ড. আশরাফ পিন্টু
১৯৯৬ সালের অক্টোবর মাস। তখন আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এম.এ. (বাংলা) শেষবর্ষের পরীক্ষার্থী। পাবনা থেকে বন্ধু ইসলাম ফেরদৌসের একটি চিঠি পেলাম। হলুদ রঙের লম্বা সাইজের খামটি খুলতে চিঠির সঙ্গে একটি ফরম বেরিয়ে এলো। (যা বাংলা একাডেমির তরুণ লেখক প্রকল্পের আবেদন ফরম)। সময় খুব কম। তাড়াতাড়ি ফরমটি পূরণ করে ডাকে পাঠালাম। মাসখানেক পর ইন্টারভিউ কার্ড এলো। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে পরীক্ষা (তারিখটি মনে নেই)। একই সময়ে আমার এম.এ. পরীক্ষারও একটি পত্রের পরীক্ষা ছিল। কাজেই তরুণ লেখক প্রকল্পের ইন্টারভিউ দেয়া আর হলো না। খুবই মনোবেদনা নিয়ে এম.এ. পরীক্ষা শেষ করে বাড়ি (পাবনা) চলে এলাম। ইতোপূর্বে পাবনার দুই লেখক বন্ধু (ইসলাম ফেরদৌস ও মির্জা তাহের জামিল) তরুণ লেখক প্রকল্পের প্রথম ও তৃতীয় ব্যাচে ছিল। আমি যেটায় আবেদন করেছিলাম সেটাই শেষ (চতুর্থ ব্যাচ)। স্কুল জীবন থেকেই লেখালেখি করি। স্বপ্ন ছিল লেখক হবার। কিন্তু তা আর হলো না! একরাশ হতাশায় নিমজ্জিত হলাম আমি।
কিছুদিন পর হঠাৎ করেই ঢাকা থেকে ছোট দুলাভাই নজরুল ইসলামের একটি চিঠি পেলাম। তিনি বি.আর.টি.সিতে চাকরি করতেন। তার বাসা ছিল কল্যাণপুরের দক্ষিণ পিরেরবাগে। বাসার কাছেই আনিসুর রহমান নামে তার এক বন্ধুর বাসা ছিল। তিনি বাংলা একাডেমির উপপরিচালক ছিলেন। তিনি দুলাভাইকে জানিয়েছেনÑ অনিবার্য কারণবশত বাংলা একাডেমির তরুণ লেখক প্রকল্পের স্থগিতকৃত ভর্তি পরীক্ষাটি জানুয়ারি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে (তারিখটি মনে নেই) হবে। আপনার শ্যালক তো দরখাস্ত করেছিল, ওকে জানাবেন।
চিঠি পাওয়ার পর দেখি হাতে মাত্র দু’দিন সময় আছে। আমি পরদিনই ঢাকায় বোনের বাসায় চলে গেলাম এবং তার পরের দিন ভর্তি (বাছাই) পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করলাম। অনেক প্রশিক্ষণার্থীর মধ্যে আমরা ৪০ জন লিখিত ও ভাইভা পরীক্ষায় নির্বাচিত হলাম। উল্লেখ্য, আমাদের ভাইভাবোর্ডে ছিলেন কবি রফিক আজাদ, কথাসাহিত্যিক রশীদ হায়দার প্রমুখ প্রখ্যাত লেখকগণ। আমার প্রায় হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নপূরণ হওয়ায় আমি মনে মনে বিধাতাকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করলাম।
