ঐতিহাসিক জুলাই বিপ্লবের পর মনে করা হয়েছিলো যে, দেশে গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা সহজসাধ্য হবে। এ জন্য রাষ্ট্র সংস্কার, গণহত্যাকারীদের বিচার এবং একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করার জন্য যত প্রকার বাধা-প্রতিবন্ধকতা রয়েছে সেগুলো দূর করার ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠিত হবে জাতীয় ঐকমত্য। কিন্তু এ কাজটা যতটা সহজ মনে করা হয়েছিলো, বাস্তবে তা ততটা সহজ হয়নি বরং রাজনৈতিক অনৈক্য, বিভেদ ও দলীয় সঙ্কীর্ণতার কারণে এসব ক্ষেত্রে নানাবিধ জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। মহল বিশেষ সংস্কারের পক্ষে কথা বললেও তারা এর বস্তবায়ন চান না বরং তারা কাজীর গরুর মত গোয়ালে নয় বরং কিতাবের শুভ্র পাতায় সীমাবদ্ধ রাখতে চান। এরা স্বানন্দচিত্তে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করলেও এ সনদের আইনগত ভিত্তি চান না বরং তারা তা পুঁথিগত বিদ্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে চান। এ সম্পর্কে মনীষীদের বক্তব্য হলো, ‘পুঁথিগত বিদ্যা আর পরহস্তে ধন, নহে বিদ্যা নহে ধন হলে প্রয়োজন’। একথার মাধ্যমে মূলত একথাই প্রমাণ হয় যে, আইনগত বা সাংবিধানিক ভিত্তি ছাড়া জুলাই সনদ শুধু নিষ্ফলা নয় বরং জুলাই বিপ্লবের চেতনার সাথে পুরোপুরি সংগতিহীন।

একথা সত্য যে, আমাদের দেশের চলমান রাজনীতি পুরোপুরি গণমুখী হয়ে ওঠেনি। মূলত, শ্রেণি বিশেষ আমাদের দেশের রাজনীতিকে আত্মস্বার্থ, গোষ্ঠীস্বার্থ, শ্রেণি স্বার্থ, ব্যক্তি স্বার্থ ও সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থ চরিতার্থ করার মোক্ষম হাতিয়ারে পরিণত করেছে। দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থের কথা চিন্তা না করে রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ ও বৈষয়িক স্বার্থকেই অধিকগুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। ফলে রাষ্ট্র সংস্কার ও জুলাই সনদ নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এখন পর্যন্ত কোন ঐকমত্যে পৌঁছতে পারেনি বরং অনেকটা মান বাঁচানোর জন্য জোড়াতালি দিয়ে একটা কিছু দাঁড় করানো হয়েছে। এতে কোন পক্ষই পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারেনি বরং একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল অভিযোগ করে বলেছে যে, ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশন প্রকান্তরে জাতীয় অনৈক্যই সৃষ্টি করেছে’। এমনকি তারা এ কমিশনের বিরুদ্ধে জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকার অভিযোগ তুলেছে জোরালো ভাবেই। কোন কোন দল জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কোন কোন সিদ্ধান্তের সাথে দ্বিমত পোষণ করলেও তারা তা প্রত্যাখান করেনি। কিন্তু সমস্যা বেধেছে সংস্কার ও জুলাই সনদের আইনগত ভিত্তি বিষয়ক গণভোট নিয়ে। একটি দল জাতীয় নির্বাচনের দিনেই গণভোটের আয়োজনের পক্ষে। কিন্তু তাদের অনুকূলের এতদসংক্রান্ত অধ্যাদেশ জারি হলেও তারা এখনো প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে গণভোটের বিরোধিতা করেই চলেছেন। সাংবিধানিকভাবে জনগণের সার্বভৌমত্ব স্বীকৃত হলেও মহল বিশেষ কেন গণভোটে বা জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার পক্ষে নয় তা কারো কাছে বোধ গম্য নয়। তাই সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চিয়তা কেটে যায়নি। যদিও ইতোমধ্যেই নির্বাচনী তফসিল ঘোষিত হয়েছে। কিন্তু শঙ্কাটা এখনো পুরোপুরি কেটে যায়নি।

দেশে গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সুশাসন ও ন্যায়-ইনসাফের সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্যই জুলাই বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিলো। কিন্তু রাজনৈতিক অনৈক্য, বিভাজন ও অতিমাত্রায় ক্ষমতা লিপ্সার কারণে আমাদের সে অর্জন রীতিমত হুমকীর মুখে পড়েছে। নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক পক্ষগুলো যেভাবে পরষ্পর মুখোমুখী অবস্থান নিয়েছে তা কোন শুভ লক্ষণ নয় বরং গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পুরোপুরি পরিপন্থী।

