ভেনেজুয়েলা বিশ্বের একটি নতুন রণক্ষেত্র হতে পারে এমন শংকা ছিল ডিসেম্বরের শুরুতে। আর এ হামলার লক্ষ্য হতে পারে দক্ষিণ আমেরিকান স্বাধীনচেতা এ দেশটি ও দেশটির প্রেসিডেন্ট। মাসখানেক পর নতুন বছরের শুরুতে এ আশংকা সত্যি হলো দেশটিতে মার্কিন নির্লজ্জ হামলা ও প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক ধরে নিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। ১৯৮৯ সালের পর এ ধরনের ঘটনা আবারো ঘটলো। সে বছর পানামার জেনারেল নরিয়েগাকে ধরে নিয়ে এসেছিল আমেরিকা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক পাচারের অভিযোগ এনে তাকে হটানোর হুমকি দিয়ে আসছিলেন। কিন্তু তার এ রকম নগ্ন প্রকাশ ঘটবে এমনটা অনেকেই আশা করেননি। ঘটনা ঘটাতে পারঙ্গম ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত সেটাই করে বিশ্বকে চমকে দিলেন। যদিও জানা গিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতারা বলেছিলেন ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার ভেতরে কোনো হামলা চালালে তাঁরা নতুন প্রস্তাব আনবেন; যাতে এ ইস্যুতে কংগ্রেসে ভোট বাধ্যতামূলক হয়। দেশটির বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামরিক আগ্রাসন ঠেকাতে দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা চালিয়ে আসছিলেন এ আইনপ্রণেতারা।

তারা বলেছিলেন ‘ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে অননুমোদিত সামরিক অভিযান হবে বিশাল ও ব্যয়বহুল এক ভুল; যা অপ্রয়োজনে আমাদের সেনাদের জীবনের ঝুঁকি বাড়াবে’, বিবৃতি দেন কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাট সিনেটর টিম কেইন (ভার্জিনিয়া), চাক শুমার (নিউইয়র্ক), অ্যাডাম শিফ (ক্যালিফোর্নিয়া) ও রিপাবলিকান সিনেটর র‌্যান্ড পল (কেন্টাকি)। কিন্তু তা কোন কাজে আসেনি। খৃস্টান ধর্মগুরু পোপ লিও চতুর্দশ যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনিজুয়েলার মধ্যে সংলাপের আহ্বান জানিয়েছিলেন। ট্রাম্প সবই অগ্রাহ্য করেছেন।

কী ঘটেছে সেদিন? ৩ জানুয়ারি ভোরের দিকে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস ও আশপাশের এলাকায় বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। ভেনেজুয়েলার সরকার জানায়, রাজধানীসহ আশপাশের কয়েকটি রাজ্যে একাধিক স্থানে হামলা হয়েছে। ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে বিস্ফোরণের বিকট শব্দ, আকাশে বিমান, সামরিক স্থাপনার কাছে ধোঁয়া এবং বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতার খবর পাওয়া গেছে। এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলা এবং দেশটির নেতা প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে সফলভাবে বড় আকারের হামলা চালিয়েছে। মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করে দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।’ ট্রাম্প এটিকে ‘মার্কিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে যৌথভাবে’ পরিচালিত একটি অভিযান হিসেবে উল্লেখ করেছেন। মার্কিন হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে নিহত হয়েছে অন্তত ৫৭ জন।

ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে এ আগ্রাসনের নিন্দা শুধু দেশটির ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়। হামলার পর দেশটিতে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। মাদুরোর মুক্তির দাবিতে দেশটির রাজধানী কারাকাসের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ করছেন তার সরকারের সমর্থকরা। কারাকাসের মেয়র কারমেন মেলান্দেজ, যিনি মাদুরো সরকারের অনুগত বলে পরিচিত, তিনিও বিক্ষোভে যোগ দিয়েছেন। মাদুরো ও তার স্ত্রীকে যুক্তরাষ্ট্রে বন্দি করে নিয়ে যাওয়ার পরদিন ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসের বেশিরভাগ রাস্তাঘাট ছিল ফাঁকা। কোথাও কোথাও প্রেসিডেন্ট মাদুরোর মুক্তির দাবিতে তার সমর্থকরা বিক্ষোভ করছেন।

