মোঃ রিশাদ আহমেদ
মাঠের কিনারে ভোরের আলো যখন ধুলোমাখা ঘাসে রঙ ছড়ায়, তখন দূর থেকে দেখা যায় কিছু ছায়া নুয়ে নুয়ে জমিতে কাজ করছে। প্রথম দেখায় মনে হয় শ্রমিক মাত্র, কিন্তু কাছে গেলে বোঝা যায়-এরা সেসব নারী, যাদের হাতের স্পর্শে জমি জেগে ওঠে, ধান দুলে ওঠে, সবজি হাসে, আর একটি পরিবার টিকে থাকার ভিত্তি খুঁজে পায়। তাদের মুখে নেই আলোড়ন, নেই বাহুল্য। যেন মাঠের মাটির মতোই স্থির, নরম, অথচ দৃঢ়। কৃষিতে নারীর নেতৃত্ব আসলে এমনই নিঃশব্দ শক্তির গল্প, যা বহুদিন ধরেই আমাদের সমাজের আড়ালে লুকিয়ে আছে।
যে সমাজে কৃষি শুধু জীবিকা নয়, রাষ্ট্রের অর্থনীতির মূল ভরসা, সেখানে নারীরা অদৃশ্য অবদান রেখেই চলেছেন বহু বছর। ঘরের ভেতরের কাজ সামলে ভোরে মাঠে যাওয়া, বীজ বোনা, আগাছা পরিষ্কার করা, ধান কাটা, শাকসবজি উৎপাদন, হাঁস-মুরগি পালন, আর্থিক লেনদেন-সবকিছুতেই নারী আছে, তবুও তাদের নাম নেই জায়গামতো নথিতে। কৃষি অফিসে তালিকা করতে গেলে পুরুষের নামই আগে লেখা হয়, কৃষি ঋণ নিতেও পুরুষকেই দেখা হয়, এমনকি সিদ্ধান্ত নেয়ার টেবিলেও নারীর স্থানে যেন অদৃশ্য শূন্যতা। অথচ কৃষিতে নারীর নেতৃত্বই অনেক পরিবারকে দারিদ্র্য থেকে টেনে তুলছে, অনেক গ্রামকে পরিবর্তনের আলো দেখাচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে আজ কৃষিতে নারীর নেতৃত্বের গল্প শুধু একটি বিষয় নয়; এটি একটি জাতীয় বাস্তবতার আয়না।
দেশের বিভিন্ন জেলায় করা সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, কৃষি খাতের প্রায় অর্ধেক শ্রমই নারীরা দিচ্ছেন, কিন্তু তাদের মধ্যে খুব কমজন নিজেদের প্রধান কৃষক হিসেবে পরিচয় দিতে পারেন। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে স্থানীয় কৃষক সমিতির কয়েকটি সমীক্ষা বলছে, নারীরা কৃষিকাজের সময়ের হিসেবে পুরুষদের চেয়েও বেশি পরিশ্রম দেন, বিশেষ করে বীজতলা করা, রোপন, শাকসবজি চাষ, মাছের খাবার দেয়া, হাঁস-মুরগির দেখভাল, দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদন-এসব কাজে নারীর অংশগ্রহণ সবচেয়ে বেশি।
অনেক এলাকায় আবার নারীরাই ছোট খামারের পুরো পরিচালনা সামলান, কারণ পুরুষেরা হয় শহরে শ্রমিক হিসেবে যান, নয়তো মৌসুমি কাজে বাইরে থাকেন। ফলে বাড়ির খাদ্যের নিরাপত্তা থেকে শুরু করে বাজারে বিক্রি-সবকিছুই নারী চালিয়ে নিয়ে যান।
এত পরিশ্রমের পরও নারীর নেতৃত্ব নথিতে প্রতিফলিত না হওয়ার কারণ অনেক। প্রধান বাধা সামাজিক মানসিকতা। কৃষিকে এখনো বহু স্থানে পুরুষের ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হয়। পরিবারের জমির মালিকানাও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পুরুষের হাতে, ফলে নারীর স্বীকৃতি পাওয়ার সুযোগ কমে যায়। আরেকটি বড় কারণ শিক্ষার সুযোগ সীমিত হওয়া। অনেক নারী জানেন না কীভাবে কৃষি ঋণ নিতে হয়, সরকারি প্রশিক্ষণে যোগ দিতে হয়, অথবা কীভাবে প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক কৃষি পদ্ধতি ব্যবহার করতে হয়। এছাড়া গ্রামে নারী একা বাইরে বের হতে অসুবিধা বোধ করেন, ফলে বাজারে পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রেও পুরুষকে এগিয়ে আসতে হয়। নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা সীমিত। তাদের সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা প্রায়ই পরিবারের নিয়ন্ত্রণের ভেতর বন্দী থাকে। অন্যদিকে প্রযুক্তিগত সুবিধা, সেচব্যবস্থা, মানসম্মত বীজ, বাজারমূল্যের তথ্য-এসব তথ্য নারীরা ঠিকমতো পান না। কারণ তথ্য আদানপ্রদানের কেন্দ্রগুলোতে সাধারণত পুরুষদের জমায়েত বেশি, আর নারীরা সামাজিক সংকোচে সেখানে যেতে পারেন না। অনেক সময় আবার নারীর কাজকে কাজ হিসেবেই দেখা হয় না। পুরুষের শ্রমকে হিসেব করা হয়, কিন্তু নারীর শ্রমকে ধরা হয় পারিবারিক দায়িত্ব হিসেবে। ফলে তাদের প্রকৃত অবদান অদৃশ্য থেকে যায়।