আধুনিককালের শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ লর্ড ব্রাইসের ভাষায় গণতন্ত্র হলো, ‘A government in which the will of the majority of the qualified citizens rules….say, at least three-fourths so that the physical force of the citizens coincides with their voting power.’ ‘যে শাসন প্রথায় জনসমরি অন্তত তিন-চতুর্থাংশ নাগরিকের অধিকাংশের মতে শাসনকার্য পরিচালিত হয়, তাই গণতন্ত্র। এ ক্ষেত্রে এও উল্লেখযোগ্য যে, নাগরিকের ভোটের শক্তি যেন তাদের শারিরীক বলের সমাজ হয়’। কিন্তু আমাদের দেশে বিগত প্রায় দেড় দশকের নির্বাচনগুলোতে লর্ড ব্রাইসের গণতন্ত্রের সংজ্ঞার বাস্তব প্রতিফলনটা লক্ষ্য করা যায়নি। আমাদের গণতন্ত্রের দুর্ভাগ্যটা বোধহয় সেখানেই।

আমাদের দেশের সংবিধানে বহুদলীয় গণতন্ত্র স্বীকৃত। এটি উদারনৈতিক গণতন্ত্রেরই নামান্তর। আর উদারনৈতিক গণতন্ত্রের মূল কথা হলো ব্যক্তি স্বাধীনতা, নানাবিধ অধিকার এবং শাসিতের সম্মতি-সাপেক্ষে গঠিত সরকার। নাগরিক জীবনের পৌর ও রাষ্ট্রীক অধিকারের স্বীকৃতি, আইনের শাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের গণতান্ত্রিক বিধি-ব্যবস্থার সঙ্গে উদারনীতির সুসংঘবদ্ধ সম্পর্ক হলো এ প্রত্যয়ের মূল কথা। কালপ্রবাহে গণতন্ত্রের বিবর্তন হয়েছে। এসেছে পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও পরিমার্জনও। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মিশ্র অর্থনীতি ও গণতান্ত্রিক পরিকল্পনা অবাধ বাণিজ্যের স্থান অধিকার করেছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আমরা অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছি। সঙ্গত কারণেই আমরা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় খুব একটা সুবিধা করতে পারছি না।

আওয়ামী-বাকশালী শাসনামলে নির্বাচনগুলো কেমন হয়েছে, তা আমাদের কারোরই অজানা নয়। এসব নির্বাচনে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতিফলন যেভাবে হওয়া উচিত ছিল তা হয়নি বরং দেশে নির্বাচনের নামে নির্মম প্রহসনই অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। আর দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিলো রীতিমত ডামি নির্বাচন। নবম, দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিলো তামাশা ও ভাঁওতাবাজির নির্বাচন। একাদশ জাতীয় সংসদ নিয়ে ভারতের কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ এর একটি প্রতিবেদনের কিয়দংশ উল্লেখ করা যুক্তিযুক্ত মনে করছি। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘২৮৮ আসনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট জয়লাভ করলেও বিরোধীরা ভোট কারচুপির অভিযোগ তুলে পুনরায় নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে মহাজোটের সমর্থকদের বাধার মুখে লোকজন ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেনি বলে অভিযোগ করা হয়েছে। প্রধান বিরোধী জোটের নেতা এ নির্বাচনকে প্রহসন উল্লেখ করে তা বাতিলের আহ্বান জানিয়েছে। অনেক পোলিং এজেন্ট জানিয়েছে তারা ভয়ে কেন্দ্র থেকে দূরে ছিলেন। আবার অনেকে অভিযোগ করেন তাদের মারধর করে কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া হয়েছে।.....এমনকি ক্ষমতাসীন দলের নেতারা ব্যালটে সিল মেরে ব্যালটবাক্স ভরাট করেছে। একজন নারী ভোটার দাবি করেন, পুলিশ তাদের স্বাধীনভাবে ভোট দিতে দেয়নি। পুলিশ বলেছে যদি নৌকায় ভোট দেয় তাহলেই কেবল ভোট দিতে পারবে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, শেখ হাসিনার ক্ষমতা দিন দিন শক্তিশালী হয়ে উঠেছে এবং দেশটি এক দলীয় শাসনে পরিণত হতে চলেছে’।

আমাদের দেশে নির্বাচনে অনিয়ম নিয়ে অভিযোগ নতুন কিছু নয়। তা অতীতে ছিল এবং এখনও আছে। অতীতে নির্বাচনে ‘সূক্ষ্ম’ ও ‘স্থুল’ কারচুপির অভিযোগ ছিল বহুল আলোচিত। ভোট গণনায় অনিয়ম, নির্বাচনী কর্মকর্তাদের পক্ষপাতিত্ব, একজনের ভোট আরেকজন দেয়ার অভিযোগ আমরা অতীতেও শুনেছি। কোন কোন ক্ষেত্রে কেন্দ্র দখল করে বিশেষ প্রার্থীর পক্ষে গণহারে সিল মারার অভিযোগেও কোন অভিনবত্ব নেই। কিন্তু সারাদেশেই ভোটারদের ভোটদানে নিরুৎসাহিত করা, পোলিং এজেন্ট দিতে বাধা প্রদান, ক্ষেত্র বিশেষে মারধর বা প্রায় সকল কেন্দ্র দখল করে নিয়ে গণহারে সীল মারার ব্যাপক অভিযোগ বিগত পতিত আওয়ামী লীগ সরকারে আমলে রীতিমত প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি পেয়েছে। কিন্তু ফ্যাসিবাদীরা এসব অভিযোগ কোনভাবেই আমলে নেয়নি। ঘটনার ধারাবাহিকতায় আমাদের বৈশ্বিক গণতান্ত্রিক সূচকে অবনোমন ঘটার বিষয়টি একেবারে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিলো।

একথা আরও জোরালো লন্ডনভিত্তিক সাময়িকী ‘দ্য ইকোনমিস্ট-এর ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ)’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে। সংস্থাটি ১৬৫টি দেশে জরিপ পরিচালনা করে দেখায় যে, গণতন্ত্রের সূচকে বাংলাদেশের অবনতি হয়েছে। ২০১৬ সালে যেখানে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৮৪তম সেখানে ২০১৭ সালে ৮ ধাপ নিচে নেমে হয়েছে ৯২তম। পরের বছর সূচকে বাংলাদেশ ‘হাইব্রিড শাসনব্যবস্থার’ বিভাগের মধ্যেই ছিলো। অর্থাৎ ২০১৮ সালে এসে সে সূচকের আরও অবণতি ঘটেছে। ‘হাইব্রিড’ বলতে এমন শাসন ব্যবস্থাকে বোঝায়, যেখানে প্রায়ই অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয়। নির্বাচনে জনমতের প্রতিফলন উপেক্ষিত থাকে। স্বাধীনতা অর্জনের প্রায় অর্ধশতাব্দি পরেও এমন অপবিশেষণে বিশেষিত হওয়া আমাদের জন্য হতাশারই বলতে হবে।

একথা অস্বীকার করার জো নেই যে, আওয়ামী-বাকশালী শাসনামলে দেশের গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রাষ্ট্রের প্রায় সকল অবকাঠামোকে ধ্বংস করে দিয়েছে। তাদের অপশাসন-দুঃশাসনে দেশ একেবারে অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হতে বসেছিলো। সে বাস্তবতায় তারা বিরোধী দলের সকল প্রকার গণতান্ত্রিক ও মৌলিক অধিকার কেড়ে নিয়েছিলো। এমনকি দুর্নীতি সর্বগ্রাসী রূপ নিয়েছে বলে জোরালো অভিযোগ রয়েছে। আইনের শাসনের দুর্বলতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এজন্য প্রধানত দায়ি। বিচার ব্যবস্থা ও জনপ্রশাসনের উপর নির্বাহী বিভাগের খবদারিকেও এজন্য দায়ি করা হয়। ইআইইউ-এর প্রতিবেদন থেকে একথা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, আমাদের দেশের গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কতটা ভঙ্গুর অবস্থায় এসে পৌঁছেছে এবং দিন দিন তা অবনতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তবে জুলাই বিপ্লবের নতুন আশাবাদের সৃষ্টি হয়েছে।