লাতিন আমেরিকার বহু দেশ, রাশিয়া, চীন, ইরানসহ বিভিন্ন রাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক বামপন্থী ও মানবাধিকার সংগঠন মার্কিন হস্তক্ষেপের নিন্দা ও তীব্র সমালোচনা করেছে। সামরিক অভিযান চালিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে ‘জোরপূর্বক আটক’ করে এনেছে, তাতে ‘আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন’ ঘটেছে বলে মন্তব্য করেছে চীন। এ ঘটনার নিন্দা ও উদ্বেগ জানিয়ে মাদুরো ও তার স্ত্রীকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বেইজিং। রাশিয়াও ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হামলা ও স্ত্রীসহ মাদুরোকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা মাদুরোকে ‘স্বাধীন সার্বভৌম দেশের বৈধভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট’ অভিহিত করে তার ও তার স্ত্রীর দ্রুত মুক্তির আহ্বান জানিয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের একজন মুখপাত্র বলেছেন, ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে তিনি ‘খুবই উদ্বিগ্ন’। এ ঘটনা শুধু ভেনেজুয়েলার জন্য নয়, পুরো অঞ্চলের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বিবৃতিতে বলা হয়, ভেনেজুয়েলার ভেতরের অবস্থা যেমনই হোক না কেন, এভাবে অন্য দেশের ওপর সামরিক অভিযান চালানো একটি বিপজ্জনক উদাহরণ তৈরি করছে। এই ঘটনায় গত সোমবার নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে রাশিয়া ও চীন। যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন বলে দেশ দুটি মাদুরো দম্পতির মুক্তি দাবি করেন।

বৈঠকে জাতিসংঘে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ভাসিলি নেবেনজিয়া বলেন, ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্র যেসব ‘অপরাধ’ করেছে, সেগুলোর বৈধতা দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অন্যদিকে চীনের উপরাষ্ট্রদূত গেং শুয়াং বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই ‘অবৈধ’ ও ‘গুন্ডামির’ পদক্ষেপে বেইজিং গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।

ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের পদক্ষেপ বেআইনি ও অদূরদর্শী বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ও বিগত নির্বাচনে ডেমোক্রেট দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী কমলা হ্যারিস। তিনি বলেন, ট্রাম্পের পদক্ষেপ আমেরিকাকে নিরাপদ, শক্তিশালী বা আরও সাশ্রয়ী করে তোলে না। তিনি বলেন, তেলের জন্যই এ হামলা চালানো হয়েছে। শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য যুদ্ধ অথবা তেল যা শক্তি হিসেবে বিক্রি হয়। কিন্তু বিশৃঙ্খলায় পরিণত হয় এবং আমেরিকান পরিবারগুলোকে এর মূল্য দিতে হয়। মাদুরোকে আটকের নিন্দা জানিয়েছেন নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি। তিনি এই হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের লংঘন বলে উল্লেখ করেছেন।

সর্বশেষ খবর নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়ার বিরুদ্ধে মাদক চোরাচালান ও সন্ত্রাসের অভিযোগ এনেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তারা। সোমবার নিউইয়র্কের ম্যানহাটানের একটি ফেডারেল আদালতে তাঁদের বিচারও শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র সরকার। আদালতে নিজেদেরকে নির্দোষ দাবি করেন তারা। মাদুরো বলেন, তাকে অপহরণ করা হয়েছে। তিনি এখনো ভেনিজুয়েলার বৈধ প্রেসিডেন্ট। বিশ্লেষকেরা বলেছেন, তাকে বিচারের নামে যে প্রহসন চলছে তাতে মনে হয় তার অবস্থাও নরিয়েগার মতো হতে পারে। তাকে দীর্ঘদিন বন্দী রাখা হতে পারে।

