॥ রুশাইদ আহমেদ ॥
একবিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্ন থেকে বিশ্বে যে বিস্ময়কর প্রাযুক্তিক বিপ্লব ঘটতে শুরু করেছে, তার ভরকেন্দ্র হিসেবে এখন সামাজিক মাধ্যমকে একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক শক্তি বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। আগে আমরা জানতাম, পত্র-পত্রিকা, রেডিও কিংবা টেলিভিশনের মতো গণমাধ্যমগুলো নয় থেকে ৯০ বছরের মানুষের জন্য বার্তা উৎপাদন করে। কিন্তু কালপরম্পরায় সেই দায়িত্ব বর্তমানে কাঁধে তুলে নিয়েছে সামাজিক মাধ্যমগুলো।
শুধু তাই নয়, সামাজিক মাধ্যম বিশ্ববাসীকে এখন আর বিবিধ বার্তা বা সংবাদের ভোক্তা পরিচয়ের ভেতর সীমাবদ্ধ করে রাখছে না। বরং এটি একইসঙ্গে বহু বার্তা ও নাগরিক সংবাদ উৎপাদন এবং ভোগ করার এক সর্বজনীন প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। এ কারণে আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সকলেই একটি “কৃত্রিম ডিজিটাল বিশ্বে” নিজেদের স্বতন্ত্র ব্যক্তিপরিচয় গড়ে তোলার সুযোগ পাচ্ছেন। পাশাপাশি, স্বতন্ত্র কনটেন্ট প্রস্তুত ও প্রচার করার মধ্য দিয়ে গোটা বিশ্বে তাঁরা নিজেদেরকে এক ধরনের “কাল্ট সত্তা” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করছেন। এতে দেখা যাচ্ছে, বাস্তবতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আচার-আচরণ কিংবা কর্মকা-ের তেমন সাদৃশ্য থাকছে না।
আর এই সমগ্র বিষয়টি আমাদেরকে এক প্রকার “জনতুষ্টিবাদী জীবে” পরিণত করতে প্রভাবকের ভূমিকায় আবির্ভূত হচ্ছে। আবহমান কাল থেকে জনতুষ্টিবাদ ধারণাটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের এক চটকদার কৌশল বলে বিবেচিত হয়ে আসলেও, এখন এটি মানুষের ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে বিকশিত হচ্ছে সামাজিক মাধ্যমের বদৌলতে।
আপাতদৃষ্টিতে, সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জনতুষ্টিবাদীরা সর্বদা একমাত্র “সঠিক, সৎ ও মহান” পরিচয়বাহী গোষ্ঠী হিসেবে নিজেদেরকে উপস্থাপনের প্রবণতা যেভাবে লালন করে থাকেন, তেমনিভাবে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীরাও ফেসবুক, এক্স (সাবেক টুইটার), ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউবের মতো সাইটগুলোতে সর্বদা সকলের সামনে নিজেদের “ক্লিন ইমেজ” বজায় রাখার প্রবণতা ধারণ করছেন। আবার, জনতুষ্টিবাদী গোষ্ঠীর সদস্যরা চটকদার বক্তৃতা আর দৃঢ় কার্যকলাপের মাধ্যমে সবসময়ে নিজেদের প্রভাব জাতির কাছে যেমন দৃশ্যমান করে রাখতে চান,তেমনই “সোশ্যাল ইনফ্লুয়েন্সার”তকমা পেতে বিবিধ ধরনের কনটেন্ট উৎপাদন করে ভাইরাল হওয়ার স্বপ্নও কিছু সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারী প্রায়শই লালন করে থাকেন।
এই অপাংক্তেয় প্রবণতাগুলো সামাজিক জীব বলে খ্যাত মানবজাতিকে ক্রমেই এমন এক বাস্তবতার দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে ক্ষেত্রবিশেষে আমাদের নির্বুদ্ধিতা আর বুদ্ধিবৃত্তিক অবদমনের ইঙ্গিত পরিস্ফুটিত হয়ে উঠছে। শুধু নিছক “ভাইরাল হওয়ার মাদকতায়” আমরা আমাদের মানবীয় বিবেচনাবোধকে জলাঞ্জলি দিচ্ছি। যখন যে বিষয় ট্রেন্ডিংয়ে থাকছে, সেই বিষয়গুলো নিয়ে মেতে থাকছি।
