॥ অধ্যক্ষ ডা. মিজানুর রহমান ॥
ভূমিকম্প যুদ্ধহীন ও শব্দবিহীন একটি প্রাকৃতিক গজব। যা মূলত মহান আল্লাহ তায়ালার পক্ষ পথকে এক মহা সতর্কবাতা। এতে কারো কোন হাত নেই। ভূমিকম্পন কখন, কোথায়, কি কারণে সংগঠিত হয় তা একমাত্র আল্লাহতায়ালাই ভালো জানেন। ঘন ঘন ভূমিকম্পন জনমনে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা বাড়ায়। কারণ ভূমিকম্প এমন একটি ধ্বংসলীলা যা থেকে মানুষসহ সকল প্রাণিজগত এবং সব ধরনের সম্পদই মহাক্ষতির শিকার হয়ে থাকে, যা কখনও কারো কাম্য নয়। তবে এ গযব থেকে মানবজাতির অনেক কিছু শিক্ষা গ্রহণ করার সুযোগ আছে।
বিজ্ঞানীদের মতে সাড়ে চারশকোটি বছর আগে পৃথিবী সৃষ্টির সূচনা হয়েছে। এর দুশ’ কোটি বছর সময় অতিবাহিত হয়েছে স্থির হতে। এরপর দেড়শ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে আগমন ঘটেছে মানব জাতিসহ সকল প্রাণী জগতের। তারা বলেছেন, পৃথিবীর টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়ার কারণে সৃষ্টি হয় ভূমিকম্প। ভূমিকম্পের এত বিশাল ক্ষমতা যে, মুহুর্তের মধ্যেই দুনিয়ার চেহারা একদম বদলে দেবার ক্ষমতা রাখে।হিমালয়, পাহাড়-পর্বত একেবারে ধ্বংসকরে দিতে পারে, নদ-নদীর গতিপথ পাল্টেদিতে পারে। ঘরবাড়ি, বহুতল দালানকোঠা, গাছপালা, বিদ্যুতের খুঁটি, নেটওয়ার্কের টাওয়ার, ইন্ড্রাস্ট্রির বড় বড় যন্ত্রপাতি ও টাওয়ার মুহূর্তেই ডেবে গিয়ে মাটির সাথে মিশে যেতে পারে। গভীর সমুদ্রে দ্বীপ জেগে উঠতে পারে। সেন্ট মার্টিন তার একটি উদাহরণ।
২০১৬ সালের এ গবেষণায় নিউইয়র্কের কলম্বিয়া ক্লাইমেট স্কুল ল্যামন্ট- আর্থ অবজারভেটরির ভূপদার্থবিদ ড. মাইকেল স্টেকলার তার এক গবেষণায় উল্লেখ করেন, টেকটোনিক প্লেটের সংঘষের্ কীভাবে গাঙ্গেয় গঙ্গার বদ্বীপ এলাকার চেহারা বদলে দিয়েছিল।গাঙ্গেয় বদ্বীপে আবারো এ ধরণের আরেকটি ভূমিকম্প হলে এ অঞ্চলের ১৪০ মিলিয়নের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ভূমিকম্প মূলত মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে সতর্কবার্তা। আল কুরআনে সূরা আন নাযিয়াত, আল কাহাফ, আল ক্বমার, আদ-দোখান, আন নাজম, ইনফিতার, ইনশিকাক, সাবা, নাবা, জুমার, মুলক, আল-কিয়ামাহ, আত-ত্বরিক, জিলজাল, আর রাহমানসহ আরও বেশ কিছু সুরায় কিয়ামতের জীবন্ত বর্ণনা দেয়া হয়েছে। যাতে করে মানুষ আল্লাহর ক্ষমতা, তার প্রতি আস্থা ও ভয় করার সতর্কবার্তা জ্ঞাত হয়ে নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে আল্লাহ প্রদত্ত আদেশ নিষেধ ও উপদেশ মোতাবেক জীবন পরিচালনা করতে পারে। এই সতর্কবার্তার একটি নমুনা হলো জিলজাল বা ভূ-কম্পন।যা মানবজাতির জন্য কিয়ামতের আলামতের যৎকিঞ্চিত ধারণা মাত্র। এগুলোমূলত: রাব্বুল আলামিনের হুকুমে সংগঠিত হয়ে থাকে। তাঁর আদেশেই ইতোপূর্বে সংগঠিত অগণিত ভূমিকম্পের অনেক শক্তিশালী ও অর্থবিত্তে সামর্থবান জাতি ও মহারগর চিরতরে ধ্বংস হয়ে গেছে,যার বিস্তারিত বর্ণনা মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে পরবর্তী প্রজন্মের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের নিমিত্ত বার্তা হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। যা থেকে বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মের মানুষ শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।
