গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়ে গেলো। জনগণ উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারলেও ভোট গণনা ও ফলাফল ঘোষণায় অনিয়মের অভিযোগ পুরো নির্বাচনের ওপর কিছুটা হলেও কালিমা লেপন করেছে। এমনটি না হলে সদ্য সমাপ্ত নির্বাচন আমাদের দেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে অদ্বিতীয় হয়ে থাকতে পারতো। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যে তা হয়নি। মূলত, একশ্রেণির উচ্চাভিলাষী রাজনীতিকের অতিমাত্রায় ক্ষমতা লিপ্সা ও আমলাতান্ত্রিক বিচ্যুতির কারণে আমাদের গণতন্ত্র এখনো প্রশ্নমুক্ত হয়নি।
সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট জাতীয় সংসদে ২শ’র বেশি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। অপর পক্ষে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটের আসন সংখ্যা ৭৭। সংবিধান ও প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার গঠন করবে। ইতোমধ্যেই সে প্রস্তুতি এগিয়ে চলেছে। ব্যতিক্রম কিছু না ঘটলে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী। তার নেতৃত্বেই আজই একটি মন্ত্রী সভা গঠিত হবে এবং মন্ত্রীসভা ও নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ গ্রহণ করবেন আজই।
এবারের নির্বাচনের উল্লেখযোগ্য দিক হলো গণভোট। জনগণের ব্যাপক সাড়র মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র সংস্কার ও জুলাই সনদ বিষয় প্রস্তাবনা বাস্তবায়নের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হয়েছে। সচেতন জনগণ অতীতের অশুভ বৃত্ত থেকে বেড়িয়ে এসে ফ্যাসিবাদ, স্বৈরাচার, মাফিয়াতন্ত্র, দুর্নীতি, চাঁদাবাজির বিপক্ষে এবং সুশাসনের পক্ষে রায় দিয়েছে। যা আমাদের জাতীয় জীবনের এক ইতিবাচক অর্জন। কিন্তু এক্ষেত্রে শঙ্কাটা এখনও কেটে যায়নি। জনগণ জুলাই সনদের অনুকূলে রায় দিলেও বিভীষণদের ষড়যন্ত্র বন্ধ হয়নি।
একথা ঠিক যে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনার মধ্যে সমাপ্ত হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে বিদায় নেওয়ার সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। ইতোমধ্যেই নতুন সরকারের অগ্রাধিকার কী হবে এবং সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ, নতুন সরকারকে নানাবিধ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই সামনের দিকে এগুতে হবে। তাই বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানাবিধ আলাপ চলছে। থেমে নেই আন্তর্জাতিক মহলও। তারাও বিষয়টি নিয়ে রীতিমত নড়েচড়ে বসেছেন।
ব্রাসেলস ভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ’ তাদের এক নিবন্ধে নতুন সরকারের জন্য অন্তত পাঁচটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করছে। এসবের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো ‘আওয়ামী লীগকে ঘিরে রাজনৈতিক সমঝোতার মতো জটিল বিষয়’। অভিযোগ রয়েছে যে, আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে ফেরানো সহ বিভিন্ন বিষয়ে ভারতের সাথে সমঝোতাও হয়েছে। এক্ষেত্রে কলকাঠি নেড়েছে এদেশে ভারতীয় এজেন্টরা। নির্বাচনী প্রচারে বিএনপি নেতাদেরে বিভিন্ন বক্তব্য থেকেও এদাবির প্রমাণ মেলে। আর দলটির মহাসচিব তো বলেই ফেলেছেন, তারা ক্ষমতায় আসলে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সকল মামলা প্রত্যাহার করা হবে।
অবশ্য সংস্থাটি এটিও বলছে যে, নির্বাচিত সরকার হওয়ার কারণে সমস্যা সমাধানে কাজ করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নতুন সরকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা নিতে পারবে। বিশ্লেষকরা অবশ্য বলছেন, কর্তৃত্ববাদী ও অগণতান্ত্রিক সরকারের পতনের পর বিভিন্ন কারণে আইনশৃঙ্খলার যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা থেকে উত্তরণ এবং এটি করতে যে রাষ্ট্র বা সরকারের সক্ষমতা আছে প্রাথমিকভাবে সেটি প্রমাণ করাই হবে নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। তারা বলছেন, আওয়ামী লীগ ইস্যু ছাড়াও ভারতের সাথে সম্পর্ক এবং বৈশ্বিক চাপ সামলিয়ে রোহিঙ্গা ইস্যুতে শক্ত অবস্থান নেওয়াটাই নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে। যা খুব একটা সহজসাধ্য নয়।