মধ্যযুগের ধর্মচিন্তক ও রাষ্ট্রচিন্তকরা মানবকল্যাণে যে অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছিলেন, তা একবিংশ শতাব্দীতে এসে অনেকটাই অনুপস্থিত। বিশেষ করে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে একথাটা খুবই সামঞ্জস্যপূর্ণ। একবিংশ শতাব্দীতে এসে আমরা মানুষকে স্বপ্ন দেখালেও তা শুধু অন্তঃসারশূন্য বলেই প্রতীয়মান হয়েছে। আমরা ক্রমেই যেন আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছি। বস্তুত, মানবসভ্যতার অবিস্মরণীয় অবদান হচ্ছে কল্যাণমুখী, গণতান্ত্রিক ও গতিশীল রাষ্ট্রব্যবস্থা। কিন্তু আমরা তা থেকে অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছি বলতে হবে। দেশে গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সুশাসন নিশ্চিতের জন্য সরকার ও সংবিধান থাকলেও প্রচলিত রাজনীতি ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হওয়ায় আমরা সে লক্ষ্য থেকে যোজন যোজন দূরেই অবস্থান করছি। ফলে আইন ও সাংবিধানিক শাসনের ধারণাটা আজও আমাদের কাছে অধরাই রয়ে গেছে। একদিকে দেশে গণতন্ত্র প্রশ্নবিদ্ধ, অন্যদিকে দেশে আইনের শাসনের অবস্থাও বেশ ভঙ্গুর। কারণ, পতিত শাসকগোষ্ঠীর উড়ণচণ্ডী মনোভাবের কারণে দেশের সুশাসনও তিরোহিত হয়েছিলো। দার্শনিক প্লেটোর মতে, ‘When the prince is virtuous, law are unnecessary; when prince is not virtuous, law is useless’ অর্থাৎ ‘শাসক যখন হবেন ন্যায়বান, তখন আইনের শাসন নিষ্প্রয়োজন। আবার যখন হবেন দুর্নীতিপরায়ণ তখন আইন হবে নিরর্থক’। কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই আমাদের দুর্বলতা ছিলো বেশ প্রকট।

আমাদের সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্র হবে একটি গণতন্ত্র, যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকবে, মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হবে এবং প্রশাসনের সকল পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে’। কিন্তু সংবিধানের গণমুখী অনুচ্ছেদগুলো শুধু সংবিধানেই লিপিবদ্ধ রয়েছে। ফ্যাসিবাদী আমলে এর বাস্তব প্রয়োগটা বরাবরই থেকেছে উপেক্ষিত। ক্ষমতাসীনরা বরাবরই প্রচার করে এসেছে যে, দেশে সংবিধান আছে, আছে সাংবিধানিক শাসন। এমনকি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধও সুপ্রতিষ্ঠিত রয়েছে।কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলনটা একেবারেই ছিলো না।

উল্লেখ করা দরকার যে, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে মাত্র দশ মাসে প্রণীত সংবিধান ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর বাংলাদেশের গণপরিষদে পাস হয় এবং ঐ সংবিধানকে ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে কার্যকারিতা প্রদান করা হয়। জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে এই সংবিধান বিশ্বের সকল স্বাধীনতা-অর্জনকারী রাষ্ট্রের মধ্যে অপেক্ষাকৃত স্বল্পসময়ে প্রণীত ও অনুমোদিত গণতান্ত্রিক সংবিধান হিসেবে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়। কিন্তু স্বাধীনতার প্রায় ৫ দশক অতিক্রান্ত হওয়ার পরও আমাদের দেশে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বিকশিত হয়নি বরং ক্রমেই তা আরও অধিক সঙ্কটাপন্ন হয়ে পড়ছে। জুলাই বিপ্লবের পর নতুন সম্ভবনার সৃষ্টি হলেও একশ্রেণির রাজনীতিক আত্মকেন্দ্রিকতা ও অহমিকার কারণেই সে আশায়ও গুড়ে বালির আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।

মূলত, কমিউনিষ্টরা গণতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাস করে না। তাদের ভাষায়, ‘ভোট (ঠড়ঃব) সংসদীয় বা আঞ্চলিক ক্ষেত্রে একটি পক্ষের লোকজনের ভেতরে বিরাজমান কোন মত বা বিতর্কে কাউকে সমর্থন করার প্রক্রিয়া। পুঁজিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী যুগের প্রতিনিধিত্বমূলক সরকারে ভোটকে খুব বড় করে দেখানো হয়। কেননা, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক শাসন, শোষণ ও নির্যাতন চালাতে সরকার পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষকে নির্ধারণ করতে সাধারণ জনগণের ভোট দেবার প্রয়োজন পড়ে’।

‘ফলে শ্রেণিভিত্তিক সমাজে রাজনৈতিক সম্মতিসূচক ভোট (Approval of voting) হচ্ছে জনগণকে শাসন, শোষণ ও নির্যাতনকারী কর্তৃপক্ষ নির্ধারণের একটি আইনগত প্রক্রিয়া। আর উদারনৈতিক গণতন্ত্র বা উদারবাদী গণতন্ত্র বা পাশ্চাত্য গণতন্ত্র (Liberal Democracy) হচ্ছে গণতান্ত্রিক শোষণমূলক সমাজ ব্যবস্থারই একটি রূপ বিশেষ। উদারনৈতিক গণতন্ত্র মার্কসবাদী, লেনিনবাদী, মাওবাদী ও সাম্যবাদী, সমাজতন্ত্র ও নৈরাজ্যবাদীদের যুক্তিতে হচ্ছে বুর্জোয়া শ্রেণির একনায়কত্ব’।