ভেনেজুয়েলা ঘটনায় বিশ্বব্যাপী এ নিন্দা একটি বড় বার্তা দেয় যে, একটি সার্বভৌম দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার কেবল তার জনগণের। তেল বা অন্য কোনো প্রাকৃতিক সম্পদের লোভে সেই অধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্য ভেনেজুয়েলার সমস্যা শুধু দেশের ভেতরের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনেই সীমাবদ্ধ নয়। তাদের দাবি, দেশটি আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হয়ে উঠেছে, যেখানে অপরাধী নেটওয়ার্কের বিস্তার, অভিবাসনের বাড়তি চাপ এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর অস্থিরতার প্রভাব একসঙ্গে জড়িত।

লাতিন আমেরিকার ইতিহাস মানেই এক দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশিক শোষণ ও বহিরাগত হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদার লড়াই। সে ইতিহাসের সর্বশেষ ও সবচেয়ে জ্বলন্ত অধ্যায়গুলোর একটি হলো তিন কোটি লোকের দেশ ভেনেজুয়েলা। বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ, বিশেষ করে বিশ্বের বৃহত্তম প্রমাণিত তেল মজুদের অধিকারী এ দেশটি বহু বছর ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক আগ্রাসনের শিকার। গণতন্ত্র, মানবাধিকার কিংবা জনগণের কল্যাণের বুলি আওড়ালেও বাস্তবে ভেনেজুয়েলার তেলক্ষেত্রকে কব্জা করাই মার্কিন নীতির মূল চালিকাশক্তি এ কথা আজ আর গোপন কোনো বিষয় নয়।

ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি ঐতিহাসিকভাবেই তেলনির্ভর। দেশটির মোট রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ আসে অপরিশোধিত তেল ও তেলজাত পণ্য থেকে। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ভেনেজুয়েলার তেলের অন্যতম বড় ক্রেতা ছিল। কিন্তু হুগো শাভেজের নেতৃত্বে বলিভারিয়ান বিপ্লবের পর ভেনেজুয়েলা যখন তার তেলসম্পদের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ জোরদার করে এবং সেই সম্পদ সামাজিক খাতে ব্যবহারের উদ্যোগ নেয়, তখনই ওয়াশিংটনের সঙ্গে সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে।

শাভেজ সরকার তেল কোম্পানিকে কার্যত জাতীয় সম্পদে পরিণত করেন, বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর অযৌক্তিক সুবিধা কমিয়ে আনেন এবং তেল আয়ের বড় অংশ শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও দারিদ্র্য বিমোচনে ব্যয় করেন। এ নীতি সরাসরি আঘাত হানে মার্কিন কর্পোরেট স্বার্থে। ফলে ‘স্বৈরতন্ত্র’, ‘অদক্ষ শাসন’ কিংবা ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন’ এই শব্দগুলো মার্কিন রাজনৈতিক অভিধানে ভেনেজুয়েলাকে আক্রমণের প্রধান অস্ত্রে পরিণত হয়।

মার্কিন আগ্রাসনের সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ দেখা যায় অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে। একে বিশ্লেষকরা ‘নীরব যুদ্ধ’ বলে আখ্যা দেন। ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে আরোপিত একের পর এক নিষেধাজ্ঞা দেশটির ব্যাংকিং ব্যবস্থা, তেল রপ্তানি, খাদ্য ও ওষুধ আমদানিকে কার্যত অচল করে দেয়। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল বিক্রি করা কঠিন হয়ে পড়ে, বিদেশে থাকা রাষ্ট্রীয় সম্পদ জব্দ হয়, এমনকি মানবিক সহায়তা পৌঁছাতেও তৈরি হয় জটিলতা।

