মো: নাহিদ আলী
১৯৪৭ সাল, পৃথিবীর ইতিহাসে নতুন দুটি দেশের গোড়াপত্তন ঘটে। ভারত ও পাকিস্তান। পাকিস্তানের আবার দুটি অংশ, পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান। একই দেশ অথচ ভৌগোলিক দুরত্ব প্রায় ১২০০ কিলোমিটার। ৪৭-এর স্বাধীনতার পর উভয় পাকিস্তানের ক্ষমতা চলে যায় পশ্চিম পাকিস্তানি নেতাদের নিয়ন্ত্রণে। তারা ক্ষমতা কুক্ষিগত করেন। শুরু হয় রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা। সেই যে শুরু হয়েছে অস্থিতিশীলতা যা আজও ভিন্ন ভিন্ন স্বাধীন দেশ হলেও উভয় দেশেই বিরাজমান। আমরা যদি পাকিস্তানের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে যায় তাহলে দেখতে পাবো, ১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর এখন পর্যন্ত পাকিস্তানের কোন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী নির্ধারিত ৫ বছর মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি। সর্বশেষ ১০ এপ্রিল ২০২২ সালে ইমরান খান জাতীয় সংসদে আস্থাহীনতার ভোটে পরাজিত হয়ে পদত্যাগে বাধ্য হন। পাকিস্তানে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি অপসারণের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ, এক কথায় পাকিস্তান আলাদা হওয়ার পর থেকে বর্তমানকাল পর্যন্ত। কান্ট্রি প্রধান ক্ষমতাচ্যুত করার ক্ষেত্রে সেদেশের সেনাবাহিনী বিশ্বের ইতিহাসে সেরা এবং অগ্রগামী। এইদিকে চলতি বছরের গত ১২ নভেম্বর পাকিস্তান ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সেনাপ্রধানের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে বিল পাশ করেছে শাহবাজ শরিফ সরকার। এতে বিশ্বের অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভবিষ্যতে আরও অস্থিতিশীলতার দিকে আগাচ্ছে। আর এই অস্থিতিশীলতা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভিত্তিকে ক্রমাগত দুর্বল করেই চলেছে।
এবার আসা যাক বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে। সংক্ষেপে বললে, ১৯৭১ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান সেনা ক্যূ-এর মাধ্যমে স্ব-পরিবারে নিহত হন। এরপর জেনারেল জিয়াউর রহমান অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ১৯৭৭ সালে হ্যাঁ না ভোটের মাধ্যমে তাকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে বৈধতা দেয় দেশের জনগণ। এরপর ঘটে দেশের ইতিহাসের অন্যতম একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা; ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সেনা বিদ্রোহে তাকে শহীদ করা হয়। এরপর ১৯৮২ সালে ক্ষমতায় আসেন জেনারেল হোসেইন মোহাম্মদ এরশাদ। তিনিও ১৯৮৩ সালে হ্যাঁ না ভোটের মাধ্যমে জয়ী হয়ে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতা কুক্ষিগত করেন এবং একই বছর পুনরায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত দেশ পরিচালনা করেন। পরবর্তীতে উক্ত বছরেই ব্যাপক গণ আন্দলোনের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। নামের সাথে যুক্ত হয় স্বৈরশাসক পদবি। এরপর ১৯৯১-৯৬ বেগম খালেদা জিয়া (বিএনপি) নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারী একতরফা, নির্বাচন আয়োজন করেন। যেখানে বেগম জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি বিজয় অর্জন করেন। তবে এই নির্বাচনের বিরুদ্ধে আন্দোলন, হরতাল, অবরোধ ও সহিংসতা সৃষ্টি হয় যার পরিপ্রেক্ষিতে বেগম খালেদা জিয়া মাত্র ১২ দিনের মাথায় সংসদ বিলুপ্ত করতে বাধ্য হন। এরপর ১৯৯৬ সালেই ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয় এবং একই বছরের ১২ জুন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে পুনরায় ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। অর্থাৎ ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে ক্ষমতায় আসেন শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ। এবং ২০০১-২০০৬ মেয়াদে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি আবারো ক্ষমতায় আসেন। এরপর বেগম খালেদা জিয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করলে ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধিনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় যেখানে ২০০৯-২০১৪ মেয়াদে আওয়ামী লীগ নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় আসে। এরপর শুরু হয় ক্ষমতা কুক্ষিগত করার সিস্টেম। পিলখানা হত্যাকান্ড, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল, একপক্ষীয় নির্বাচন আয়োজন, দিনের ভোট রাতে করে নেওয়া ইত্যাদি। এভাবে শেখ হাসিনা প্রায় ১৬ বছর ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখেন। সর্বশেষ ২০২৪ সালে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ ছাড়াই নির্বাচন আয়োজন করে ক্ষমতা চূড়ান্তভাবে কুক্ষিগত করেন ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা। কিন্তু কোটাবিষয়ক আদালতের একটি রায়ের বিরুদ্ধে সহসা কোটাবিরোধী আন্দোলন শুরু হয় দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের নাম দেন “বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন”। পরবর্তীতে এই কোটাবিরোধী বৈধ আন্দোলনের দাবি মেনে না নিয়ে স্বৈরাচার শেখ হাসিনা সরকার আন্দোলন দমনের নামে প্রায় ১৪০০(সরকারি হিসাব) /২০০০ (জাতিসংঘের হিসাব) মানুষ হত্যা করে। যার ফলে তীব্র আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট।
অর্থাৎ আমরা ১৯৭২ থেকে শুরু করে ২০২৪ পর্যন্ত যতগুলো সরকারপ্রধানের আমলনামা দেখলাম। সেখানে হত্যাকাণ্ডের শিকার ও গণ আন্দলোনের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন প্রায় সকলেই। এতেই বোঝা যায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি শুরু থেকেই অস্থিতিশীল। আর এহেন অস্থিতিশীল পরিস্থিতি দেশের উন্নয়নের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা করাপশন বৃদ্ধি করে। আর করাপশন দেশের সকল উন্নয়নের অন্তরায়। করাপশন তথা দুর্নীতি একটি দেশের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষা, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, পরিবেশগত দিকসহ সকল ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এখন প্রশ্ন হলো কিভাবে করে? করাপশন যখন উল্লিখিত দিকসমূহের সাথে স্বাভাবিকভাবে জড়িয়ে যায় তখন সেগুলো সঠিকভাবে ফাংশন করতে পারে না, ফলে প্রশাসনিক দুর্বলতা পরিলক্ষিত হয়, পলিটিক্যাল ভায়োলেন্স দেখা দেয়, অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙ্গে পড়ে, শিক্ষাখাতে দুর্বলতা আসে, পর্যাপ্ত সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পরিবেশগত অগ্রগতি ব্যাহত হয়। অর্থাৎ রাজনৈতিক অস্থিরতা উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে বাধা ও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। আর উন্নয়ন অগ্রগতি না হওয়ায় দেশের জনগণ বছরের পর বছর ভোগান্তি উপভোগ করে। সুতরাং দেশ বিনির্মাণে সকল দলের রাজনীতি হতে হবে ন্যায়পরায়ণ, যোগ্যতাভিত্তিক, করাপশন-ফ্রি, স্থিতিশীল, জনকল্যাণমুখি ও আধিপত্যবিরোধী। নির্বাচিত রাজনৈতিক দলকে মনে রাখতে হবে জনগণের সমর্থনের মাধ্যমে তারা দেশ বিনির্মাণের সুযোগ পেয়েছে। সেই সুযোগ যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে। বাংলাদেশের ছোট বড় যত রাজনৈতিক দল রয়েছে তারা যদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তিতে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে তাহলে গ্রাম থেকে শহর অর্থাৎ দেশের সর্বত্র উন্নয়ন অগ্রগতি ও শান্তি বিরাজ করবে। তবে এটা তখনই সম্ভব যখন রাজনীতিবিদদের নৈতিক জ্ঞান, ন্যায়পরায়ণতা ও স্বদিচ্ছা থাকবে।
লেখক : শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।