ভোট ও গণতন্ত্র নিয়ে কমিউনিষ্টদের এমন বক্তব্যের সাথে পুরোপুরি একমত হওয়ার কোন সুযোগ নেই। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমাদের দেশে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিয়ে যে সঙ্কট চলছে, তাতে গণতন্ত্র যে স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করতে পারছে না একথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ফলে মানুষ গণতন্ত্রের সুফলগুলো পুরোপুরি ভোগ করতে পারছে না। যা কমিউনিস্টদের ওয়ালাদের বগল বাজানোর সুযোগ করে দিচ্ছে। বিশেষ করে আমাদের দেশের গণতন্ত্র চর্চার প্রেক্ষাপটে তা আরও জোরালো ভিত্তি পেয়েছে। কারণ, আমাদের দেশের গণতন্ত্র জনগণের কল্যাণে আবর্তিত হচ্ছে না বরং গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ছদ্মবরণে যে সুবিধাভোগী শ্রেণি তৈরি হয়েছে, তারাই আমাদের দেশের প্রচলিত গণতন্ত্রের সুবিধাভোগী। যা গণতন্ত্র নিয়ে বিরুদ্ধবাদীদের তিক্ত কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।

জুলাই বিপ্লবের পর মনে করা হয়েছিলো যে, দেশের কক্ষচ্যুত রাজনীতি নিজ কক্ষে ফিরে আসবে। ফ্যাসিবাদ পরবর্তী দেশের রাজনৈতিক শক্তিগুলো গণতান্ত্রিক ও ইতিবাচক রাজনীতির চর্চা শুরু করবে। কিন্তু এক্ষেত্রে আমাদেরকে আবারো হতাশই হতে হয়েছে। রাজনীতি ফিরতে শুরু করেছে সে নেতিবাচক বৃত্তেই। অতীতের চেতনার ফেরিওয়ালাদের স্থান দখল করে নিয়ে নব্য চেতনা ব্যবসায়িরা। যার প্রমাণ মেলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্যে। তিনি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতে ইসলামী কী কী করেছিল, তা মনে রাখার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন দেশবাসীর প্রতি। তার ভাষায়, ‘কেউ কেউ বলে যে একবার দেখুন না এদের (জামায়াত)। তাদের তো দেশের মানুষ ১৯৭১ সালেই দেখেছে। তারা লাখ লাখ মানুষকে শুধু হত্যাই করেনি, তাদের সহকর্মীরা কীভাবে মা-বোনদের ইজ্জত পর্যন্ত লুট করেছিল, এ কথাটি আমাদের মনে রাখতে হবে।’ এক সময়ের বিএনপি জোট সঙ্গী ও সরকারের অংশীদারদের সম্পর্কে এমন মন্তব্য বিজ্ঞচিত বলে মনে করার কোন কারণ নেই। বিষয়টি আগামী দিনের রাজনীতির জন্য বেশ ভাবনার।

আমাদের গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও পরমত সহিষ্ণুতার পারদটা যেভাবে নিম্নগামী হয়েছে তাতে আমাদের এ প্রিয় মাতৃভূমিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ গল্পের ‘ভূতুরে বাড়ী’র সাথে তুলনা করলে অত্যুক্তি হবার কথা নয়। যে বাড়ীতে অতীতে আনন্দ-উচ্ছাস ও জৌলুষের কোন কমতি ছিল না। কিন্তু আত্মপুজারীদের আত্মপুজার কারণেই তা একসময় বিরাণভূমিতে পরিণত হয়। গল্পকথকের ভাষায় এ ভূতূরে বাড়ীতে একরাত্রী যাপন করলে তার পাগল হওয়া ছাড়া কোন বিকল্প থাকে না। তাই পাগল মেহের আলী তার প্রতি প্রত্যুষেই মানুষকে সতর্ক করে বলতে থাকে, ‘সব ঝুট হ্যায়! সব ঝুট হ্যায়! তফাৎ যাও! তফাৎ যাও! শ্রেণি বিশেষের ক্ষমতালিপ্সার কারণেই আমাদের গণতন্ত্র ও প্রিয় মাতৃভূমির কি সে বেহাল দশাই সৃষ্টি হবে? দেশে গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও পরমত সহিষ্ণুতার অনুশীলন কি শুরু হবে না? সব দোষ কি ফ্যাসিবাদের ঘাড়ে চাপিয়ে নিজেরা দায়মুক্ত থাকা যাবে?

www.syedmasud.com