এ নিষেধাজ্ঞার সরাসরি শিকার হয় সাধারণ মানুষ। খাদ্যসংকট, ওষুধের অভাব, মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রার অবমূল্যায়ন দেশটিকে গভীর মানবিক সংকটে ঠেলে দেয়। অথচ এ পরিস্থিতির দায় চাপানো হয় ভেনেজুয়েলার সরকারের ‘ব্যর্থতা’র ওপর, নিষেধাজ্ঞার প্রভাবকে ইচ্ছাকৃতভাবে আড়াল করা হয়। বাস্তবে নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট অর্থনীতিকে ধ্বংস করে জনগণকে সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড় করানো এবং শেষ পর্যন্ত একটি অনুগত সরকার প্রতিষ্ঠা করা।

ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ আজ বহু অনিশ্চয়তায় ঘেরা। একদিকে অর্থনৈতিক সংকট, অন্যদিকে বহিরাগত চাপ, এ দ্বিমুখী চাপে দেশটির সামনে পথচলা কঠিন হয়ে উঠেছে। তবে ইতিহাস বলে, লাতিন আমেরিকার জনগণ সহজে মাথা নত করে না। কিউবা থেকে বলিভিয়া প্রতিটি দেশই একসময় সাম্রাজ্যবাদী চাপ মোকাবিলা করে নিজেদের পথ খুঁজে নিয়েছে।

ভেনেজুয়েলার জন্য ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে কয়েকটি বিষয়ের ওপর। প্রথমত, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঐক্য ও সংস্কার। দুর্নীতি, অদক্ষতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কাটিয়ে উঠতে না পারলে বাইরের চাপ মোকাবিলা করা কঠিন হবে। দ্বিতীয়ত, বহুমুখী আন্তর্জাতিক সম্পর্ক। শুধু একটি বা দুটি শক্তির ওপর নির্ভর না করে বহুপাক্ষিক কূটনীতি জোরদার করা ভেনেজুয়েলার জন্য জরুরি। তৃতীয়ত, তেলনির্ভরতা কমিয়ে অর্থনীতিকে বৈচিত্র্যময় করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। এদিকে ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজকে বেশ কিছু শর্ত দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। এসব শর্ত মানলে তিনি নিকোলা মাদুরোর মতো পরিণতি এড়াতে পারবেন বলে জানানো হয়েছে। মূলত ওয়াশিংটন-ঘনিষ্ঠ নীতি গ্রহণ করার জন্যই তাঁর ওপর এই চাপ দেওয়া হচ্ছে।

মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, দেলসি রদ্রিগেজকে অন্তত তিনটি পদক্ষেপ নিতে হবে। এগুলো হলো মাদক পাচার কঠোরভাবে দমন করা; ইরান, কিউবা ও ওয়াশিংটন-বিরোধী অন্যান্য দেশের নেটওয়ার্ক বা গোয়েন্দাদের দেশ থেকে তাড়ানো এবং যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুদেশগুলোর কাছে তেল বিক্রি বন্ধ করা।

জানা গেছে, রদ্রিগেজের কাছ থেকে শেষ পর্যন্ত একটি অবাধ নির্বাচন ও ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রত্যাশা করছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এসব দাবি পূরণের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়নি। মার্কিন কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেছেন, ভেনেজুয়েলায় এই মুহূর্তে কোনো নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

ভেনেজুয়েলার সংকট কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি বৈশ্বিক ক্ষমতার রাজনীতিরই অংশ। তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তি যে কোনো সময় গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের মুখোশ খুলে ফেলতে পারে, ভেনেজুয়েলা তার জলজ্যান্ত উদাহরণ। এ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী নিন্দা শুধু নৈতিক অবস্থান নয়, বরং একটি ন্যায়ভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার দাবিও বটে।

ভেনেজুয়েলার জনগণ তাদের তেল, তাদের রাষ্ট্র ও তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজেরাই সিদ্ধান্ত নেবে, এ অধিকার রক্ষা করাই আজকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ইতিহাসের আদালতে শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা একটাই থেকে যাবে: শক্তির জোরে নয়, ন্যায়ের ভিত্তিতে কি বিশ্ব পরিচালিত হবে? ভেনেজুয়েলার সংগ্রাম সেই প্রশ্নেরই এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক।