মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন
‘জাতিসত্তার কবি’ হিসেবে পরিচিত আবদুল হাই শিকদারের সাহিত্যচর্চা বহুমাত্রিক হলেও কবিতার জগতে তাঁর পদচারণা সবচেয়ে উজ্জ্বল। আশির দশক থেকে সক্রিয় এই কবির লেখনীতে প্রেম, প্রকৃতি, মানবতা ও আধ্যাত্মিকতার পাশাপাশি প্রবলভাবে উপস্থিত থেকেছে বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী চেতনা, সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন এবং শোষণমুক্ত সমাজের আকাক্সক্ষা। তার কাব্যগ্রন্থগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘আশি লক্ষ ভোর’, ‘আগুন আমার ভাই’, ‘এই বধ্যভূমি একদিন স্বদেশ ছিলো’, ‘কবিতাসমগ্র’, ‘কসম’, ‘নদীর মেয়ে বাংলাদেশ’ এবং ‘ইশক আবাদ’। শিকদারের কবিতা শব্দ ও ছন্দের নান্দনিক কারুকার্যকে ছাপিয়ে একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক ভাষ্য হয়ে ওঠে। তিনি তাঁর কবিতায় বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের সংগ্রাম, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য এবং ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারকে ধারণ করেন। তাঁর কবিতার ভাষা শক্তিশালী ও আপসহীন, যা পাঠককে নিজের শেকড় ও পরিচয়ের মুখোমুখি দাঁড় করায়।
আবদুল হাই শিকদার কেবল একজন কবিই নন, তিনি একজন নিবিষ্ট প্রাবন্ধিক ও ইতিহাস অনুসন্ধানী লেখক। সাহিত্য-সংস্কৃতির পাশাপাশি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও ঐতিহাসিক ঘটনাবলী নিয়ে তাঁর গবেষণা ও লেখালেখি বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। তাঁর রচিত প্রবন্ধ ও ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থগুলোর মধ্যে ‘জানা অজানা মওলানা ভাসানী’, ‘জ্যোতির্ময় জিয়া এবং কালো মেঘের দল’, ‘হারিয়ে যাওয়া হায়দারাবাদ’, ‘যে প্রাণ অফুরান: ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস’ এবং ‘বাংলাদেশের অলি আহাদ’ উল্লেখযোগ্য। এই গ্রন্থগুলিতে তিনি প্রচলিত ইতিহাসের বাইরে গিয়ে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে ঘটনাবলী ও ব্যক্তিত্বকে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছেন। তাঁর গদ্যে গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও তথ্যের সমাবেশ ঘটেছে, যা তাঁকে একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঐতিহাসিক ভাষ্যকারের মর্যাদা দিয়েছে। জাতীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্য অনুসন্ধানে গণমাধ্যমেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন; বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত তাঁর শিকড় সন্ধানী ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান “কথামালা” তাঁকে ব্যাপক জনপ্রিয়তা এনে দেয়।
আবদুল হাই শিকদারের কাব্যচর্চা ও ইতিহাস বিষয়ক লেখনী পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়, বরং একে অপরের পরিপূরক। তাঁর কবিতায় যে ইতিহাসচেতনা, জাতীয়তাবোধ ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের স্বরধ্বনিত হয়, তার তাত্ত্বিক ও বাস্তবিক ভিত্তি তিনি নির্মাণ করেন তাঁর প্রবন্ধ ও গবেষণামূলক লেখায়। কবিতায় তিনি যে শোষণ, আধিপত্যবাদ ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে শৈল্পিক প্রতিরোধ গড়ে তোলেন, তাঁর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও যৌক্তিকতা তিনি তুলে ধরেন তাঁর গদ্যে। উদাহরণস্বরূপ, তাঁর ‘কসম’ কবিতায় উচ্চারিত সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের দৃপ্ত শপথের পেছনে রয়েছে তাঁর ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থাবলীতে উপস্থাপিত গভীর ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ। এভাবেই তাঁর কবিতা ও গদ্য একটি অখণ্ড উদ্দেশ্যকে ধারণ করেÑআর তা হলো বাংলাদেশের জাতিসত্তার স্বরূপ সন্ধান এবং তার ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তিকে সুদৃঢ় করা।