জানুয়ারিতে আমাদের প্রশিক্ষণ ক্লাস শুরু হবার কথা থাকলেও অনিবার্য কারণবশত ভর্তি পরীক্ষা পিছানোর কারণে ক্লাস শুরু হলো ফেব্রয়ারি মাসের ১ তারিখ থেকে। আমাদের প্রশিক্ষণকালীন মেয়াদ ছিল ৬ মাস (জানুয়ারি-জুন ’৯৭) কিন্তু আমরা সময় পেয়েছিলাম ৫ মাস। এই ৫ মাসে আমাদের প্রশিক্ষণ ক্লাস নিয়েছেন দেশ-বিদেশের প্রথিতযশা সব কবি-সাহিত্যিক। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলেন: কবি শামসুর রাহমান (তৎকালীন বাংলা একাডেমির চেয়ারম্যান), ইতিহাসবিদ সৈয়দ আনোয়ার হোসেন (তৎকালীন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক), কবি আসাদ চৌধুরী (প্রকল্প পরিচালক), কবি নূরুল হুদা (মহাপরিচালক)। আমার জানা মতে, প্রকল্পটি ছিল তাঁরই মস্তিষ্কজাত। তিনিই লেখক তৈরির এই মহত্তম উদ্যোগটি বাস্তবায়িত করেছিলেন। এছাড়া অন্যান্য যাঁরা ক্লাস নিয়েছেন তারা হলেন : কবি রফিক আজাদ, কবি সৈয়দ শামসুল হক, নাট্যকার মমতাজ উদ্দীন আহমদ, নাট্যকার সেলিম আল দীন, নাট্যকার রাজিব হুমায়ূন, ফোকলোরবিদ ওয়াকিল আহমদ প্রমুখ। এছাড়া কয়েকজন বিদেশি কবি-সাহিত্যিকও অতিথি হিসেবে আমাদের প্রশিক্ষণ ক্লাস নিয়েছেন। তারা হলেন: বিখ্যাত পোলিশ সাহিত্যিক এলিজাবেথ ওয়াল্টার। তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে পি-এইচ.ডি. ডিগ্রিধারী। তিনি বাঙালিদের মতোই সুন্দর বাংলা বাচনভঙিতে ক্লাস নিয়েছিলেন। ভিজিটর ক্লাস নিয়েছিলেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে আগত পবিত্র সরকার এবং আসাম থেকে আগত এলাংবম নীলকান্তসিংহ।
এতজন কবি-সাহিত্যিকের মধ্যে শুধু একজনের একটি ক্লাসের রোমান্টিক কথার উল্লেখ না করে পারছি না। তিনি হলেন কবি ও কথাসাহিত্যিক সৈয়দ শামসুল হক। সৈয়দ হক বাংলা একাডেমির সেমিনার রুমে ক্লাস নিচ্ছিলেন। তিনি তরুণদের উৎসাহিত করার জন্যই বুঝি ক্লাসের মধ্যে তার তরুণ বয়সের একটি স্মৃতিচারণ করলেন :
শৈশবে খুব দুষ্ট ছিলাম আমি। আমার এক বন্ধু ছিল। সে মাদরাসায় পড়ত। মুয়াজ্জিনের অনুপস্থিতিতে মাঝে মাঝে মসজিদে আজানও দিতো। মাদরাসার ছেলেরা সাধারণত দুষ্টু হয়। কিন্তু দুষ্টুমিতে ওর চেয়ে কয়েক ধাপ বেশি ছিলাম আমি। দুজনেই সারাদিন টো-টো করে ঘুরে বেড়াতাম। গাছের ডালে বসে আম খেতাম, প্রবল বৃষ্টির মধ্যে পুকুরে মাছ ধরতাম। এভাবে কাটতো আমাদের দিন। আস্তে আস্তে কৈশোরে পদার্পণ করলাম। আরো একজন সঙ্গী হলো। চঞ্চল চটপটে স্বভাবের একটি মেয়ে। ভারী দুষ্টু। খুব জ¦ালাত মেয়েটি আমাকে। ওর সাথে সহজে আমরা কেউ পেরে উঠতাম না। হঠাৎ ও একদিন আমাকে বলল, ‘‘তুই যদি আমাকে একটি কবিতা লিখে দিতে পারিস তবে পুরস্কারস্বরূপ আমার কাছে থেকে একটি ‘চুমু’ পাবি।’’
চুমুর বিনিময়ে কবিতা! কবিতার পুরস্কার চুমু! লাখ টাকা দিলেও আমি এতটা উৎসাহ পেতাম কি না কে জানে? আমি ওর প্রস্তাবে রাজী হয়ে গেলাম। সৈয়দ হক একটু থেমে বললেন, প্রথম কবিতার সম্মানি পেয়েছিলাম ওই চুমু। এরপর কত কবিতা লিখেছি কিন্তু কেউ আর এমন প্রস্তাব দেয় নি।
