হাসান আলীম

আমার প্রথম গ্রন্থ প্রকাশ হয়েছে ১৯৮৩ সালের জানুয়ারি মাসে। এটি ছিল আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ। নাম “শ্বাপদ অরণ্যে অগ্নি শিশু”। এর প্রকাশক ছিলেন আমারই কাব্যসতীর্থ কবি আসাদ বিন হাফিজ, প্রত্যয়ী প্রকাশ, ৮৫, মীর হাজির বাগ ঢাকা- ৪। আর এর মুদ্রাকর ছিলেন আমার কলেজ জীবনের বন্ধু বিশিষ্ট ফটো সাংবাদিক আবদুর রাজ্জাক। প্রচ্ছদ শিল্পী ছিলেন বিশিষ্ট কবি, সাংবাদিক ও সম্পাদক নূরুল ইসলাম।

এই বইয়ে নয়টি কবিতা রয়েছে। শিরোনাম কবিতা- শ্বাপদ অরণ্যে অগ্নিশিশু, এবং অন্যান্য কবিতা আমাকে একটি আলিঙ্গণ দাও, একটি শিশুর আগ্নেয় প্রসব, উজান রাতের সকাল, আঁধার গাঁয়ের কথা, গৃহের অধিবাসীরা যখন, মাটির কেলাস থেকে, পানকৌড়ি, সুজনের কাছে লিখছি।

আমি তৃতীয় শ্রেণি থেকে ছড়া কবিতা লিখতে থাকি কিন্তু স্থানীয় পত্র পত্রিকায় ছাপা হতে থাকে সপ্তম শ্রেণির ছাত্র অবস্থায়। এই বইয়ের কবিতাগুলো রচনা করেছিলাম ১৯৮১ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত।

কাব্য সতীর্থদের মধ্যে প্রথমে আমি কবিতার বই প্রকাশ করতে চাইনি কিন্তু কবি মতিউর রহমান মল্লিক, কবি আসাদ বিন হাফিজ এবং ফটো সাংবাদিক আবদুর রাজ্জাকের পীড়াপীড়িতে

একটি পাণ্ডুলিপি জমা দিতে হয় তাদের কাছে।

এই পাণ্ডুলিপিতে অনেক কবিতা ছিলো। এরা তা থেকে বাছাই করে আমার দীর্ঘ কবিতা “শ্বাপদ অরণ্যে অগ্নিশিশু” শিরোনামের প্রায় ৯০০ পঙক্তির এই দীর্ঘ কবিতা নিয়ে বই প্রকাশ করতে চায়। আমি তাতে রাজি হইনি। আমার পরামর্শে আরও কিছু কবিতা নিয়ে বইটি প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

উল্লেখ্য “শ্বাপদ অরণ্যে অগ্নিশিশু “ কবিতাটি মরহুম প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে কেন্দ্র করে লেখা হয়। এ বিষয়টি আজ দীর্ঘ সময় পরে প্রকাশ করা কর্তব্য বলে মনে করছি। স্বাধীনতার ঘোষক প্রসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মৃত্যু আমাকে দারুণভাবে বিচলিত এবং শোকার্ত করেছিলো। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের ছাত্র। থাকি ফজলুল হক মুসলিম হলের এক্সটেনশন ৩৩ নম্বর রুমে। রাত জেগে জেগে বিপুল আবেগে এই ৯০০ পঙক্তির দীর্ঘ কবিতাটি লিখেছিলাম কয়েক দিন ধরে। আমি তখন রসায়নের বিএসসি অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্র।

এই কবিতাটি টানা গদ্য ফর্মের কবিতা। এছাড়া “আঁধার গাঁয়ের কথা, “ কবিতাটি স্বরবৃত্ত ছন্দের চার মাত্রার চালে রচিত, “পানকৌড়ি “ কবিতাটি মাত্রাবৃত্ত ছন্দের ছয় মাত্রার চালে রচিত। বাকি কবিতাগুলো গদ্য ফর্মের কবিতা। কবিতাগুলোর বিষয়বস্তু দেশপ্রেম এবং আদর্শপ্রেম।

বইটি প্রকাশের জন্য প্রকাশক আর্থিক সহযোগিতা চাইলেন। প্রকাশক এবং লেখক যেহেতু ছাত্র তাই এ জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন আমার মমতাময়ী মা জননী। বই প্রকাশের যাবতীয় খরচ বহন করলেন তিনি। এ জন্য আমি পুত্র হিসেবে তার কাছে চিরঋণী এবং চমৎকৃত।

কোন মা বাবা চাননা তার মেধাবী ছেলে কবিতা লিখে অপ্রতিষ্ঠিত হোক। কিন্তু আমার মা এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম, তিনি ছিলেন সংস্কৃতমনা এবং পুত্রের মেধা ও যোগ্যতার ব্যাপারে দারুণ আশাবাদী।

বইটি প্রকাশের সময় আমি গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরে ছিলাম। বইটির প্রচ্ছদ নিয়ে নানা জল্পনা কল্পনা ছিলো। আমার মুখোচ্ছবির ফটোগ্রাফ তুলে রেখেছিল ফটো সাংবাদিক আবদুর রাজ্জাক। এটিকে কারুকাজ করে প্রচ্ছদ ছবি করেছিলেন নূরুল ইসলাম। এ খবরটি বেশ পরে জেনেছিলাম।

ঢাকায় এসে বন্ধুবর কবি আসাদ বিন হাফিজের প্রীতি প্রকাশন থেকে বইটি কিছু কপি সংগ্রহ করি। এরপর বইটির আলোচনা লিখেছিলেন মাখরাজ খান সহ আরও অনেকে। ছাত্রী সংস্থার তৎকালীন নেত্রী ফজিলাতুন্নেছা মিতু তার একটি ছোটগল্পে আমার এ বইয়ের প্রশংসা করেন অভিনব কৌশলে । এতে আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম।

রসায়ন ক্লাসে প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক, কথাশিল্পী ও নাট্যকার অধ্যাপক ড. হুমায়ুন আহমেদ আমার এ বইয়ের খবর জেনে ক্লাসে খুব প্রশংসা করলেন, আমার ক্লাসমেটদের বইটি সংগ্রহ করতে নির্দেশ দিলেন। ক্লাস শেষে সায়েন্স ক্যাফেটেরিয়ায় আমাকে এ জন্য মিষ্টি মুখ করালেন। আমাকে তাঁর দুটো বই ‘শঙ্খনীল কারাগার’ এবং ‘নিশিকাব্য ‘ উপহার দিলেন। এটি ছিলো আমার লেখক জীবনের একটি সেরা ঘটনা।