আসিফ আরসালান

যখন রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে লিখতে যাই তখন আমরা শুধুমাত্র তার সারফেসটা, অর্থাৎ শুধুমাত্র ওপরেরটাই দেখি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঐ সারফেসের ভেতরে যাওয়ার চেষ্টা করি না। দ্বিতীয় বিষয় হলো, কোনো একটি বিষয় নিয়ে ফলাও করে নিউজ হলো। তারপর কয়েকদিন ঐ বিষয়টি নিয়ে খুব হইচই হলো। কিন্তু তার পরেই আমরা সব ভুলে যাই। ধীরে ধীরে সে উত্তেজনাকর বিষয়টিও ব্যাক বার্নারে চলে যায়। ড. ইউনূসের ইন্টারিম সরকার অনেকগুলো কাজেই হাত দিয়েছিলেন। কিন্তু কোনোটাই সম্পূর্ণ করতে পারেননি। এজন্য ব্যর্থতার দায় শুধুমাত্র সরকার প্রধানের ওপর চাপালেই হবে না। আমাদেরকে অবশ্যই নিজেদের দিকেও তাকাতে হবে। আমাদেরকে আত্মসমালোচনা করতে হবে। দুঃখের বিষয় হলো, আমাদের অধিকাংশই সমালোচনা সহ্য করতে পারি না। অন্যের সমালোচনায় আমরা খই ফোটাবো, কিন্তু আমার সমালোচনা করলেই আমি রেগে আগুন।

ড. ইউনূস অনেক কিছুই করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু করতে পারেননি। কারণ সময়ের অভাব। পুরানা কাসুন্দি বেশি ঘাঁটবো না। কারণ ঘেঁটে লাভ নেই। ৩৬ দিন ধরে দেশে একটি বিপ্লব ঘটলো। কিন্তু আমাদের মাঝে যারা দল বিশেষকে সবচেয়ে বড় ভাই মনে করেছিলেন তারা এটাকে বিপ্লব বলে এখন পর্যন্ত স্বীকৃতিই দেননি। উল্টো বিপ্লবের দু’দিন পর তারা তাদের দলীয় অফিসের সামনে জনসভা করে ৩ মাসের মধ্যে ইলেকশন দাবি করে বসেন। সে থেকে বিগত ১৬ মাসে ইলেকশনের বাইরে তাদের মুখে আর কোনো দাবির কথা শোনা যায়নি। ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং তার উপদেষ্টা পরিষদের একটি অংশ অবশ্য বিপ্লবের স্পিরিট নিয়েই এগুতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পারেননি। ঐ বড় ভাইরা সংবিধানকেই প্রাধান্য দিলেন। অথচ ঐ বিপ্লবের মাধ্যমে যে সংবিধানের কবর রচনা করা হয়েছে সেই চরম সত্যটি চাপা পড়ে গেলো। বরং সংবিধানকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে জুলাই বিপ্লবটাই ব্যাক সিটে চলে গেলো।

অনেক কিছুই তো বাকি রয়ে গেলো। শেখ হাসিনা শাপলা ম্যাসাকারের মাধ্যমে যে আলেম-ওলামা নিধন করেছিলেন তার বিচার হওয়া তো দূরের কথা তার ওপর কোনো কমিশনও গঠন করা হয়নি। বিষয়টি ঝুলে গেছে। আগামীতে জামায়াত বা এনসিপি ছাড়া অন্য কেউ যদি সরকার গঠনের সুযোগ পান তাহলে ঐ কমিশন আর আদৌ গঠিত হবে বলে মনে হয় না।

বৃহস্পতিবারের খবরের কাগজে দেশের ৩টি ভুয়া নির্বাচনের ওপর যে তদন্ত কমিশন গঠিত হয়েছিলো তার রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। এটা কোনো বিরোধী দল নয় বরং খোদ ঐ কমিশনই বলেছে যে, ২০১৪ সালে হয়েছে এক তরফা ভোট। সে ভোটে ৩০০ জনের মধ্যে ১৫৩ জন অর্থাৎ সংখ্যা গরিষ্ঠেরও বেশি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। অবশিষ্ট ১৪৭টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার নামে যা হয় সেগুলো ছিলো সম্পূর্ণ সাজানো ও সুপরিকল্পিত। ঐ কমিশনই বলেছে যে, ২০১৮ সালের ভোট হওয়ার কথা ছিলো ৩০ ডিসেম্বর সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। কিন্তু সেটি হয়েছে আগের রাত অর্থাৎ ২৯ ডিসেম্বর রাত ১০টা থেকে রাত ৩টার মধ্যে। এ সময়ে ৮০ শতাংশ কেন্দ্রে সিল মেরে বাক্সো ভরে রাখা হয়েছিলো। কমিশনের কাছে স্বীকার করেছেন ভোট কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা প্রিজাইডিং অফিসাররা নিজেই। আর ২০২৪ সালে যে ভোট হলো সেটি তো ‘আমি এবং ডামি’ ভোট নামেই মশহুর হয়েছে। কমিশনই বলেছে যে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী এসব ভুয়া ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। আর বেসামরিক প্রশাসন, পুলিশ এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা এজেন্সি সরকারের এসব ‘ডিজায়ার’ বাস্তবায়ন করেছে।