সৈয়দ শামসুল হকের কথায় ক্লাসের সবাই এক সঙ্গে হাসিতে ফেটে পড়ল।
ওই সময়ে ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে এবং ক্লাস শেষে অনেক কবি-সাহিত্যিকের বাসায় আমি গিয়েছি। এ ব্যাপারে আমাকে সহযোগিতা করেছে আমার ব্যাচের তরুণ লেখক বন্ধু নাট্যাভিনেতা লুৎফুল আহসান বাবু। ওর মোটরবাইকে করে বাসায় গিয়ে বিখ্যাত সব কবি-সাহিত্যিকের বাসায় গিয়ে সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। এরকম ২৫ জন কবি-সাহিত্যিকের সাক্ষাৎকার নিয়ে তাদের ছবিসহ ‘‘অন্যরকম গল্প’ নামে ৪ ফর্মার একটি বইও বের করেছিলাম। উপরে বর্ণিত কবি-সাহিত্যিক ছাড়াও এই বইতে যাঁদের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম তারা হলেন : কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ, কবি আল মাহমুদ, কবি সৈয়দ আলী আহসান, কথাসাহিত্যিক শওকত ওসমান, রশীদ হায়দার, কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ, বিজ্ঞানী আব্দুল্লাহ আল মুতী, লোকবিজ্ঞানী আশরাফ সিদ্দিকী, কবি নির্মলেন্দু গুণ, শিশুসাহিত্যিক রোকনুজ্জামান (দাদা ভাই), সুকুমার বড়ুয়া, কথাসাহিত্যিক শওকত আলী, হায়াৎ মামুদ, কবীর চৌধুরী, মুস্তফা নূর-উল-ইসলাম প্রমুখ। এঁদের জ্ঞানগর্ভ আলোচনা আমার লেখকজীবনের পথনির্দেশক হিসেবে কাজ করেছে।
বর্তমানে আমার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৪৫টি। অনেকেই আমাকে গবেষক হিসেবে চেনে, কেউ কেউ আবার অণুগল্পকার ও সায়েন্সফিকশনার হিসেবেও জানে। তবে আমি প্রথম জীবনে ছড়া ও কবিতা লিখতাম। তরুণ লেখক প্রকল্প থেকে আমার প্রকাশিত (জুন ১৯৯৭) বইয়ের নাম ‘‘হিগিন বিগিন’’। এটি একটি শিশুতোষ ছড়ার বই। এখন পর্যন্ত ওটিই আমার প্রথম এবং একমাত্র ছড়াগ্রন্থ। আমার ছড়াগ্রন্থের ভূমিকা লিখেছিলেন কবি আসাদ চৌধুরী। তিনি খুব আন্তরিক ও মিশুক মানুষ ছিলেন। তিনি বর্তমানে ইহজগতে নেই। আমি তাঁর শান্তি কামনা করছি।
তরুণ লেখক প্রকল্পে এসে আমি দুজন স্কুল জীবনের লেখক এবং পত্রবন্ধুকে পেলাম। এরা হলোÑ কুষ্টিয়ার আতিক হেলাল এবং জয়পুরহাটের মাসুদার রহমান। মাসুদ আমার ব্যাচেই ছিল, আর আতিক ছিল প্রথম ব্যাচে। তবে ও মাঝেমধ্যে বাংলা একাডেমিতে এসে আমাদের সঙ্গে আড্ডা দিতো। এ দুজন বন্ধু স্কুল জীবন থেকেই খুলনা থেকে প্রকাশিত শিশু-কিশোর মাসিক ‘‘সপ্তডিঙা’’য় ছড়া লিখত। আমিও ওই পত্রিকায় ছড়া লিখতাম এবং ওই পত্রিকাতেই আমার লেখকজীবনের হাতেখড়ি। সপ্তডিঙায় লেখালেখির সুবাদেই আতিকের সাথে আমার পত্রমিতালি হয়ে গেল। ও কিশোর বয়সেই খুব সুন্দর ভাষায় চিঠি লিখত আমাকে। আমিও উত্তর দিতাম। কিন্তু সামনে এস.এস.সি. (১৯৮৬) পরীক্ষার কারণে আমি ওর কয়েকটি চিঠির জবাব দিতে পারিনি। ও হয়তো তা বুঝতে পেরেছিল। এস.এস.সি. পরীক্ষার কয়েকদিন পর লম্বা সাইজের হলুদ খামে একটি চিঠি পেলাম। খামের ওপরে সবুজ কালির সিলমোহরকৃত রবীন্দ্রনাথের একটি উক্তি ছিলÑ ‘‘চিঠিও এক প্রকার সুখ’’। যাহোক, খামটি খুলে চিঠিটি পড়তে লাগলামÑ
