অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের উলফসন কলেজের রিসার্স ফেলো অধ্যাপিকা মাসুদ বানুর একটি গবেষণা প্রতিবেদন পড়ছিলাম। ধর্ম ও উন্নয়ন গবেষণা কর্মসূচির আওতায় তার অধ্যয়নের বিষয়টি ছিল : ‘Marker

of identity : Religions Political parties and welfare work_ the case of Jama’at-e-Islami in Pakistan and Bangladesh’

দুটি বিস্তৃত প্রশ্নকে সামনে রেখে তিনি তার অনুসন্ধান কাজ চালিয়ে গেছেন এবং মুখ্য ও গৌন উভয় উৎসব থেকে তথ্য সংগ্রহ করে তার অনুসন্ধান প্রতিবেদন প্রণয়ন করেছেন। পাকিস্তান ও বাংলাদেশ জামায়াতের জনকল্যাণমূলক কর্মসূচিগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তার প্রাপ্ত ফলাফলগুলোর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হচ্ছে :

দুটি দেশেই জামায়াত স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, জরুরি, ত্রাণ, পানি সরবরাহ ও এতিম প্রতিপালনসহ ব্যাপকভাবে জনকল্যাণ ও দাতব্য কর্মকাণ্ডে জড়িত আছে। তাদের প্রতিটি সেবা দরিদ্র ও অক্ষমদের বিনামূল্যে প্রদান করা হয়। স্বল্পবিত্ত-মধ্যবিত্তসহ অন্যান্যদের জন্য তাদের সেবামূল্য বা ফিস বাজার দরের তুলনায় অনেক কম। সেবার মানও ভালো. যেমন হাসপাতালের চিকিৎসা ও চিকিৎসা ব্যয়।

ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক ও বাস্তব কারণ ভিন্ন ভিন্ন ধারায় দুটি দেশেই সংগঠনদ্বয় তাদের সেবাধর্মী কার্যক্রমসমূহ পরিচচালনা করে থাকে। পাকিস্তান বহুধা বিস্তৃত পরিমণ্ডলে তাদের কল্যাণ কর্মকাণ্ডকে পরিচালনা ও সেবা বিতরণের জন্য বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে এবং এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অনেকগুলোই আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও কাজ করছে। প্রক্ষান্তরে বাংলাদেশে রাজনেতিক বিরোধিতা, সরকারি নিষেধাজ্ঞা প্রভৃতি কারণে জামায়াতের ত্রাণ সংস্থাগুলোকে তাদের নিজ নাম ও ব্যানারে কাজ করতে দেয়া হয়নি (যেমন রোহিঙ্গা শিবির)। তবে জামায়াত কর্তৃক স্বতন্ত্র সংস্থা ফাউন্ডেশন হিসেবে স্থাপিত প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনায় জামায়াত সদস্যরা মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে।

জামায়াতের যাবতীয় ত্রাণ ও পরিসেবা কার্যক্রমের মধ্যে তাদের ধর্মীয় আদর্শের প্রতি নিষ্ঠা; বিশেষ করে ইসলামের সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে অঙ্গীকারের প্রতিফলন পাওয়া যায়।

বহুমুখী ত্রাণ ও সেবামূলক কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নের মাধ্যমে সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠার জন্য দু’দেশেই এ দলগুলোকে শক্তিশালী ও সুসংগঠিত দলীয় কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ সদস্যদের ব্যাপক ও পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও অন্যান্য প্রকাশ্য ও বৈধ অর্থের উৎস ছাড়া কোনো ধর্মভিত্তিক দলই দল পরিচালনার পাশাপাশি জনকল্যাণ ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার এতবড় কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারে না। জামায়াতের ন্যায় পাকিস্তান বা বাংলাদেশের অন্য কোনো ইসলামী দলের এত বিশাল ও ফলপ্রসূ নেটওয়ার্ক নেই। জামায়াত তার সেবা ও ত্রাণ তৎপরতা পরিচালনার জন্য স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে, বেতনভুক কর্মচারীদের পরিবর্তে দলীয় সদস্য এবং ভলেন্টিয়াররা এগুলো পরিচালনা করেন। ফলে এখানে লালফিতার দৌরাত্ম্য নেই এবং তারা অনেক ব্যয় সাশ্রয়ী হিসেবে পরিগণিত হয়।

নির্বাচন কাছাকাছি আসলেই রাজনৈতিক দলগুলো মাঠে ময়দানে তৎপর হয়ে উঠে এবং ভোটারসহ সাধারণ নাগরিকদের মনোযোগ আকর্ষণের জন্য প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে। নির্বাচন শেষে তাদের তৎপরতা আর দেখা যায় না। ধর্মীয় রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থা ভিন্নতর। তারা তাদের সদস্যদের নিয়ে যে ক্যাডারবাহিনী গঠন করে তা তাদের ধর্মীয় আদর্শের তাড়নাতেই করে। পার্টি হিসেবে তাদের পরিচিতি এবং আদর্শ হিসেবে ইসলামী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা খেদমতে খালফকে তাদের জন্য অপরিহার্য করে তোলে; জনগণের ভোট বা সমর্থন আদায় এখানে মটিভেটিং ফ্যাক্টর বা প্রণোদনার উপকরণ নয়। ইসলামের অন্যতম মূল স্তম্ভ সালাতের আহ্বান বা আজানে পাঁচবেলা সালাতের পাশাপাশি কল্যাণের জন্যও মসজিদে আসার আহ্বান জানানো হয়। এ কল্যাণই জামায়াতসহ ধর্মভিত্তিক দলগুলো ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে মানুষের দুয়ারে পৌঁছিয়ে দেয়। অনুকূল বা প্রতিকূল পারিবেশ যাই হোক না কেন, জামায়াত সর্বাবস্থায় সৃষ্টি ও স্রষ্টার প্রতি তার দায়িত্ব পালন করে এসেছে। বাংলাদেশ হবার পর থেকে দলটি জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনেও অংশগ্রহণ করেছে। জাতীয় নির্বাচনে দলটি সর্বনিম্ন ২টি থেকে ইতোপূর্বে সর্বোচ্চ ১৮টি পর্যন্ত, আসন পেয়েছে; তার ভোট প্রাপ্তির সর্বোচ্চ রেকর্ড ছিল ৪৮ লাখ।

এখন সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে আসি। ঐতিহাসিক ত্রয়োদশ সাধারণ নির্বাচনটি যে ইস্যুগুলোকে সামনে রেখে অনুষ্ঠিত হয়েছিল সেগুলো ছিল : “দেশের যুব সমাজ বিশেষ জুলাই যোদ্ধাদের প্রত্যাশা পূরণ, বৈষম্য দূরীকরণ, কোটা প্রথার বিলোপ সাধন ও মেধা ও সার্বজনীন অধিকারের ভিত্তিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বেকারত্ব দূরীকরণ, দুর্নীতি দূরীকরণ, চাঁদাবাজি রোধ, গুম, খুন, দলীয় আধিপত্যবাদের পুরাতন কালচার ও তথাকথিত দেশপ্রেমের একক কর্তৃত্ব ও দেশকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ ও বিপক্ষ শক্তিতে বিভক্তকরণ এবং প্রতিবেশী বা অন্য যেকোনো দেশের আধিপত্যবাদ প্রতিরোধ, জামায়াতের জন্য এ নির্বাচন ছিল অত্যন্ত কঠিন। আওয়ামী লীগ এ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। জামায়াতের প্রধান প্রতিপক্ষ ছিল বিএনপি। বিএনপি তার চৌদ্দদলীয় জোটের বাইরেও অপ্রকাশ্য শক্তিসমূহ বিশেষ করে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি প্রমুখ দলের সামগ্রিক আনুকূল্য পেয়েছে এবং ভারতীয় পত্রপত্রিকা এবং দেশি-বিদেশি রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে ভারতীয় স্বার্থ সংরক্ষণ ও ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের তিন দফা সমঝোতার ভিত্তিতে ভারতের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। সারা দেশের ২৯৯টি আসনে ২০২৮ জন প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। মোট ১২ কোটি ৭০ লাখ ভোটারের মধ্যে ৫৯.৪৪% ভোটার ভোটে অংশগ্রহণ করেছেন। এতে বিএনপি ও জামায়াত জোট প্রাপ্ত আসন সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ২১২ ও ৭৭; অন্যান্যরা পেয়েছেন ৮টি আসন। বিএনপি ও জামায়াতের দলভিত্তিক প্রাপ্ত আসন সংখ্যা হচ্ছে যথাক্রমে ২০৯ ও ৬৮ (৪৯.৯৭ ও ৩১.৭৭%) এ নির্বাচনে দলওয়ারী প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা নিম্নরূপ ১. বিএনপি-৩,৭৪,৬৮,৯৯৪ (২) বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ২,৩৮,২৫,২৫৯ (৩), এনসিপি ২২,৮৬,৭৯৫ (৪), চরমোনাইর ইসলামী আন্দোলন ২০,২৩, ৯৬৬ (৫), খেলাফত মজলিশ ১৫,৬৪,৯২৮ (৬), জাতীয় পার্টি ৬,৬৯,০৮২ (৭), গণঅধিকার পার্টি ২,৪৪,০০০ (৮), এ বি পার্টি ২,১০,০০০ (৯), জনতা দল ৩৭,৪০২ (১০), বাসদ ১৩,২৩৫ (১১), নাগরিক ঐক্য ৬,২০৯ (১২), গণফোরাম ৫,০৬৬।

উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশে এ প্রথমবারের মতো প্রবাসীদের জন্য পোস্টাল ব্যালটের প্রবর্তন করা হয়। তবে দুর্ভাগ্য হচ্ছে প্রবাসীদের প্রদত্ত ৭৪ লাখ ভোট গ্রহণ ও গণনা করা হয়নি। নির্বাচনটি সুনির্দিষ্ট আদর্শের ভিত্তিতে না হয়ে রাষ্ট্র সংস্কার তথা সুশাসনের প্রতিশ্রুতিকেন্দ্রিক ছিল বেশি। লখ্যনীয় ছিল যে, ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের আগে এবং নির্বাচনের দিন সারাদেশ ছিল অত্যন্ত উৎসবমুখর। এ পরিবেশ বাংলাদেশের ইতিহাসে ইতোপূর্বে কখনো দেখা যায়নি। লঞ্চে, স্টিমারে, ট্রেনে, বাসে, ট্রাকে করে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী জিন্দাবাদ শ্লোগানে আকাশ বাতাস মুখরিত করে দেশের বিভিন্ন গন্তব্য থেকে মানুষ জামায়াতের কেম্পেইনে অংশগ্রহণ করেছে এবং ভোট দেয়ার জন্য নিজ নিজ এলাকায় ফিরে গেছেন। মানুষ জামায়াতের ব্যাপারে তাদের সমর্থনে যে উচ্ছ্বাস ও উদ্যম প্রদর্শন করেছে তা তুলনাহীন। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক বিপ্লব ঘটিয়ে এবং ব্যাপক ইলেকশান ইঞ্জিনিয়ারিং-এর মাধ্যমে নির্বাচনী ফলাফলে বিরাট বিপর্যয় ঘটানো হয়। বলাবাহুল্য, সারা বাংলাদেশে জামায়াতের অনুকূলে গড়ে ওঠা গণজোয়ার দেশে বিদেশে ইসলাম বিদ্বেষী শক্তিকে সজাগ করে তোলে। অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু কিছু উপদেষ্টাও জামায়াতের উত্থানে শংকিত হয়ে ওঠেন। ইলেকশান ইঞ্জিনিয়ারিং ছিল এ শক্তিসমূহের জামায়াত ঠেকানোর সম্মিলিত প্রয়াসেরই একটি অংশ। কিন্তু তা সত্ত্বেও ভোটের ফলাফল জামায়াতকে মূলধারার রাজনীতির মহাসড়কে নিয়ে এসেছে। জামায়াত এখন সংসদে প্রধান বিরোধীদল হিসেবে তার দায়িত্ব পালন করছে। এ সাফল্যের কৃতিত্ব জামায়াত নেতাকর্মীদের যেমনি তেমনি জামায়াত আমীর ডা. শফিকুর রহমানেরও। তার ক্যারিসমেটিক নেতৃত্ব এ সংগঠনকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ইসলামী আন্দোলনের জন্য একটি আলোক বর্তিকায় পরিণত করেছে। অনেকের ধারণা ছিল জামায়াত এ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করবে। দীর্ঘদিনের ফ্যাসিস্ট শাসনে অতীষ্ট দেশের মানুষ পরিত্রাণের উপায় খুঁজছিলেন। আওয়ামী লীগ পলাতক এবং অতীতের দুর্নীতি দুষ্কর্মের জন্য তাদের প্রকাশ্যে আসার সাহস ও মুখ কোনটাই নেই। গণঅভ্যুত্থান পূর্ববর্তী সময়ে বিএনপির নিষ্ক্রিয়তা ও দখলবাজি, চাঁদাবাজি বাণিজ্যে তাদের ব্যাপক সম্পৃক্তি ও অভ্যুত্থান পরবর্তীকালেও তা অব্যাহত থাকায় বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে জামায়াতই ছিল একমাত্র অবলম্বন। কিন্তু তা হয়নি। আল্লাহ হয়ত এর মধ্যে কল্যাণ রাখেননি, জামায়াতকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে এনে আরো যোগ্যতা ও শক্তি অর্জনের সুযোগ করে দিয়েছেন। এ সুযোগ কাজে লাগানোর ব্যাপারে জামায়াতের নির্বাচিত এমপিরা সততা, নিষ্ঠা ও যোগ্যতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেন।

আমাদের দেশের মানুষের চাহিদা খুব বেশি নয়। তারা অল্পতেই তুষ্ট থাকেন। এমপি সাহেবরা চেষ্টা করলে তাদের নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকার সরকারি সম্পদ ও সরকারি, আধা সরকারি ও বেসরকারি সুযোগ সুবিধা ব্যবহার করে একেকটি আদর্শ এলাকা গঠন করতে পারেন। অর্থসম্পদের মৌহ, ক্ষমতার মৌহ ও নারীর মৌহ মানুষকে বিপথগামী করে। নির্বাচিত অনেক এমপি অতীতে এ মৌহে পড়ে আদর্শচ্যুত হয়েছিলেন। এ বিচ্যুতি রোধে জামায়াতকে পাহারাদারের ভূমিকা অব্যাহত রাখা জরুরি বলে আমি মনে করি।