এগুলো তো এখন আর কোনো রাখঢাকের ব্যাপার নয়। যে দলের সরকার এ রকম তিন তিনটি নির্বাচনকে তামাশার বস্তুতে পরিণত করতে পারে সে দলের আর রাজনীতি করার অধিকার থাকে না। সে দল অর্থাৎ আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণার জন্য দাবি তুলেছিলো জামায়াত এবং জুলাই বিপ্লবের ছাত্র নেতারা, যারা পরবর্তীকালে এনসিপি গঠন করেছেন। নাম ধরে বলতে পারি, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের ব্যাপারে বিএনপি বিরোধীতাই করেছিলো। তারেক রহমান তখন লন্ডনে ছিলেন। কিন্তু ঢাকায় বাস করা বিএনপির স্ট্যান্ডিং কমিটির নেতারা তো প্রকাশ্যেই বললেন যে, আমরা একটি রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার কে? এটি করতে হলে জনগণ করবে।

জনগণ কিভাবে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করবে? এটি কী সে হাজার বছর আগের গ্রীক সিটি স্টেট যে প্রজাবৃন্দ নিয়ে রাজা সভা করবেন এবং ঐ সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ১৮ কোটি লোককে নিয়ে কি প্রধানমন্ত্রী সভা করতে পারেন? যেখানেই ফ্যাসিবাদ এসেছে সেখানেই সে ফ্যাসিবাদী দলটিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। জার্মানি এবং ইটালি এর জ¦লন্ত প্রমাণ। প্রায় ৮০ বছর হয়ে গেলো, ইটালিতে ফ্যাসিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ হয়ে আছে। প্রায় একই সময় ধরে জার্মানিতে নাৎসী পার্টি নিষিদ্ধ হয়ে আছে। শুধু দলগুলীই নিষিদ্ধ নয়, কেউ যদি নতুন নামে ফ্যাসিবাদ বা নাৎসীবাদের আদর্শ প্রত্যক্ষভাবে না হলেও পরোক্ষভাবেও তুলে ধরেন তাহলেও তাদেরকে সেই রাজনীতি করতে দেওয়া হয় না।

কী আশ্চর্য, বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লবের দেড় বছরও পূর্ণ হয়নি, তার আগেই অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের নামে আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে আনার পাঁয়তারা করছে একটি বিদেশী শক্তি এবং তাদের পদলেহী কতিপয় স্থানীয় দালাল। আগামী ফেব্রুয়ারি মাসের নির্বাচনে কোনো দল মেজোরিটি পেয়ে ক্ষমতায় যাবে সেটা আমরা কেউ জানিনা। ১৩ ফেব্রুয়ারি সব কিছু জানা যাবে। তারপরেও একশ্রেণীর মিডিয়া এবং ডিসি এসপি ওসি এবং ইউএনওর মতো প্রশাসন যেসব আচার আচরণ করছেন তাতে মনে হচ্ছে যে, বিএনপি ক্ষমতায় ইতোমধ্যেই এসে গেছে। তাই তারা নতুন কুর্সিকে কুর্নিশ করার মহড়া দেওয়া শুরু করেছেন।

আমার শুধু একটি প্রশ্ন। ১২ কোটি ৭০ লাখ ভোটারের মধ্যে যেখানে ১৮ থেকে ৩৭ বছরের এজ গ্রুপের মধ্যে আছেন ৫ কোটি ৪৭ লক্ষ ভোটার, তারা কোথায় ভোট দেবেন সেটি একমাত্র ওপরওয়ালা ছাড়া আর কেউ জানেন না। সকলেই বলছেন যে, ঐ এজ গ্রুপের তরুণরাই হবেন এবারের ইলেকশনের ডিসাইডিং ফ্যাক্টর। তারপরেও অত্যন্ত প্ল্যান্ড ওয়েতে বিএনপির পক্ষে একটি হাইপ তোলা হয়েছে।