ক্রাইসিস গ্রুপের দিক থেকেও নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জগুলোর তালিকায় এসব ইস্যু ঠাঁই পেয়েছে। প্রসঙ্গত, গত ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট এ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। গণভোটেও ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হয়েছে। যা দেশ ও জাতির জন্য একটি মাইল ফলক। নির্বাচনে মূল প্রতিযোগিতা হয়েছে বিএনপি জোট ও জামায়াত জোটের মধ্যে। ভোটারটা উৎসব মুখর পরিবেশে ভোট দিতে পারলেও ভোট গণনা ও ফলাফল ঘোষণায় বড় ধরনের অনিয়ম হয়েছে বলে জামায়াত জোটের পক্ষে অভিযোগ করা হয়েছে। অন্যদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের গণরায়ে পতিত আওয়ামী লীগের ‘খয়ের খাঁ’ জাতীয় পার্টি এখন রীতিমত বিলুপ্তির পথে। নির্বাচনে তারা একটি আসনেও জয়লাভ করেনি। দলীয় চেয়ারম্যান পতিত এরশাদের অনুজ জিএম কাদের খুবই সামান্য ভোট পেয়েছেন। দলীয় মহাসচীব ব্যরিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারি রীতিমত জামানত খুঁইয়ে বসেছেন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ১৪৩ আসনে ‘এ’ গ্রেডের বিপরীতে সবেধন নীলমনি ১ আসনে বিজয়ী হয়ে এখন মন্ত্রীত্ব দাবি করে বসেছে। যা সাধারণ মানুষের মধ্যে রীতিমত হাস্যরসের সৃষ্টি করেছে। অবশ্য ২০২৪ সালের অগস্টে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ এ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। দলটির কার্যক্রম অন্তর্বর্তী সরকার নিষিদ্ধ করেছে।
একথা অনস্বীকার্য যে, জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে দেশে একটি মৌলিক পরিবর্তন এসেছে। এ বিষয়েও চলছে নানা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ। ক্রাইসিস গ্রুপের সিনিয়র কনসালট্যান্ট টোমাস কিনের সম্প্রতি প্রকাশিত একটি নিবন্ধে বিষয়টি স্থান পেয়েছে। এতে ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে গত দেড় বছরে বাংলাদেশে সামগ্রিক চলমান ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরা হয়েছে। এ নিবন্ধেই তিনি বাংলাদেশের নতুন সরকারকে সম্ভাব্য যেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে তার একটি বিন্যস্ত ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেছেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বেশ কয়েকটি কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। এ ভোট বাংলাদেশকে শুধু সাংবিধানিক কাঠামোতেই ফেরাবে না বরং ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর প্রথমবারের মতো সত্যিকার জনরায়ের ভিত্তিতে একটি সরকারকে ক্ষমতায় নিয়ে আসবে। তিনি মনে করেন, দুর্বল প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে পোশাক রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল ধীরগতির অর্থনীতি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবসহ একগুচ্ছ চ্যালেঞ্জ নতুন প্রশাসনকে মোকাবেলা করতে হবে। নতুন সরকারকে সামলাতে হবে ভারতের সাথে সম্পর্কের ইস্যুসহ যুক্তরাষ্ট্র চীন প্রতিযোগিতার প্রভাব ও রোহিঙ্গা ইস্যুসহ জটিল পররাষ্ট্রনীতির বিভিন্ন দিক।
টোমাস কিন লিখেছেন, হাসিনার পতনের পর হিযবুত-তাহরিরের মতো উগ্রবাদী গোষ্ঠীর ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং এদের মোকাবেলায় রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তার মতে, নির্বাচনের পরে নতুন সরকারকে রাজনৈতিক সমঝোতার জটিল ইস্যুও মোকাবেলা করতে হবে। কারণ, ইতিহাস ও শক্ত ভোট ভিত্তির কারণে আওয়ামী লীগকে অনির্দিষ্টকালের জন্য রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা সম্ভব নয়।
