন্তক ও সংস্কৃতিচর্চাকারীদের মধ্যে মুক্তবুদ্ধির চর্চাকে উজ্জীবিত করেছে। বাঙালি মুসলমান সমাজকে বৃহত্তর বাঙালি সংস্কৃতি ও মানবিক জাগরণের সঙ্গে যুক্ত করার যে প্রয়াস মুসলিম সাহিত্য সমাজ গ্রহণ করেছিল, তা আজও প্রাসঙ্গিক ও অনুসরণযোগ্য। তাই মুসলিম সাহিত্য সমাজকে বাংলা সাহিত্য ও চিন্তার ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী অধ্যায় হিসেবে স্বীকার করতেই হয় যেখানে সাহিত্য হয়ে উঠেছিল সমাজ রূপান্তরের শক্তিশালী মাধ্যম, আর বুদ্ধির মুক্তি ছিল তার চূড়ান্ত লক্ষ্য।