উমাইর আফতাব
কী আগে - লেখা না পুরস্কার? লেখক না পদক? মান না সম্মান? নিঃসন্দেহে পুরস্কার পাওয়া সম্মানের বিষয়। লেখার মানের উপর তা দেওয়া হয়। একজন লেখক, কবি বা সাহিত্যিক সবসময় চান একটা ভালো মানের লেখা লিখতে। তিনি তার ভালো মানের বা মানসম্মাত লেখার জন্য এই সম্মান আশা করতেই পারে। তবে লেখকেরা প্রথমত এই আশায় লেখালেখি করে না। পরেও করে না। পুরস্কার না পেলেও তারা লেখার কাজ চালিয়ে যান। অন্যদিকে কেউ কেউ পুরস্কার আশা করে। কেউ কেউ অতিমাত্রায় লালায়িত থাকে। আজ আমাদের লেখক সমাজের একটা অংশ পুরস্কারকে অনেক বড় কিছু মনে করে। অনেকে পুরস্কারের জন্য তদবিরও করে, দেনদরবার করে। লেখালেখির হাত-পা গজানোর আগেই অনেকের প্রাপ্তির ভাণ্ডার বেশ সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। আবার অনেক ক্ষেত্রে পুরস্কারটাই কলঙ্কিত হয়ে ওঠে।
আমাদের কাছে পুরস্কারটাই আজ আগে মনে হয়। এটাই অগ্রাধিকার। এটাকে আমরা অতীব জরুরি বলে ধরে নিয়েছি। অথচ লেখালেখি করার জন্য পুরস্কার মোটেই জরুরি নয়। পুরস্কারের জন্য একজন লেখককে ভালো লেখা লিখতে হয়। ভালো লেখার স্বীকৃতি স্বরূপ কিংবা অন্যান্য ক্ষেত্রে যোগ্যতা, দক্ষতা, কর্মের মূল্যায়ন স্বরূপ কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বা কেউ কাউকে পুরস্কৃত করতে পারে। কিন্তু এর জন্য সবার আগে কর্মের গুণগত মান অপরিহার্য। পুরস্কার পেলে একটা স্বীকৃতি মেলে। ইচ্ছাশক্তির উপর বাড়তি অনুপ্রেরণা যুক্ত হয়ে লেখককে আরো উৎসাহিত করে তোলে। লেখাই যদি না হয় পুরস্কারের আশা জাগবে কেন মনে? মানসম্মত লেখা হয় না অথচ আমাদের পুরস্কার নিয়ে হইচইয়ের অন্ত নাই। আমরা এখন পুরস্কারকেই আগে ভাবছি, মুখ্য ভাবছি। কবি বা লেখক বা সাহিত্যিক হয়ে ওঠার হাতিয়ার ভাবছি। শ্রম, সাধনা, মেধা ভালো লেখার জন্য নিয়োজিত করছি না।
আমাদের দেশে পুরস্কার দেওয়া হয় কতটুকু মান বজায় রেখে? ইদানিং এটা নিয়ে বেশি বিতর্ক দেখা যায়। নানা কারণে আমাদের দেশে সাহিত্য পুরস্কারগুলো বিতর্কের উর্ধ্বে উঠতে পারে না। এখানে পুরস্কার একটা অপদার্থ বস্তুর মতোন। যার লেখা হয় না সেও ছোটে পুরস্কারের লোভে। আমাদের যাচাই পদ্ধতি উন্মুক্ত না। ফলে কে কি দিচ্ছে, কাকে দিচ্ছে এসব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে কথা হয়। স্বচ্ছতার অভাব থাকায় অভিযোগ ওঠে প্রায়। এখন এই পুরস্কার দেওয়া-নেওয়ার বিষয়টা অনেকটাই হালকা বলে মনে হয়।
পুরস্কারের মোহ আমাদের লেখকদের মধ্যে প্রবল। এটা বিগত বেগ কয়েক বছর ধরে যেন আরো বেড়ে গেছে। লেখা হোক বা না হোক পুরস্কার তার চাই। এই চাওয়াটা মনে মনে থাকলে ভালো হতো। কিন্তু সেটা মনের ভিতর আর লুকানো থাকে না। একজন লেখকের এটা মনের ভিতর থাকলে সেই লেখক লেখার প্রতি হয়তো আরো অধিক আগ্রহী হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু অনেকেই মনের ভিতর রাখতে পারে না। চেয়েও পুরস্কার নেয়। বয়সে মুরুব্বীদেরও দেখা যায় পুরস্কারের পিছনে ছুটতে। এই চাওয়াটাই কেন যেন আজকাল অনেক বড় হয়ে উঠেছে লেখদের কাছে।
লেখক তার লেখার জন্য পুরস্কার পাবে এটা স্বাভাবিক। অথচ এটাকেই অস্বাভাবিক পর্যায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কে পেল না পেল বড় বিষয় না। পদক ঘোষণার পর বিতর্কের ঝড় ওঠে। নানা দিক থেকে তখন ব্যক্তির দুর্বলতাগুলো তুলে ধরা হয়। লেখার মান নিয়ে প্রশ্ন করা হয়। কিন্তু যারা যাচাইবাচাই করে তারা কি এই মান দেখেছে? যদি দেখে থাকে তাহলে তারা মানহীনকে পদক দিল কেন? যদি না দেখে থাকে তাহলে তো জড়িতরা নিজেরাই প্রশ্নবোধক হয়ে দাঁড়ায়। যোগ্যতাস¤পন্ন লেখক, কবি, সাহিত্যিক থাকার পরও দুর্বল কাউকে দিলে প্রশ্ন ওঠায় স্বাভাবিক। পুরস্কার দিতেও কষ্ট করা লাগে। যারা দেয় তাদের লেখক, লেখা যাচাই-বাছাই করতে হয়। ভালো লেখা খুঁজে খুঁজে বের করতে হয়। তবে এই কাজটা এখনকার দিনে সেভাবে হয় বলে শোনা যায় না। বিভিন্ন রকম সন্দেহের কথা শোনা যায়। স্বজনপ্রীতির কথা ওঠে। অর্থের বিনিময়ের কথা শোনা যায়। দুনীতির কথা চলে আসে। এজন্য যারা দেয় তাদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া ও বিবেচনাবোধ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
পুরস্কার হোক মানসম্মত। ভালো মানের লেখার জন্য। ভালো লেখকের জন্য। মুখ চিনেচিনে নয়। পুরস্কার হোক বিতর্কমুক্ত। স্বীকৃতির প্রক্রিয়াটাও যেন স্বচ্ছতার মাধ্যমে হয়। এতে পুরস্কারের মানও বাড়ে। মর্যাদাও বাড়ে। তাই লেখকরা আগে লেখক হয়ে উঠুন। পুরস্কারের পিছনে না ছুটে লেখার পিছনে শ্রম দেন। কাজে লাগবে সেটা। হয়তো এই পরিশ্রমের জন্য কোনো না কোনো পুরস্কার পেয়েও যেতে পারেন। সেটাই কি উত্তম নয়?
এটা নিতেই হবে এমন কোনো জরুরি বিষয় নয়। কত লেখকই তো কত পুরস্কার নেয়নি। দেওয়া হলেও গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ফেরত দিয়েছে। যারা একাজ করেছে তারা সাহসের পরিচয় দিয়েছে। শুরুতে না বলতে পারাটার জন্য সাহস লাগে। এই সাহসটা সবার থাকে না। একজন প্রকৃত লেখকের এই সাহস থাকে। কখনো কেউ কি শুনেছে অলেখকরা কোনো পুরস্কার ফেরত দিয়েছে? বেশি ভাগই তো লালায়িত থাকে, ফেরত দেবে কি! ফেরত দেওয়ার প্রশ্নই আসে না!
পুরস্কার নিয়ে নানা সময়ে কথাবার্তা ওঠে। বিতর্কের জন্ম দেয়। আমরা এসবের অবসান চাই। কোনো পুরস্কার যেন বিতর্কিত না হয়। কোনো অলেখকের মানোত্তীর্ণ লেখার স্বীকৃতি প্রদানের মধ্যে দিয়ে পুরস্কার যেন অমর্যাদার হয়ে না দাঁড়ায়। কলঙ্কমুক্ত হোক লেখক, কবি, সাহিত্যিকদের জন্য ঘোষিত পুরস্কার। সুন্দর, স্বচ্ছ হোক এর সফল আয়োজন। যে-কোনো পুরস্কার হয়ে উঠুক মর্যাদার। লেখকরা পাক তার প্রকৃত স্বীকৃতি।