যখন কোন জাতি মাত্রাতিরিক্ত অমিতাচার আর পাপচার, অনাচার, অবিচারে জড়িয়ে পড়ে, তখন সে জাতিকে উচিৎ শিক্ষা দানের জন্য এমন এমন গজব মহান আল্লাহ নাযিল করেছেন যে সব গজবে বেষ্টিত হয়ে বহু জাতি ধ্বংস হয়ে গেছে, এর বর্ণনাও পবিত্র কুরআনে এসেছে। যে গজব থেকে সে সব জাতির বাঁচার কোন উপায় ছিল না।
ভূমিকম্পের অতীত ইতিহাস : বিশে^র সবচেয়ে শক্তিশালী যে সব ভূমিকম্প সংঘঠিত হয়েছে তন্মধ্যে মধ্যে ১৯০০ খ্রিষ্টাব্দের পর থেকে রেকর্ডকৃত সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বড় ১০টি ভূমিকম্প হলো-১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দে এসমেরাল্ডাস,ইকুয়েডর: ৮.৮মাত্রার, ১৯৫২খ্রি: ক্যামচাটকা, রাশিয়:৯.০০মাত্রায়, ১৯৬০খ্রি: বিওবি, চিলি: ৯.৫ মাত্রার, ১৯৬৪ খ্রি: আলাঙ্কা, ইউএস:৯.২ মাত্রার, ১৯৬৫ খ্রি: আলাঙ্কা, ইউএস: ৮.৭ মাত্রায়, ২০০৪ খ্রি: সুমাত্রা, ইন্দোনেশিয়া: ৯.১ মাত্রায়, ২০১০খ্রি: বিওবি, চিলি: ৮.৮ মাত্রায়, ২০১১ খ্রি: তোহোকু, জাপান: ৯.১ মাত্রায়, ২০১২খ্রি: সুমাত্রা, ইন্দোনেশিয়: ৮.৬ মাত্রায়, ২০২৫খ্রি: ক্যামচাটকা, রামিয়া: ৮.৮ মাত্রার ভূমিকম্প।
বাংলাদেশের ইতিহাসেও শক্তিশালী ভূমিকম্পনের তথ্য পাওয়া যায়। এরমধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ভূমিকম্পটি হয়েছিল ১৭৬২ খ্রিষ্টাব্দে টেকনাফে। টেকনাফ থেকে মিয়ানমার পর্যন্ত প্রায় চার’শ কিলোমিটার লম্বা ফল্টলাইনে ৮দশমিক ৫ মাত্রার বেশি কাঁপুনি সংঘটিত হয়।
এতে সেন্টমার্টিন দ্বীপ তিন কিলোমিটার উপরে উঠে আসে। এর আগে এটি ছিল নিচু ও প্রায় ডুবন্ত দ্বীপ। একই ভূমিকম্পে মিয়ানমারের একটি দ্বীপ ৬ মিটার ওপরে উঠে আসে। সীতাকুন্ডের পাহাড় থেকে শক্ত পাথর ভেদ করে নিচ থেকে কাঁদা ও বালুমাটি বের হয়ে আসে এবং বঙ্গোপসাগরে সুনামি হয়। ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর পাশের অনেক ঘরবাড়ি পানিতে ভেসে যায় প্রায় ৫শ’ শতাধিক মানুষ মৃত্যুবরণ করেন।
বর্তমানে আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম ভূমিকম্পন প্রবল অঞ্চল। গত ২১ নভেম্বর ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দে শুক্রবার সকালে সংঘঠিত ভূমিকম্পটি ছিল ৫.৭ এবং পার্শবর্তী দেশ ভারতে ছিল ৫.২ মাত্রা, সেই সাথে পাকিস্তানেও এর ঝাঁকুনী অনূভূত হয়েছে বেশ জোড়েসোড়ে। এতে প্রাণহানির মাত্রা কম হলেও কম্পন তরঙ্গের ফলে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ উৎকন্ঠা ও আতঙ্ক ছিল প্রবল। এরপর দুদিন না যেতেই ৩১ ঘন্টার ব্যবধানে উপর্যপরি দুবার ভূমিকম্পের কারণে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়ে গিয়েছে। দেশের মানুষ সর্বক্ষনিকভাবে জীবন ও সম্পদের ক্ষতির আশঙ্কায় দিনাতিপাত করছেন। ভূমিকম্পের কারণে গত ২৩ নভেম্বর ঢাকাবিশ^বিদ্যালয়ের সকল ধরণের ক্লাস পরীক্ষা বন্ধছিল। অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল কম। অভিভাবকরা রোববার তাদের সন্তানদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠাননি। বেশকিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছিল।