তিনি মনে করেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে দলের কর্মকাণ্ডের কারণে নতুন নেতৃত্বের অধীনে হলেও আওয়ামী লীগকে আবার নির্বাচনী রাজনীতিতে ফিরতে দেওয়া রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হবে। আওয়ামী লীগের কোনোভাবে প্রত্যাবর্তনের শর্ত নিয়ে প্রধান রাজনৈতিক দল ও প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ঐকমত্য গড়ে উঠলে এ ইস্যুকে কেন্দ্র করে সংঘাতের ঝুঁকি কমবে। তিনি মনে করেন এটি করতে হলে আওয়ামী লীগকে আগে সহিংসতা ও গণহত্যার জন্য জন্য অনুশোচনা করতে হবে, যা করতে শেখ হাসিনা এখনো অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছেন। তবে এক্ষেত্রে সমঝোতায় পৌঁছাতে ভারত ও অন্য বিদেশি প্রভাবশালী সরকারগুলো মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে পারে বলে তিনি মনে করেন। তিনি মনে করেন, দেশের তরুণদের আশা পূরণে ব্যর্থতার কারণে আগামী বছরগুলোতে দেশের স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি আসতে পারে।
এ বিষয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ডঃ ইফতেখারুজ্জামানের বক্তব্য হলো, নতুন প্রশাসনের সামনে আইন শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং একই সাথে দেশ শাসন ও রাজনীতির ক্ষেত্রে পুরনো সংস্কৃতির পরিবর্তন করে ভিন্নতা তুলে ধরে জনমনে আস্থা অর্জন করাই হবে নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি মনে করেন, কর্তৃত্ববাদ ও স্বৈরাচার পরবর্তী সময়ে আইন শৃঙ্খলার যে অবস্থা তৈরি হয়েছে সে বিবেচনায় আইন শৃঙ্খলা ঠিক করা এবং রাষ্ট্র ও সরকার যে সেটি করতে সক্ষম সেই আস্থা জনমনে ফিরিয়ে আনার চ্যালেঞ্জ তাদের থাকবে। ক্রাইসিস গ্রুপের নিবন্ধেও বলা হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা খাতে সংস্কার প্রায় অগ্রগতি পায়নি এবং পুলিশ বাহিনীর ওপর মানুষের আস্থা ফেরেনি। এছাড়া পুলিশের দুর্বল অবস্থানের কারণে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সন্ত্রাস, বিশেষ করে দল বেঁধে মানুষকে পিটিয়ে হত্যা বেড়েছে। র্যাব, ডিজিএফআইয়ের মতো সংস্থাগুলোতে সংস্কার হয়নি বলে ওই নিবন্ধে বলা হয়েছে।
এ বিষয়ে অন্তত তিনটি মানবাধিকার সংগঠন ২০২৫ সালের মানবাধিকার প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রদত্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সন্ত্রাস বছর জুড়ে আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। যা জনজীবনের ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এসব সংগঠন বলছে, ২০২৫ সাল জুড়ে সন্ত্রাসের মাধ্যমে দেশজুড়ে ভিন্নমত ও রাজনৈতিক ভিন্ন আদর্শের মানুষের ওপর হামলা, নিপীড়নের ঘটনা ক্রমাগত বাড়লেও এর বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃশ্যমান পদক্ষেপ খুব একটা দেখা যায়নি। এমনকি পুলিশের উপস্থিতিতেও বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে।
এসব ক্ষেত্রে ব্যবস্থা না নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের নিষ্ক্রিয়তা নাগরিকদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা এবং ভয় আরো বাড়িয়ে দিয়েছে বলেও অনেকে মনে করেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আইনশৃঙ্খলা পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়েছে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, থানা, পুলিশ, সচিবালয়সহ কোথাও কোন চেইন অব কমান্ড নেই। এ বিশৃঙ্খলা থেকে মুক্তিটাই হবে নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। বিভিন্ন জায়গায় কিছু ব্যক্তি দানব হয়ে ওঠেছে এবং তারা যা খুশী করছে। দেখার বিষয় হবে পরবর্তী সরকার কিভাবে এটি মোকাবেলা করে।