কবিতা কেবল নিছক সৌন্দর্যচর্চা বা ব্যক্তিগত অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যম নয়, বরং তা একটি জাতির ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ধারক। কবি তাঁর সমকাল ও অতীতকে ধারণ করে ভবিষ্যতের জন্য রচনা করেন দিকনির্দেশনামূলক পঙক্তিমালা। বাংলাদেশের সমকালীন কবিতায় যে ক’জন কবি তাঁদের লেখনীতে ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে সফলভাবে ধারণ করেছেন, তাঁদের মধ্যে আবদুল হাই শিকদার অন্যতম। তাঁকে ‘জাতিসত্তার কবি’ হিসেবে অভিহিত করা হয়, কারণ তাঁর কবিতার পরতে পরতে জড়িয়ে আছে দেশ, মাটি, মানুষ এবং তাদের হাজার বছরের সংগ্রামের গৌরবময় ইতিহাস। শিকদারের কবিতা শুধুমাত্র নান্দনিকতার অর্ঘ্য নয়, বরং তা বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়ের সংকট, ঐতিহাসিক বিজয়, বিপর্যয় এবং সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষার এক শৈল্পিক দলিল। তাঁর কবিতায় ইতিহাসচেতনা এতটাই প্রবল যে, অতীত যেন বর্তমানের সঙ্গে কথা বলে ওঠে, পাঠককে দাঁড় করিয়ে দেয় তার শেকড়ের মুখোমুখি।
আবদুল হাই শিকদারের কবিতার একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে বাংলাদেশের দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রেক্ষাপট এবং জাতিগত পরিচয়ের অন্বেষণ। তিনি ইতিহাসকে কেবল সাল-তারিখের নীরস পরিসংখ্যান হিসেবে দেখেন না, বরং তাকে এক জীবন্ত সত্তা হিসেবে উপস্থাপন করেন, যা বর্তমানের পথচলায় প্রেরণা জোগায়। তাঁর “জুলাই বাংলাদেশ” কবিতাটি এর এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। জুলাই মাসকে তিনি এখানে একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে নতুন অর্থ দান করেছেন। কবিতাটির ছত্রে ছত্রে ধ্বনিত হয়েছে মুক্তি, স্বাধীনতা এবং এক রক্তস্নাত জাতির পুনর্জাগরণের কথা। তিনি লিখেছেন, “আমার ভাইয়ের রক্ত মাখা জুলাই অনিঃশেষ, / জুলাই তুমি স্বাধীন সকাল তুমিই বাংলাদেশ।” এই পঙক্তি কেবল একটি মাসের বন্দনা নয়, এটি সেইসব অগণিত মানুষের আত্মত্যাগের প্রতিচ্ছবি, যাদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। এখানে ‘জুলাই’ একটি রূপক, যা জাতির জীবনে ঘটে যাওয়া কোনো ইতিবাচক ও মুক্তিপরায়ণ পরিবর্তনের প্রতীক। কবিতাটিতে তিনি দানবীয় শক্তির বিনাশ এবং চোরের বংশ ধ্বংসের কথা বলে মূলত বাংলাদেশের ঐতিহাসিক শত্রুদের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন, যারা বিভিন্ন সময়ে এই মাটির স্বাধীনতা ও সমৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
শিকদারের ইতিহাসচেতনার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তাঁর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি গভীর অনুরাগ এবং আগ্রাসনের বিরুদ্ধে শৈল্পিক প্রতিরোধ। তিনি তাঁর ‘কসম’ কবিতায় অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে নিজ সংস্কৃতি ও পরিচয়ের প্রতি অবিচল থাকার শপথ গ্রহণ করেছেন। এই দীর্ঘ কবিতায় তিনি একে একে তাঁর পিতা-মাতা, শৈশবের গ্রাম, প্রিয়তমা নারী, মাতৃভূমি, ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি, লালন, হাছন রাজা, আব্বাস উদ্দিন থেকে শুরু করে কপোতাক্ষ, ষাটগম্বুজ, পল্টন ময়দান পর্যন্ত প্রায় সমস্ত সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক প্রতীকের নামে শপথ করে বলছেন যে, তিনি এই পরিচয় কিছুতেই বদলাতে পারবেন না। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন, “আমার পরম শ্রদ্ধেয় পিতার নাম আমি/ বদলাতে পারবো না। / আমার মমতাময়ী মায়ের নাম আমি / বদলাতে পারবো না। / আমার শৈশবের গ্রামের নাম আমি / বদলাতে পারব না।” এই উচ্চারণ কেবল ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রকাশ নয়, বরং এটি একটি সম্মিলিত সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের ইশতেহার। কবি যখন বলেন, “আমি আব্বাস উদ্দিনের বদলে আদভানিকে / ভালোবাসতে পারবো না” বা “আমি নজরুলের বদলে নরেন্দ্র মোদীকে / নিতে পারবো না”, তখন তাঁর ইতিহাস ও রাজনৈতিক চেতনা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি এখানে নিছক ব্যক্তি বা শিল্পীর কথা বলছেন না, বরং দুটি ভিন্ন সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ধারার কথা বলছেন। আব্বাস উদ্দিন বা নজরুল বাঙালি মুসলমানের সাংস্কৃতিক জাগরণের প্রতীক, অন্যদিকে আদভানি বা নরেন্দ্র মোদী এক ভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মতাদর্শের প্রতিনিধি। এর মাধ্যমে কবি মূলত সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষার সংগ্রামের কথাই বলেছেন।