ভূকম্পনের ফলে অনেক স্থানে সরকারি-বেসরকারি পুরাতন ভবন,সড়ক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভবনে ফাঁটল দেখা দিয়েছে। রাজধানী ঢাকার বাইরে অবস্থানরত অভিভাবকরা সারাক্ষণ আফটরশকের আশঙ্কায় উদ্বেগের মধ্যে সময় কাটাচ্ছেন। অনেকে ভাবছেন, আবারও হঠাৎকরে ভূমিকম্প শুরু হলে বহুতল ভবন থেকে কিভাবে নীচে নামবেন, কীভাবে পরিস্থিতি সামলাবেন।
রাজধানীমহ দেশের অধিকাংশ শহর-নগরে গড়ে ওঠা বহুতল ভবনের সমূহ ওপর তলা থেকে দ্রুত নীচে নামার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নাথাকার দরুণ উৎকণ্ঠা বাড়ছে। সেই সাথে অপরিকল্পিত অবকাঠামো, মেয়াদ উত্তীর্ণ ভবনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন।
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট শহরে সবচেয়ে বেশি সুউচ্চ বহুতল দালান নির্মাণের ফলে এখানকার মাটির ওপর ওজনচাপ অনেকবেশি বেড়ে গেছে। তদুপরি বসবাসরত মানুষের ওজনও অন্যান্য শহরের তুলনায় এ নগরে গুলোতে বেশি , বিধায় বাংলাদেশে এই তিনটি জেলা মূলত প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতে রয়েছে বলে ভূতাত্বিকেরা পুর্বাভাস দিয়েছেন। ইতোমধ্যে এসব এলাকার পানির স্তর অনেক নীচে নেমে গেছে, পাহাড় ও গাছপালা কেঁটে অপরিকল্পিতভাবে নগরায়ন করা হয়েছে। জলাশয়, পুকুর ভরাট করে বড় বড় দালান নির্মাণ অব্যাহত রয়েছে। ফলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। এতে জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবে শহরগুলোতে বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে এবং জননিরাপত্তা ও ঝুঁকি বাড়ছে।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বশ^বিদ্যালয়ের জিওলজি বিভাগের অধ্যাপক ও ভাইস প্রোভোস্ট ড. সৈয়দহুমায়ুন আখতার বলেন, ভূমিকম্প বিষয়ে গবেষণা থেকে আমাদের অনেক কিছু জানার আছেএবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ারও সুযোগ রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, আরেকটি ভূমিকম্প থেকে মানুষকে রক্ষা করতে সিসমিক পর্যবেক্ষণ ও পূর্ব-সতর্কতা ব্যবস্থা, অবকাঠামো উন্নয়ন ও গণসচেতনতা বাড়াতে ব্যক্তি ও সরকারী পর্যায়ে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
অপরদিকে আল্লাহর নাফরমানী ও তার নির্ধারিত সীমা লংঘনের কারণে প্রকৃতিরক বিপর্যয় ও দুর্যোগ নেমে আসে। সুতরাং আল্লাহর পথে ফিরে আসলেই কেবল মানুষের উপর যাবতীয় আসমানী আযাব-গযব বন্ধ হতে পারে। সেই সাথেমহান আল্লাহতায়ালার অফুরন্ত রহমত, বরকত ও আখিরাতে নাযাতের প্রত্যাশারপথ সুগম হতে পারে।
লেখক : জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রাবন্ধিক গবেষক ও সাংবাদিক।