ব্রাসেলস ভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ’ তাদের এক নিবন্ধে নতুন সরকারের জন্য বেশ কয়েকটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করেছে। এবার সংসদ নির্বাচনের সাথে গণভোটও হয়েছে সাংবিধানিক সংস্কারের লক্ষ্যে। ফলে নির্বাচনে বিজয়ী দল রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য সাংবিধানিক সংস্কার, সংসদে আইন প্রণয়ন ও রাষ্ট্রপরিচালনা-এ তিন ক্ষেত্রেই ভূমিকা রাখার সুযোগ পাবেন। কিন্তু এক্ষেত্রে অতীতের সরকার ও রাজনীতির যে সংস্কৃতি সেটির পরিবর্তে জনপ্রত্যাশা পূরণে কতটা ভিন্নতা তারা দেখাতে পারেন সেটিও নতুন সরকারের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হবে বলে মনে করেন তত্তাভিজ্ঞ মহল।
তবে ক্রাইসিস গ্রুপের নিবন্ধে আওয়ামী লীগকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সমঝোতার যে চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে সে বিষয়ে টিআইবি মনে করে, নতুন সরকারকে প্রতিবেশী ভারতের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ও আওয়ামী লীগের নিজের পদক্ষেপের ওপর অনেকটাই নির্ভর করতে হবে। ইতোমধ্যেই ঢাকায় বিএনপির সাবেক চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার জানাযার দিনে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকায় আসা এবং পরে ভারতের লোকসভায় তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশকে ভারত সরকারের দিক থেকে বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারের সাথে কাজ করার আগ্রহের একটি ইঙ্গিত বলেও মনে করছেন অনেকে। টিআইবির পক্ষে বলা হয়, আওয়ামী লীগের ইস্যুটি দলটির নিজের ওপর অনেকখানি নির্ভর করে। পাশাপাশি বড় প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্কের বিষয়টিও নতুন সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে। কূটনৈতিক বোদ্ধারা মনে করছেন, ভারতের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চ্যালেঞ্জ যেমন নিতে হবে, তেমনি রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রভাবশালী কিছু দেশ যেভাবে চাপ তৈরি করতে শুরু করেছে নতুন সরকারকে সেটিও সামলাতে হবে। একই সাথে স্থবির ব্যবসা বাণিজ্যকে সচল করা এবং পুরোপুরি বিশৃঙ্খল হয়ে পড়া শিক্ষা খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর চ্যালেঞ্জও নতুন সরকারকে নিতে হবে।
জুলাই বিপ্লব পরবর্তী একটি অনির্বাচিত সরকার দেশ পরিচালনা করলেও এখন একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করতে যাচ্ছে। দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরাচারী শাসনে রাষ্ট্রীয় কাঠামোগুলো ভেঙে ফেলা হয়েছে। দলীয়করণ ও আত্মীয়করণ করা হয়েছে সবকিছু। কিন্তু ১৮ মাসে অন্তর্বর্তী সরকার পুরোপুরি সে বৃত্ত ভাঙতে পারেনি। যদিও এ ক্ষেত্রে তাদের অন্তরিকতার কোন অভাব ছিলো না। তাই নতুন সরকারের অগ্রাধিকার কাজ হবে সে অশুভবৃত্ত থেকে দেশকে বের করে আনার জন্য। একই সাথে দেশের ভঙ্গুর গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে নিজ কক্ষে ফিরে আনাতে হবে। গণভোটে পাশ হওয়া জুলাই সনদ কোন টালবাহানা ছাড়া পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে হবে। গণরায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে তাদেরকে আবারো গণবিচ্ছিন্ন হতে হবে।
নতুন সরকার একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি উত্তরাধিকার সূত্রে পাচ্ছে। তাই অর্থনীতি পুনরুদ্ধারকে অবশ্যই অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিরোধী দলকে আস্থায় নিয়েই তাদেরকে এগুতে হবে। রোহিঙ্গা সমস্যা ও ভারতের সাথে অমিমাংসিত বিষয়গুলো পারস্পরিক সোহার্দ, সমসর্যার সাথে যৌক্তিক সমাধানের বের করতে হবে। সর্বোপরি দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিকীকরণ, দুর্নীতি দমন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা হবে নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। তাই নতুন সরকারকে পথ চলতে হবে অতি সন্তর্পণে।
www.syedmasud.com