অথচ বেকারত্ব, অপরিকল্পিত উন্নয়ন পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে সৃষ্ট সমস্যা, জীবনমানের নি¤œগামিতার মতো ক্রমাবনতিশীল আর্থসামাজিক প্রসঙ্গসমূহ প্রতিনিয়ত আমাদের আলোচনার বাইরে রয়ে যাচ্ছে। ফলে জনতুষ্টিবাদের অলীক মায়াজালে আবদ্ধ হয়ে জাতি ও সমাজের সামগ্রিক কল্যাণ আর অগ্রযাত্রা বারবার ব্যাহত হচ্ছে।
অপর দিকে, ভাইরাল হওয়ার জনতুষ্টিবাদী প্রবণতা অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীদের নৈতিক স্খলনে প্ররোচিত করছে। যা আরেকটি সামাজিক বিপর্যয় ডেকে আনছে। বিশেষ করে সামাজিক প্ল্যাটফর্মগুলোতে অসাধু আর অশ্লীল কনটেন্টের প্রসার যুব সম্প্রদায়কে মানসিক বিকলাঙ্গতার দিকে ধাবিত করছে। পাশাপাশি, সামাজিক মাধ্যমে অপতথ্য ও কু-তথ্যের জোয়ার দেশ তথা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টির ভয়াবহ সম্ভাবনাও তৈরি করছে।
অথচ ২০০২-২০০৪ সালের মধ্যে যাত্রা শুরু করা ফ্রেন্ডস্টার, ফেসবুকের মতো প্রাথমিক পর্যায়ের সামাজিক মাধ্যমগুলো প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ছিল গোটা বিশ্বের নাগরিকদের মাঝে এমন একটা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, যার মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করা সম্ভব হয় স্থান আর কাল ভেদে। কিন্তু উত্তরোত্তর বাড়তে থাকা সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীর সংখ্যা এবং কনটেন্ট ক্রিয়েশনের মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের সুযোগ মানুষকে নৈতিকভাবে নিচে নামাতে নিয়ামক হয়ে উঠছে। ফলে শুধু ভিউ বাণিজ্য, ভাইরাল হওয়ার প্রবণতা এবং ডিজিটাল দুনিয়ায় নিজের ব্যক্তিত্বকে কৃত্রিমভাবে অপরাজেয় করে তোলার স্বার্থে মানুষ সামাজিক মাধ্যমগুলোতে অপ্রতিরোধ্য জনতুষ্টিবাদী চরিত্রে রূপায়িত হচ্ছে।
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত মিডিয়া পর্যবেক্ষণ সংস্থা মেল্টওয়াটার ও সোশ্যাল মিডিয়া সংস্থা উই আর সোশ্যালের এক জরিপ প্রতিবেদন মোতাবেক বর্তমানে গোটা বিশ্বের ৬২.৩ শতাংশ মানুষ সামাজিক মাধ্যমগুলোতে সক্রিয় রয়েছেন।মাধ্যমগুলোতে আগত ক্রমবর্ধমান নতুন নতুন ফিচার ও সুবিধা সংবলিত আপডেটের কারণে চলতি বছরের শেষ নাগাদ এসে এই অঙ্ক নিঃসন্দেহে আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
এমতাবস্থায়, সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীরা যদি নিজেদের মনস্তত্ত্বকে নিয়ন্ত্রণে রাখার সক্ষমতা অর্জন করতে পারেন, তবেই দেশ, জাতি, সমাজ তথা সমগ্র বিশ্বের কল্যাণ সাধন সম্ভবপর হবে। এ কারণে আমাদের খেয়াল রাখতে হবেএটি সামাজিক মাধ্যম; “জনতুষ্টিবাদী মাধ্যম” নয়। এখানে কোনো কিছু শেয়ারের আগে তাই যাচাই করতে হবে সত্যতা। কনটেন্ট ক্রিয়েশনের সময় মেনে চলতে হবে সামাজিক রীতিনীতি ও শিষ্টাচারের মৌলিক বিষয়াদি। পাশাপাশি, মানবতার অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রাখতে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অবিচারের বিরুদ্ধে গঠনমূলকভাবে তুলতে হবে আওয়াজ। আর এভাবেই প্রতিটা সামাজিক মাধ্যমকে মানবতার ঝা-াবাহী কল্যাণকর “ডিজিটাল ভুবন” হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে বলে বিশ্বাস করা যায়।
লেখক : শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।