পিন্টু, তুমি কেমন আছো
পরীক্ষা তো শেষ,
জানি তুমি সব পেপারেই
করছো ভালো বেশ।
পত্র দিলাম বন্ধু তুমি
উত্তর দিও ঠিক,
ধন্যবাদান্তে টানছি
ইতিÑ তোমার আতিক।
ছড়ার মাধ্যমে চিঠি! আমার মনের মাঝে দাগ কেটে আছে ছড়া-পত্রটি; হয়তো আতিকেরই তা মনে নেই। আতিক হেলাল যে একজন জাত ছড়াকার তা বাল্যকালের এ ছড়া-পত্রটিই প্রমাণ দিচ্ছে।
আমাদের পাবনার ৫ জন তরুণ লেখক প্রকল্পে অংশগ্রহণ করেছিল। তারমধ্যে ইসলাম ফেরদৌস ও মজিদ মাহমুদ ছিল প্রথম ব্যাচে, মির্জা তাহের জামিল ছিল তৃতীয় ব্যাচে এবং আমি ও জহির বিশ্বাস ছিলাম চতুর্থ ব্যাচে। জহির আর আমি একই সাথে পাবনা জেলা স্কুলে পড়েছি (অর্থাৎ ও আমার ক্লাসমেট)। ইসলাম ফেরদৌস ও মির্জা তাহের জামিল আমার ইয়ারমেট ছিল। ছোটদের পত্রিকায় লেখালেখির সুবাদে এ দুজনের সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে কিশোরবেলা থেকেই। মির্জা তাহের জামিল গত বছর মৃত্যুবরণ করেছে। আর মজিদ মাহমুদ ছিল আমার কয়েক বছরের সিনিয়র।
ক্লাসের ফাঁকে বসে আমি আশরাফ পিন্টু, লতিফুল ইসলাম শিবলী, (আমাকে ধরে) জজির বিশ্বাস, তার পাশে শামিম সিদ্দিকী ও টোকন ঠাকুর।
তরুণ লেখকদের মধ্যে যাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ছিল এবং ফেসবুকের মাধ্যমে এখনো যোগাযোগ আছে, তারা হলো : লুৎফুল আহসান বাবু, জহির বিশ্বাস, পরাগ আরমান, মিয়া তোফায়েল, তোফাজ্জল তফায়েল, শাকিল মামুদ, আলমগীর মোহাম্মদ রঞ্জু, আমিনুল রানা, আইরীন নিয়াজী মান্না প্রমুখ। এই তরুণ লেখকদের মধ্যে অনেকেই আজ প্রতিষ্ঠিত কবি ও লেখক, কেউবা সাংবাদিক। অনেকেই বলেন, লেখক তৈরি করা যায় নাÑ এ প্রতিভা হলো ঈশ্বর প্রদত্ত। কিন্তু আমি বলি, লেখক তৈরি না করা গেলেও তরুণ লেখক প্রকল্প লেখকদের লেখনির কলা-কৌশলের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে, তাদের প্রথম বই প্রকাশ করে দিয়ে, মাসিক ৩ হাজার টাকা ভাতা দিয়ে যে উৎসাহ প্রদান করেছে তাতে অনেক তরুণ লেখক উৎসাহিত হয়েছে এবং বর্তমানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
এদের মধ্যে কেউ কেউ হয়তো বা ঝরে গিয়েছে কিংবা পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে। কেননা সব ফুলেই ফল হয় নাÑ এটাই প্রকৃতির নিয়ম। আমাদের মধ্যে অনেকেই ইহলোক ত্যাগ করেছে এবং আমরাও একদিন চলে যাবো কিন্তু লেখকদের কর্ম থেকে যাবে।