এ পরিস্থিতি বদলানোর জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো নারীর কৃষিশ্রমকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া। জমির মালিকানায় নারীর অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। জমির কাগজপত্রে নারীর নাম যোগ হলে তারা কৃষি ঋণ, ভর্তুকি এবং সরকারি সহায়তা সহজে পেতে পারেন। এরপর দরকার দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ। গ্রামে গ্রামে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বাড়ানো, নারীর জন্য আলাদা কৃষি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা, নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারে হাতে-কলমে শেখানোর পরিবেশ তৈরি করা-এসব উদ্যোগ নারীদের আত্মবিশ্বাসী করে তুলবে। আরেকটি বড় প্রয়োজন বাজারে প্রবেশাধিকারের সুযোগ। নারীদের জন্য আলাদা কৃষক বাজার, সমবায় গোষ্ঠী, এবং সরাসরি ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করলে তাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতা বাড়বে।
পারিবারিক পর্যায়ে মানসিকতার পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের পুরুষ সদস্যদের বুঝতে হবে যে নারীর কৃষিশ্রম শুধু সহায়তা নয়-এটি পরিবার এবং জাতির উন্নয়নের একটি প্রধান স্তম্ভ। নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়াতে পরিবারকে সহযোগী হতে হবে। প্রযুক্তিসেবার সঙ্গে নারীর সংযোগ নিশ্চিত করতে মোবাইলভিত্তিক কৃষি পরামর্শ, নারী কৃষকদের জন্য দূরশিক্ষণ, এবং ঘরে বসে তথ্য পাওয়ার সুবিধা বাড়ানো দরকার। পাশাপাশি স্থানীয় সরকারের উদ্যোগে নারী কৃষকদের সম্মাননা, পুরস্কার, এবং সফলতার গল্প প্রচার করলে আরও অনেক নারী এগিয়ে আসতে উৎসাহিত হবেন।
এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে কৃষিতে নারীর নেতৃত্ব আর গোপন থাকবে না; বরং দৃশ্যমান বাস্তবে রূপ নেবে। একটি নারী যখন নিজের জমির পাশে দাঁড়িয়ে সেচযন্ত্র চালান, তখন তিনি শুধু নিজের পরিবারকে নয়, একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকেও এগিয়ে নেন। যখন কোনও নারী বাজারে নিজ হাতে উৎপাদিত শাকসবজি বিক্রি করেন, তখন তিনি শুধু আয় করেন না, নিজের অবস্থানকেও বদলান। এ ধরনের প্রতিটি ছোট পদক্ষেপই দেশের কৃষিকে আধুনিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তোলে।
আজ সময় এসেছে নারীর পরিশ্রমকে আলোয় আনার। কৃষিতে নারীর নেতৃত্ব কেবল ব্যক্তিগত সংগ্রামের গল্প নয়; এটি একটি জাতির শিকড়কে শক্ত করে তোলার পথ। যে নারীরা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাটিকে আদর করে ফসল ফলান, তারাই প্রকৃত অর্থে এ দেশের অদৃশ্য নায়ক। তাদের স্বীকৃতি দেওয়া মানে শুধু সম্মান নয়, দেশের ভবিষ্যৎকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো। এ বাস্তবতা যত দ্রুত স্বীকার করবো, কৃষি তত দ্রুত স্থিতিশীল, সমৃদ্ধ এবং ন্যায়ভিত্তিক হয়ে উঠবে। তাই এখনই আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে-নারীর নেতৃত্বকে প্রান্তিক রেখে চলব, নাকি তাকে জাতীয় অগ্রগতির কেন্দ্রে নিয়ে আসব।
লেখক : শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।