আবদুল হাই শিকদারের কবিতায় ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব ও তাঁদের অবদান বারবার ফিরে এসেছে। তিনি পলাশীর প্রান্তরে সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় থেকে শুরু করে মওলানা ভাসানী, শেরে বাংলা, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং জিয়াউর রহমানের মতো ঐতিহাসিক নেতাদের তাঁর কবিতায় স্থান দিয়েছেন। ‘তারেক রহমান’ কবিতায় তিনি তারেক রহমানকে নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে চিত্রিত করেছেন, যার হাতে জিয়াউর রহমানের আদর্শের পতাকা। তিনি লিখেছেন, “তারেকের হাতে জিয়ার নিশান, খালেদার স্নেহমায়া, / তারেকের মুখে ফুটে আছে দেখো বাংলাদেশের ছায়া।” এখানে ইতিহাস কেবল অতীত নয়, বরং তা বর্তমান ও ভবিষ্যতের পথনির্দেশক। একইভাবে, তিনি ‘কবিতার সেনাপতি’ কবিতায় কবি আল মাহমুদকে বাংলা কবিতার এক ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। গেটে, বায়রন, রুমি, নজরুল, জসীমউদ্দীন এবং জীবনানন্দের মতো কালজয়ী কবিদের কাতারে আল মাহমুদকে স্থাপন করে তিনি বাংলা কবিতার এক বিশাল ঐতিহাসিক ক্যানভাস তুলে ধরেছেন। এর মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে, কোনো কবিই বিচ্ছিন্ন নন, তিনি তাঁর পূর্বসূরিদের দ্বারা নির্মিত পথের ওপর দাঁড়িয়েই নতুন পথ তৈরি করেন।
আবদুল হাই শিকদারের কবিতার পরিধি শুধু বাংলাদেশের ইতিহাসে সীমাবদ্ধ নয়; আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ঘটে যাওয়া অন্যায় ও নিপীড়নের বিরুদ্ধেও তিনি সমান সোচ্চার। তাঁর “হামাস” কবিতাটি এর একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এই কবিতায় তিনি ফিলিস্তিনের জনগণের ওপর চলমান নিপীড়ন এবং মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উদাসীনতাকে তীব্র ভাষায় সমালোচনা করেছেন। তিনি আফ্রিকার নেতা প্যাট্রিস লুমুম্বা এবং নেলসন ম্যান্ডেলার সংগ্রামের কথা স্মরণ করে ফিলিস্তিনের মুক্তি সংগ্রামের প্রতি তাঁর সমর্থনব্যক্ত করেছেন। তিনি লিখেছেন, “ফিলিস্তিনে মানবতার বধ্যভূমির বিরুদ্ধে/ ঘৃণার তুফান তোলে বলিভিয়া। / ক্রোধের বিস্ফোরণ ঘটে কলম্বিয়ায়। / .../আর মুসলিম শাসকেরা ইয়াংকিদের পায়ের উপর সিজদায় পড়ে আছে।” এই পঙক্তিগুলো তাঁর গভীর আন্তর্জাতিকতাবোধ এবং ঐতিহাসিক সচেতনতার পরিচায়ক। তিনি ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমানের সংকটকে বিশ্লেষণ করেছেন এবং সাম্রাজ্যবাদী ও আধিপত্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে তাঁর লেখনীকে শাণিত করেছেন।
আবদুল হাই শিকদারের কবিতা তাই কেবল শব্দ বা ছন্দের খেলা নয়, তা এক চলমান ইতিহাস। তিনি তাঁর কবিতায় একটি জাতির উত্থান-পতন, তার সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং তার ভবিষ্যৎ স্বপ্নের এক অখণ্ড আখ্যান রচনা করেছেন। তাঁর ভাষা কখনও বজ্রের মতো কঠিন, কখনও বা নদীর মতো স্নিগ্ধ, কিন্তু তাঁর মূল লক্ষ্য সর্বদা জাতিসত্তার শেকড় সন্ধান করা। তিনি ইতিহাসকে বর্তমানের আয়না হিসেবে ব্যবহার করেছেন, যার মাধ্যমে একটি জাতির আসল মুখচ্ছবি দেখতে ও দেখাতে চেয়েছেন। তাঁর কবিতা পাঠ করলে একজন পাঠক কেবল শিল্পের রসাস্বাদন করেন না, বরং তিনি তাঁর নিজের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং পরিচয়ের মুখোমুখি হন। এ কারণেই আবদুল হাই শিকদার বাংলাদেশের কবিতায় একজন স্বতন্ত্র ও অপরিহার্য কবি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবেন, যাঁর কবিতা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ইতিহাস ও জাতিসত্তার পাঠ হিসেবে বিবেচিত হবে।