জনগণ যাকেই ভোট দিয়ে ক্ষমতায় বসাবেন তাকেই আমরা মেনে নেবো। এখন জুলাই বিপ্লব পূর্ববর্তী মিডিয়া নতুন বেশ ধারণ করে যে নতুন সূর্যের পূজা করছে তারা কি বলবে যে, বিএনপি ক্ষমতায় এসে বিডিআর ম্যাসাকারের বিচার করবে? বিএনপি ক্ষমতায় এলে বিডিআর ম্যাসাকারের ওপর ফজলুর রহমান কমিশনের রিপোর্টের কী হবে? আগামী সরকার শাপলা ম্যাসাকারের কী বিচার করবে? আইনমন্ত্রী আসিফ নজরুল এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বা আইসিটির চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম একাধিকবার বলেছেন যে, দল হিসাবে আওয়ামী লীগের বিচার করা হবে। আজ ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত আওয়ামী লীগের বিচারের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। আগামী সরকার কি সে উদ্যোগ নেবে? না নিলে কমিশনের তদন্ত করে লাভ কী হলো?

এ ধরনের আরো অনেক বিষয় জানার এবং প্রশ্ন করার ছিলো। তবে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে আমরা সকলেই মত্ত হয়ে গেছি নির্বাচন নিয়ে। কিন্তু ঐ একই দিনে যে নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোট অনুষ্ঠিত হবে সে ব্যাপারটি রাজনৈতিক দলসমূহ বিশেষ করে বিএনপি কি মাথায় রেখেছে? জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপি তো প্রকাশ্যে বলছে যে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’র মধ্যে হ্যাঁ’র পক্ষে ভোট দিতে হবে। হ্যাঁ ভোট যদি জয়যুক্ত না হয় তাহলে কিন্তু সব কিছু ভেঙে পড়বে। জুলাই সনদ বাস্তবায়িত হবে না। জুলাই সনদে যেসব সংস্কারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে সেগুলো সব বাতিল হয়ে যাবে।

ঐকমত্য কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব শেষ হওয়ার পর প্রফেসর ড. আলী রিয়াজকে পূর্ণাঙ্গ উপদেষ্টার বেতন ও মর্যাদাসহ প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী নিযুক্ত করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম জেলা স্টেডিয়ামে বিভাগীয় ইমাম সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় ড. আলী রিয়াজ বলেন, রাষ্ট্রের ভিত্তি কেমন হবে বা কী থাকবে তারই দলিল হচ্ছে জুলাই জাতীয় সনদ এবং সে জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতেই এ গণভোট। তিনি বলেন, গণভোট হচ্ছে আপনি বাংলাদেশের একটা ব্যবস্থাকে বদলে ভবিষ্যতে নতুন বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠা করার জন্য আপনার সমর্থন জানাচ্ছেন কি না? একটি মহল অপপ্রচার চালাচ্ছে যে, জুলাই সনদ পাস হলে সংবিধান থেকে ১৯৭১ মুছে যাবে, বিসমিল্লাহ থাকবে না- এসব কথা ঠিক নয় বলে জানান ড. আলী রিয়াজ।

আমি প্রথমেই বলেছি যে, একটি ইস্যু এলে আমরা সেটি নিয়ে মত্ত হয়ে পড়ি। তারপর সময় গড়িয়ে গেলে আমরা সেটি বেমালুম ভুলে যাই। জুলাই সনদের অবস্থা হয়েছে তাই। জুলাই সনদে রয়েছে আপার হাউজ বা উচ্চ কক্ষ, রয়েছে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বৃদ্ধি, রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কিছুটা ছেঁটে ফেলা। আরো রয়েছে একই ব্যক্তি দলের প্রধান, সংসদ প্রধান এবং প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না। এই ধরনের আরো বেশ কিছু সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি শুধুমাত্র জাতীয় সংসদের ৩০০টি আসনের ভোট নিয়েই মাতামাতি চলছে। এ ভোট অবশ্যই অতীব গুরুত্বপূর্ণ। তাই বলে গণভোটের কথা এ আড়াই হাজার প্রার্থীর মুখে শোনা যাচ্ছে না কেনো? এরা যদি গণভোটে হ্যাঁ’র সপক্ষে কথা না বলেন তাহলে না জয়যুক্ত হবে। তখন যে দেশ কত বড় ভয়াবহ দুর্যোগে নিক্ষিপ্ত হবে সেটি আমরা এ মুহূর্তে কল্পনাও করতে পারছি না।

Email:[email protected]